“মৃত পশুদের মতো আমাদের মাংস ল’য়ে আমরাও প’ড়ে থাকি।”
এই লাইনটি জীবনানন্দ দাশের ‘ক্যাম্পে’ কবিতা থেকে নেওয়া। তেমন কোনো গূঢ় উদ্দেশ্য নেই। ইতিহাস লিখতে বসে কবিতার লাইন লিখে বিরাট কী উদ্দেশ্য সাধিত হবে এ সময়ে, ঠিক জানি না। বুঝিও না।
তবু…
আপনি কখনো Karl Gebhardt, Herta Oberheuser এবং Carl Clauberg-এর নাম শুনেছেন?
এঁরা ছিলেন ডাক্তার।
নাম শুনেছেন Ravensbrück অথবা Auschwitz-Birkenau-এর?
হয়তো শুনেছেন, হয়তো শোনেননি। এগুলো জায়গার নাম। এর মধ্যে প্রথমটিতে কেবলই বন্দী নারীরা থাকত।
আর এঁরা ছিলেন তৎকালীন জার্মানির নাৎসি বাহিনীর ডাক্তার। যে বাহিনীতে অন্য যেকোনো পেশার চেয়ে বেশি যোগ দিয়েছিলেন ডাক্তাররা! বলা হয় প্রায় সত্তর শতাংশ ডাক্তার নানারকম ‘মহান কাজ’ করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন।
বুঝতেই পারছেন একটুখানি ডাক্তারদের ইতিহাস লিখব। দুমদাম ভক্তিরসে জারিত হবেন না। একটু পড়ে নিন।
এই তিন ডাক্তার এবং আরো অনেক ডাক্তারের বদান্যতায় তখন যেসব কাজকর্ম চলত উপরোক্ত ক্যাম্পগুলোতে, সেসব দেখে কেউ জীবনানন্দ দাশের কবিতা আবৃত্তি করেনি—এটা না বললেও চলে।
উপরোক্ত ক্যাম্পে চলা মহান কাজ থুড়ি ডাক্তারির কয়েকটি উদাহরণ দিই:
১. নারী বন্দীরা যদি যুবতী হতো, তাঁদের পা চিরে ফেলে, হাড় ভেঙে, স্নায়ুর প্রান্তে ময়লা, কাচের টুকরো, কাঠের টুকরো ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। যুদ্ধক্ষেত্রে আঘাতের ধরন মেনে এরপর সালফার ড্রাগের পরীক্ষা চলত।
২. নারীদের জোর করে স্টেরিলাইজেশন করা হতো। উপায়? কস্টিক কেমিক্যাল জরায়ুতে ঢুকিয়ে, হাই ডোজ এক্স-রে দিয়ে পুড়িয়ে বা অ্যানেস্থেসিয়া ছাড়াই সার্জারি করে।
বলাই বাহুল্য ডাক্তারির গবেষণা হিসেবে খুবই মানবিক!
অবাক হচ্ছেন?
হবেন না। ‘শিক্ষিত’ মানুষের এসব সাজেশন বিজ্ঞানসম্মত বটে!
৩. এ ছাড়া ছিল কৃত্রিমভাবে ইনসেমিনেশন। যেগুলো ছিল অত্যন্ত ইনভেসিভ (invasive) এবং বেদনাদায়ক (painful)। দাবি ছিল—প্রজনন (reproduction) নিয়ে গবেষণা হচ্ছে!
এ ছাড়া গ্যাস চেম্বার বা অন্যান্য ‘শৈল্পিক’ উপায় তো ছিলই।
এর সঙ্গে ছিল আরেকটি মহান কর্মসূচি। অত্যাচারিত নারী বন্দীরা বাচ্চা জন্ম দিলে তাদেরকে নিয়মমাফিক জলে ডুবিয়ে, বিষ খাইয়ে, খাবার না দিয়ে বা জন্মের পরপরই মেরে ফেলা হতো।
কখনো কখনো আবার বয়স্ক মহিলা, ছোট বাচ্চা-সহ মা—এদেরকে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে ‘মুক্তি’ দেওয়া হতো… যত তাড়াতাড়ি সম্ভব!
এ ছাড়া যত রকমভাবে যৌন অত্যাচার করা সম্ভব, মেরে ফেলা সম্ভব ছিল সেই সময়, তার কোনোটাই বাদ যায়নি।
বিস্তারিত লেখার জন্য এই পোস্ট নয়।
এর সঙ্গে একটি নাম নিয়ে কিছু যোগ না করলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
আপনাদের মনে একটা ছোট্ট প্রশ্ন থেকে যাবে।
Dr. Herta Oberheuser। ইনি একজন নারী চিকিৎসক ছিলেন।
আরো অনেক নারী চিকিৎসকের মতো ইনিও ছিলেন নাৎসি বাহিনীর সদস্য।
কিন্তু এঁর কৃতিত্ব একটু বেশিই।
ইনি ছিলেন Karl Gebhardt-এর সহযোগী। উপরোক্ত কাজগুলোতে ইনি ছিলেন এককথায় কুখ্যাতভাবে নিখুঁত (notoriously perfect)!
প্রাতঃস্মরণীয়, তাই না?
এইটুকু লেখার কারণ একটাই—ডাক্তার বা তথাকথিত শিক্ষিত লোকজনকে দেখলেই যদি ভাবেন যে এরা এরকম ‘মহান কাজ’ কিছুতেই করতে পারে না বা কল্পনাও করতে পারে না, তাহলে আপনি একটু চোখ খুলে চারপাশে দেখুন।
দেখবেন, একদম হুবহু কপি না করতে পারলেও, অনেকেই দু-চারটে সাজেশন ঠিক দিয়ে ফেলছেন! হয়তো একদিন এনারাই এসব কাজে সরাসরি হাত লাগাবেন!
একটু খুঁজে দেখলে হয়তো এমনও দেখবেন—তিনি আপনার ভার্চুয়াল বন্ধু!
আরো একটু গভীরে নামলে হয়তো দেখবেন—আপনি নিজেই সেখানে কমেন্ট করে বাহ্ বাহ্ করেছেন! আরো বীভৎস সব বিকল্প সাজেশন দিয়েছেন।
না, আর বাড়িয়ে লাভ নেই। বরং আসুন—
“মৃত পশুদের মতো আমাদের মাংস ল’য়ে আমরাও প’ড়ে থাকি।”











