বাম ছাত্রদের মিছিলে সাংবাদিকদের উপর আক্রমণ ঘটায় শুভেন্দু অধিকারী গুণ্ডা আইন কার্যকর করলেন। সাংবাদিকরাও প্রতিবাদ মিছিলে।
কিন্তু একবারও কেউ ভাবছে না আজ সাংবাদিকদের একাংশকে কেন শুনতে হচ্ছে “দালাল”?
মিডিয়া এবং মিডিয়া কর্মীদের (সাংবাদিক??) অবস্থা এক জটিল সংকটে। কে যে সাংবাদিক আর কে যে স্রেফ বেতনভুক মিডিয়া কর্মী যার কাজ সাংবাদিকতার ভেক ধরে কোন দল বা ক্ষমতাসীন শক্তির পক্ষে প্রচার করা সেটা আলাদা করা মুস্কিল হয়ে যাচ্ছে জনগণের পক্ষে। যাঁরা সমাজের কল্যাণে সত্যের পথে অবিচল থেকে সমস্ত রকম অন্যায়, অসাম্য, অত্যাচার ও কুসংস্কার মুক্ত সমাজ গঠনের জন্য কলম তুলে নিতেন হাতে, সেই সাংবাদিক নামের কলঙ্ক যাঁরা তাঁরাই এখন মাঠে নেমে পড়েছেন কোন দল বা সরকারের প্রচারে। হারিয়ে গেছে নিরপেক্ষতা। গুলিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রচারক কিংবা স্রেফ ক্ষমতার দালালদের সঙ্গে, যাঁরা টাকার বিনিময়ে খবর করেন। মুড়ি মিছরি সব একাকার, সত্যিকারের সাংবাদিক কোথায়? খুঁজছে সমাজ।
রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করার ব্রত ছাড়া আগে কোনও সংবাদপত্র বা পত্রিকা জন্ম নিত না। এখন মিডিয়া কর্তারা খোঁজে কোন লাইনে মুখ্যমন্ত্রী খুশি হবেন।
অবশ্য এই অবক্ষয় আজ শুরু হয় নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেদিন ক্ষমতায় এলেন সেই ২০১১ সালেই পরের দিন একটি বহুল প্রচারিত বাংলা দৈনিকের প্রথম পাতায় সম্পাদক লিখেছিলেন “বাংলার ঘরে ঘরে যেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো মেয়ে জন্ম নেয়” বাংলা তারপর দেখেছে সেই সংবাদপত্রের ১৫ বছর একটানা সমর্থন, আর রাজ্যের যাবতীয় সন্ত্রাস, দুর্নীতি, অভয়া, টেট নিয়ে নীরব থাকা। অবস্থা তখন থেকেই এমন করে দেওয়া হয় যে মতবিরুদ্ধ প্রশ্ন তোলা মানে রাষ্ট্র বিরোধিতা, আর তার মানে মাওবাদী। সত্যিটা জানতে চাওয়া মানেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা, এটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। তখন থেকেই মিডিয়ার একাংশের ক্ষমতাসীন দলের পা চাটা ছাড়া কোন গতি নেই।
আর এখন? নিজেদের মধ্যেই খেয়োখেয়ি চরমে। কে চটি চাটা, কে বালিশ চাটা, কে কী কাকে কতটা চাটতে পারে মিডিয়ায় এখন তারই প্রতিযোগিতা। কারণ, রাষ্ট্রের অনুগ্রহে কার ঝুলিতে কী আসছে প্রতিযোগিতা সেটার জন্যই।
অথচ এই বাংলায় দেখেছি করেছি রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে সাংবাদিকতা, মুখ্যমন্ত্রী বা দলের সভাপতির সামনে সেই সব কঠোর প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া। রাষ্ট্রের কড়া সমালোচনা করাটাই ছিল মিডিয়ার কাজ। ক্ষমতাসীন দল কোনোকালেই সেটা হজম করতে পারত না। ফলে দ্বন্দ্ব ছিল, তার জন্য মিডিয়ার ঘাড়ে নেমে আসত দণ্ড। পোহাতে হয়েছে প্রচুর খেসারত। বাম আমলে সংবাদপত্র চালানো আর সাংবাদিকতা করা মানেই রাষ্ট্র নামক সিংহের মুখের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দেশের মানুষের স্বার্থে অপারেশন করা। সেটা কোনোদিনই সিংহের পছন্দ ছিল না, তাই বলে মিডিয়ার অপারেশনও বন্ধ ছিল না। সিপিএমের একটানা ৫২ দিন অবরোধ সত্ত্বেও আনন্দবাজার ৩৪ বছর বাম দল ও সরকারের চোখে চোখ রেখে সংবাদপত্র প্রকাশ করেছে। সঙ্গে একইভাবে বর্তমান, ভগবান ছাড়া ভয় পেতো না, সে সব বাম আমলেই।
আর তার পর, এখন? সকাল থেকেই ঠিক হয়ে যাচ্ছে নবান্ন বা দিল্লির কোন কথা অনুযায়ী কীভাবে স্ক্রিপ্ট লেখা হবে। কাকে কীভাবে ইন্টারভিউ নিয়ে সেটাকেই দাঁড় করাতে হবে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারের জন্য কীভাবে সংবাদ চেপে দেওয়া হবে, কিংবা সংবাদ প্রকাশে কতটা বিকৃত করা হবে। উদ্দেশ্য একটাই: সরকারের লাইন মেনে, মিডিয়া মালিককে মেনে নিজের বেতন লাইন ঠিক রাখা। রাষ্ট্র, শাসক দল আর মালিকের উদ্দেশ্য একই সূত্রে বাঁধা: সেটাই নাকি রাষ্ট্রের স্বার্থ! সেটা প্রচার করার জন্যেই মিডিয়া! তাতেই বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে বিশেষ আরও অনেক কিছুই হাসিল করা। মিডিয়া মালিক যেখানে নিজেই রাষ্ট্রের বন্ধু, তথাকথিত সেই মিডিয়ায় সংবাদকর্মী পাঠকের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে পারবে না, সেটা বলাই বাহুল্য। সবার আগে তাই এখন সাংবাদিক নিজের প্রতি দায়বদ্ধ! আপনি বাঁচলে বাপের নাম, চুলোয় যাক সাংবাদিকতা! সত্য দিয়ে কী হবে? সত্যি লিখলে খবর ছাপা হবে? উল্টে চাকরিটাই যাবে! এমনই একটা স্বাসরোধকারী অবস্থা মেনস্ট্রিম মিডিয়ার। কর্পোরেট মিডিয়ার কাছে সংবাদপত্রের আদর্শ আশা করাই তো অন্যায়, বলেছিলেন আনন্দ বাজার পত্রিকার ভূতপূর্ব সম্পাদক অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে ।
এদিকে সারাক্ষণ মিথ্যে দেখতে দেখতে ক্লান্ত বিরক্ত ক্ষুব্ধ জনগণ। হাতের কাছে পেলে তারা বুঝিয়ে দিচ্ছে। মিথ্যে কথা বললে/ লিখলে তাদের তো এটাই স্বাভাবিক প্রাপ্তি!
যন্তর মন্তরে দাঁড়িয়ে আন্দোলনরত অনশনরত শান্ত ছাত্রদের সম্পর্কে দেশের বড় বড় নামি সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেলের রিপোর্টাররা বলে চলছিল যে তারাই নাকি পুলিশের দিকে পাথর ছুঁড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ধরে ছাত্ররা প্রতিবাদ জানাতে থাকে! এরপরেই সেই মিডিয়া কর্মী বলা শুরু করে সাংবাদিক আক্রান্ত! আদৌ তাঁকে কেউ স্পর্শ করেনি! এটাই যদি সাংবাদিকতা হয়, তাহলে তো জনগণ যোগ্য জবাব দেবে।
মিডিয়া এবং সাংবাদিকরা নিজেদের জায়গা নিজেরাই খুইয়ে ফেলছে দ্রুত। এখনই আর টিভি মিডিয়া আর চব্বিশ ঘন্টা চ্যানেলগুলি দলীয় কর্মী ছাড়া কেউ দেখে না। সন্ধ্যার পর থেকে একটানা তার কথা প্রচারের হল্লা দেখে আনন্দ পায়। শুধু তাই নয়, বিরোধী দমন, বিরোধী নিকেশ, ভোট ব্যাংক তৈরি থেকে বিরোধী ভোটারদের আক্রমণ, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, জোর করে জমি অধিগ্রহণ ও উচ্ছেদের মতো সমস্ত অমানবিক কাজকে উন্নয়নের নামে চালানো এবং সর্বোপরি সমাজকে ধর্মীয় মেরুকরণ করে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার প্রক্রিয়ার মধ্যে সমাজের বুদ্ধিজীবী, শিক্ষিত সমাজ ও ব্যবসায়ী সকলকেই সমর্থক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে তোলা এই মিডিয়া হাউসগুলোর কাজ। এই মহান প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাজ্যের সংখ্যালঘু শ্রেণির মানুষকে হুমকি দেওয়া চলছে, আর সেটাকেই মান্যতা ও ন্যায্যতার জন্য যুক্তি তর্ক খাঁড়া করে সাংবাদিকতার নামে সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ানো চলছে। সাংবাদিকতা ‘এখন সত্যিই’ এক মহান পেশা। সাংবাদিক দেখলেই জনতার মধ্যে থেকে “দালাল” শব্দটা উড়ে আসে।
এভাবেই মেনস্ট্রিম মিডিয়ার মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে। সমাজ মাধ্যমে পোস্ট দেখলেই বোঝা যায়, বিকল্প খুঁজছে মানুষ।











