টিচার্স ডে এলো, তাই টিচার্স ডের গল্পের পালা – প্রতি বছরের মতো এ বছরও শোনাবো, শুনতে চাইলে ভালো, নয়তো স্ক্রল করে নেমে যান।
আমাদের বেলায় জয়েন্ট পরীক্ষা পিছিয়ে গেছিল ভোটের জন্য, ২০১১ সালে, যেবার ঘুঘনি কন্যা জিতে এলো আর কি। আমি মনে করি, পরীক্ষা না পেছলে আমার পরীক্ষা ততটা ভালো হতো না, যতটা ভালো হয়ে মেডিকেলে চান্স পেয়েছিলাম। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যেটা, সেটা হলো আমার ইঞ্জিনিয়ারিংয়েও খুব সুন্দর একখান র্যাঙ্ক এসেছিল, সরকারি কলেজে নিশ্চিন্তে চান্স পেতাম আর সেটা সম্ভব হয়েছিল আমার ফিজিক্স খুব স্ট্রং ছিল বলেই। কিন্তু তার বাইরেও একটা মানুষের অবদান ছিল, আমার অংকের টিউশন স্যারের – শুভাশিস রায় স্যার। স্যার আমাকে অঙ্কে বিশাল কেউকেটা বানিয়ে দিয়েছিলেন, সেরকম নয়। বলেছিলেন, ৬০% করে আসবে, তার বেশি লাগে না। ৬০% অঙ্ক ঠিক হলে এমনিই ভালো র্যাঙ্ক পেয়ে যাবে। আমি ফিজিক্স কেমিস্ট্রি বেশ ভালো আটেম্পট করেছিলাম, অঙ্ক করেছিলাম গুনে গুনে ৬০%, বাদবাকি কঠিন প্রশ্ন হাত দিই নি; দেখলাম স্যারের কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে…
স্যারের সঙ্গে পরিচয় আমার ফিজিক্সের স্যার প্রবাল স্যারের সূত্রে। আমার বাড়ির কাছে কোর্ট মোড়ে স্যার পড়াতেন। শুরুর দিকে ভালোই ছেলেমেয়েরা আসতো। স্যার বলতেন, ব্যাচ ফাঁকা হয়ে যাবে চিন্তা নেই। এই কথাটা অনেক স্যার বলতেন, আমার খুব স্পিডে সিলেবাস শেষ হয়, তাল রাখতে না পারলে ছেলেমেয়ে কমে যাবে। কিন্তু আদতে আমি কারো ব্যাচ এত তাড়াতাড়ি ফাঁকা হতে দেখিনি, স্যারের কথা আর কাজে মিল ছিল বেশ। যে কোন চ্যাপ্টার ধরে শুধু কন্সেপ্ট বুঝিয়ে দিতেন, কয়েক ধরনের অঙ্ক করিয়ে দিতেন, বাকি প্রশ্নমালা তুমি বাড়ি গিয়ে চেষ্টা করো। সব অঙ্ক আমি হাতে ধরে করিয়ে দেবো না। পরদিন প্রশ্ন আটকালে দেখিয়ে দিতেন। নয়তো পরের চ্যাপ্টার। চোখ নিমেষে দেখলাম সিলেবাস শেষ, চলো রিভিশন শুরু করো…
আমার ক্ষেত্রে সমস্যাটা ছিল, বাড়ি গিয়ে প্রশ্নমালা আমার আর খোলা হতো না। আমি ছিলাম ব্যাচের সবচেয়ে ফাঁকিবাজ স্টুডেন্ট। রাত জেগে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি বা হয়তো বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পড়লাম, বা অরকুটে বন্ধুবর্গের সাথে হ্যাজ নামালাম। দিয়ে সাতটার সময় পৌঁছতাম টিউশনে। টিউশনির সময় ছিল সাড়ে ছ’টায়, ক্লাস শুরু হয়ে যাওয়ার পর একজনই ঢুকতো, সেটা স্যার জানতেন আমিই হবো। আমার অঙ্ক খাতা স্যারের ক্লাসেই খুলতো, সেখানেই বন্ধ হয়ে যেত। স্কুলের ক্লাসে গণিতচর্চা হতো কিছুটা। এর বাইরে খুব খুব কম সময় আমি অঙ্ক বই খুলেছি।
কিন্তু স্যার এত সহজে জিনিসগুলো বোঝাতেন, স্যারের ওই চ্যাপ্টারের কন্সেপ্ট পার্টটুকু এত ক্রিসপ ছিল, যে সেটুকু বুঝলে মোটামুটি যে কোনো সাধারণ মানের অঙ্ক করে ফেলা যায়। জাস্ট ওই ছাঁচে জিনিসটাকে সাজাতে হবে। পারমিউটেশন কম্বিনেশন এর জটিল অঙ্ক, স্যার বলতেন গোল্লা বানাও, দিয়ে ভাবো কোন গোল্লায় কে কে বসতে পারে… যে কোনও অঙ্কের আসল যে আবস্ট্রাক্ট থিঙ্কিং, সেটায় স্যার জোর দিতেন। তাই খুব বেশি অভ্যাস না করলেও অঙ্কগুলো সেরে ফেলা যেত। আমার প্রবলেম হতো অনভ্যাসের জন্য প্রচুর সিলি মিসটেক হতো, অঙ্কের স্টেপগুলো ঠিক হতো, কিন্তু কোথাও একটা মাইনর মিস্টেকের জন্য উত্তর মিলত না, দিয়ে কেস খেতাম…
কিন্তু স্যারের বিশ্বাস ছিল আমি অঙ্ক পরীক্ষায় ভালোই ফল করবো। কীসের ভিত্তিতে স্যারের এই আস্থা ছিল আমি জানি না। এম সি কিউ পরীক্ষাকে স্যার তিলক কাটার পরীক্ষা বলতেন।ইঞ্জিনিয়ারিং করার ইচ্ছা ছিল না বলে স্যারের তিলক কাটার ট্রেনিং দেওয়ার ক্লাসেও আমি যেতাম না। স্যার বলতেন, দরকার নেই, তুমি বোর্ডের অঙ্কই ঠিক করে করো। ওই দিয়ে তিলক কাটা ঠিক হয়ে যাবে। এম সি কিউ পরীক্ষা নিয়ে বিভিন্ন কোচিং সংস্থার অহেতুক ভীতি সঞ্চারের তীব্র বিরোধিতা করতেন। কীভাবে এই সংস্থাগুলো এবং কিছু ওভার হাইপড ফ্যাকাল্টি অভিভাবকদের ব্রেনওয়াশ করে মুনাফা লুটছে, সেই নিয়ে কটাক্ষ প্রতিটা ক্লাসের একটা কম্পোনেন্ট ছিল… স্যারের এই কথাগুলো এত বছর পেরিয়েও ঠিক একইরকম সত্যি রয়ে গেলো জীবনের প্রতিটা কম্পিটিটিভ পরীক্ষায়…
স্যার খুব ফেমাস ছিলেন না, জনপ্রিয় তো ছিলেনই না, পড়ানোর গতির সুবাদে। কিন্তু স্যার যা বলতেন, তাই করতেন – এই ব্যাপারে কোনো আম্বিগুইটি ছিল না, যেটা অনেকের ক্ষেত্রেই দেখেছি। আমি কন্সেপ্ট বলে দেব, পাতার পর পাতা নোট লেখাতে পারব না, সব বইতেই লেখা আছে, পড়ে নেবে। ডে ওয়ানে ক্লিয়ার করে দিয়েছিলেন, শেষ দিন অব্দি মেনটেন করেছেন। দিনের শেষে অন্তত আমার জন্য ব্যাপারটা খুব সহজপাচ্য হয়েছে, এত কম সময় দিয়েও সাবজেক্টটা উতরে গেছি, যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গে…
এতো গেলো অঙ্কের কচকচি। অঙ্কের মতো আপাত নীরস বিষয়ের মানুষটি যে শিল্পসত্তাতেও অবিচল, সেটার সন্ধান পেলাম শিক্ষক দিবসের দিন। স্যারের গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত ছিল স্যারের পড়ানোর মতোই সাবলীল। পড়ানোর সাথে সাথে আবির লাল, সৌরদীপ ইত্যাদি স্যাম্পেলের সঙ্গে খিল্লি চলত অবিরাম। রসে বসে থেকেও যে অঙ্ক করা যায়, স্যারের কাছেই শিখলাম…
টিচাররা টিউশন পড়ান সংসার চালানোর জন্য, কেউ কেউ পড়ান নিজের খ্যাতির জন্য, খুব কম মানুষই পড়ান শুধু পড়ানোর জন্য, এরকম একজন বৈরাগী শিক্ষক শুভাশিস স্যার, ছোট ব্যাচ, অল্প লোকজন আর গোল্লা পাকানোর অঙ্ক – ক্লাসিক…











