আমরা যখন মেডিক্যাল কলেজে ঢুকি, তখন আমরা গল্প শুনেছিলাম স্যারদের থেকে যে তাঁরা যখন ছাত্র ছিলেন, তখন তাঁরা মেডিক্যাল কলেজে পড়তে আসতেন পার্শ্ববর্তী অন্যান্য কলেজ থেকে। যে সকল কিংবদন্তী মানুষদের বই পড়ে আমরা এনাটমি শিখেছি, তাঁরা মেডিক্যাল কলেজেই পড়াতেন, বিভিন্ন রঙের চক দিয়ে নাকি বোর্ড ভরে ছবি আঁকা হতো এবং সেই ক্লাস দেখতে বিভিন্ন কলেজ থেকে পড়ুয়ারা আসতেন। আমাদের সময় এই চল ছিল না। আমাদের লোকজন আক্কেল সেলামি দিয়ে বাইরে টিউশন পড়তো। জয়েন্টে র্যাঙ্ক করে রাজ্যের সেরা মেডিক্যাল কলেজে ঢুকেও পড়তে হচ্ছে বাইরের টোল থেকে, জীবনে কোনোদিন মানতে পারিনি এটা। তাই কলেজের স্যার ম্যাডামদের ধরেই ক্লাসের বাইরেও অন্যান্য সময়ে গিয়ে পড়েছি। কিন্তু অস্বীকার করার জায়গা নেই আমরা মেডিক্যাল শিক্ষার একটা মধ্যযুগে বাস করেছি, আমাদের ক্লাস সেই মাত্রার হতো না, লেকচার থিয়েটার ফাঁকা – বাইরের কলেজ থেকে লোক আসবে সেই আশা দুরাশা বই আর কিছু নয়। হাতে গোনা কিছু লোকের দয়ায় বিষয়টা শিখতে পেয়েছি।
এখন এসবের কোনো প্রয়োজন নেই। এখন মেডিক্যাল শিক্ষার আধুনিক যুগ। মানুষ কলেজে ভর্তির দিনই ম্যারো, প্রেপ ল্যাডার, সেরিবেলাম ইত্যাদি কোর্স নিয়ে নেয়। কলেজে ক্লাস হলো কি না হলো দেখার দরকার নেই। লোকজন অনলাইনেই পড়া বুঝে নেয়, সেই দিয়েই কাজ চালায়। কিছু না শেখার থেকে এভাবে শেখা ভালো, এই জিনিসটা আমিও মেনে নিয়েছি। কিন্তু সমস্যা হলো, অনলাইনেই যদি ডাক্তারি শেখ যেত, তাহলে তো যে কেউই ঘরে কোর্স নিয়ে পড়তে পারতো, কলেজের দরকার হতো কি! এই যে মহাজ্ঞানী স্বাস্থ্যমন্ত্রী বললেন, আজকাল ডিসেকশন লাগে না সব থ্রি ডি মডেলে শিখে নেওয়া যায়, আদপে যায় কি? আমার ধারণা যায়না…
আচ্ছা স্টুডেন্টরা তো শিখছে যেমন তেমন, টিচাররা কী করছেন? গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর সিনেমায় পঙ্কজ ত্রিপাঠীর একটা ডায়লগ ছিল, যার অর্থ হলো এখানে পায়রাও এক ডানা দিয়ে ওড়ে, দ্বিতীয়টা দিয়ে নিজের ইজ্জত বাঁচায়। মেডিক্যাল কলেজের টিচারদের এখন সেই অবস্থা। চার আনার স্বাস্থ্যমন্ত্রী গুলো এসে হম্বি তম্বি করে যায়, ওনারা শোনেন। বাড়ির কাছে পোস্টিং বা কলকাতায় পোস্টিংয়ের জন্য ডিপার্টমেন্টের থেকে বেশি সুপার/ ডিরেক্টর অফিসে তেলের বাটি হাতে দাঁড়িয়ে থাকে। যাঁরা ক্লিনিকাল লাইনে আছেন, তাঁরা ঠিক সময়ে ফোন ধরে নেতাদের রোগী ভর্তি করেন। এসব করেও কখনও কখনও শেষরক্ষা হয়, কখনও হয় না। আমি যে সময়ে এম ডি করতে ঢুকেছিলাম, সে সময় যা তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো ফ্যাকাল্টি লিস্ট ছিল, আজ তার ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে। পুরোনো লোকেরা অবসর পাচ্ছেন, কোনো মানসিক ভাবে স্থিতিশীল লোক, যার বাইরে করে খাওয়ার ক্ষমতা আছে, সে সরকারি চাকরি নিচ্ছে না। দুদিন পর স্টুডেন্ট দের পড়াবে কে? যার কোর্স কেনার পয়সা নেই, তাকে শেখাবে কে? জানিনা…
এসবের শুরু কোথায় বলুন তো? সেই সিপিএম আমলেই। মেডিক্যাল কলেজের টিচারদের বাইরে রোটেশন করাতে হবে, যাতে পেরিফেরী কলেজেও সবাই স্যারদের অভিজ্ঞতার স্বাদ পান। প্রথমত আসল উদ্দেশ্য সেটা ছিল না। আসল উদ্দেশ্য ছিল স্বজন পোষণ। আমরা মেডিক্যাল কলেজেই ঢুকেই সেটার স্বাদ পেয়েছি। তৃণমূল এসেই বাম মনষ্ক ফ্যাকাল্টিদের কান ধরে বাইরে পোস্টিং দিলো। দ্বিতীয়ত একটা মানুষ তার কাজের জায়গায় স্থিতিশীলতা না পেলে কোনো গবেষণাধর্মী কাজ করতে পারে না, স্বভাবতই বাংলার কলেজগুলোর মেডিক্যাল লিটারেচারে অবদান শূণ্যের কোঠায়। শুধু কয়েকটা ডিপার্টমেন্ট যেগুলোর এসএসকেএম বা কলকাতার দুয়েকটা হাসপাতাল ছাড়া কোথাও কোনো অস্তিত্ব নেই, তারাই অল্প স্বল্প গবেষণা করতে পারে। বাকিদের অবস্থা গয়ং গচ্ছ…
গোটা জিনিসটা যাদবপুরে হতে চলেছে, এবার সিপিএমের জায়গায় ক্রেডিট হবে বিজেপির। কাজটা একই, ইন্টেনশন ও একই। আসলে সমস্যা হচ্ছে এখন সময়টাই শূদ্র শাসনের। আমাকে মেরে ফেলবেন না প্লিজ জাতিগত বৈষম্যের আরোপে 🙏 ব্যাপারটা জাতিগত নয়ই, ব্যাপারটা কর্মগত। যার পড়াশোনা নেই, পড়াশোনা করার ইচ্ছা নেই, পড়াশোনার মাধ্যমে জাগতিক উন্নতি হোক সেই কামনাও নেই – এরকম প্রজাতির হাতে সমাজের শাসনব্যবস্থা চলে গেলে মধ্যমেধার বিকাশ হয়। তা দিয়ে কোনো মহৎ কাজ হয় না। এই সময়ে এটাই হবে, সেটা সিপিএম নামে হোক, কি বিজেপির নামে… এই একটা কাজে তৃণমূল ভালো ছিল, শুধু পয়সা মেরে ক্ষান্ত থাকতো, নিজেদের কোনো ভাবধারা ছিল না। চোর ডাকাতদের যদি নিজস্ব ভাবধারা থাকে, সেটা আরও ভয়ঙ্কর – সিপিএম ও বিজেপি – মেধার বিকাশে দুজনেই চরম অন্তরায়।











