আজ আপনাদের মাঙ্গা বুকস এর গল্প শোনাবো। এই বই হল এক ধরণের “ছবিতে গল্প” এর বই চলতি কথায় আমরা যাকে “কমিকস” বা গ্রাফিক নভেল” বলি। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে জাপানে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে এই ধরণের বই, শুধু শিশু কিশোর নয়, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও।
পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপান, ২০০১ সালের পর প্রথম আর্থিক মন্দার মুখোমুখী। সে দেশের দিশেহারা সরকার বিশ্ব আর্থিক সুনামির হাত থেকে বাঁচতে ঘোষণা করে ২৭৫ বিলিয়ন ডলার এর স্টিমুলাস প্যাকেজ। দেশের মোট কর্মশক্তির এক তৃতীয়াংশ পার্ট টাইম কর্মচারীতে পরিণত। মহাজাগতিক টাইপের কর্পোরেট সোনি বা টওটার মুনাফা নিম্নগামী। দেশের মানুষ, বিশেষ করে কম বয়সীরা ভীত, বিভ্রান্ত। মনে অনেক প্রশ্ন জমাট বাঁধে। সদুত্তর নেই। নেই দৈনিক সংবাদপত্রের পাতায়, নেই সিলেবাসের পাঠ্যপুস্তকে।
তাহলে কি উত্তর লুকিয়ে আছে দেড়শ বছর আগে প্রকাশিত হওয়া সেই বইটার মধ্যে, যার লেখক লিখে গিয়েছিলেন যে পুঁজিবাদ তার নিজের ওজনের তলায় চাপা পড়বে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বের জন্য। ১৮৬৭ সালে আজকের দিনে ১৪ই সেপ্টেম্বর এক দাড়িওয়ালা জার্মান গোটা বিশ্বের নিশ্চিত, নিরূপদ্রবে জীবন যাপন করা মানুষজনের ওপরে ছুঁড়ে মেরেছিলেন থান ইটের মতো মোটা একখানা বই। নাম দাস ক্যাপিটাল।
পাঠকদের চাদিদা বুঝে ইস্টপ্রেস কোম্পানি প্রকাশ করে দাস ক্যাপিটালের মাঙ্গা সংস্করণ। ট্রেনে, বাসে, ট্রামের নিত্য যাতায়াতের সময়, অফিসে লাঞ্চ ব্রেকের সময় জাপানি পাঠক হুমড়ি খেয়ে পড়ছে সেই গ্রাফিক নভেল। ইস্টপ্রেস এর ইউসুকে মারুও এর হিসেব অনুযায়ী প্রথম দুদিনেই বিক্রি ৬ হাজার কপি।
এ গল্পটা ১০ বছর আগের। এখন পর্যন্ত কত কপি বিক্রি হয়েছে জানা নেই। শুধু এটুকু জানা আছে যে হাজার চেষ্টা করেও মার্ক্সকে মুছে ফেলা যায় নি। তার লেখা বই লাইব্রেরির ধুলো মাখা তাক থেকে নেমে এসেছে লোকাল ট্রেনের কামরায়। এই দার্শনিক আজ প্রাসঙ্গিক না হলে কে প্রাসঙ্গিক ?
মার্ক্সবাদের বিরোধীরা মার্কসবাদ যে অচল এটা প্রমাণ করতে প্রায়শই একটা কুযুক্তির অবতারণা করেন যে মার্ক্স নাকি প্রযুক্তির এই উন্নতি বিশেষত তথ্য প্রযুক্তির এই অভাবনীয় উন্নতি দেখে যেতে পারেন নি, তাই উনি ও ওনার চিন্তা ভাবনা না কি ব্যাকডেটেড। ওপেন সোর্স, হাইব্রিড মডেল, আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং ইত্যাদি টার্ম ছুঁড়ে দিয়ে এরা বোঝাবার চেষ্টা করেন যে হু হূ বাবা, তোমাদের মার্ক্স এসব কি দেখে গেছেন তার জীবদ্দশায় ? তাহলে বাপু মেনে নাও যে আজকের দিনে মার্ক্সবাদ অচল কারণ সেটা ব্যাকডেটেড।
আপাত ভাবে দেখলে মনে হয় এদের কথায় কোথাও একটা সলিড যুক্তি আছে। কারণ আমি বা আপনি দাস ক্যাপিটাল তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কিন্তু মেশিন লার্নিং বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স শব্দটা পাবো না। কিন্তু ঐভাবে খুঁজতে যাবই বা কেন। কারণ “সবই ব্যাদে/ কুরআনে আছে জাতীয় হাস্যকর দাবি মার্কসবাদীরা করেন না। একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যায় যে ঐগুলি নিছক ফ্রেজলজি। পেছনের মূল অর্থনৈতিক ধারণা যে সেই অটোমেশন, মানুষের শ্রমকে, তার দক্ষতাকে মেশিন দিয়ে প্রতিস্থাপিত করার চেষ্টা প্রযুক্তি কৌশলের মাধ্যমে, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
তাই সমালোচকদের যদি পাল্টা প্রশ্ন করেন যে আরে বাবা, দিনের শেষে তো তোমার বলা ভারী ভর্কম শব্দ গুলো তো আসলে সেই আদি ও অকৃত্রিম অটোমেশনেরই নানান রূপ মার্ক্স যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে গেছেন ক্যাপিটাল এর প্রথম খন্ডের পনেরো নম্বর অধ্যায়ের ছয় নম্বর অনুচ্ছেদ যার শিরোনাম ছিল THE THEORY OF COMPENSATION AS REGARDS THE WORKPEOPLE DISPLACED BY MACHINERY”, তখন আর এরা পালবার পথ পায় না।
পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ট চিন্তানায়ক হিসেবে মার্ক্স যে যে কারণে চিহ্নিত হয়েছিলেন তার অন্যতম ছিল তাঁর দূরদর্শিতা, মার্ক্স অনাগত কাল নিয়ে অনেকদূর ভাবতে পেরেছিলেন তার প্রমাণ আপনি খুঁজে পাবেন “দাস ক্যাপিটাল” সহ অন্যান্য বইতে। এখন তাঁর এই ক্ষমতাকে আমরা নিশ্চয়ই নস্ত্রদামুস মার্কা ভবিষ্যতবাণীর সাথে গুলিয়ে ফেলবো না। মার্ক্স আর যাই হোক, জ্যোতিষী ছিলেন না। মার্ক্সবাদ এক লাইন না পড়ে মার্ক্স এর এই সব সমালোচনাকারীদের কি জবাব দেয়া যায় সেটা খুঁজতে গেলে হতবাক হয়ে যাওয়া ছাড়া মার্কসবাদীদের আর অন্য কোনো উপায় নাই। মার্ক্সবাদ আজও কতটা প্রাসঙ্গিক সেটা বুঝতে গেলে মার্কসবাদ চর্চার কোনো বিকল্প আজ অবধি আবিষ্কার হয় নি।
“কার্ল মার্ক্স ইজ ডেড, লং লিভ কার্ল মার্ক্স”









