সুন্দর আর অসুন্দর একসঙ্গে জড়িয়ে থাকে। নুয়াকোটে নির্দিষ্ট যে এলাকায় আমাদের যাওয়ার ছিল, সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই রাত প্রায় ১০ টা। মাথার উপর গাড় নীল আকাশ আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু তারা। আমরা জানতাম না ঠিক কোথায় পৌঁছাতে হবে, নুয়াকোটের বিদুর নগরপালিকার এক নম্বর ওয়ার্ড ঢুঙ্গিতে পৌঁছে ফোনাফোনি করে শেষ পর্যন্ত আমাদের অভীষ্ট স্হান খুঁজে পাওয়া গেল। জায়গাটা ত্রিশুলি বাজারের কাছে।
যেসব এলাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে যাওয়ার পথেই আমরা এমন একটা বাজারের কঙ্কালের মধ্য দিয়ে গাড়িতে করে এলাম। ইলেকট্রিক বিহীন ওই গাঢ় অন্ধকারে গাড়ির স্বল্প আলোয় জায়গাটিকে কোন্ ফেলে আসা প্রাচীন প্রেতপুরী বলে মনে হচ্ছিল। জানা-অজানা অনেক রকম দ্বন্দ্ব আর প্রশ্ন নিয়ে আমরা গাড়ির মধ্যেই নিশ্চুপ বসে রইলাম। অন্ধকারে ওর বেশি দেখা সম্ভব নয়। পরে জেনেছিলাম ওই এলাকার নাম ঢুঙ্গি বাজার।
জায়গাটা পেরিয়ে সামনে কিছু মানুষের জটলা। জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের কাছে রাস্তা বুঝে নিয়ে শেষ পর্যন্ত পৌছালাম। আমাদের ড্রাইভার ওই এলাকাটা আগে থেকে জানায় কিছুটা সুবিধা হয়েছে। তার বাড়ি নদীর অপর পাড়ে ত্রিশুলি বাজারের কাছে। এলাকাটা উঁচু হওয়ায় তাদের বাড়ি এ যাত্রায় বেঁচে গেছে। কিন্তু ত্রিশুলি বাজার, ত্রিশুলি হাসপাতাল, ত্রিশুলি ব্রিজ নিয়ে প্রায় গোটা এলাকাটাই নিশ্চিহ্ন।
যে নেপালি সংস্থার সঙ্গে নুয়া কথা সেরে রেখেছিল, তাদের জায়গায় পৌঁছানো গেল। পাহাড়ের উপরে বেশ কিছুটা সমতল ভূমি, এদিক ওদিক ছড়ানো ছোট্ট ছোট্ট গাছপালা। একদিকে চিয়া বাগান। মাঝখানে টিনের দো চালার সেড দেওয়া একটা জায়গা। সেখানে টিমটিমে কিছু সোলারের আলো। ইলেকট্রিক নেই বোধহয়। তবুও ওই রাতে ওই সময়ে ওই গোটা এলাকার মূল আলোকবর্তিকা ওই জায়গাটুকুই। চারপাশে নিশ্চিম নিবিড় নিশ্চুপ অন্ধকার। মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁর শব্দ। এছাড়া এদিক ওদিক কাজের জন্য রয়েছে কিছু অস্পষ্ট আলোর ব্যবস্থা। হ্যারিকেন ব্যবহার করতে দেখলাম বহু বছর পর। এই জেড আলোর চড়া সময়ে হ্যারিকেন ব্যবহারকারী কিছু মানুষের দিকে এই প্রথম তাকালাম।
আমরা যখন ওখানে গিয়েছি সংস্থার চার পাঁচ জনই ছিল মাত্র। আর ছিল স্থানীয় ৩টি বাচ্চা ছেলে। বাচ্চা বলতে ১৫-১৬ বছর বয়স হবে, যারা ওখানে প্রতিদিনকার কাজ করে, আবার কলেজে পড়াশোনাও করে। কাঠমান্ডু থেকে চার পাঁচ ঘন্টা পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি করে যাওয়ার দরুন প্রত্যেকেই খুব ক্লান্ত। সেই সময় ওদের দেওয়া চিয়া- বিস্কুট , আধমরা শরীরকে অনেকটাই চাঙ্গা করলো। ও বলতে ভুলে গেছি, নেপালে স্থানীয় ভাষায় চা হলো চিয়া।

আগেই বলেছি আমাদের এখানে মেডিকেল ক্যাম্প করতে আসার বিষয়ে এনাদের সঙ্গেই কথা বলা হয়েছিল। ওই টিনের চালার ভেতর মাটির ওপরে কিছু ফরাস ও কার্পেট পাতা। চারপাশ খোলা, একদিকে ছোট কাঠের টেবিলে প্রয়োজনীয় সামগ্রী রাখা। যে জায়গাটায় বসেছিলাম সেটা আড়ম্বরহীন হলেও খুব গোছানো এবং পরিষ্কার। একটানা ঝিঁঝিঁর শব্দ। টিম টিমে সোলারের আলো। ছোট ছোট কয়েকটা মোড়া এবং কাঠের চেয়ারে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে, বাদবাকি সবাই নিচে।
এক শান্ত চোখের নেপালি ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গে কথা বলতে বসলেন। আমদের সবার মনোযোগ তাঁর দিকে। উনি প্রথমেই নিজেদের কাজের পদ্ধতি সম্পর্কে বলতে শুরু করলেন। বললেন, ওনারা মানুষকে প্রকৃত সম্মান দিতে চান। মূলত প্রকৃতিকে বাঁচানোর জন্য এনারা নানান জিনিসপত্র রিসাইকেল করার কাজের সঙ্গে যুক্ত। এনারা সদ গুরুর অনুপ্রেরণায় পথ চলেন। এই চরম দুর্ভোগের সামনে দাঁড়িয়েও ওনারা ধীর স্থির পক্রিয়ায় এগিয়ে মানুষের পাশে থাকতে চান বলে জানালেন। সেই কারণেই উনাদের মনে হয়েছে প্রথমেই ওই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদেরকে চিকিৎসা না করে বরং তাদেরকে বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। এক কথায় বললে বলা যায় যে আগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সঙ্গে কথা বলে তাদের প্রয়োজনগুলোকে বোঝার চেষ্টা করার কথা ভাবতে অনুরোধ করলেন আমাদের। এই পদ্ধতিতে কাজ এগোলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের প্রতি সম্মানো রাখা যাবে, এবং প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে ওই মানুষদের যথার্থ প্রয়োজন সম্পর্কে আমাদের ধারণাও তৈরি হবে। ৩-৪ দিন এইভাবে নানান হোল্ডিং সেন্টারে ভলেন্টিয়ারের কাজ করার মধ্য দিয়ে আমাদের পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক ধারণাও হবে এবং পাশাপাশি ওই সময়ের মধ্যে আমাদের ডাক্তারদেরকে কিভাবে কজে লাগানো যাবে তার কিছু ব্যবস্থাও তাঁরা করতে পারবেন। সেই সঙ্গে জানালেন, পরিস্থিতি সামলানোর জন্য এখানকার সরকার খুবই তৎপর। নুয়াকোট এলাকার বিদুর নগরপালিকায় মোট ৩৪ টি হোল্ডিং সেন্টার বানিয়েছে সরকার। ওনারা ওই হোল্ডিং সেন্টারগুলোতেই ভলেন্টিয়ার হিসেবে কাজ করছেন। বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। অনেক জায়গায় গ্রামের পরে গ্রাম মুছে গেছে কাদা জলের বিধ্বংসী স্রোতে। কিন্তু সরকার তৎপরতার সঙ্গে কাজ করছে। যদিও তারা বিদেশি কোন শক্তির কাছে থেকে সাহায্য নিতে চাইছেন না। এখনো পর্যন্ত কোনো বিদেশী চিকিৎসকদেরকে পারমিশন দেওয়াও হচ্ছে না সরাসরি ভাবে ওই এলাকায় মেডিকেল ক্যাম্প করার জন্য।
আগেই জানিয়েছি, ওদেশে আমাদের চিকিৎসকদের চিকিৎসা করার জন্য নেপাল মেডিকেল কাউন্সিলের এক বিশেষ ছাড়পত্র প্রয়োজন, এটি এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে নেই। এছাড়াও উনি ইউনাইটেড নেশানের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কাজ করার জন্য যে নির্দিষ্ট এসওপি মানা হয়, ওই ধরনের একটি এসওপি আমাদেরকে দেখান এবং সেইটা সম্পূর্ণ মেনে ওনাদের সংস্থার সঙ্গে কাজ করার কথা বলেন। আমাদের টিমের ওই এলাকায় কাজ করার জন্য একটি বিশেষ পরিচয় পত্র বানিয়ে দেওয়া হবে বলেও জানান।।
এত পর্যন্ত শুনে আমাদের সবাই খুব হতাশ হয়। কারণ নুমার সঙ্গে ওনারা যেভাবে কথা বলেছিলেন তাতে মনে হয়েছিল আমরা গিয়েই ওই এলাকায় মেডিকেল ক্যাম্প করতে পারব, এবং তাতে ওনারাই আমাদের সাহায্য করবেন।
কসমিক এনার্জি। নামটাতে সবাই একটু থমকালাম। এই প্রথম ঘাড় ঘুরিয়ে ওই টিনের দোচালা শেডের ভেতর একদিকে টাঙানো নামটা পড়লাম। মূলত আমরা যে ধরনের কাজকর্ম করি তাতে বিজ্ঞানের অস্তিত্বকেই মেনে চলা হয় সেখানে আধ্যাত্মিকতাবাদের স্থান নেই, আমরা বিজ্ঞানকেই চূড়ান্ত শক্তি বলে মনে করি। মহাবিশ্বকে সংযুক্ত বা চালিত করে এমন সর্বব্যাপী শক্তির কোন ফিলোসফি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। তাই তা আমাদের চর্চার বাইরে। সেই কারণেই সবাই কৌতূহলী।
আমরা জানি এই মুহূর্তে এখানকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোটাই মূল হওয়ার কথা। আমরা মানুষের পাশেই দাঁড়াতে এসেছি, এই ঘটনার রাজনৈতিক গুরুত্ব তো আছেই, কিন্তু সেই সঙ্গে এটা যথেষ্ট জরুরিও বটে। তার পাশাপাশি আমরা এটাও জানি কোনো ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয় মানেই সেটি ইতিহাস, দর্শন বা সংস্কৃতিতে অর্থহীন নয়। “সর্বব্যাপী শক্তি” বা universal life force–এর ধারণা ভারতীয় সভ্যতায় বহু শতাব্দী ধরে দর্শন, যোগ, তন্ত্র, আয়ুর্বেদ, ধর্মীয় আচার এবং লোকাচার এর মধ্যে বিভিন্ন নামে এসেছে। তবে একে আধুনিক বিজ্ঞানের energy-র সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা ঠিক হবে না। কিন্তু কাজ করার ক্ষেত্রে এই অনৈক্যটি ঘনঘোর রাজনৈতিক বৈ তো নয়!
বুঝতে পারি আমাদের নেতারা ভাবনায় পড়লেন। জনস্বার্থে যে কোন অবস্থায় যেকোনো রাজনৈতিক মতাদর্শকে সরিয়ে রেখে এগোতে হবে,এটা আমরা প্রত্যেকেই জানি। রাতটা অদ্ভুত ছিল। একদিকে আকাশের কাছাকাছি এমন ছড়ানো জমিতে কখনো রাত কাটাইনি। অন্যদের মতোই একটা ছোট্ট টেন্ট এ আমি আর ডাক্তার অভনি উন্নি জায়গা করে নিলাম। টেন্টগুলি আধুনিক সুবিধা যুক্ত। টেন্টের চেইন লাগানো প্রবেশদ্বার খুলে দিলেই একরাশ আকাশ ঢুকে পড়ে। এমন তারার হাতছানি দেওয়া রাত কাটাইনি কখনো। এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙলো প্রবল বৃষ্টি ও বাজ পড়ার শব্দে। তড়িঘড়ি করে উঠে দেখে নিলাম চেনগুলো ঠিকঠাক আটকানো আছে কিনা। দেখলাম ইতিমধ্যে টেনটের গায়ে রাখা লাগেজ জলের ছাঁটে বেশ কিছু এলাকায় ভিজে গেছে। ভয় লাগলো। আকাশের কাছাকাছি পাহাড়ের ওপর এমন ছড়ানো জমিতে এই প্রথম রাত্রিবাস। খোলা আকাশ থেকে বজ্রপাতের আওয়াজে বেশ ভয় পেলাম আমি। যদিও কখন ঘুমিয়ে পড়েছি আবার।

এক অদ্ভুত আলোয় ঘুম ভাঙলো। আমরা যারা নিত্য দিনের নিজস্ব বাহুডোরে একান্ত গৃহকোণবাসী তারা ওই আলোর খবর জানি না। নাগালও পাইনে। টেন্ট থেকে বেরিয়ে মনে হল জায়গাটা যেন আলোয় ভেসে যাচ্ছে। যদিও সময় সকাল সাড়ে ছটা। চারপাশে পাখি ডাকার আওয়াজ শুনলাম বোধহয়। রাতে বোঝা যায়নি, আসলে গোটা এলাকা নির্দিষ্ট প্ল্যান মাফিক তৈরি করা। পাহাড়ের ধারগুলো চাষের জমি। ওখানে স্টেপ বাই স্টেপ ঝুম চাষ করা হয়েছে। কোথাও ধান কোথাও বিনস। মধ্যখানের এলাকাটা পুরোটাই একটা বড় বাগান। ছোট ছোট কেয়ারি করা গাছের ঝাড় তৈরি করা হয়েছে। মধ্যিখানটা বসবাসের জন্য। ওই খালি জায়গাটার ঠিক মাঝে সেই দোচালা টিনের সেড। তা থেকে কিছুটা দূরে বাথরুম, বাথরুমের একদিকে কিছুটা এগিয়ে জলের একটা ট্যাংকি। সেখান থেকে হাত ধোয়া, মুখ ধোয়া বা স্নান করার ব্যবস্থা। এলাকাটা বেশ গোছানো , কিন্তু রাতের অন্ধকারের জন্য আগের দিন তার কিছুই বোঝা যায় নি। এমন স্নিগ্ধ জায়গায় প্রকৃতির এমন রোষ!!
রাতে একটা অর্ধ সমাপ্ত প্রশ্ন নিয়ে ঘুমোতে গিয়েছিলাম। সকালে তার উত্তরের সামনে পড়তে হলো। আগের দিনটা কসমিক এনার্জির ওই ভদ্রলোকের সব কথা শোনা হয়েছিল, কিন্তু কোন টিম মিটিং হয়নি। আগের দিন রাত ভোর ঝড়-বৃষ্টি চলেছে। তাই সবার উঠতে দেরি হবে বলে ভেবেছিলাম। প্রাতকৃতের কাজ সেরে একটু এদিক ওদিক করার পরই দেখলাম টিমের প্রায় প্রত্যেকেই উঠে পড়েছে। এই এলাকা থেকে দূরে সবুজে ঘেরা পাহাড়ের এক বিস্তৃত অংশকে দেখলাম লাল মাটির কঙ্কাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মানে পাহাড়ের অন্যান্য জায়গাগুলোতে সবুজ টিকে থাকলেও ওইদিনের কাদা মাটির তোড়ে ভেসে আসা ভয়াল শব্দের স্পন্দনে পাহাড়ের ওই এলাকায় ল্যান্ড স্লাইডিং হয়েছে। ফলে সমস্ত গাছ উপড়ে পড়ে নিচের লাল মাটি-পাথর বেরিয়ে গেছে। মনে পড়ে গেল সুন্দর আর অসুন্দর একসঙ্গে জড়িয়ে থাকে। দূর থেকে এই প্রথম দিনের আলোতে সেই ভয়াল ঘটনা ‘ ত্রিশুলি বাঁধি’র পদচ্ছাপ দেখতে পেলাম।










