দু মাস যেতে না যেতেই শুভেন্দু অধিকারীর ” সকালে জমা বিকেলে খরচ” নীতি ঘোষণা, তারপরেই পুলিশের এনকাউন্টার! বুলডোজারের পর গুণ্ডা দমন নীতি,তারপরেই এনকাউন্টার,এ যেন বাংলায় শুরু মধ্যযুগীয় যোগী রাজ!
পশ্চিমবঙ্গের গত অর্ধ শতকের ইতিহাসে এই প্রথম এনকাউন্টার! বারুইপুর ধর্ষণ কাণ্ডে ধৃত আসামি প্রভাস মন্ডল খুন হলেন পুলিশের হাতে।
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে ব্যাপক উল্লাস বাঙালির একাংশের যাঁরা এর আগে ভোট হারা ২৭ লাখ নাগরিকের মধ্যে প্রচুর বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গার সন্ধান পেয়ে আনন্দে দুহাত তুলে নেচেছিল। যাঁরা অপরাধী ধরা পড়লেই তার ধর্ম দেখে লম্ফ ঝম্প দেন, তারা কেউ ভাবলই না যে এনকাউন্টার করা হয় আসল অপরাধী আড়াল করতে আর অপরাধের পিছনে প্রকৃত মাস্টার মাইন্ডকে বাঁচাতে। নইলে প্রকৃত সত্য উদঘাটনে যে সব কথা বলে দিচ্ছিল, সেই সম্ভাব্য রাজসাক্ষী সরিয়ে পুলিশের লাভ কি?
নাকি পুলিশকে সরিয়ে দিতে হল তদন্তে বড় কাউকে বাঁচাতে??? সন্দেহ দানা বাঁধছে আরও গভীরে।উঠে আসছে অনেক তথ্য ও ততোধিক সংশয় ও প্রশ্ন।
যদিও এনকাউন্টারের সময় সর্বদা যে কথাগুলো পুলিশ বলে ,এখানেও সেই একই গল্প চলছে।
কী সেই গল্প? গল্পটা বলা হচ্ছে পুলিশের পক্ষ থেকে। পুলিশের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনতাই করে পুলিশকেই নাকি গুলি ছুঁড়ে ছিল আসামি।
কিন্তু পুলিশের বয়ান থেকেই এই কথার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশ বলেছে পুলিশের কাছ থেকে রিভলবার ছিনতাই করে সে পালাচ্ছিল। পালাতে গিয়ে এক রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে । প্রশ্ন এখানে : যে পালায়, পুলিশ তাকে গুলি করলে, গুলি তার পায়ে বা পিঠ ফুঁড়ে গুলি বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে যেতে ও পারে।
কিন্তু মৃত প্রভাস মন্ডল এর বুকে গুলি লেগেছিল এবং লেগেছিল কোমরের উপরে। সন্দেহ এখানেই।তাহলে কি তাকে গুলি করা হয়েছে সামনে থেকে? দাঁড় করিয়ে?
এনকাউন্টার এভাবে করা হলো কেন?
তদন্ত চলাকালীন আসামির এনকাউন্টার মানে তদন্ত ব্যহত হওয়া। নিট ফল প্রকৃত সত্য হয়তো আর কোনদিন বেরোবে না, এমনই আশঙ্কা তাই স্বাভাবিক। বারুইপুর কাণ্ডের অন্যতম অভিযুক্ত আসামি প্রভাষ মন্ডলকে এনকাউন্টার করে মেরে ফেলায় সেই আশঙ্কার মেঘ জমছে এখন বাংলার নাগরিক সমাজমনে।
বিরোধীদের অভিযোগ, রাজসাক্ষী হয়ে উঠছিল প্রভাস। সে সবার নাম বলে দিচ্ছিল। তাই কি প্রমাণ লোপাটের দরকার হল বলেই বিনা বিচারে
এই ধর্ষণকাণ্ডের রাজসাক্ষী হয়ে উঠেছিল প্রভাস মন্ডল। নিজেই সে সমস্ত কথা বলছিল এমনকি মোবাইলে সমাজ মাধ্যমে তার স্বেচ্ছায় এর সমস্ত কথা বলবার এবং অভিযুক্তদের নাম উল্লেখ করে তাদের চিনিয়ে দেওয়া ও তাদের কার কী ভূমিকা ছিল সেটাও বলে দিচ্ছিল। সেই কারণেই কি প্রকৃত সত্য চাপতে প্রভাস মন্ডলকে সরিয়ে দেওয়া হল??
পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত সন্দেহজনক।
পুলিশ যে বয়ানটা বলছে তার কতটুকু সত্য ? পুলিশ নিজের স্বপক্ষে প্রমাণ দিয়েছে কি?
সাধারণ বিষয় হলো পুনর্নির্মাণের সময় পুলিশের সাথে ক্যামেরা থাকে। ভিডিওতে তোলা হয়। এখনও সেরকম ভিডিওগ্রাফি পুলিশ দেখাতে পারে নি।
বলা হচ্ছে, রাত্রে সাড়ে এগারোটা থেকে একটার মধ্যে বারুইপুর থানার পুলিশ অভিযুক্ত কে নিয়ে তদন্ত করতে যায় সেই জলাধারের স্পটে যেখানে বালিকার মৃতদেহ পাওয়া যায়।
প্রথম প্রশ্ন: একজন অভিযুক্তকে তদন্তের স্বার্থে ঘটনার পুন:নির্মাণ করতে দিনে না নিয়ে গিয়ে অত রাত্রে নিয়ে যাওয়া হল কেন?
দ্বিতীয় প্রশ্ন, আসামিকে তো হাতে হ্যান্ডকাফ এবং কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাওয়ার কথা। সে পালাতে পারে এমন সম্পূর্ণ মুক্ত অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হল কেন?
তৃতীয়ত, অতগুলো পুলিশের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও আসামির পালিয়ে যাওয়ার মতন সম্ভাবনা তৈরি হয় কি করে?
বারুইপুর ধর্ষণ কাণ্ডে যে আসামি দেখিয়ে দিয়েছিল জলের মধ্যে কোথায় বালিকার দেহ ফেলা হয়েছে, যে আসামি পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আগেও পালায় নি, বরং প্রথম থেকেই স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়ে বলে দিচ্ছিল নিজে থেকেই কারা কারা যুক্ত, সেই আসামি বলে দেয় বিজেপির স্থানীয় এক গুরুত্বপূর্ণ নেতার নাম।তাঁর মারা যাওয়া মানেই হলো প্রকৃত সত্য উদঘাটনে ব্যাহত হওয়া।
এর আগে এই গণধর্ষণ কান্ডে যুক্ত একজন গণপিটুনিতে মারা গেছে। কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই মুখ্যমন্ত্রী বলে দেন যে গণপিটুনিতে মৃত ব্যক্তি ছিল সম্পূর্ণ নির্দোষ। তদন্ত ছাড়াই কী করে জানলেন মুখ্যমন্ত্রী? তার পুলিশ বলেছে বলে?. পুলিশ তো কাউক আড়াল করতে ওই কথা বলতে পারে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই একজনকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা আর অন্য কাউকে এনকাউন্টার?. বিচার বিভাগীয় তদন্ত হোক এই দুই ঘটনাকে এক সূত্রে গেঁথে। তাহলে হয়ত অনেকাংশে সত্য প্রকাশিত হবে।
অপরাধ যত নৃশংস হোক, সেটা নির্মূল করার কথা বলে, শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে বিচার না করে এনকাউন্টার করা চরম অপরাধ। এই জন্য বারবার সুপ্রিম কোর্ট পুলিশের এনকাউন্টার নিয়ে তুলোধোনা করেছে। যোগী আদিত্যনাথের তীব্র সমালোচনা করা হয় ইতিপূর্বে দিল্লি হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টে উত্তরপ্রদেশে পুলিশের এনকাউন্টারের জন্য। সেখানে এটাই প্রশ্ন: এই রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী আগে থেকেই কাউকে নির্দোষ বলছেন, কাউকে দোষী বলছেন কিংবা কখনও বা ঘটনায় সাম্প্রদায়িক রং চাপিয়ে দিচ্ছেন। বিজেপি সরকার আর তার পুলিশ কি বিচার ব্যবস্থার উর্দ্ধে?
প্পপসব শেষে আরও একটা কথা: রাজ্য কি চলবে আইনের বিচারে নাকি ক্ষমতার গা- জোয়ারিতে, ইচ্ছে আর নৈরাজ্যে? সকালে জমা ( গ্রেপ্তার) ,আর বিকেলে খরচ ? একথার মানে কি? যাকে ইচ্ছে তাঁকে তুলে আনা আর হত্যা করা? একি মগের মুল্লুক নাকি? কোন সভ্য সমাজে এই কথা বলা যায়?
বিনা বিচারে মুখ্যমন্ত্রী বা পুলিশ মন্ত্রী কোনো অপরাধীকে হত্যার নির্দেশ দিতে পারেন?? সংবিধান কি সেই অধিকার কোনো মুখ্যমন্ত্রী,পুলিশ মন্ত্রী বা কাউকে দিয়েছে?
আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি বাংলা সমাজের শিক্ষিত মানুষের ব্যবহার দেখে যারা এন কাউন্টারের সমর্থনে বলছেন ঘৃণ্য অপরাধীকে বাঁচিয়ে রাখার কোন অর্থ হয় না,তারা কি দশজনে একসাথে বলে নিজেরাই ঠিক করে দেবেন অপরাধী কে? আগে তো আইনের বিচারে ঠিক হবে অপরাধী কিনা। আপনি আমি কাউকে অপরাধী বলে দিলেই যদি সে অপরাধী হয় তাহলে তো আমরা সবাই সবাইকে নিকেশ করার জন্য একই কথা বলতে পারি ইচ্ছাকৃতভাবে , কোন অভিসন্ধি নিয়ে যে এ কথা বলা হচ্ছে না কারোর বিরুদ্ধে তার প্রমাণ? নাগরিক বাঙালির একাংশের কি বুদ্ধি, শিক্ষা, নৈতিকতা, বিচার বোধ সবকিছুই লোপ পেল?










