বায়ুহীন কাচের টিউবের মধ্যে দিয়ে তড়িৎপ্রবাহ পার করালে কী কী হতে পারে, সেসব নিয়ে গবেষণা করতে করতে খানিকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই উইলহেম কনরাড রন্টজেন যে এক্স-রে আবিষ্কার করে ফেলেন, সে গল্প অনেকেই জানেন। গল্পের সময়টা ১৮৮৫, ডিসেম্বর মাস – অকুস্থল প্রবল শীতের সময়কার জার্মানি। আবিষ্কার হওয়ামাত্র এ নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে হইচই পড়ে যায়, একথাও অনেকেরই জানা। (এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোর অধিকাংশই সেসময় শ্বেতাঙ্গ বিশ্বের উপনিবেশ – আধুনিক বিজ্ঞানের চর্চা সেখানে সীমিত – সুতরাং নতুন আবিষ্কার-জনিত উচ্ছ্বাসের অংশ হতে পারার ক্ষেত্রে তারা পিছিয়েই ছিল।) তবে যে গল্প প্রায় সবারই জানা, তা আর নতুন করে শোনানোর মানে হয় না – আমার গল্পটাও এক্স-রে সংক্রান্ত, তবে রন্টজেনের তুলনায় কম আলোচিত।
এমিল গ্রাব-এর জন্ম শিকাগো-তেই, ১৮৭৫ সালে। জার্মান অভিবাসী পরিবারের সন্তান। তেরো বছর বয়স থেকেই নিজের পেট নিজে চালানোর ব্যবস্থা করতে হয়। কাজ বলতে স্থানীয় একটি ওষুধের দোকানে শিশিবোতল ধোয়া, সঙ্গে টুকটাক ফাইফরমাশ খাটা। কিছুদিনের মধ্যে আরেকটু ভদ্রস্থ কাজ জুটল – দোকানে খাতা লেখা। পরিশ্রমী, বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহী ও অনুসন্ধিৎসু ছেলেটি মালিকের সুনজরে পড়ল শিগগিরই – দোকানমালিকই তাকে উৎসাহ দিলেন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে।
এমিল-এর স্বপ্ন সে ডাক্তার হবে। পনেরো-ষোলো বছর বয়স থেকে ভর্তির চেষ্টা সে শুরু করল (ওই বয়সে তখন ডাক্তারিতে ভর্তি হওয়া যেত) – কিন্তু মুশকিল, প্রথাগত শিক্ষার জায়গাটা তার নড়বড়ে। স্বপ্ন সফল করতে গেলে এভাবে হবে না, কথাটা দ্রুত বুঝে গেল সে। অতএব, স্কুলে ভর্তি হলো – পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাসাচ্ছাদনের বন্দোবস্ত করতে রাত্তিরে নাইট-ওয়াচম্যানের কাজ। তো যেভাবেই হোক, স্কুল আর প্রিমেডিকেল উতরে গিয়ে এমিল গ্রাব ভর্তি হলেন মেডিকেল স্কুলে। “অ্যালোপ্যাথি”-তে সুযোগ হলো না, অগত্যা হোমিওপ্যাথি – উন্নাসিক “অ্যালোপ্যাথ”-রা যেমন বলেন, যার নাই কোনও গতি তার আছে হোমিওপ্যাথি – এক্ষেত্রে শিকাগো শহরের হ্যানিম্যান মেডিকেল স্কুল। তবে আমাদের গল্পটা হোমিওপ্যাথি নিয়েও নয়।
বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহী এমিল ঘরেই যন্ত্রপাতি নিয়ে টুকটাক পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতেন। তাঁর ঘরে ছিল ক্রুকস টিউব, যা নিয়ে পরীক্ষা করতে করতে এক্স-রে আবিষ্কার করেন রন্টজেন। রন্টজেনের গবেষণার বিশদ বিবরণ পড়ে এমিল নিজেও সেই পরীক্ষা করতে থাকেন। কাচের টিউব ঠিক কতখানি বায়ুশূন্য হলে এক্স-রে বেশী তীব্র হবে, তা যাচাই করার জন্য এমিল গ্রাব টিউবের সামনে নিজের হাতটি ধরতেন – ছবি যখন সবচাইতে স্পষ্ট, ঠিক তখন টিউবের সঙ্গে লাগানো বায়ুনিষ্কাশক পাম্প বন্ধ করতেন। পরীক্ষা দিব্যি চলত – কিন্তু মুশকিল, হাতখানায় বারবার এক্স-রে পেতে পেতে চামড়ায় রীতিমতো সমস্যা শুরু হলো। চামড়া খসখসে হলে গেল – তারপর ফোস্কা, সেখান থেকে ঘা। এবং সে ঘা আর সহজে কমার নামটি নেই। বাধ্য হয়েই এমিল হাতের চিকিৎসার জন্য শরণাপন্ন হলেন মেডিকেল কলেজে তাঁর স্যার, ডা জেপি কব-এর। স্যার দেখলেন বটে, কিন্তু আসল গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বললেন ডা কব-এর সঙ্গে থাকা আরেক অধ্যাপক, ডা গিলম্যান।
একথা অনেকেই জানেন যে হ্যানিম্যানের হোমিওপ্যাথি দর্শনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এই ধারণা, যে, যে উপাদান মানবদেহে রোগের উপসর্গ সৃষ্টিতে সক্ষম, সেই উপাদান ওই রোগের নিরাময় ঘটাতে পারবে। সেভাবেই গিলম্যান বললেন, যে এক্স-রে এভাবে স্বাভাবিক মানবত্বক ঝলসে ফোস্কা ফেলে দিতে পারে, তা একইধরনের রোগের চিকিৎসাতেও কার্যকরী হওয়ার সম্ভাবনা। সেভাবে দেখতে গেলে ডা গিলম্যান-এর এই পর্যবেক্ষণই চিকিৎসাক্ষেত্রে এক্স-রে ব্যবহারের – বা রেডিওথেরাপির – সূচনা করল।
গিলম্যানের পর্যবেক্ষণ গভীরভাবে প্রভাবিত করল এমিলকে। বা বলা যায়, গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল সেখানে উপস্থিত আরেক চিকিৎসক ডা লুডলাম-কে। লুডলাম-ই এমিলকে অনুরোধ করলেন তাঁর এক রোগীর উপর এক্স-রে চিকিৎসা প্রয়োগ করে দেখতে। রোগী বলতে রোজ লি – স্তনের ক্যানসারে আক্রান্ত, অপারেশন হওয়ার পর অসুখ আবার ফিরে এসেছে দ্বিগুণ তীব্রতায় – বাদ-পড়া স্তনের দিকে বুকে ডুমো ডুমো অসুখ, কয়েকটি ইতিমধ্যেই ঘা হয়ে গিয়েছে – প্রথাগত চিকিৎসা বলতে কিছুই করার নেই, ঘা বেড়ে চলারই সম্ভাবনা – রোজ-এর জীবনের বাকি দিনগুলো কাটতে চলেছে অসহনীয় কষ্টে।
১৮৯৬ সালের ২৯-শে জানুয়ারি – রন্টজেনের এক্স-রে আবিষ্কারের কয়েক সপ্তাহ বাদেই – এমিল গ্রাব রোজ লি-র বক্ষদেশে প্রয়োগ করলেন এক্স-রে থেরাপি – রেডিওথেরাপি। ঠিক পরের দিন, আরও একজন ক্যানসার-আক্রান্তর শরীরে প্রয়োগ হলো এক্স-রে থেরাপি। দুই ক্ষেত্রেই শরীরের সংশ্লিষ্ট অংশ বাদে বাকি অংশ সীসার পাত দিয়ে ঢাকা দেওয়া ছিল, যাতে ক্ষতিকর এক্স-রে শরীরের অন্যত্র পৌঁছাতে না পারে। পরবর্তীকালে এমিল গ্রাব দাবি করেন যে রেডিওথেরাপির উদ্ভাবক তো তিনি বটেই, তার সঙ্গে এক্স-রের ক্ষেত্রে ‘লেড শিল্ডিং’-এর আবিষ্কর্তাও তিনি।
তাহলে কি শিকাগোর এক হোমিওপ্যাথি ছাত্র এমিল গ্রাব-ই ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপির প্রবর্তক? দুর্ভাগ্যজনকভাবে উত্তরটা অত সোজাসাপটা নয়।
সারাজীবন ধরেই এমিল গ্রাব বিভিন্ন বিষয়ে অজস্র দাবি করে এসেছেন, যার অধিকাংশই মিথ্যে তো বটেই, রীতিমতো অবাস্তব। ক্যানসার-চিকিৎসায় তাঁর এক্স-রে আবিষ্কারের গল্পটাও সেরকমই নয় তো?
কেননা, এই চিকিৎসা-সংক্রান্ত কোনও কাগজপত্রই তিনি সর্বসমক্ষে পেশ করতে পারেননি বহুদিন অব্দি (তিনি দাবি করেছিলেন, কাগজ তিনি হারিয়ে ফেলেছেন) – এমনকি, চাঞ্চল্যকর চিকিৎসার খবরটাও তিনি সবাইকে জানান ঘটনার বছরদুয়েক বাদে। প্রথম যে দুজন রোগীর চিকিৎসা তিনি করেছিলেন, দুজনেই নাকি মারা যান মাসখানেকের মধ্যেই – কিন্তু পরবর্তীকালে, রীতিমতো গোয়েন্দাতদন্ত করেও ওইসময় সেই নামের কোনও ব্যক্তির মৃত্যুর নথি পাওয়া যায়নি, ওই নামের কোনও ব্যক্তির চিকিৎসার খবর পাওয়া যায়নি, ওই নামের কোনও মানুষ শিকাগো অঞ্চলে থাকতেন এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য তো দূর, অমন দুজন মানুষের অস্তিত্বের কোনও প্রমাণই মেলেনি।
এমনকি ১৯০১ সালে অনুষ্ঠিত এক কনফারেন্সে ডা গিলম্যান-এর বক্তব্যের শেষে এমিল বলেন – এক্স-রে দিয়ে ক্যানসার চিকিৎসার অভিজ্ঞতা আমার খুব একটা নেই, তবে অন্য পদ্ধতিতে কিছু রোগীর চিকিৎসা আমি করেছি।
তাহলে?
এমিল-কে প্রথম রোগীটি রেফার করেছিলেন ডা লুডলাম – সেই রেফার-এর চিঠিটি এখনও সযত্নে রক্ষিত। এমিল গ্রাব-এর দাবির যাথার্থ্য নিয়ে সংশয় হওয়ায় এমন সংশয়ও স্বাভাবিক, যে, এ চিঠি জাল নয় তো! এই সংশয় কাটাতেই স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউট, ঐতিহাসিক দলিল নষ্ট হতে পারে এমন ঝুঁকি সত্ত্বেও, এফবিআই-কে দিয়ে এ চিঠির ফরেন্সিক পরীক্ষা করান। না, চিঠি জাল নয়। কাগজ ও কালি পরীক্ষা করে তাঁরা জানান, চিঠিটি আসল – এবং চিঠিটি উনবিংশ শতক ও বিংশ শতকের সন্ধিক্ষণের ওই সময়েই লিখিত।
তবে কি ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিয়েশন থেরাপির প্রবর্তক এমিল গ্রাব-ই। উত্তর দেওয়া মুশকিল।
অত্যন্ত গোলমেলে ধরনের মানুষ ছিলেন তিনি। আজীবন বিচিত্র সব দাবি করে গেছেন – আগেই বলেছি, যার অধিকাংশই মিথ্যা। সহকর্মীদের মধ্যেও জনপ্রিয় ছিলেন না একেবারেই। স্বাভাবিকভাবেই সম্মান তিনি পাননি কখনোই। নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়ে সারাজীবন এক্স-রে থেরাপি নিয়ে লেখালিখি করে গেছেন – গবেষণাপত্র তো বটেই, আস্ত বইও লিখে গেছেন – আর্থিক সাফল্যও পেয়েছিলেন – কিন্তু কেউই তাঁকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেনি।
মৃত্যুর আগে উইল করে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি তাঁর সম্পত্তির বড় অংশ এবং তাঁর গবেষণাকাজের নথিপত্র দিয়ে যান। বিনিময়ে শর্ত ছিল, তাঁর মৃত্যুর পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যেন তাঁর একখানা জীবনীগ্রন্থ প্রকাশ করেন।
তো শর্ত মেনে জীবনী লেখার ভার যাঁর উপর ন্যস্ত হয়, সেই পল হজেস জীবনী লিখতে গিয়ে বেশ মুশকিলে পড়েন। তিনি যতোই এমিল গ্রাব-এর জীবনের খুঁটিনাটি জানতে চান, ততোই তাঁর লোকটিকে গোলমেলে মনে হয়, ততোই তিনি লোকটিকে অপছন্দ করতে থাকেন।
এমিল গ্রাব নিয়ে তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতা বিষয়ে পল হজেস নিজের এক বন্ধুকে যে কথাটা বলেছিলেন, সেটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছিলেন – বুঝলে হে, যদি তুমি উইল করে এমন বন্দোবস্ত করেই যাও যে কেউ না কেউ তোমার জীবনী লিখবেই লিখবে, তাহলে অন্তত জীবনটা এমনভাবে কাটিও যাতে জীবনীকার কিছু ভালো ভালো কথা লিখতে পারেন।
জীবনী লেখা হোক বা না হোক, জীবনযাপন করার ক্ষেত্রে হজেস-এর কথাটার সারমর্ম সকলেই মনে রাখতে পারলে ভালো।









