আমার জীবনের সবচেয়ে পছন্দসই মানুষদের তালিকায় একদম সামনের সারিতে থাকবেন করণদা মানে নিমাই করণ, প্রাক্তন WBCS officer। এখন অবশ্য সবদিক থেকেই প্রাক্তন ..
যে কোনো বিষয়ে অনর্গল বকে যেতে পারতেন করণদা, কিন্তু তার খুব favourite topic ছিল বাঙালী অস্মিতা। বারবার বলতেন, দেখো বাঙালী অস্মিতা কখনো মমতাকে বেশিদিন সহ্য করতে পারে না। সরকারি কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার কারণে বামফ্রন্ট সরকারের কাজের ভালো মন্দ অনেক কিছু জানতেন। তাই বামফ্রন্টের একনিষ্ঠ সমর্থক কখনোই বলা যেতো না, আবার ব্যক্তিগত ভাবে ছিলেন অসম্ভব সৎ মানুষ।
যাই হোক মমতার শাসনকালেই করণদা চলে গেছেন, দেখার ‘সৌভাগ্য’ হয়নি বাঙালী অস্মিতার কী হাল হয়েছে! বাঙালী আজ গর্ব করে বলে পুরো ‘ইউ পি মডেল’ চালু হয়ে যাবে! মনে পড়ে গেল, এক সময়ে বলা হতো, ‘ইন্দোনেশিয়া নিলে নাম বাঙলা হবে ভিয়েতনাম’। সত্যি সময় কতো এগিয়ে যায়! ইন্দোনেশিয়ায় এখন দলে দলে মানুষ যান পুরোনো হিন্দু মন্দির দেখতে, আর ভিয়েতনামে স্রেফ বেড়াতে!!
আসলে কে জানে বাঙালী কি সত্যিই খুব এগিয়ে থাকা বুদ্ধিমান জাতি? এতোদিন জেনে বা গর্ব করে এসেছি মহামতি গোপালকৃষ্ণ গোখেলের বিখ্যাত উক্তি, “What Bengal thinks today, India thinks tomorrow”.. এখন তো শুনছি গোখেলজী বাঙালী নিয়ে কোনো কথাই বলেন নি। ১৯০৫ সালের কংগ্রেসের বারাণসী সম্মেলনে উনি নাকি বলেছিলেন, “What educated Indians think today, the rest of India thinks tomorrow”.(Hindustan Times, Sept 22, 2024 by Rahul Sagar). বোঝো কাণ্ড!! আর, আমরা কবে থেকে এই নিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছি, ‘দেখো, মহামতি গোখেল কী বলেছিলেন আমাদের সম্বন্ধে’! আসলে, আমরা বোধহয় ধরেই নিয়েছিলাম, শিক্ষিত বলতে তো সেই সময়ে বাঙালীকেই বোঝাতো, কারণ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিতদের অগ্রভাগেই ছিল বাঙালীরা। Hindistan Times-এর ঐ প্রতিবেদনে আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়া আছে এই বিষয়ে। ভারতে ইংরেজ আমলে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রচলন হয় বাঙলার আগে তাঞ্জোরে (বর্তমান তাঞ্জাভুর) মহারাজা তুলজাজী ভোঁসলের সময়ে ১৭৮৪ সালে খ্রিস্টান মিশনারি ফ্রেডরিক সোয়ার্জের তত্ত্বাবধানে। ইংরেজরা যে শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে গোটা ভারতবর্ষে তাদের প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে, তার উৎস সন্ধানেই মহারাজের এই উদ্যোগ ও স্কুল স্থাপন, সঙ্গে অবশ্যই সোয়ার্জ সাহাবের মিশনারি উদ্দেশ্য। এই কাজে অবশ্য তাদের সহায়ক ছিল ইংরেজ রেসিডেন্ট জন সুলিভান (উটির প্রতিষ্ঠাতা)।
দ্বিতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের পর (১৮০৩-০৫) এর আরো প্রসার লাভ ঘটে। এর মধ্যে ১৮০৩ সালে পরবর্তী মহারাজ সারফোজী চালু করেন রাজ আনুকুল্যে ‘নববিদ্যা কলানিধি সালা’। পরে ১৮০৬ সালে প্রাসাদেই স্থাপন করেন পাশ্চাত্য কলেজের। এই সারোফজী ছিলেন বহু গুণের অধিকারী এবং নিজেই নাকি ‘ক্যাটারাক্ট অপারেশন’ করতেন।
এই পর্বে এক ঝাঁক মারাঠী ছাত্র শিক্ষিত হয় পাশ্চাত্য শিক্ষা ও বিজ্ঞানে। কোম্পানীর হস্তক্ষেপে পরে কলেজ বন্ধ হলেও ছাত্রদের অনেকেই পরে যোগ দেন ত্রিবাঙ্কুর, মহীশূর, বরোদা, ইন্দোর রাজসভায়। এদের মধ্যে ‘ইংলিশ’ সুব্বা রাও-এর অবদান তো প্রচুর, ত্রিবাঙ্কুর (ত্রাভাঙ্কর) রাজ্যের দেওয়ান হিসাবে শিক্ষা-সাহিত্য-কলা-বিজ্ঞান-চিকিৎসা-জ্যোতির্বিদ্যা সমস্ত বিষয়ে পাশ্চাত্যের আধুনিকতার আনয়নে। সাহেবের মতো ইংরেজী বলতে পারতেন বলে তার নামের আগে ‘ইংলিশ’ যোগ হয়ে গিয়েছিল।
তাহলে কি গোখেলজী বাঙালী নয় তার নিজের জাতির প্রশংসাই করতে চেয়েছিলেন ঘুরিয়ে? তিনি তো ছিলেন মারাঠী ব্রাহ্মণ (চিতপাবন সম্প্রদায়ের), তাদের অস্মিতা তো কিছু কম ছিল না!!
যাইহোক, মহামতি গোখেল যাই বলে থাকুন আর যার উদ্দেশ্যেই বলুন, আমরা কেন সারা ভারতই জেনে এসেছে এই অমোঘ শব্দগুলো, “What Bengal thinks today…”
তবে অনেক হয়েছে, সব জিনিস পাল্টাচ্ছে এবার একেও পাল্টাতে হবে। এখন লেটেস্ট ট্রেন্ড হলো, ‘What UP thought (or, acted) yesterday, Bengal will think (or, act) today.’
‘ইউ পির পথ, আমাদের পথ, ইউ পির……
‘৭০ এর দশকে দেওয়ালে লেখা থাকতো না, “চীনের পথ আমাদের পথ, চীনের……..
পঞ্চাশ বছরে বাঙলা তাহলে এগিয়েছে চীন থেকে ইউ পি পর্যন্ত !! অবশ্যই লঙ মার্চ…….
কিন্তু বাঙালী অস্মিতা ?!
করণদাকে তো কবর দেওয়া হয়নি যে সেখানে নড়েচড়ে উঠবে। হিন্দুমতেই পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গেছে, তাই চিন্তা নেই………












