একটা প্রবাদ আছে ‘Never judge a book by its cover’. যা সামনে দেখা যাচ্ছে তাকেই সত্যি বলে মেনে নিলে খুব মুশকিল!!
কিছুদিন আগে প্রাক্তন ‘যুবরাজ’ কোনো এক মৃত কর্মীর বাড়িতে হঠাৎ চলে গিয়ে হেনস্থা হলেন, আর কোথাও যাবার নামও করলেন না। গতকাল আবার প্রাক্তন ‘মহারানী’ পুলিশি হেফাজতে এক তৃণমূল কাউন্সিলারের স্বামীর মৃত্যুতে তার বাড়িতে চলে গেলেন সঙ্গে দুই সাংসদ ও ‘দলের’ আই টি সেলের সম্পাদিকা। যদিও স্থানীয় ভাবে সেখানে সে রকম কোনো বিক্ষোভ ছিল বলে জানা যায় নি(অন্তত সেই সময়ে বাড়ির সামনে তৃণমূলের জমায়েতের কোনো দৃশ্যমানতা ছিল না )। এক্ষেত্রেও এক তরফা হেনস্থা চলে কোনো ধরণের বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ ছাড়া। আশা করি, অন্য কোনো মৃতদেহের কাছে ওনাকে ইদানীং কালে আর যেতে হবেনা। এর মধ্যে ‘যুবরাজে’র বিদেশ যাত্রার অনুমতিও বেরিয়ে গেছে। না, ভাববার কোনো কারণ নেই, উনি ঠিকই ফিরে আসবেন।
বস্তুত, এ সবই পুরো নাটক। সত্যি করে বলতে গেলে খুবই বাজে চিত্রনাট্য, এমনকি সিরিয়াল এবং এখনকার বেশির ভাগ বাঙলা চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের চেয়েও ঢের বেশি জঘন্য!!
একটা কথা বলুন তো, অভিষেকের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দুটো নিয়ে বেশি হইচই করা হচ্ছে, তা কতটা গুরুতর? বাস্তবিক ক্ষেত্রে,ওর মারাত্মক সব দুর্নীতির(বস্তত উৎসস্বরূপ) তুলনায় সেগুলো তো নস্যির নস্যি তার এবং তার …..। মিটিংয়ে অন্যের সই করা বেআইনি অবশ্যই, কিন্তু বিভিন্ন সংস্থাতে কাজকর্মে তা কি খুব অপ্রচলিত? যেটা uncommon সেটা হলো প্রকাশ্যে আসা বা ধরা পড়া। আর, মেডিকেল ক্যাম্পে জোর করে লোককে আনা, প্রমাণ করা যাবে তো? অভিযোগ ক্যাম্পে ডাক্তারি ছাত্রদের দিয়ে ডাক্তারি করা হয়েছে। আমরা তো ফার্স্ট ইয়ার থেকে ‘রিলিফে’ গেছি। হ্যাঁ, সঙ্গে সিনিয়র ছাত্র থাকতো, কিন্তু ডাক্তার থাকতো খুব কম ক্ষেত্রে।
আসলে, এই অভিযোগগুলো জোর করে সামনে আনা, যাতে লোকের মনে হয় কিছু একটা করা হচ্ছে। আপ্ত সহায়ক নিয়ে নাটক কিছুদিন চললো, তার সঙ্গে বিদেশে চোখ দেখানোতে বাধা দেওয়া।
আর এই সবকিছুর আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে এক ব্যাপক বিশাল চুরি জোচ্চুরি ডাকাতির অভাবনীয় চক্র, যা গত দেড় দশক ধরে রাজত্ব করে গেছে এই রাজ্যে। দুর্নীতি সব জায়গায় হয় এমনকি অনেক সময়েই সর্বোচ্চ স্তরেও। কিন্তু, সর্বোচ্চ স্তর থেকেই পুরোটা সংগঠিত করার এমন উদাহরণ ভূ ভারতে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। তাও যদি আর. জি. কর. কাণ্ডের মতোই সম্পূর্ণ অন্ধকারে থেকে যায়, তাহলে আর বলার কী আছে?!!
আসলে, এরা প্রত্যেকে চরম প্রতারণা করছেন মানুষের সঙ্গে। শুধু ‘ভালো তৃণমূলরা’ই নয়, তাদের যারা সাদরে কাছে টেনে নিচ্ছেন এবং বাকি অন্যদের নিয়ে ব্যাপক ‘নাটক’ করছেন, সেই শাসক দলের নেতৃত্বও। তো, কী করা যাবে? মানুষই বা কী করবে? বা, নিচুতলার কর্মীরা, প্রতিটি রাজনৈতিক সংঘর্ষে যাদের মূল্য চোকাতে হয়েছে ঘরবাড়ি সম্মান জীবন জীবিকা দিয়ে? সত্যি, খুব খারাপ লাগে সেই মানুষদের জন্যে যারা ভীষণ ভীষণ আন্তরিক ভাবেই চেয়েছিলো, এই চোর ডাকাতের শিরোমনিদের যথাযথ শাস্তি হোক! চাওয়াটা কি সত্যিই খুব অন্যায় বা অনুচিত ছিল??
আরও অবাক লাগে অন্যান্য বিরোধী দলগুলির ভূমিকা নিয়ে। কংগ্রেসের কথা ছেড়েই দিলাম। ভোটের বেশ কিছুদিন আগে বামপন্থীরা বিভিন্ন জায়গায় তাদের মতো করে সমীক্ষা করেছিল রাজ্যজুড়ে দুর্নীতির ‘নেটওয়ার্ক’ খুঁজে বার করতে। কিন্তু, এই পর্যায়ে কোথাও কি সেভাবে তাদের এগিয়ে আসতে দেখা গেছে দুর্নীতির সুস্পষ্ট অভিযোগকে সামনে আনতে, অন্তত যেভাবে আনতেন ‘পরিবর্তনে’র আগে?! কিন্তু কেন? যখন দেখাই যাচ্ছে, বর্তমান শাসকরা ‘দুর্নীতির উৎস সন্ধানে’ আদৌ উৎসাহী নন ; তাদের অন্য অনেক ‘অ্যাজেন্ডা’ আছে। জানিনা সমস্যাটা কোথায়, তাত্ত্বিক, লোকবল না ইচ্ছার? নাকি, কেন্দ্রীয় কর্মসূচি থেকে বিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা?
তো কী করা যাবে, খুব বেশি হলে দু একটা ‘টুলু মণ্ডল’ মাঝে মাঝে পাওয়া যেতে পারে, তার উপরে আর ওঠা সম্ভব না, রাজনৈতিক প্রশাসনিক কোনো ভাবেই নয়। লোকাল থানার কয়েকজন ছাড়া তো প্রায় কেউ কিছু জানতোই না। নিশ্চয়ই কিছু বলার নেই?!
টুলু মণ্ডলের কেসটাও বেশ interesting, অন্তত যা পুলিশ বলেছে। কিছু লোক ডাকাতি করতে যাচ্ছিলো, পুলিশ জিগ্যেস করলো কোথায় ডাকাতি করতে যাচ্ছে। তারা বললো এক জায়গায় অনেক টাকার খোঁজ পেয়েছে, পুলিশ গিয়ে সেই ‘খাজানা উদ্ধার’ করলো। এই চিত্রনাট্যটা কতটা বিশ্বাসযোগ্য জানিনা, তবে সঠিক হলে এই ডাকাত দলকেই ‘স্পেশাল টীম’এর মর্যাদা দিয়ে বিভিন্ন ‘গুপ্তধন’ উদ্ধারের কাজে লাগিয়ে দেওয়া উচিত। এরা পুলিশের থেকে অনেক কার্যকরী হতে পারতো!!
চাকরির একটা পর্যায়ে উত্তরবঙ্গের একটি জায়গায় রোগীর ঠিকানা দেখে একটু হোঁচট খেতে হলো, লেখা আছে ‘সাধু পাড়া’। পেশেন্ট পার্টি সামনেই ছিল, জিগ্যেস করলাম পাড়ার এরকম নামের কারণ। সে অকপটে প্রায় innocently জানালো, ‘আসলে আমাদের পাড়ার নাম ছিল চোরপাড়া। শুনতে বা বলতে খুব খারাপ লাগতো, তাই পাড়ার সবাই মিলে ঠিক করে নাম পাল্টে করে দেওয়া হলো সাধুপাড়া’। অতি সরল স্বীকারোক্তি, কিছু বলার আছে?! না, আমিও শুধু শুনে গেছি, কোনো পরিহাস করিনি। এরা তো একেবারে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ।
বরং, যারা হাজার হাজার কোটি টাকা চুরি করে রাজনৈতিক ‘এফিডেভিট’ বলে রাতারাতি মহাচোর থেকে মহাসাধু হয়ে গেলো তার কী হবে??
আমার খুব কাছের বন্ধু সোমেন সাহা বারবার বলতো, ‘হ্যাঁরে, এ যাবে কবে?’ আমি বলতাম, “তোর আমার জীবদ্দশায় নয়’। সোমেন মারা যাবার এক বছরের মধ্যেই উনি ক্ষমতা থেকে চলে গেছেন। আমি এখনো বেঁচে আছি।
কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয় উনি কবে জেলে যাবেন শাস্তি পেয়ে, তাহলে উত্তর হবে ‘আমার ও ওনার জীবদ্দশায় নয়’……………











