১.
স্মৃতিভ্রষ্টতা বা ডিমেনশিয়া রোগের কথাটা নতুন করে শোনা হলো ভটচাজ দার সূত্রে। আমার প্রতিবেশী মানুষ। আমাদের বাড়ি থেকে একটা গলি বাদ দিয়ে পাশের গলিতে ওঁর বাড়ি। মাসকয়েক আগেও প্রায় প্রতিদিনই দেখা হতো, সুখ দুঃখের কথা হতো । হঠাৎ করে মানুষটির আর দেখা নেই। কী হয়েছে? খবর নিতেই জানা গেল ভটচাজ দা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গৃহবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। মানুষের স্মৃতিশক্তি যদি লোপ পায় তাহলে যে ঘোরতর সমস্যা। অথচ এই মুহূর্তে পৃথিবীর বহু বৃদ্ধ মানুষ, বয়স্ক মানুষ মানুষ এই রোগের শিকার হয়ে একরকম গৃহবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। এইসব মানুষের জীবনে সুবিস্তৃত পৃথিবীর সমস্ত দরজা বন্ধ হয়ে থমকে গিয়েছে একটি ঘরের সীমানায়। ভাবলেই শরীরে একটা হিমেল স্রোত বয়ে যায়।
২.
ডিমেনশিয়া একান্ত ভাবেই একটি বয়সজনিত সমস্যা। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা অনেকটাই কমে যায়, কমে যায় চিন্তা ভাবনা ও যুক্তি সম্মত আলোচনার ক্ষমতা। মস্তিষ্কই হলো আমাদের প্রতিদিনের কাজকর্মের প্রধান সঞ্চালক। তা যদি নিছকই বয়সজনিত কারণে অকেজো হয়ে পড়ে তাহলে যে অতি কেজো মানুষও জড়বৎ হয়ে যায়। ভটচাজ দার মতো সদা ব্যস্ত মানুষটিও আজ এ দুনিয়ায় এক রকম “খোটে সিক্কে” হয়ে গেছেন। এখন তিনি সংসারের বোঝা।
৩.
চিকিৎসাশাস্ত্রের পরিভাষা অনুযায়ী ডিমেনশিয়া হলো একটি নিউরোডিজেনারেটিভ অবস্থা। এরফলে আক্রান্ত মানুষটির স্মৃতিশক্তিই শুধু লোপ পায় তেমনটা নয়,একই সঙ্গে লোপ পায় কিছু বুঝতে পারা, শিখতে পারা, গুণতে পারা, নিজেকে পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারা, ঠিকঠাক পরিস্থিতির বিচার করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারার মতো ক্ষমতাও। সঠিক শব্দ প্রয়োগের ক্ষমতাতেও খামতি দেখা যায়। গুছিয়ে কথা বলতে না পারলে ভাবের আদান প্রদান হবে কি করে? স্বাধীনভাবে কাজ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বেমালুম লোপ পেলে এক দুঃসহ অবস্থায় পড়তে হয় আমাদের। ডিমেনশিয়ার ক্ষেত্রে এমনটাই স্বাভাবিক বলে মনে করেন চিকিৎসকরা। ভটচাজ দার কথাবার্তার মধ্যে বেশ কিছু অসংলগ্নতা লক্ষ করেছিলাম। তবে তা যে এমন পরিণতির দিকে তাঁকে নিয়ে যাবে এই ভাবনা কখনোই মাথায় আসেনি।
একেই হয়তো বলে ভবিতব্য!
৪.
একজন পরিণত বয়সের মানুষের মস্তিষ্কের মধ্যে স্মৃতিভ্রংশতার সমস্যা বাসা বেঁধেছে কিনা তা টের পাবেন কীভাবে? এই সময়ে আমাদের ঘরে ঘরে বৃদ্ধ , বয়স্ক মানুষদের ভিড় বাড়ছে। এরফলে দেখা যাচ্ছে নতুন সামাজিক সমস্যা যার প্রতিফলন লক্ষ করা যাচ্ছে বৃহত্তর সমাজের প্রেক্ষাপটে। তাই সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এই রোগের সাধারণ লক্ষণগুলো হলো :
১. কোনো অভিজ্ঞতার কথা ভুলে যাওয়া। অনেক সময়ই খুব টাটকা বিষয় বা ঘটনা মনে রাখতে না পারা। সবথেকে সমস্যা হয় যখন অতি পরিচিত মানুষের সঙ্গে হওয়া কথা ভুলে যান।
২. প্রাত্যহিক জীবনের খুব সহজ সমস্যার সমাধান করতে না পারা। স্নানের পর গা মুছতে হবে এমন বিষয়গুলো ঠিক মতো মনে থাকে না।
৩. সময় ও স্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তি জন্মানো। এমন রোগীরা য়শই রাস্তা হারিয়ে ফেলেন। নিজের বাড়ির পথও চিনতে পারেন না। সঠিক বক্তব্য রাখতে গিয়ে রীতিমতো হিমসিম হয়ে যান।
৫. সন্দেহ বাতিক দেখা যায়। নিজের প্রিয়জনকেও সন্দেহ করতে শুরু করেন। এই অবস্থায় পারিবারিক সম্পর্ক মলিন হতে শুরু করে। কখনো কখনো দিবাস্বপ্ন দেখতে পারে।
৬. ঘরোয়া পরিবেশেও নড়াচড়া করতে অসুবিধা হয়।
৭. শারীরিক পরিস্থিতির উন্নতি হলেও আচরণগত অসঙ্গতি থেকে যেতে পারে। নিজের পরিচর্যার ক্ষেত্রে উদাসীনতা দেখা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে যেসব শারীরিক সমস্যার কারণে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে একজন বরিষ্ঠ মানুষ সেগুলো হলো —
১. বেড়ে যাওয়া বয়স :- সাধারণত ৬৫+ বয়সের প্রবীণদের মধ্যে স্মৃতি হারানোর সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায়।
২.বংশগত ইতিহাস:- পারিবারিক ইতিহাস থাকলে এমন হবার আশঙ্কা থাকে। গবেষকরা জানিয়েছেন যে আলঝাইমার রোগের ক্ষেত্রে জেনেটিকাল ডিস অর্ডার বড়ো ভূমিকা নিয়ে থাকে। এই তথ্য যাচাই করা দরকার।
৩.পূর্ববর্তী কার্ডিওভাসকুলার সমস্যা :- উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকলে বা কোলেস্টেরলের সমস্যা থাকলে ভাস্কুলার ডিমেনশিয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
৪.মাথায় গুরুতর আঘাতের সমস্যা থাকলে :- দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত লেগে থাকলে তা স্মৃতিভ্রম ঘটাতে পারে।
৫. অতিরিক্ত ধূমপান, মদ্যপান, শারীরিক ক্রিয়াকলাপের অভাব থাকলে এই রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। পুষ্টিকর খাবার না খেলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা হ্রাস পায় যা স্মৃতিশক্তি কমাতে পারে।
৫.
ডিমেনশিয়া সম্পর্কে এতো কিছু জানার পর যে প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক ভাবেই উঠে আসে তার হলো, এই রোগ কি সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভবপর? এর উত্তরে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে এই রোগে মস্তিষ্ক একবার আক্রান্ত হলে তা থেকে সম্পূর্ণ
সুস্থ হয়ে ওঠা সম্ভব নয়। তবে এক সংবেদনশীল গৃহপরিবেশ এই সমস্যার প্রকোপকে প্রশমিত বা বিলম্বিত করতে সাহায্য করে মাত্র। সংসারে বৃদ্ধ বয়স্ক মানুষদের অবস্থান বদলে গেছে এই ব্যস্ততার দুনিয়ায়। ভারতীয় সমাজের অন্দরমহলেও এমন অনাদৃত মানুষের ভিড় বাড়ছে হু হু করে। ফলে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছেন আমাদের প্রবীণ প্রবীণারা। পারিবারিক সম্পর্ক সুস্থ সুন্দর হলে এই রোগের লক্ষণ থেকে হয়তো মুক্তি পাবেন আমার আপনার একান্ত পরিজনেরা। প্রবীণদের প্রতি একটু সহানুভূতিসম্পন হই আমরা।
ঋণ স্বীকার: Cleveland Clinic News Letter এবং অন্যান্য পরিচিত সূত্র।
সেপ্টেম্বর ১৩.২০২৬















