★
ধর্ম কেতাবে আছে
মূর্খের উপাসনার অপেক্ষা জ্ঞানীর নিদ্রা শ্রেয়।
★
তা মেনে, মহা ধার্মিক আমি জ্ঞানীর মত নিদ্রাতেই সারা জীবনের অধিকাংশ সময় খরচ করেছি বটে, কিন্তু সলজ্জভাবে স্বীকার করি মূর্খের মত শিক্ষার উপাসনাও কিঞ্চিৎ করেছি কখনও ভ্রমক্রমে।
মূর্খের সেই পাঠ-ক্রমনিকা লিপিবদ্ধ করলাম। সেই সঙ্গে আমার শিক্ষকদের কথাও…
★
মা আর বাবা ছিলেন সবচেয়ে উজ্জ্বল শিক্ষক।
★
স্মৃতি দুর্বল তবু যতটুকু মনে পড়ে।
চার বছরের আমাকে রেখে মা গেলেন চাকরির ট্রেনিংয়ে। প্রথমে লেডি ডাফরিন হাসপাতাল তার পরে সিঙ্গুরে। সপ্তাহে একদিন বাড়ি আসতেন।
বাড়িতে মানে খড়দার আদর্শ পল্লীর ভাড়া বাড়িতে তখন দাদু মানে পিতামহ দুর্গাকান্ত, বড় পিসিমণি সুলেখা (ডাকনাম খুকু, আমি ডাকতাম মামণি), মেজপিসিমণি সুচিত্রা( ডাকনাম রেবু), ছোট পিসিমণি সুব্রতা(ডাকনাম লক্ষ্মী), আর একদম ছোট কাকু অমলরঞ্জন(ডাকনাম মনু, আমি ডাকতাম চিনিকাকু)। তাঁদের পরিচর্যায় থাকতাম আমি।
বাবা(আমি ডাকতাম বাবুনা) আর অন্য কাকাজ্যাঠারা জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র। এই বিস্তারিত হিসেবটা দিলাম কেন না বাসায় যাঁদের কাছে ছিলাম, প্রাথমিক শিক্ষা তাঁদের কাছেই শুরু হল। তাঁরা আমার প্রথমদিককার শিক্ষক।
বস্তুত হাতে খড়ির আগেই আমার অক্ষর পরিচয় আর লিখতে পারা শুরু হয়ে গেছিল। ভাড়াবাড়ির ঘরে সমস্ত দেওয়াল আমার হস্তাবলেপনে আচ্ছন্ন ছিল।
স্পষ্ট মনে পড়ে, এক সরস্বতী পুজোর দিন হাতেখড়ি। ঠাকুরমশাই শ্লেটে শ্রী রামকৃষ্ণ লিখে সযত্নে হাতে একটা খড়ি দিয়ে বললেন- হাত বোলাও তো দাদুভাই।
মহা অবাধ্য( নাকি অকালপক্ব?) আমি, একেই তো খোকা বলায় রেগে রয়েছি, নির্দেশ না মেনে সগর্বে তাঁর লেখার তলায় নিজে নতুন করে শ্রী রামকৃষ্ণ লিখে একগাল হেসে বললাম, – বেশ ভালো হয়েছে, না?
সেই শিক্ষক তাঁর খুদে ছাত্রের পাকামি দেখে যদ্দুর মনে পড়ে, স্মিত হেসেছিলেন।
দিন যায়। এখনকার মত প্রি-নার্সারি, নার্সারি, কেজি পেরিয়ে ইশকুলের ধারণা সেই ষাট বছর আগে এক ছিন্নমূল উদ্বাস্তু পরিবারের আবহে অকল্পনীয় ছিল। বাড়িতেই চলছিল কাকা পিসিদের তত্বাবধানে বিদ্যাভ্যাস। ছোটোখাটো কিছু মানে বর্ণপরিচয়, হাসিখুশি বা আদর্শ লিপি নয়। আজ আবোলতাবোল তো কাল দেবতার গ্রাস। পিসিমণিরা মুখস্ত করাবেই। পিসিদের অনুপ্রেরণায় কচি ঠোঁট নড়ে চলেছে।
বাড়িতে অতিথি এলে, শো পিস। পুরাতন ভৃত্য কিম্বা তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম। মুখস্ত, প্রডিজি প্রমাণের চেষ্টা যেন বা। পরে আমার সারা জীবনে প্রমাণিত, ব্যাপার আদৌ তা ছিল না। নেহাতই পেতলকে ঘষে সোনার হিসেব দাখিল করার উদ্যোগ।
বছর তিনেক পর মায়ের ট্রেনিং শেষ। চন্দ্রকোণা হাসপাতালে পোস্টিং। বাবার কর্মস্থল দূরে। মুর্শিদাবাদে। কিছুদিন বাড়িতে একজন গৃ্হশিক্ষকের কাছে পড়ালেন মা। শাবককে স্কুল রেডি করে দিতে। কয়েকমাস বাদে, হাসপাতালের পাশেই ভেলাইবুনি ফ্রি প্রাইমারি ইস্কুলে নিয়ে ভর্তি করা হল। সরাসরি ক্লাস ফোরে। রোজ যে যেতাম তা নয়।
এই খানে একটু থেমে ক্লাসের বর্ণনা দেওয়া যেতে পারে। একজনই স্যার, মধ্যিখানে। ক্লাস ওয়ান-টু-থ্রি-ফোর তাঁর চারপাশে। আলাদা আলাদা ঝাঁকে বসেছে। মিড ডে মিলের ধারণা আসবে আরও চল্লিশ বছর পর। কাজেই ওয়ান থেকে ফোর উঠতে প্রচুর ড্রপ আউট। ক্লাস ফোরের দিকটায় মোটে ভিড় নেই। আমি আর বংশী কবিরাজ। দুজন।
নিজের নিজের খেজুরপাতার চাটাই বগলে স্কুলে যেতে হত। যেন রাজনীতির প্রথম পাঠ। যে যার গদি নিজে সামলাও। তোমার চাটাই যারে দাও… তারে বহিবারে দাও শকতি।
বছর শেষে পরীক্ষা দিলাম। চন্দ্রকোণা টাউন হাইস্কুলে সেন্টার। তখন বলত বৃত্তি পরীক্ষা। গুজব শুনেছিলাম কী একটা বৃত্তি নাকি পেতে পারতাম… অথবা নাকি পেয়েওছিলাম। কিন্তু না, পাইনি। জেলা বদল হয়ে গেলে পাওয়া যায় না।
তদ্দিনে মা বদলি হয়ে মুর্শিদাবাদের হিলোড়া পিএইচসিতে। এবার শুরু হল নতুন স্কুল। প্রায় দু কিলোমিটার দূরের জাজিগ্রাম জুনিয়র হাইস্কুলে। ওয়াক ইন ইন্টারভিউ। মোটামুটি সন্তোষজনক। অন্য কিছুই মনে নেই। শুধু মনে পড়ে বাঁদর ইংরেজি কী জিজ্ঞেস করায় তো তো করে বলেছিলাম ডাংকি। জিজ্ঞাসাকর্তা স্যার উচ্চকিত হেসে বললেন, তুই তো দেখছি বাংলা ইংরেজি দুটোই!
শুরু হল সত্যিকারের স্কুল জীবন।
★
হিলোড়া পর্ব-
★
হিলোড়া গ্রামটা মুর্শিদাবাদে। আমার স্কুল জাজিগ্রামে। সেটি বীরভূমে। আমাদের বাসা থেকে আন্দাজ আড়াই কিলোমিটার দূরে। আরও একটা বিকল্প ছিল। সেই স্কুল একটু বেশি ওজনেরও বটে। বংশবাটি গ্রামের হাইস্কুল। কিন্তু দূরত্ব আরও এক কিলোমিটার বেশি। এখন শুনেছি বাস রাস্তা হয়েছে । তখন ছিল না। কাজেই জাজিগ্রাম জুনিয়র হাই। জুনিয়র হাই মানে ক্লাস এইট অবধি।
হিলোড়া থেকে ক্লাস ফাইভের আমরা দুজন পদব্রজে যাই। আমি আর বাচ্চু। বাচ্চুর পোষাকি নাম অন্নদাকিঙ্কর দাস।
লাল মাটির রাস্তা। লাল ধুলো। পায়ে চটি। আমাদের স্কুলে সেটাই দস্তুর। শীতকালে সরষের তেল মাখি। জ্যাবজেবে করে। পায়েও। লাল ধুলো লেগে আখের গুড়ের মত আস্তরণ পড়ে বন্ধুযুগলের পায়ে। এ তাদের এক নৈমিত্তিক অর্থহীন খেলা। কার পায়ে কতটা গুড় জমে। যেতে যেতে কত না অর্থহীন কথা। অধিকাংশ সময়েই বক্তা আমি। যে তালগাছগুলো দেখি রাস্তার দুপাশে মাঠে, তারা যদি ভূতুড়ে পা হয়ে আমাদের পাশে পাশে চলতে থাকে, এমন সব অদ্ভুত সব কল্পনা। বাচ্চু হয় তো আমাকে পাগল ভাবে। ভাবুক গে। নিজেকে আমিও পাগল ভাবি। হ্যাঁ, আজ এখনও।
স্কুলের কোনও ইউনিফরম নেই। কেউ হাফপ্যান্ট, কেউ পাজামা। এক আধজন লুঙ্গি, খুবই কম যদিও। হয়তো বা নাচার হয়েই। না, ধুতি একজনও না। একটা ব্যাপারে অনেকের মিল। সেটা হল পোষাক অধিকাংশ দিনই পুরোনো মলিন কখনও বা সামান্য টুটাফাটা। পরিষ্কার কি না সেটা সামর্থ আর সুযোগ অনুযায়ী।
মাস্টারমশাই যাঁদের কথা মনে করতে পারি তাঁদের প্রথম জন হলেন, হেড মাস্টারমশাই। শীর্ণ একজন আপাদমস্তক ভদ্রলোক। তাঁর বাড়ি ছিল হিলোড়া পেরিয়ে আরও দূরের সম্ভবত নয়াগ্রাম বলে এক গ্রামে। অনেক দিনই স্কুল থেকে সাইকেল করে ফেরার পথে সাইকেলে না চেপে হিলোড়া অবধি আমার সঙ্গে হেঁটে আসতেন স্নেহবশে। নানান রকম কথা বলতেন সারা পথ। পড়াশুনোর কথাও থাকত। বড় হয়ে বুঝেছি আমার সঙ্গে তাঁর এই হাঁটা ছিল স্নেহবশে। তখন কিন্তু ভাবতাম অন্যরকম। না, খারাপ কিছু ভাবনা না। জাজিগ্রাম হিলোড়ার মাঝখানে নির্জন রাস্তায় এক ঝাঁকড়া মাথাওয়ালা বিশাল বটগাছ ছিল। ছড়ানো সেই গাছের তলায় ঝুঁঝকো অন্ধকার ঝুঁকে থাকত দিনের বেলাতেও। সবাই বলত, সেই গাছে নাকি কিলবিল করে নানা কিসিমের অপদেবতা। আমি তখন ভাবতাম, হেডস্যার বেজায় ভীতু বলে একা আসতে সাহস পান না। আমি কিনা মহা সাহসী! আমার সঙ্গে আসতেন তাই। আমিও ভয় পেতাম বই কি। কিন্তু রাম লক্ষ্মণকে জড়িয়ে এক শক্তিশালী ভূত তাড়ানোর মন্ত্র জানতাম আমি। প্রশ্ন উঠতে পারে হেড স্যারও তো ওই মন্ত্র ইস্তেমাল করতে পারতেন। কিন্তু না, সেটি হবার নয়। আমার সহপাঠী প্রায় সর্বজ্ঞ লক্ষ্মীকান্তর সঙ্গে আলোচনায় ব্যাপারটা পরিষ্কার হল আমার। সে আমায় কনফিডেন্টলি বোঝাল,- উর বেলা মন্তরে কাজ কেমুন করি? ও শালোর জাত যে আলাদা।
শিক্ষককে আত্মীয় সম্বোধনে চমকিত হলাম বটে, কিন্তু যুক্তি অকাট্য। হেড মাস্টারমশাই যে মুসলমান। রাম লক্ষ্মণের মন্ত্র তিনি জপ করলে কাজ করবে না।
লক্ষ্মণ রবিদাস বলে আর একজন স্যারের কথা মনে পড়ে। ইংরেজি পড়াতেন। অনেক বানান আর ব্যাকরণ ভারি যত্ন করে শেখাতেন। অল্প বয়স। আমার সেই কিশোর বয়সেও কেমন যেন মনে হত, জুনিয়র হাইস্কুলে আটকে থাকার মত নন এই স্যার। ওই স্কুল ছাড়ার পর তাঁর আর কোনও খোঁজ পাইনি যদিও পরবর্তী কালে। সে ভাবে খোঁজ করেছিলাম কি? এই প্রসঙ্গে বলি, স্যারের পদবী থেকেও প্রতীয়মান। গ্রাম্য হিসেবে পদবী অনুযায়ী স্যার ছিলেন অন্ত্যজ মুচি।
ছিলেন পন্ডিত মশাই। তাঁর বয়সও তত বেশি না। সংস্কৃত আর বাংলা পড়াতেন। ক্লাসে মাঝে মধ্যেই পড়ার বাইরের অন্য গল্প বলতেন। অধিকাংশ গল্পই থাকত অতিলৌকিক বিষয় নিয়ে। অবধারিত ভাবে সেই গল্পের এক চরিত্র তিনি নিজে। আমাদের সেই বয়সেও আলো আঁধার সেই গল্প অনেক সময়েই বিশ্বাস্য হত না। স্যার কিন্তু বিশ্বাস করতেন। বলার ভঙ্গীতেই বোঝা যেত।
মৌলবি স্যার পড়াতেন হিন্দি আর আরবি। ফাইভ সিক্স সেভেন এই ভাষা অত্যাচার চলত সেকালে। মুসলমান ছাত্ররা পড়ত আরবি ভাষা। আর হিন্দুদের জন্য সংস্কৃত। কিন্তু হিন্দি সবার জন্য। শেখানোর ভার মৌলবি স্যারকে কেন দেওয়া হয়েছিল কোন দুর্বোধ্য কারণে, বোঝা মুশকিল। সম্ভবত আরবি উর্দু জানেন, কাজেই হিন্দিও তিনি জানেন, জানতে বাধ্য এরকম একটা ধারণা ছিল। স্যারও হিন্দির ব্যাপারে খুব পারঙ্গম ছিলেন বলে আমার মনে হত না। কিম্বা হয় তো ছিলেন বুঝতে পারতাম না। আদৌ মনোযোগী ছিলাম না তাঁর ক্লাসে। অথচ চাপ যে খুব ছিল তা না। হিন্দি হাতের লেখা রোজ রুলটানা খাতার একপাতা। শর্টকাট বার করেছিলাম জব্বর। কোনও ক্রমে এক দু লাইন বই দেখে দেবনাগরীতে। তারপর দশ বারো লাইন অর্থহীন বাংলা লিখে ঘিজি ঘিজি করে কেটে আবার এক লাইনের হিন্দি পুষ্পাঞ্জলি। স্যার চালাকির প্রক্রিয়াটা ধরে ফেলেছিলেন। তার ওপরে সেই ক্লাসে আর একজন সহপাঠী কেন জানি না প্রায়ই আমার নামে নালিশ করত। এখানে বলে রাখা ভাল, খুব একটা শিষ্ট বালক ছিলাম না কাজেই নালিশ করা যেতেই পারত। কিন্তু অন্য ক্লাসে নালিশ না করে সে যে কেন মৌলবি স্যারের ক্লাসেই নালিশের পশরা মেলে বসত, সেদিনও বুঝিনি, আজও বুঝে উঠতে পারি না। হাতের লেখা সংক্রান্ত তঞ্চকতার পর অভিযোগের পাহাড় শুনেই মৌলবি স্যার প্রবল পেটাতেন আমাকে। সেই আমার স্কুলে মার খাওয়া শুরু। আর একজন স্যারও মেরেছিলেন একদিন। সে ছিল প্রায় ‘স্যাকরার ঠুকঠাক কামারের এক ঘা’র সঙ্গে তুলনীয়।
বিস্তারিত বলি। সম্ভবত ক্লাস সিক্সের ঘটনা সেটি। আগেই বলেছি শিষ্ট আইনমানা বালক ছিলাম না। সবে লাট্টু ঘোরাতে শিখেছি। সর্বক্ষণ প্রবল উত্তেজনা। উৎকণ্ঠাও সেই সঙ্গে। লোটনদা লেত্তিতে জড়ানো লাট্টু ছুঁড়েই সেই ঘুরন্ত বিস্ময়কে হাতের তালুতে লুফে নিতে পারে। লাট্টু তখনও তার হাতেই পাক খাচ্ছে। এই অতিমানবিক বিদ্যা আমাকে শিখতেই হবে। কিন্তু তার আগে বড়ই জরুরী আদৌ লাট্টু ঠিকমত মাটিতেই ছুঁড়তে শেখা। অভ্যাস আর অধ্যাবসায় হচ্ছে সাফল্যের মূল অস্ত্র, পণ্ডিত মশাই অর্জুনের লক্ষ্যভেদ পড়াতে গিয়ে বলেছেন। সেই প্র্যাকটিশের তাড়নায় রশিদ স্যারের অঙ্কক্লাসে ঘটনা ঘটল। ঘটনা না বলে অঘটন বলাই ভালো। পেছনের বেঞ্চে একদম সাইডে বসে আমি। স্যার বোর্ডের দিকে ফিরে অঙ্ক করছেন। দু সারি বেঞ্চের মাঝখানে বোঁ বোঁ করতে সশব্দে নামল ঘুরন্ত সেই মিসাইল। বেঁচে যেতাম হয় তো। কিন্তু বেনিফিট অফ ডাউট পেলাম না। লেত্তিটা ঠিক সময়ে গোটাতে না পারায় আদালতে সোপর্দ হলাম। রশিদ স্যার কিন্তু এমনিতে আদৌ নির্দয় প্রকৃতির ছিলেন না। কিন্তু অঙ্ক বিষয়টাকে প্রাণাধিক ভালবাসতেন বলে এই বেয়াদবিটা ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নিলেন। সরু লিকলিকে কঞ্চি দিয়ে অপমানের বদলা শুরু হল। ক্লাস শেষ হতে মিনিট কুড়ি বাকি ছিল। প্রায় সেই কুড়ি মিনিট ধরেই প্রহার চলল। কী রকম অভিজ্ঞতা ছিল সেটি? অন্যভাবে বলি। ঘটনার চমৎকারীত্ব দেখে অভিভূত সহপাঠী কমলারঞ্জন (নাকি সোমনাথ?) বমি শুরু করল শেষ ঘণ্টা বাজার ঠিক আগে আগে। রশিদস্যার হতক্লান্ত হয়ে অস্ত্রত্যাগ করে তার পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তিনিও হাঁপাচ্ছেন ক্লান্তিতে। আর আমি ক্লান্ত তারস্বরে চেঁচিয়ে। শরীরের বিবরণ? আমি যেন নাম পাল্টে শরদিন্দুর উপন্যাসের নায়ক স্বয়ং চিত্রক বর্মা। বদলা আমিও নিয়েছিলাম। ক্লাস সিক্সের বাৎসরিক পরীক্ষায় ইচ্ছে করে অঙ্ক খারাপ দিয়ে একশয় ঊনিশ পেয়েছিলাম। হেডমাস্টার মশাই পরম অভিমানে বলেছিলেন,- তুই কী রে!
আর বাড়িতে ফিরে যা হয়েছিল, সেই হেনস্থার কথা না তোলাই ভাল।
প্রসঙ্গত বলি, আমরা, সেই গ্রামীণ অনুজ্জ্বল স্কুলের ছেলেমেয়েরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতাম সিউড়ি বা আরও বড় শহরের স্কুল নিয়ে। যেখানে রোজ একই রকমের পোষাক পড়ে স্কুলে আসতে হয়। শুধু তাই নয়, বছরে একবার স্কুলেরই ছাত্রদের লেখা নিয়ে একটা বই বার হয়।
আমাদের স্কুলে ইউনিফর্মের বালাই ছিল না। স্কুল ম্যাগাজিনের প্রশ্নই নেই।
মাঝে নয়নসুখএ ক্লাস এইট আর বারাসত গান্ধী স্কুলে নাইন কাটিয়ে ক্লাস টেনে সোপর্দ হলাম রঘুনাথগঞ্জ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে।
নয়নসুখের হেড স্যারের পদবি ছিল “আইন”। আর একজন অতি সুদর্শন স্যার ছিলেন বিকাশবাবু স্যার। এয়ারগানে নিখুঁত লক্ষ্যভেদ করতে পারতেন।শুধু এইটুকু খেয়াল পড়ে স্যার ক্লাসে ভাবসম্প্রসারণ লিখতে দিয়েছিলেন, ” শৈবাল দিঘিরে কহে উচ্চ করি শির…” ইত্যাদি। তা সেইটি লিখতে গিয়ে আমি লিখেছিলাম “হাস্যাস্পদ” শব্দটি। স্যার সেইটির উল্লেখ করেছিলেন ভরা ক্লাসে। তিনি বলা মাত্রই পুরো ক্লাস ঝাঁপিয়ে পড়ল, “স্যার ও বই থেকে মুখস্ত লিখেছে”! স্যার চাপের মুখে আমাকে শব্দটা লিখতে বললেন। আর আমি অবধারিত ভাবে বানানটা ভুল লিখলাম। স্যার ভারি বিষণ্ণ ম্রিয়মান ভাবে বসে রইলেন বাকি ক্লাসটা। কেন মুখস্ত লিখলে ঠিক বানান বেরোবে আর আলাদা শব্দটা লিখলে ভুল বানান আর মুখস্ত করাটা (করিনি যদিও) কেন অন্যায় আমি বুঝিনি।
বারাসত গান্ধী স্কুলে অঙ্কে হাফ ইয়ার্লিতে পেলাম বাইশ আর অ্যানুয়াল পরীক্ষায় খুব খেটে(?) পঁচিশ। বাবা মা আমাকে ফেরত নিয়ে গেলেন কর্মস্থলে, রঘুনাথগঞ্জে।
নয়নসুখ আর বারাসতের শিক্ষকেরা তত ছাপ না ফেললেও রঘুনাথগঞ্জের শিক্ষকদের স্নেহের কথা ভোলা সম্ভব না।
এখানে ভর্তির দ্বিতীয় দিনেই মৃগাঙ্কবাবু আবিষ্কার করেন, মায়োপিক আমি প্রায় অন্ধ। বাবাকে ডাকিয়ে(এখনকার ভাষায় গার্জিয়ান কল) চশমার ব্যবস্থা করে দুনিয়াকে দেখার চোখ পালটে দেন, আক্ষরিক অর্থেই। এখানের চাঁদুবাবুর কাছে কেমিস্ট্রি, রজতবাবুর(ইতিহাসে এমএ অথচ) কাছে ফিজিক্স, প্রণব স্যারের বায়োলজি আর সর্বোপরি নিতাই স্যারের অঙ্কক্লাস, এখনও স্বপ্নে হানা দেয়। এবং হ্যাঁ, হাবুলস্যারের হোমিওপ্যাথির গুলি। মাঝে মধ্যেই পেটব্যথা বলে সেই মিষ্টি গ্লোবিউল খেতে যেতাম।
মেডিক্যালএ চান্স না পেয়ে বিএসসিতে নষ্ট হল দু’বছর।
এরপর প্রিমেডিকেলের অর্থহীন এক বছর কাটিয়ে,মেডিকেল কলেজ।
আমার ডাক্তারি শিক্ষার প্রি-ক্লিনিক্যাল, প্যারা-ক্লিনিক্যাল ও ক্লিনিক্যাল বিষয়ের শিক্ষক শিক্ষিকারা, সে এক বিরাট অধ্যায়। কলেজে সমর মিত্র থেকে শুরু করে শীতল ঘোষ তো বটেই, মোটেই বয়সে তত বড় নন এমন হাউসস্টাফ দাদা দিদিরাও হাতে ধরে শিখিয়েছেন কত কিছু। এর পরেও আরও কতজন, চাকরি জীবনে।
ইন্টার্নশিপ আর হাউসস্টাফশিপের স্যারেরা। সুনীল চৌধুরী, প্রণব চৌধুরী, দেবব্রত সেন, পোস্ট গ্র্যাজুয়েটের শিক্ষক সুবল করগুপ্ত, আরও কত জন। এই শ্রদ্ধেয় প্রত্যেকের নামের আগে ডাঃ এবং প্রফেসর বসবে কিন্তু।
যে হেতু মূর্খের পাঠক্রম, ক্রোনোলজি মেনে চলা সম্ভব হবে না। মূর্খ যা করে থাকে। আগু পিছু জ্ঞান থাকে না। আসলেও অ্যামনেশিয়ার কেস। কখনও অ্যান্টেরোগ্রেড, কখনও বা সে বিস্মৃতি রেট্রোগ্রেড।
যা কথা, যে কথাগুলি এখনই না বললে হারিয়ে যাবে বলে দিতে চাই এখনই।
আমার সারা জীবনে শিক্ষকেরা ছড়িয়ে আছেন সর্বত্র। সেই গল্পের অবধূতের অসংখ্য গুরুর মত।
যেমন সন্তোষ দা। সন্তোষ হালদার। কৃষ্ণগঞ্জের দাদা আমার। আমার থেকে সামান্যই বয়সে বড়। যদ্দিন বেঁচে ছিলেন, পদে পদে প্রতি মুহূর্তে আমাকে শিখিয়ে গেছেন কিছু পাবার আশা না করে কীভাবে ভালোবাসতে হয়। না, শুধু আমাকে ভালোবাসতেন তা নয়। অকৃপণ ভালোবাসতেন সবাইকে। আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশী সবাইকে। যেন সংসারে থাকা এক সন্ন্যাসী। খুব যে অর্থবান ছিলেন তা না। কিন্তু মনটা ছিল বিরাট সিংদরজা খোলা এক প্রান্তর।
এই অকৃপণ ভালোবাসতে পারার শিক্ষা দিয়েছেন আরও অনেকজন। আসলেই বাঁচাটাতো আর কম দিন হল না। সেই প্রথম দিকের কাজের জায়গার নারাণ(জিডিএ পরে ওয়ার্ডমাস্টার), জীবিতেন্দ্র দা'(এমওআইসি), থেকে শুরু করে কত কত জন। কাজের জায়গার বাইরেরও কতজন। এই শেষ বয়সের বন্ধুরা অমিত বিভাসে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসা শিখিয়েছে আর শেখাচ্ছে আমাকে।
যেমন অঙ্কন, আমার কালিম্পংয়ের হাসপাতালের তথা চাকরি জীবনের শেষ সুপারিন্টেন্ডেন্ট। ভালোবাসার কথা মুখে না বলেও যে প্রকাশ করা যায় ব্যবহারে, যে কদিন ছিলাম, প্রতিদিন শিখিয়েছে সে।
যেমন আমার চিকিৎসক সহকর্মী গৌরাঙ্গদা’ কিম্বা সৌমিত্র। এইরকমের আরও কেউ কেউ। যা’দের নিয়ে আমার লেখা একটা কবিতাও আছে। সত্যিই সমস্ত ডাক্তারের জন্য কি না জানি না, কিন্তু আমার জীবনের এক অমূল্য শিক্ষক এঁরা। কবিতাটা ফেসবুকের দেওয়ালে বহুবার দিয়েছি। আবারও একবার দিলাম।
★
কতজনের কথা বলি বলুন তো। পরিবার, প্রতিবেশ, সোশ্যাল মিডিয়া, কাজের জায়গায় ছড়িয়ে আছে যে জীবন, প্রত্যেকের কাছে কিছু না কিছু শেখার। সবাই শিক্ষক। শিখতে পেরেছি কি না সে প্রশ্ন অন্য।
লেখালেখির জগতে… শিক্ষক অনীশ দা দিয়ে শুরু করে কমলেশ পাল অরুণ আইন….অজস্র নাম। তা নিয়ে আলাদা একটা এপিসোড লিখব। লিখবই।
আজকের এই নিতান্ত এলোমেলো স্মৃতিচারণ আর শিক্ষকদের কথা শেষ করি আমার সন্তানসম ডাক্তারদের কথা বলে। সম্প্রতি পারিবারিক এক বন্ধু খুব অসুস্থ হয়ে পড়ায় ভারি বিব্রত হয়ে রয়েছি। রোগ চেনা। কিন্তু তার আধুনিক ম্যানেজমেন্টের মডিউল অনেকাংশই অচেনা। আমার এক ডাক্তার কন্যা এই বিপর্যয়ের মুখে এই রোগের কত নতুন জিনিস যে শেখাল।
চিকিৎসা বিদ্যা নিছকই গুরুমুখী বিদ্যা। ডাক্তার শিক্ষকদের মধ্যে সেকেন্ড টায়ারে আছেন, থাকবেন বিষাণ কৌশিক কাজল অশেষ তুহিন এবং আরও কতজন।
আমার অর্ধেক বয়সী সন্তানসমদের শিক্ষক বলে মানতে একটুও দ্বিধা হচ্ছে না আমার। হ্যাঁ, স্মরণ মজুমদার, ঐন্দ্রিল ভৌমিক আর অসংখ্য বয়সে ছোটোরাও আমার শিক্ষক।
★
সবার দেওয়া সব শিক্ষাকে হেলায় উড়িয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে এক মূর্খের তুচ্ছ অতিতুচ্ছ জীবন।
শিক্ষক দিবসে আমার সব শিক্ষকদের কাছে প্রণিপাত জানাই।
★












