(গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল বছর দশেকেরও আগে দেশ পত্রিকায়। আমার দেশ পত্রিকায় পাঠানো ও প্রকাশিত একমাত্র গল্প। আবার দিলাম – কেন দিলাম? কোনো কারণ নেই। দিতে ইচ্ছে করল তাই দিলাম)🙏
‘ডাক্তারবাবু, আপনি স্বীকার করুন।’
‘তেষ্টা পেলে পুলিশ কাস্টডিতে কি এক গ্লাস জল পাওয়া যায়?’
‘জল কেন, আপনাকে কফি খাওয়াব। আপনি শুধু স্বীকার করুন, ওদের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ আছে।’
‘ওদের আমি চিনি না।’
‘আপনি কিন্তু বড়সড় ঝামেলায় ফাঁসতে চলেছেন!’
****
মুর্শিদাবাদের একদম প্রান্তসীমায় অবস্থিত গ্রামীণ হাসপাতাল। এখান থেকে বীরভূম বর্ডার এক কিলোমিটারেরও কম। যদিও জায়গাটি মুর্শিদাবাদে, কিন্তু বীরভূমের লাল মাটির শুষ্ক আবহাওয়ার প্রভাব এখানে বেশি। হয়তো সেই আবহাওয়ার প্রভাবেই এই ব্লকে মুসলিমদের চেয়ে আদিবাসীদের জনসংখ্যা বেশি।
গ্রামীণ হাসপাতালটিই এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের বিপদের একমাত্র ভরসাস্থল। নিকটবর্তী কান্দি সাব ডিভিশন হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার। যাতায়াত ব্যবস্থাও খুব খারাপ। রোগ অনেক বাড়াবাড়ি না হলে এই অঞ্চলের বাসিন্দারা সেখানে যেতে চায় না। কান্দি হাসপাতালে দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বশান্ত হয়েছে, এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়।
বরং স্থানীয় গ্রামীণ হাসপাতালে ডাক্তারবাবুরা অনেকটা সহানুভূতি সহকারে তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা শোনেন। তাতে হয়তো তাদের অসুখ ভাল হয় না, কিন্তু সহায় সম্বলহীন মানুষগুলির মানসিক যন্ত্রণা অনেক কমে।
এই হাসপাতালের ডাক্তার চঞ্চল রায় এক জটিল সমস্যায় পড়েছেন। গত এক মাস ধরে হাসপাতালে তিনিই একমাত্র ডাক্তার। আগে দু’জন ছিলেন। একজন বাড়ির কাছাকাছি বদলি হয়ে গেছেন। তাঁর বদলে যিনি এসেছিলেন, চাকরি পাওয়ার পরে এটাই ছিল তাঁর প্রথম পোস্টিং। কম বয়স, অভিজ্ঞতাও কম। প্রথম দিন ডিউটি করার পরে তিনি ‘বহরমপুরে সিএমওএইচ অফিস থেকে একটু ঘুরে আসছি’ বলে সেই যে চলে গেলেন, আর ফেরেননি। একটা গোটা দিন অগুন্তি রোগীর স্রোত সামলেই তাঁর সরকারি চাকরি করার সাধ মিটে গেছে।
আসলে কোনও ডাক্তারবাবুই বাড়ি থেকে বহু দূরে এই খাপছাড়া-গোবিন্দপুরে পড়ে থাকতে চান না। এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থাও খুব খারাপ। নিকটবর্তী রেল স্টেশন সাঁইথিয়া অথবা বহরমপুর। দুটোই প্রায় ষাট কিলোমিটার দূরে। বাস রাস্তার দূরত্ব হাসপাতাল থেকে তিন কিলোমিটার। মাটির রাস্তা। পায়ে হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। এক ঘণ্টা অন্তর কান্দির বাস পাওয়া যায়। বিকেল চারটের পরে কোনও বাস চলে না। চঞ্চল যে এত দিন এখানে কেন পড়ে আছেন কে জানে? হয়তো এর উত্তর তিনি নিজেও জানেন না।
তিনি মেডিক্যাল কলেজের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। শহরের যে-কোনও নার্সিংহোম তাঁকে পেলে লুফে নিত। পড়াশোনা চালিয়ে গেলে এত দিনে এম.ডি করে প্র্যাকটিস জমিয়ে ফেলতে পারতেন। সকলেই বলে গ্রামে পড়ে থেকে তিনি তাঁর কেরিয়ার নষ্ট করছেন।
সবচেয়ে বেশি বলেন তাঁর স্ত্রী চৈতালী। তাঁর মতে, চঞ্চল শুধু নিজের জীবনটাই নষ্ট করছেন না, তাঁর জীবনটাকেও শেষ করছেন। মেয়ের দায়িত্ব তাঁর ঘাড়ে সঁপে দিয়ে দেশোদ্ধার করে বেড়াচ্ছেন। স্কুলের চাকরি আর মেয়ের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে চৈতালী নাকানি-চোবানি খাচ্ছেন। চঞ্চল দু’মাস-তিন মাস বাদে বাড়ি আসেন। তাও তিন-চার দিনের জন্য। বিয়ের আগের প্রেমের উচ্ছাস অনেক আগেই বাতাসে মিলিয়ে গেছে। ক্রমশই তাঁদের সম্পর্ক তিক্ত হচ্ছে। ইদানীং চৈতালী বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছেন।
অথচ চঞ্চল যে খুব আদর্শবান, খুব নিবেদিত প্রাণ তা-ও নন। তাঁর একটাই সমস্যা, তিনি বেশ একগুঁয়ে। তাঁর নিজস্ব চিন্তা-ভাবনার বাইরে তিনি বিশেষ যেতে চান না। পাশ করার পর তিনি প্রথমে এক নার্সিংহোমে যোগ দিয়েছিলেন আর এম ও হিসেবে। সেখানে তাঁর চাকরির মেয়াদ ছিল দু’ঘণ্টা মাত্র। একজন স্ট্রোকের পেশেন্টকে বড় ডাক্তারবাবু ভেন্টিলেটরে তুলতে বলেছিলেন। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘একে ভেন্টিলেটরে তোলার কী দরকার স্যার? এর তো নিশ্বাসে কষ্ট নেই। অক্সিজেন স্যাচুরেশনও ভাল আছে। ভেন্টিলেটরে তুললে এর নিউমোনিয়া হয়ে বাঁচার সম্ভাবনা আরও কমবে।’
বলাই বাহুল্য, নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ এমন বেয়াড়া ডাক্তারকে রাখতে চায়নি।
সেদিনই চঞ্চল বুঝে গিয়েছিলেন, বেসরকারি জায়গায় তিনি কাজ করতে পারবেন না। বড় ডাক্তারবাবু বা নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষের অন্যায় আবদার তাঁর পক্ষে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা সম্ভব নয়। বরং সরকারি চাকরি নিয়ে গ্রামে চলে যাওয়া ভাল। সেখানে তিনি নিজেই নিজের রাজা।
সরকারি হাসপাতালে চাকরি নিয়ে চলে যাওয়ার সময় তিনি নিজের কাজ করার স্বাধীনতাকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। অসুবিধার দিকগুলো খেয়াল করেননি। আজ তিনি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন সরকারি চাকরির আসল মজা।
অন্যান্য বিরক্তিকর রাতের মতোই আজকের রাতটিও শুরু হয়েছে। রাউন্ড দিয়ে এসে তিনি কোয়ার্টারের পথে পা বাড়িয়েছেন, কীটনাশক খাওয়া একজন পেশেন্ট এসে হাজির। মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি। তাকে নিয়ে এসেছে হাভাতে চেহারার এক মহিলা। তার আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে ছেঁড়া জামাকাপড় পরা দুটি ছেলেমেয়ে। কোলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ একটি দুধের শিশু।
চঞ্চল স্টমাক ওয়াশ দেওয়া শুরু করলেন। সিস্টারকে বললেন স্যালাইন, অ্যাট্রপিন ইনজেকশন রেডি করতে। অ্যাম্বুলেন্সের চালক প্রফুল্ল সামনে ঘোরাঘুরি করছিল। জিজ্ঞেস করল, ‘রেফার হবে নাকি ডাক্তারবাবু?
’‘হ্যাঁ। আপনি গাড়ি রেডি করুন।’
সঙ্গে আসা মহিলাটি এতক্ষণে মুখ খুলল। বলল, ‘কান্দি নিয়ে যেতে পারব না ডাক্তারবাবু। পয়সা নাই।’
ততক্ষণে বিষ খাওয়া লোকটির খিঁচুনি শুরু হয়েছে। লক্ষণ খুব খারাপ। আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই হয়তো লোকটি মারা যাবে। বিষ খাওয়া রোগী মারা গেলে হাজার সমস্যা। থানায় খবর পাঠাও। থানা থেকে কিছুতেই কাল সকালের আগে লোক আসবে না। ততক্ষণ হাসপাতালেই মৃতদেহ পড়ে থাকবে। দলে দলে লোক দেখতে আসবে। কান্নাকাটি। চিৎকার চেঁচামেচি। হাসপাতাল ও তাঁর শান্তির দফারফা!
তার ওপর গ্রামের লোকজন পোস্টমর্টেম না করেই ডেডবডি নিয়ে যেতে চাইবে। সে আর-এক হ্যাপা। গত দু-রাতে ঘুমাতে পারেননি চঞ্চল। আজ তাঁর একটা শান্তির ঘুম দরকার।
তিনি প্রায় খেঁকিয়েই উঠলেন, ‘কান্দি নিয়ে যেতে পারবে না মানে? মামাবাড়ির আবদার!’
তারপরও জলোচ্ছ্বাসের মতো রোগী আসতেই থাকল। ডায়রিয়া, জ্বর, পেটে ব্যথা, স্ট্রোক, সাপের কামড়, ডেলিভারি। তার সঙ্গে মারামারি করে দু’পক্ষের গোটা দশেক পুলিশ কেস। তাদের ইনজুরি রিপোর্ট। রাত্রি দশটা অবধি তিনি হাসপাতালেই বসে রইলেন। দশটার সময় সিস্টারকে বললেন, ‘আমি চললাম। খুব খারাপ কিছু না এলে আমাকে ডাকবেন না।’
সিস্টার বললেন, ‘আপনি নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়ুন। ডায়রিয়া, জ্বর, ডেলিভারি যাই আসুক না কেন স্যালাইন-ইনজেকশন দিয়ে রাত্রিটা আমি সামলে নেব। একদম ভোরে এসে আপনি দেখে নেবেন। খুব ইমার্জেন্সি না হলে আপনাকে ডাকব না।’
চঞ্চল বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছিলেন, কাল সকালে আউটডোর শুরু হওয়ার আগেই সিএমওএইচ-কে ফোন করতে হবে লোক দেওয়ার জন্য। তাঁর অন্তত দিন সাতেকের ছুটি দরকার। তিনি আর পারছেন না।
ভাবতে ভাবতেই চঞ্চল ঘুমে পড়লেন। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তিনি তাঁর চার বছরের মেয়েকে স্বপ্নে দেখছিলেন। স্বপ্নেই মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করছিলেন। এমন সময় গ্রুপ-ডি আজিজুলের কর্কশ স্বরে তাঁর ঘুম ভাঙল।
‘স্যার, শিগগিরি চলুন! দিদিমণি ডাকতেছেন।’
মোবাইলে সময় দেখলেন চঞ্চল। একটা বাজে। মানে মাত্র ঘণ্টা দেড়েক ঘুমিয়েছেন তিনি। কী এমন ইমার্জেন্সি হল সিস্টার ডেকে পাঠালেন? হঠাৎ কাঁচা ঘুম ভাঙায় চঞ্চলের চোখ জ্বালা করছিল।
নন্দিনী তাঁকে দেখেই বললেন, ‘সরি স্যার, এমনই পরিস্থিতি হল যে, আপনাকে না ডেকে পারলাম না। লেবার রুমে চলুন।’
লেবার রুমের টেবিলে একজন আসন্নপ্রসবা শুয়ে আছে। নন্দিনী বললেন, ‘এই মেয়েটি একা একা এসে ভর্তি হয়েছে। সঙ্গে একটি ছেলে এসেছিল। সে একে পৌঁছে দিয়েই পালিয়েছে। মেয়েটি নাম-ঠিকানা কিছুই বলতে চাইছে না। দেখে মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ বাড়িতে ফেলে রাখা হয়েছিল। সেখানে প্রসব না হওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে।’
চঞ্চল গ্লাভস পরে নিলেন। সিস্টার ঠিকই বলেছেন। বাচ্চার মাথা ফুলে গেছে। অন্তত আট ঘণ্টা আটকে না থাকলে বাচ্চার মাথা এতটা ফুলত না। মেয়েটিও কেমন ঝিমিয়ে পড়েছে। ব্যথায় মুখ-চোখ নীল হয়ে গেছে। কিন্তু মেয়েটির উরুতে কিসের ক্ষতচিহ্ন? চঞ্চলের অভিজ্ঞ চোখ বুঝতে পারছিল, ক্ষতচিহ্নটি বুলেটের।
চঞ্চল সেই ক্ষতচিহ্নর ওপর হাত রাখলেন। বললেন, ‘এটা কী করে হল?’
মেয়েটি জবাব দিল, ‘দুঃখিত ডাক্তারবাবু। আমি এ ব্যাপারে কিছুই বলতে পারব না।’
‘ঠিক আছে। আমি কিছু জানতেও চাই না। কিন্তু মা, তোমাকে এখানে কিছুই করা যাবে না। কান্দি যেতে হবে। বাচ্চার মাথাটা বিপজ্জনকভাবে আটকে গেছে। একটু ঘুরে বিচ্ছিরিভাবে আটকে গেছে। দরকার পড়লে সিজার করতে হবে। তাছাড়া বাচ্চারও খারাপ বেরনোর আশঙ্কা রয়েছে। কান্দিতে নিওনেটাল ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিট আছে। খারাপ বাচ্চা হলে সমস্যা হবে না।’
‘কান্দিতে যাওয়া সম্ভব নয় ডাক্তারবাবু। এখানে যদি না হয় বলে দিন। আমি ফিরে যাব। আপনারা শুধু পুলিশে খবর দেবেন না। তাতেই আমরা আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।’
‘কোথায় ফিরে যাবে তুমি?’
‘কোথায় ফিরব সেটাও আপনাকে বলা যাবে না। আমাদের ডেরায় ফিরে যাব।’
‘তুমি কি পাগল! সেখানে ও বাচ্চা কখনোই প্রসব হবে না। পেটের বাচ্চা তো মরবেই, তার সঙ্গে তুমিও মরবে!’
‘মরতে আমি ভয় পাই না।’
‘অকারণে মরাটা এমন কোনও গর্বের বিষয় নয়। সিস্টার ফরসেপ বের করুন।’
চঞ্চল অভিজ্ঞ হাতে ফরসেপ লাগিয়ে ফেললেন। প্রসবের দ্বার খানিকটা কেটে ফেলে প্রশস্ত পথ তৈরি করলেন। তারপর মিনিট দশকের চেষ্টায় ফরসেপ দিয়ে সদ্যজাতকে বের করে ফেললেন। সুগঠিত কেজি তিনেক ওজনের একটি কন্যাসন্তান। কিন্তু শিশুটি নীল হয়ে গেছে। হাত-পাগুলো শক্ত হয়ে গেছে। চঞ্চল স্টেথো বসালেন। হৃদস্পন্দন চলছে। কিন্তু খুবই আস্তে এবং অনিয়মিত। তাহলে কি তাঁর এতক্ষণের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে? তিনি চিৎকার করলেন, ‘সিস্টার, অ্যাম্বুব্যাগ আর অক্সিজেন। কুইক!’
চঞ্চল নিজে সাকশন মেশিনটা টেনে নিলেন। পরিষ্কার করে ফেললেন শিশুটির শ্বাসনালী।
নন্দিনীকে বললেন অ্যাম্বুব্যাগ দিয়ে বাচ্চাটিকে অক্সিজেন দিতে। তারপর নিজে বাচ্চাটির বুক চেপে হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকভাবে চালু করার চেষ্টা শুরু করলেন।
এ এক অদ্ভুত যুদ্ধ। মৃত্যুর কাছ থেকে জীবনকে ছিনিয়ে আনা। ডাক্তার, তিনি যতই অর্থপিশাচ হন, যতই অনৈতিক কাজকর্ম যুক্ত থাকুন, এই লড়াইয়ে একবার ঢুকে পড়লে জগত সংসার ভুলে যান। পার্থিব লাভ-ক্ষতি তাঁর কাছে তখন তুচ্ছ হয়ে পড়ে। রোগী মারা গেলে ঝামেলা হবে কি হবে না, এই চিন্তা মাথা থেকে দূরে সরে যায়। সমস্ত চেতনা দিয়ে তখন তিনি রোগীর দেহে প্রাণস্পন্দন খুঁজে পেতে চান। চালু করতে চান বন্ধ হয়ে যাওয়া হৃদগতি, নিশ্বাস-প্রশ্বাস। প্রত্যন্ত গ্রামীণ হাসপাতালগুলি থেকে ফাইভ -স্টারড কর্পোরেট নার্সিংহোমে আলাদা পরিকাঠামো, আলাদা যন্ত্রপাতি, কিন্তু লড়াইয়ের আসলে একই। এই লড়াই লড়তে যিনি ভয় পান অথবা মাঝপথে হাল ছেড়ে দেন তিনি ডাক্তারই নন।
কতক্ষণ সময় কেটেছে লেবার রুমে, তিনজনে কেউই সেটা খেয়াল করেননি। অবশেষে সদ্যজাত কেঁদে উঠল। নেহাতই নিস্তেজ কান্না। কিন্তু সেই কান্না তিন জনের মনে এক অপার্থিব আনন্দ নিয়ে এল। নন্দিনী বললেন, ‘স্যার, মেয়ে বাচ্চা বলেই বেঁচে গেল।’
চঞ্চল বললেন, ‘সিস্টার, আপনি এপিসিওটমি উন্ড সেলাই করে ফেলুন। আমি বাকিটা সামলে নিচ্ছি।’
মেয়েটি এতক্ষণ একদৃষ্টিতে তাঁর সন্তানের দিকে চেয়েছিল। বলল, ‘ডাক্তারবাবু, আমি ভগবানের অস্তিত্বে বিশ্বাস করি না, কিন্তু আপনি যা করলেন একজন মানুষের পক্ষে তা করা সম্ভব নয়।’
‘বাজে বকো না! আমি ব্যর্থও হতে পারতাম।’
নন্দিনী দ্রুত হাতে মেয়েটির প্রসব দ্বারের কাটা অংশটি সেলাই করে ফেললেন। তারপর মেয়েটির শাড়ি ঠিক করে পরিয়ে দিলেন। মেয়েটি বলল, ‘বাচ্চাটি আমার কোলে দিন ডাক্তারবাবু। আমাকে এবার চলে যেতে হবে।’
‘কোথায় যাবে?’
‘যেখান থেকে এসেছি। চারটে বেজে গেছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই ফিরতে হবে। চারদিকে পুলিশের টহল বেড়ে গেছে। আর বেশি দেরি করলে আমরাও বিপদে পড়ব, আপনাদেরও জবাবদিহি করতে হবে।’
চঞ্চল রেগে গেলেন। বললেন, ‘এই বাচ্চাকে নিয়ে বন-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ালে বাচ্চাটি মারা পড়বে। ওর নিজের এখন টেনে খাওয়ার ক্ষমতা নেই। দু’-তিন দিন অন্তত গ্লুকোজ ইনজেকশন দিতে হবে। ফুসফুসেও প্রচুর জল ঢুকে গেছে। অ্যান্টিবায়োটিকও দেওয়া দরকার। না হলে নিউমোনিয়া হয়ে যাবে। তার সঙ্গে দরকার মায়ের দুধ। বাচ্চাকে যখন সুস্থ জীবন দিতে পারবে না, তখন বাচ্চা নাও কেন?’
‘আপনি রাগ করবেন না ডাক্তারবাবু। এই রাষ্ট্রব্যবস্থায় আমাদের চিকিৎসার কোনও সুযোগ নেই। বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুই আমাদের ভবিনব্য । আপনার মতো একজনের দেখা পেয়েছিলাম বলেই আজ আমার জীবন বাঁচল। সন্তানেরও মরে যাওয়ার কথা। আপনার দয়ায় এখনও বেঁচে রয়েছে। এরপর মরলে মরবে, বাঁচলে বাঁচবে।’
‘বেঁচে থাকার সুযোগ পাওয়া একজন মানুষের অধিকার। সে যে-ই হোক না কেন। তুমি কারও বাঁচা-মরার সিদ্ধান্ত নিতে পারো না। এমনকী, নিজের সন্তানেরও নয়।’
নন্দিনী বললেন, ‘স্যার, ও চলে গেলে যাক। বাচ্চাটিকে রেখে যেতে বলুন। আমরা নার্সিং স্টাফেরা আছি৷ আমরা দায়িত্ব নেব।’
মেয়েটি বলল, ‘সেই ভাল। ও আপনাদের হেফাজতে থাকুক। সন্তানের ওপর দাবি জানানোর ক্ষমতা আমার নেই। আপনাদের কাছে থাকলে একটা সুস্থ জীবন পাবে ও। সেই জীবন পাওয়ার অধিকার ওর আছে।’
মেয়েটি এগিয়ে গেল। ঝুঁকে বাচ্চাটির মাথায় চুমু খেল। কান্না চাপতে চাপতে বলল, ‘আসি কমরেড।’
চঞ্চল বা নন্দিনী কেউ কোনও কথা বললেন না। মেয়েটি হাসপাতালের গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। খানিকক্ষণ পরে একটি মোটরবাইকের আওয়াজ শোনা গেল। তখন ভোরের আলো ফুটিফুটি করছে।
চঞ্চল আর বিশ্রাম পেলেন না। আউটডোরে আজ অস্বাভাবিক ভিড়। প্রায় সাতশো রোগী হয়েছে। এজা সাতশো রোগী দেখতে দেখতে দুপুর সাড়ে তিনটে বাজল। স্নান, খাওয়া-দাওয়া কিছুই হয়নি। চঞ্চল একটি ঘোরের মধ্যে কাজ করে যাচ্ছিলেন। মাঝে মাঝেই রোগীদের ওপর মেজাজ হারিয়ে ফেলছিলেন। এর ওপর এক নতুন বিপদ। সিএমওএইচ স্যারের ফোন ধরছেন না। তার মানে তিনি চঞ্চলের জন্য কোনও বিকল্প ব্যবস্থা করে উঠতে পারেননি।
অবশেষে রোজকার মতো আর-একবার সেই বিরক্তিকর রাত্রিটি চলে এল। পেশেন্ট আসছে জলস্রোতের মতো। এই পিছিয়ে পড়া ব্লকের মানুষের অসুখ-বিসুখ যেন বেশি। মাঝে মাঝেই বাচ্চাটিকে দেখছেন চঞ্চল। এখনও টেনে দুধ খেতে পারছে না। কিন্তু আগের চেয়ে ভাল আছে। শ্বাসপ্রশ্বাস অনেক স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। গ্লুকোজ স্যালাইন চলছে।
এক যুবককে কয়েকজন মিলে ধরাধরি করে নিয়ে এসেছে। লোকটি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। সঙ্গীরা উত্তেজিতভাবে বলল, ‘ডাক্তারবাবু, সাপে কামড়েছে। ধানক্ষেতের আড়ালে ছিল। ও নিচু হয়ে আগাছা পরিষ্কার করছিল। হাতে ছোবল মেরে দিয়েছে।’
চঞ্চল হাতটা দেখলেন। হাতটা বিচ্ছিরিভাবে নীল হয়ে ফুলে গেছে। কনুইয়ের ওপরের জায়গায় টাইট করে বাঁধন দেওয়া। সাপের কামড়ে নয়, হাতটা ফুলেছে বাঁধনের জন্য। এ অবস্থায় ঘণ্টাখানেক থাকলে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে হাত গ্যাংগ্রিন পর্যন্ত হতে পারে। তখন হাত কেটে বাদ দেওয়া ছাড়া প্রাণ বাঁচানোর কোনও উপায় থাকবে না।
চঞ্চল সাবধানে বাঁধন খুলে ফেললেন। নাড়ি দেখলেন। নাড়ির গতি পাওয়া যাচ্ছে। তার মানে রক্ত চলাচল শুরু হয়েছে। এবার হাতটা বেঁচে যাবে। সিরিঞ্জে রক্ত টেনে খানিকক্ষণ দেখলেন। রক্ত জমাট বাঁধছে। নির্বিষ সাপ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
আগে সাপে কামড়ালে এ অঞ্চলের লোকেরা ওঝার কাছে ছুটত। চঞ্চলের সাফল্য যে, তিনি গ্রামের লোককে বোঝাতে পেরেছেন, ওঝারা ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই করে না। ৯০ শতাংশ সাপই বিষহীন। সুতরাং তাদের কামড়ে বিষ থাকে না। ওঝার কাছে না গেলেও সেসব ক্ষেত্রে মানুষের কিছুই হবে না। বাকি দশ শতাংশ রোগীকে ওঝারা বাঁচাতে পারবে না। তারা একমাত্র বাঁচবে যদি হাসপাতালে তাড়াতাড়ি এনে প্রতিষেধক চালানো হয়। আস্তে আস্তে গ্রামের মানুষ হাসপাতালের ওপর ভরসা করতে শুরু করেছে। একারণেই হয়তো গত দু’মাসে এখানকার একজন মানুষও সাপের কামড়ে মারা যায়নি। তবে চঞ্চলের ব্যর্থতা, সাপের কামড়ে বাঁধন দিয়ে যে কোনও লাভ হয় না, এটা তিনি কিছুতেই বোঝাতে পারছেন না। আসলে কিছু কিছু সংস্কার মানুষের মনে এত গভীরভাবে ঢুকে আছে যে, সেসব পাল্টানো কঠিন।
রাত দশটা নাগাদ ঘরে গেলেন চঞ্চল। সিস্টারকে বলে গেলেন খুব দরকার ছাড়া না ডাকতে। খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছেন, হঠাৎ শুনতে পেলেন একটি তীক্ষ্ণ আওয়াজ। গুলির আওয়াজ না? আরও একবার আওয়াজ হল, আরও একবার। মিনিট তিনেক ধরে অবিরাম গুলির শব্দ। একাধিক বন্দুকের।
চঞ্চল উত্তেজিতভাবে উঠে বসলেন।
খানিকক্ষণ পরে অনেক গাড়ির আওয়াজ শুনতে পেলেন তিনি। তাঁর কোয়ার্টারের সামনে এসে তিনটি গাড়ি থামল। গাড়ি থেকে নেমে এলেন ইউনিফর্ম পরা দশ-বারোজন পুলিশ। তাঁদের মধ্যে একজন, যাঁকে দেখেই মনে হচ্ছিল পদমর্যাদায় সবার ওপরে, বললেন, ‘ডাক্তার রায়, আপনাকে আমাদের সঙ্গে বহরমপুর যেতে হবে।’
‘কেন, হঠাৎ বহরমপুরে কেন? তাছাড়া আমি এখন অন ডিউটি আছি। হাসপাতালে আমিই একমাত্র চিকিৎসক।’
‘আমাদের কাছে আপনার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে। চার্জটা খুবই মারাত্মক, দেশদ্রোহিতা। আশা করা যায় আপনাকে জোর করতে হবে না।’
‘দেশদ্রোহিতা! আমি কি একটু সময় পেতে পারি? খারাপ রোগীগুলির একটা ব্যবস্থা…’
‘দুঃখিত ডাক্তারবাবু। আমরা আপনাকে একদমই সময় দিতে পারব না। আসলে আপনার এগেনেস্টে যে-চার্জ আছে সেটা মারাত্মক। এমনকী, বাড়িতে ফোন করতে চাইলেও সেই অনুরোধ আমি রাখতে পারব না। তবে চিন্তা করবেন না। কাল সকালের মধ্যেই আপনার বাড়িতে খবর চলে যাবে।’
গ্রামীণ হাসপাতালের হতভম্ব কর্মী, কিছু অশিক্ষিত অসুস্থ রোগী ও তাদের বাড়ির লোকজনের সামনে দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে বিশাল গাড়ির কনভয় চঞ্চলকে নিয়ে চলে গেল।
অতঃপর সেই দীর্ঘ ক্লান্তিকর জেরা।
‘আপনি স্বীকার করুন ডাক্তারবাবু, ওদের আপনি চেনেন।’
‘দুঃখিত, কিন্তু আপনি কাদের কথা বলছেন আমি বুঝতে পারছি না।’
‘আমরা আপনার সম্বন্ধে অনেক খবরাখবর নিয়েছি। আপনার চলাফেরা অত্যন্ত সন্দেহজনক। আপনি এত জায়গা থাকতে এই গ্রামীণ হাসপাতালে এলেন কেন?’
‘সরকার থেকেই আমাকে এখানে পোস্টিং দিয়েছিল। আমি নিজের ইচ্ছেতে আসিনি।’
‘আমি সে কথা বলতে চাইছি না। আপনি ছিলেন অত্যন্ত ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র। উচ্চ মাধ্যমিকে সেকেন্ড হয়েছিলেন। জয়েন্টে মেডিকেলে ফার্স্ট। মেডিক্যাল কলেজেও পড়ার সময় একাধিক বিষয়ে গোল্ড মেডেল পেয়েছেন। সেই আপনিই সব ছেড়েছুড়ে গ্রামে চাকরি করতে এলেন, ব্যাপারটা খুবই অস্বাভাবিক। আপনি সরকারি চাকরি করতে চাইলে অনায়াসেই কোনও মেডিক্যাল কলেজের প্রফেসর হতে পারতেন।’
‘হইনি যে সেটা আমার দুর্ভাগ্য হলেও হতে পারে, কিন্তু অপরাধ নয়। সেই জন্য আমাকে নিশ্চয় গ্রেপ্তার করা যায় না!’
‘তারপরেও আপনার আচরণকে সন্দেহের বাইরে রাখা যায় না। দিনের পর দিন একটা গ্রামীণ হাসপাতালে আপনি অমানুষিক পরিশ্রম করে গেছেন। চিকিৎসকেরা গ্রামে গিয়ে প্র্যাকটিস করে অর্থ উপার্জন করেন। অথবা পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিয়ে কলকাতায় চলে আসেন। কোনটাই আপনি করেননি। গত এক মাস ওই হাসপাতালে আর কোনও ডাক্তারবাবু ছিলেন না। আপনি একাই হাসপাতাল চালিয়ে গেছেন। ছেড়ে পালাননি।’
‘পালানোর প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু সেটাও কি অপরাধ হতে পারে? তাছাড়া আমি নিজে বারবার সিএমওএইচ স্যারকে ফোন করে বিকল্প বন্দোবস্ত করতে বলেছি। শেষের দিকে উনি আমার ফোনই ধরতেন না।’
‘গত রাতে একজন মাওবাদী মহিলার প্রসব আপনাদের হাসপাতালে হয়েছে। ওই মহিলা মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় কমিটির ওপরের সারির একজন নেত্রী। ওকে পুলিশ দীর্ঘদিন ধরেই হন্যে হয়ে খুঁজছে। আপনি তাকে চোখের সামনে দেখেও আমাদের খবর দেননি।’
‘আমি ওর পরিচয় জানতাম না।’
‘আপনি সবই জানেন ডাক্তারবাবু। আগে থেকেই ওদের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ ছিল। নইলে দুবরাজপুর থেকে প্রায় একশো কিলোমিটার পথ মোটরসাইকেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওরা কেন আপনার কাছেই এল। আশপাশে তো অনেক হাসপাতাল ছিল। আপনি সত্যিই খুব বাজেভাবে ফেঁসে গেছেন ডাক্তারবাবু। কেউ আপনার কথা বিশ্বাস করবে না। আপনার তো স্ত্রী-কন্যা আছে। তাদের কি আপনি ভালবাসেন না? অন্তত তাদের কথা ভেবে আপনি সব কিছু স্বীকার করে নিন। ওই মহিলার ঠিকানা বলে দিন।’
‘সে কী! গুলির আওয়াজ শুনলাম। ওই মেয়েটিকে আপনারা মারতে পারেননি?’
‘না, এবারও অলৌকিকভাবে মেয়েটা যেন আমাদের চক্রব্যূহ ভেদ করে ঘনজঙ্গল আর বিলের মধ্যে দিয়ে শূন্যে মিলিয়ে গেল। খবর ছিল ওর বাচ্চাকে দেখতে আসতে পারে। মাত্র এক দিন আগে মা হয়েছে, দুর্বল শরীর। এটাই ওকে মারার সুবর্ণ সুযোগ ছিল।’
‘সদ্য মা-হওয়া একটি মেয়েকে গুলি করতে আপনাদের হাত কাঁপে না?’
‘আপনার ওদের জন্য সহানুভূতি থাকতে পারে, আমাদের নেই। পুলিশদের গুলি করার সময় ওদেরও হাত কাঁপে না। এমন একজনকে হাতের নাগালে পেয়েও আপনি আমাদের খবর দেননি। উলটে তারই প্রাণ বাঁচিয়েছেন। আপনাদের নার্সিং স্টাফ নন্দিনী মিত্র জেরায় সব স্বীকার করেছেন। আপনি না থাকলে মারা পড়ত মেয়েটা আর তার সন্তান।’
চঞ্চল হঠাৎ অনুভব করলেন, তিনি মোটেই ভয় পাচ্ছেন না। এমনকী, এই সঙ্কটের মুহূর্তে তিনি স্ত্রী, কন্যা অথবা আত্মীয়-স্বজনের কথা ভাবছেন না। তিনি একমনে ভাবছেন সদ্য মা-হওয়া মেয়েটি এবং তার সন্তানের কথা। সন্তান জন্মের পরেই মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন। তবু কী অমোঘ টান! সেই টানে পাথরের মতো কঠিনহৃদয় মায়ের বুকেও মধুসঞ্চার হয়েছে। তিনি আরও অনুভব করলেন, এই টান যেন তাঁর চেতনাতেও ছড়িয়ে গেছে। এই অনুভব এক অপার্থিব আনন্দে তাঁর হৃদয় পূর্ণ করল। অবশেষে তিনি সত্যিই একজন ডাক্তার হয়ে উঠতে পেরেছেন।
চঞ্চল প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা, বাচ্চাটি এখন কেমন আছে?’
পুলিশ অফিসারটি অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে রইলেন তাঁর দিকে।












