আশ্বিনের এক শনিবার
সন্ধে ৬টা
শরদিন্দু বন্দ্যোর ‘রিমঝিম’ উপন্যাসের নায়িকা নার্স প্রিয়ংবদা ভৌমিক ডায়েরি লিখত। গত শতকের চল্লিশ পঞ্চাশের দশকের এক নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের সাধারণ নার্স মেয়ে প্রিয়ংবদা বড় যত্ন নিয়ে, মায়াজড়ানো কলমে লিখে রাখত তার অকিঞ্চিৎকর রোজনামচা। তার একবার মনে হয়েছিল, লিপিবদ্ধ এইসব সামান্য অভিজ্ঞতা কোনও দরদী প্রকাশকের কাছে পাঠিয়ে দিলে তিনি কী ছাপবেন তার লেখা?
প্রিয়ংবদার উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমার নেই। কোনও লেখা ছাপার দুরাশাও পোষণ করি না মনে।
একটা কথা ভীষণ মনে হয় আজকাল। দিন বড় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। পারিপার্শ্বিকের অকল্পনীয় দৈন্য, অসুস্থ সামাজিক প্রতিযোগিতা, প্রতিবেশের সার্বিক অবক্ষয়, প্রকৃতির নিরন্তর প্রতিশোধ সুস্থির থাকতে দিচ্ছে না, পৃথিবীর ঠিকানাকে আর ভালবাসতে ইচ্ছে করছে না একটুও। বয়স বাড়ছে সেটা বড় কথা নয়, জীবনের কোনও উদ্দেশ্য থাকছে না – সেটাই জরুরি কথা।
শরীর তেমন সঙ্গ দিচ্ছে না, মনও বৈরাগী হয়ে গিয়েছে – আয়ুষ্কাল দীর্ঘায়িত হোক, এমন ইচ্ছে নেই দু’জনের কারোরই।
এই বেলা টুকরো টাকরা কিছু নিত্যকার গল্প করে যাই। ডায়েরি অন্য লোকের পড়ার কথা নয়, তবে আমি অলজ্জ মানুষ, গোপনীয়তা পছন্দ করি না।
‘পর্দা নহী যব কোই খুদা সে
বান্দো সে পর্দা করনা কেয়া’ –
খানিক আগে একটা বহুপঠিত পুরোনো ক্লাসিক নভেল পড়ে শেষ করলাম। শার্লট ব্রন্টির ‘জেন আয়ার’। ৬৯১ পাতার বই তো আর একদিনে শেষ করা সম্ভব নয়, সপ্তাহখানেক লাগল।
বনফুল বর্ণিত ‘পাঠকের মৃত্যু’ বিরল নয়। আগে ভাল লাগা বই পরে ভীষণ খারাপ লেগেছে পড়তে, এমন উদাহরণ প্রচুর পাওয়া যায়। আমি শেষ বার ‘জেন আয়ার’ পড়ি বছর দশ-বারো আগে। এবারে পড়া শেষ করে বুঝলাম, পাঠকের মৃত্যু হয়নি, পাঠকমনের মারাত্মক রূপান্তর ঘটে গিয়েছে।
এর আগে যতবারই পড়েছি বইটি, মুখ্য চরিত্রের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করেছি – অসুন্দর ও নগণ্য অবয়বের এক নারীর বলিষ্ঠ মন এবং চারিত্রিক দৃঢ়তার সঙ্গে তীব্র একাত্মতা। কেমন মনে হতো, বাবা মায়ের সাহচর্য ও ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হওয়া ছাড়া, জেনের সঙ্গে আমার তেমন কোনও অমিল নেই।
সাতান্ন বছর বয়সে পৌঁছে নিজের মূঢ়তায় হাসি পেল। শার্লট যে সময়ে উপন্যাসটি লিখেছেন সেই ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এক নারীর জীবনে জটিলতা বলতে কেবল উপযুক্ত জীবনসঙ্গীর অনিশ্চয়তা। ভালবাসা পরিণতি পেলে শুভম, নচেৎ চার্চের শরণাপন্ন হয়ে আরোপিত প্রব্রাজিকার জীবনযাপন। বিয়েটা বড় আবশ্যিক ছিল – না হলে অনভিপ্রেত ঘটনাবলীর অভিঘাতে মেয়েদের জীবন ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত – অন্য কোনও অপশন বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল না।
বইটিতে তথ্যের কিছু ত্রুটি চোখে পড়ল এবারে, যেগুলো আগে তেমন করে লক্ষ্য করিনি। ১৮৪৮ সালে বইটি লেখার সময়ে ভারতবর্ষ ইংল্যাণ্ডের উপনিবেশ মাত্র। কাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র সেন্ট জন রিভার্স যখন চার্চের পক্ষ থেকে ভারতবর্ষে খ্রীষ্টধর্ম প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন, দেখা যাচ্ছে তার আগে তিনি নেটিভ ‘হিন্দোস্তানি’ ভাষা শিখছেন। হিন্দি নয়, হিন্দোস্তানি। গঙ্গানদীর উল্লেখ রয়েছে, উল্লেখ আছে কলকাতারও। কিন্তু বড় অবমাননাকর সে উল্লেখ। দুর্ধর্ষ গরম, ট্রপিক্যাল রোগের আড়ত, ‘হিদেন’দের দেশ – বইটি পড়তে পড়তে কথাগুলি ভারতবাসী হিসেবে মনকে পীড়া দেয়।
জেনের কথায় ফিরি।
আমি বিংশ শতাব্দীর জাতক – আমার বাহ্যিক চলার পথে গন্তব্য বেছে নেওয়ার সুযোগ অনেক বেশি। সেই সঙ্গে জটিলতাও অনেক বেশি। আমার সমস্যাগুলি জেনের জীবনের মতো একমাত্রিক নয়, তার নানা পরত, নানা আঙ্গিক, নানারকম রঙ।
বরং শরদিন্দু-সৃষ্ট নার্স প্রিয়ংবদার সঙ্গে জেন আয়ারের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দু’টি অল্পবয়সী স্বজনহীন মেয়ের অবলম্বন খোঁজার গল্প আমাকে আকৃষ্ট করেছে চিরকাল।
তাই হয়ত বছর দেড়েক আগে ‘ঊর্মিমুখর’ নামে নাতিবৃহৎ একটি উপন্যাসিকা লেখার সময় তার নায়িকা দীপান্বিতার মধ্যে জেন আয়ারের চারিত্রিক দৃঢ়তা, একনিষ্ঠা আর অসামাজিক প্রেমের ব্যাপারে তীব্র শুচিবায়ু বুনে দিয়েছিলাম – অনেকখানি নিজের অজান্তেই।
আমার প্রখ্যাত সাহিত্যিক বন্ধু বলেছিলেন, অর্ধেক উপন্যাস পড়ার পরেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে আমি নিশ্চিতভাবে নিজের সত্তাকে নায়িকার ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি।
তিনি নির্ভুল বুঝেছিলেন।
আসলে আমি শার্লট ব্রন্টির চরিত্রটিকে নিজের অবচেতনেই দীপান্বিতার মধ্যে প্রোথিত করতে চেয়েছিলাম।
আজ অনুভব করলাম, আমি জেন নই। হতেও পারতাম না। অসীম একাকিত্ব বাদ দিলে তার সঙ্গে আমার কোনও মিল নেই। নার্স প্রিয়ংবদার সঙ্গেও নেই। তাদের মধ্যে দয়িতকে হৃদয় উজাড় করে ভালবাসবার, সেই ভালবাসার ভিতরে নিজের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণভাবে বিলীন করে দেওয়ার অসামান্য শক্তি ছিল। আমার নেই। কোনওকালেও ছিল না।
নিজেকে নিঃশেষ করে আমি কেবল একজনকেই ভালবাসতে পেরেছি সারাজীবনে। আমার মা। তাই সে অধ্যায়ের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই অন্তরের সকল মাধুর্যের উৎস শুকিয়ে গিয়েছে আমার। কোনও প্যাশন অবশিষ্ট নেই আর। না কোনও মানুষের প্রতি, না কোনও জড়বস্তুর প্রতি।
তবু শেষের ঘন্টা যখন এখনও বাজেনি, অন্তরালের ঈশ্বরবাবুর ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া তো যাবে না – যতই অর্থহীন লাগুক, জীবন সম্পূর্ণ করে তবেই মুক্তি।
অসংখ্য ভুলভ্রান্তি করেছি। সংশোধনযোগ্য নয়, এমন ভুলও করেছি। তার প্রায়শ্চিত্তও করেছি, এখনও করছি। কোনও আফশোস নেই বলব না, তবে গ্লানি নেই। আয়নায় নির্ভয়ে নিজের চোখে আজও চোখ রাখতে পারি। এইখানেই শুধু জেনের অনুভূতির সঙ্গে আমার অনুভব একাঙ্গী হয়ে গিয়েছে।
‘I care for myself. The more solitary, the more friendless, the more unsustained I am, the more I will respect myself.’
(ক্রমশ)
সঙ্গের ছবি: সপ্তাহখানেক আগে পাড়ার রক্তদান শিবিরে, যারা আমাকে ফেলে এগিয়ে গিয়েছে, তাদের স্মৃতিফলকের সামনে।











