নিজের স্কুলের বিষয়ে খারাপ খবর পেলে মন ভারাক্রান্ত হয়, বিশেষত যদি তা হয় এক তরতাজা তরুণ ছাত্রের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর খবর এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একধরনের সিস্টেম ফেইলিওর।
নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলের এক ছাত্র গরম চা খেয়ে ফেলার ফলে মারা গেছে, এটা শুনে চিকিৎসক হিসেবে প্রথম প্রশ্ন জেগেছিল চোকিংয়ের ফলে তাৎক্ষণিক মৃত্যু কিনা। পরে বিভিন্ন জায়গা থেকে টুকরো টুকরো খবরে জানতে পারলাম ছেলেটি ঘটনার পরেও বেশ খানিকক্ষণ জীবিত ছিল এবং পরে প্রবল শ্বাসকষ্ট সহ্য করে চলে গেছে। শুধুমাত্র গরম চা গলায় ঢেলে ফেলার ফলেই এতটা হল, নাকি চায়ের মধ্যে অন্য কিছু মিশে গিয়েছিল, যা থেকে তার অ্যালার্জিক রিয়্যাকশন বা অন্য কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তা জানি না। পোস্ট মর্টেম, ভিসেরা পরীক্ষা, টক্সিকোলজির পরীক্ষা ইত্যাদির পর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এবং ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরাই বলতে পারবেন।
কিন্তু অন্য কতগুলো করুণ দিক ধরা পড়ল। বুঝতে পারলাম, ঘটনাটির গুরুত্ব প্রথমে কেউ বুঝতে পারেনি। ছেলেটি নিজেও কষ্ট চেপে ক্লাস করার চেষ্টা করছিল এবং বন্ধুদেরও চুপচাপ ক্লাস করতে বলছিল। ক্লাসে প্রায় ১০০% উপস্থিতি আশা করা হত আমাদের সময়, এখনও হয়ত তাই। কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে যেমন একটা জীবনের প্রশিক্ষণ ছিল বা আছে, তেমনি একধরনের শাস্তির ভয়ও কাজ করত বা এখনও করে। সেই ভয় হয়ত ছেলেটিকে এবং তার বন্ধুদের কাবু করে রেখেছিল অনেকক্ষণ। পরে পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকার পরেও হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেরি ইত্যাদির বিভিন্ন খবর পেলাম। (তার মধ্যে কিছু পরস্পরবিরোধী হলেও মূল বিষয়টা বোঝা যাচ্ছে।)
আশ্রমের মধ্যে যে হাসপাতাল আছে, তার নাম ‘আরোগ্য ভবন’। আমাদের সময় অন্তত খুব উঁচু দরের চিকিৎসার ব্যবস্থা সেখানে ছিল না। জ্বরজারির চিকিৎসা হত। গুরুতর কিছু হলে রামকৃষ্ণ মিশন সেবাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো হত। এখন কাছাকাছি বেশ কিছু মোটামুটি মানের নার্সিংহোম এবং কিছু বড় হাসপাতাল আছে, যেখানে আরও তাড়াতাড়ি পৌঁছানো সম্ভব। শুনলাম আরোগ্য ভবনের চিকিৎসক সেরকম প্রয়োজনের কথা জানিয়েছিলেন, কিন্তু সিস্টেমের মধ্যে একরকম লাল ফিতের ফাঁস আছে, যার ফলে কে অথরাইজ করবে, কার অনুমতি নিয়ে কোথায় নিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের নিজেদের পিঠ বাঁচবে, এসব নিয়ে দ্বিধা কাজ করেছিল হয়ত। অথবা স্রেফ গুরুত্ব বুঝতে না পারা বা না চাওয়া। সেসবের ফলে সেই ছেলেটি যে ভবনে (হস্টেল) থাকত, তার ওয়ার্ডেন দেরি করে ফেলেন।
হেডমাস্টারকে জানানোর প্রসঙ্গ উঠেছিল শুনলাম এবং তখন হেডমাস্টারমশাই নাকি কোনো মিটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন এবং বিরক্ত করলে রাগ করবেন, এরকম কথাবার্তা হয়েছিল! এটা আপত্তিকর। প্রায়রিটির বোধ থাকা আবশ্যক। কোনো ছাত্রের জীবন বিপন্ন হতে পারে মনে হলে, এমনকি তার সামান্য আভাস থাকলে কোনো মিটিং, ক্লাস, পরীক্ষা… কোনোকিছুই তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। আমি যে সন্দীপনকে চিনি (সন্দীপন মহারাজ, সন্ন্যাস নাম ভুলে গেছি, আমাদেরই স্কুলের প্রাক্তনী এবং আমাদের জুনিয়র), সেই যদি প্রধানশিক্ষক থেকে থাকে, তাহলে সে খুব একটা ভয়ঙ্কর ব্যক্তি নয়। তাকেও এই গুরুতর খবরটা জানাতে এত ভয়! তার মানে ভয়ের বাতাবরণটা সিস্টেমের মধ্যেই আছে। একটা অনমনীয় হায়ারার্কির মধ্যে আছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। যে বিবেকানন্দ কাউকে চ্যালেঞ্জ করতে ভয় পেতেন না, এমনকি নিজের গুরুকেও পরীক্ষা করতে ছাড়েননি, তাঁর আদর্শে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এত ভয় বা রিজিড হায়ারার্কি কীসের, যার ফলে এক ছাত্রের প্রাণ চলে যেতে পারে? বরং স্কুলের ছেলেরা যে শেষ অব্দি রুখে দাঁড়িয়েছে, প্রতিবাদ করছে, এটাই আশাব্যঞ্জক।
আমার স্কুলটাকে আমি খুব ভালোবাসি। হয়ত বছরের পর বছর চব্বিশ ঘণ্টা সেখানে থেকেছি, বড় হয়েছি বলে আরও বেশি। স্কুল বলতে স্কুল, ঘরবাড়ি বলতে ঘরবাড়ি, পরিবার বলতে পরিবার, সবই তো ছিল ওটাই। প্রাচীন ভারতীয় আশ্রমিক ব্যবস্থা বা গুরু-শিষ্য সম্পর্কের আবহ ছিল এবং অনস্বীকার্যভাবে অন্যান্য আধুনিক শিক্ষাকেন্দ্রের সঙ্গে আমাদের পাঠক্রম এক হলেও সামগ্রিক শিক্ষার কিছুটা তফাৎ ছিল। কিছুটা অথরিটারিয়ান ব্যাপার ছিল, কিন্তু স্নেহ-ভালোবাসার একটা স্রোতও বয়ে যেত, নইলে এই জীবনব্যাপী ভালোবাসার জন্ম হত না৷
রামকৃষ্ণ মিশনের স্কুল, দূর থেকে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মনে হয়। সেই কারণে আমার পরিচিত মহলে অনেকেই স্কুলটিকে ভালো নজরে দেখেন না। সবকিছু সত্ত্বেও আমি স্কুলটাকে ভালোবাসি বলে আমাকেও সন্দেহের চোখে দেখেন। তবু আমি আমার স্কুলকে ভালোবাসি এবং এরপরেও ভালোবাসবো, কারণ ভালোবাসা খুব দামি। কিন্তু স্কুলকে ভালোবাসা মানে তো স্কুলের ছাত্রদেরও ভালোবাসা। যে ছেলেটি মরে গেল, তাকে ভালোবাসা, তার জন্য শোকার্ত হওয়া এবং গাফিলতির গন্ধ পেলে ক্রুদ্ধ হওয়াও বটে। যেসব ছাত্রদের জীবন ভবিষ্যতে অসুরক্ষিত হতে পারে, তাদের জন্য চিন্তিত হওয়াও স্কুলকে ভালোবাসার অঙ্গ।
আমার মনে হয়, আমাদের (প্রাক্তনীদের) উচিত বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা, সত্যের মুখোমুখি হওয়া, ধামাচাপা না দেওয়া, লঘু না করা, সমালোচনা এবং প্রতিবাদ করা। অন্যদের চেয়ে বেশি করে এগুলো করার দায় আমাদেরই। যাঁরা রামকৃষ্ণ মিশনকে এবং নরেন্দ্রপুরকে অপছন্দ করেন, তাঁদের সমালোচনার মধ্যে তাচ্ছিল্য থাকবে, বিরূপতা থাকবে, নির্লিপ্ততা থাকবে। কারো কারো এমনকি গোপন ভালো লাগাও থাকতে পারে নরেন্দ্রপুরের সুনাম নষ্ট হবে ভেবে। আমাদের সমালোচনা এবং প্রতিবাদের মধ্যে থাকবে বেদনা এবং স্কুলের ভালো চাওয়া, তার ভবিষ্যৎকে রক্ষা করার ইচ্ছা। এই বেদনার্ত সমালোচনা এবং প্রতিবাদ না করলে অপরাধ হবে৷
আমরা চাই ঘটনার নিরপেক্ষ এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হোক উপযুক্ত এজেন্সির মাধ্যমে। স্কুলের আভ্যন্তরীণ তদন্ত নয়, কোনোকিছু ধামাচাপা দেবার চেষ্টা নয়, সরকারের তরফে প্রকৃত তদন্ত হোক এবং সব সত্যি উদঘাটিত হোক। দোষী যেই হোক, তার বা তাদের শাস্তি হোক। আমরাও তো ছোটবেলায় শাস্তি পেয়েছি, যা ছিল আমাদের শিক্ষার অঙ্গ। এক্ষেত্রেও শাস্তিটি হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার অঙ্গ। এর মধ্য দিয়ে স্কুলের ব্যবস্থাপনার সবরকম প্রয়োজনীয় সংশোধন হোক এবং ভবিষ্যতে সব ছাত্রের, সব কর্মীর সুরক্ষা, সুস্থতা নিশ্চিত হোক এবং সুস্থতর জীবনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার উপযুক্ত শিক্ষার প্রসার হোক। অন্যায় মেনে নেবার শিক্ষাটা কোনো ভালো শিক্ষা নয় এবং সেই শিক্ষা আমাদের অন্তত দেওয়া হত না। এখন যদি বিনয় বা শ্রদ্ধা শেখানোর নামে সর্বদা মাথা নত করে থাকা শেখানোর প্রচলন হয়ে থাকে, তাহলে সেটার বিলুপ্তি ঘটুক এবং মনুষ্যত্বের সার্বিক শিক্ষা ফিরে আসুক।











