ড্রোনের ঝাঁক: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শনিবার, সৌদি আরবের উত্তরে থাকা ইরাকে অবস্থিত ইরানের মদতপুষ্ট শিয়া মিলিশিয়া এবং সৌদি আরবের দক্ষিণে অবস্থিত ইয়েমেনের উত্তর ও উত্তর পশ্চিম বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে নেওয়া ইরানের মদতপুষ্ট ‘ আনসার আল্লা ‘ বা ‘ হুথি ‘ শিয়া মিলিশিয়ারা একসঙ্গে সৌদি আরবকে আক্রমণ করল। ব্যালাস্টিক ও ক্রুজ মিসাইলের সঙ্গে শয়ে শয়ে ড্রোন আছড়ে পড়ল রাজধানী রিয়াধ এবং আল খাজর, ফারাসান, দিশ, তাইফ, ইয়ানবু প্রমুখ বড় শহর, বন্দর, খনিজ তেলের কেন্দ্রগুলিতে। কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা ‘ অ্যারামকো ‘ র কেন্দ্রগুলি ছাড়াও লোহিত সাগর দিয়ে তেল সরবরাহের প্রধান ‘ ইস্ট – ওয়েস্ট পাইপলাইন ‘ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তেল সরবরাহ বিপর্যস্ত হল। এমনিতেই ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় সৌদি আরব পূর্ব দিকে পারস্য উপসাগরে অবস্হিত বন্দর ও টার্মিনালগুলি থেকে তেল সরবরাহ করতে পারছিল না। এইবার ধনাঢ্য ও ইসলামি সুন্নি দুনিয়ার কর্ণধার সৌদি আরব কোন দিক দিয়েই তাদের অর্থনীতির প্রাণ ভোমরা তেল রপ্তানি করতে না পেরে সমূহ বিপদে পড়ল।
মধ্য এশিয়ার যুদ্ধ ও হুথি: মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ায় সাড়ে সাত দশক ধরে চলমান যুদ্ধে ও গৃহযুদ্ধে মার্কিন – ব্রিটিশ – ইজরায়েল – ইরাক – ইরান – সৌদি আরব – সিরিয়া – মিশর – জর্ডান – বড় মেজো খেলোয়াড়দের পাশাপাশি ইসলামি মিলিশিয়াগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। অতীতে পিএলও, ফাতাহ্ পরবর্তীতে আল কায়দা, ইসলামিক স্টেট জঙ্গী মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলি শিরোনামে এলেও ১৯৭৯ তে ইসলামি বিপ্লবের পর শিয়া ধর্মীয় মৌলবাদী – সামরিক জোট ইরানের ক্ষমতা দখল করার পর থেকে তাদের আইআরজিসি – কাদ বাহিনীর সাহায্যপ্রাপ্ত লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস, ইয়েমেনের হুথিদের প্রতিপত্তি বৃদ্ধি।
হুথির সৃষ্টি: ইসলামের শিয়া ধারার একটি উপধারা জায়দি। এর প্রবক্তা জায়েদ – ইবন – আলি। মধ্য এশিয়ার আরব মুলুকের একবারে দক্ষিণে আফ্রিকার উপান্তে এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগর সন্নিহিত অত্যন্ত গরীব দেশ ইয়েমেন। ১৯৯০ তে শক্তিশালী নেতা আবদুল্লা সালে র নেতৃত্বে ‘ গণতান্ত্রিক ‘ উত্তর ইয়েমেন ও ‘ কমিউনিষ্ট ‘ দক্ষিণ ইয়েমেন মিলে ‘ গণপ্রজাতন্ত্রী ইয়েমেন ‘ র জন্ম হলেও শোষণ – বৈষম্য, শিয়া – সুন্নি দ্বন্দ্ব এবং জনজাতি সম্প্রদায় গুলির মধ্যেকার সংঘাত বন্ধ হয়নি। ইয়েমেন সুন্নি প্রধান রাষ্ট্র হলেও জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ জায়েদি শিয়া এবং ইয়েমেনের উত্তর ও উত্তর – পশ্চিমে তাদের বসবাস। সেখানে বদর – আল – দিন – আল – হুথি ও তার পুত্র হুসেন – আল – হুথি জায়েদি শিয়া ধর্মীয় পুনরুত্থান আন্দোলন শুরু করে অচিরে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সালের সেনা বাহিনী তাদের দমন শুরু করে এবং ২০০৪ এ হুসেনকে হত্যা করা হয়। এর প্রতিবাদে শুরু হল ‘ আনসার আল্লা ‘ বা ‘ হুথি ‘ সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধ। শিয়া ইরান হুথিদের আর সুন্নি সৌদি আরব আবদুল্লাকে সমর্থন দিল। শুরু হল ইয়েমেন রাষ্ট্র এবং হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে ভয়ংকর গৃহযুদ্ধ।
হুথির উত্থান: ২০১২ র ‘ আরব বসন্ত ‘ আন্দোলনে আবদুল্লাকে সরে যেতে হল। ২০১৪ তে দেশ জুড়ে আন্দোলন গৃহযুদ্ধের সুযোগে হুথিরা রাজধানী সানা সহ উত্তর ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চল দখল করে নিল। তারপর থেকে তাদের সঙ্গে ইয়েমেন সরকারের যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ল। সৌদি ও ইয়েমেনের যৌথ বাহিনীর বোমা বর্ষণ ও আক্রমণে হুথি অধিকৃত ইয়েমেন বিধ্বস্ত হলেও, বহু মানুষ হতাহত ও গৃহহীন হলেও, দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তৈরি হলেও হুথিদের পুরোপুরি দমানো গেলনা। উপরন্তু তারা লোহিত সাগর থেকে যাতায়াতকারী জাহাজগুলিতে দস্যুবৃত্তি করে উপার্জন করতে লাগল।
হুথি আগ্রাসন: ২০২২ এ ইরান ও সৌদির মধ্যে চুক্তির পর গৃহযুদ্ধ সাময়িক বন্ধ হলেও ইরানের প্রশিক্ষণ ও আধুনিক অস্ত্র পেয়ে হুথি মিলিশিয়া বাহিনী আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। ততদিনে ইয়েমেন ভেঙ্গে চার টুকরো। (১) পূর্ব ও মধ্য ইয়েমেন নিয়ে ইয়েমেন, (২) দক্ষিণে এডেন বন্দর নিয়ে আরব আমির শাহী সমর্থিত ‘ সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল ‘, (৩) উত্তর ও উত্তর পশ্চিমের হুথি অধ্যুষিত ইয়েমেন এবং (৪) দক্ষিণ পশ্চিমের ইয়েমেন ও সৌদি সমর্থিত তারেক সালে র ‘ ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্স ‘ দখলীকৃত অঞ্চল। ২০২৩ এ হামাসের সঙ্গে হিজবুল্লাহ ও হুথি ইসরায়েল আক্রমণ করে। হুথিরা ইসরায়েল লক্ষ্য করে বেশ কিছু মিসাইল ছোড়ে, প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল সানায় বোমা বর্ষণ করে। আবার ২০২৬ এর মার্কিন – ইরান যুদ্ধে হুথিরা লোহিত সাগরে অবস্হিত মার্কিন নৌবহর এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলি আক্রমণ করে। প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হুথি এলাকায় বোমা বর্ষণ করে। এতদসত্ত্বেও হুথিরা কিন্তু দমে না।
সাম্প্রতিক সংঘাত: সম্প্রতি ইসলামি শিয়া দুনিয়ার নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অন্ত্যেষ্টিতে ইরান সরকারের বিমানে করে হুথি নেতাদের ইরানে যাতায়াত ইত্যাদি নিয়ে সৌদি – হুথি বিবাদ বাড়ে। সৌদি – ইয়েমেন যৌথ বাহিনী সানায় বোমা বর্ষণ করে। ইরানের সাহায্যে হুথি মিলিশিয়া বাহিনী প্রস্তুত ছিল। মিসাইল, ড্রোন সহ তীব্র প্রতিআক্রমণ শুরু করে সৌদি ও ইয়েমেনের বিরুদ্ধে। সৌদি আরব অভিযোগ করে যে হুথিরা ইসলামের পবিত্রতম ভূমি মক্কার দিকেও মিসাইল ছুড়েছিল, যা অবশ্য হুথিরা অস্বীকার করে। তবে অপর পবিত্রতম ভূমি মদিনার নিকটবর্তী তেল শহর ও বন্দর ইয়ানবু হুথিদের ছোড়া মিসাইল ও ড্রোন বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর হুথিরা ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর মোখা ও ধুবাব সহ লোহিত সাগরের প্রায় পুরো তটরেখা দখল করে নেয়। তারপর দখল করে লোহিত সাগরে অবস্হিত পেরিল সহ ছোট কিন্তু রণকৌশলগত দ্বীপগুলি। অর্জন করে হদেইদা ও তাইজের কর্তৃত্ব। এভাবে আরব সাগর থেকে সুয়েজ খালের দিকে যাওয়া – আসার লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগে বাব – এল – মান্দেদ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলে। ধ্বংস করে দেয় লোহিত সাগরে অবস্হিত সৌদি ও অন্যান্য বেশ কিছু জাহাজ। ইয়েমেন ও সৌদির সীমান্ত ভেদ করে ঢুকে পড়ে। মারিদ, আল – বায়দা, জায়ফ রণাঙ্গনে তুমুল যুদ্ধ চলে।
বাব – এল – মান্দেদ প্রণালী বন্ধের প্রভাব: এখনও অবধি বিশ্বের প্রধান জ্বালানি শক্তি খনিজ তেলের ২০ % রপ্তানি হয় পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। সেটি ইরান কার্যত বন্ধ করে রেখেছে। বিশ্বের ১৫ % তেল রপ্তানি হয় লোহিত সাগর দিয়ে। সেটিও বন্ধ করে দিল হুথিরা। এছাড়াও ইউরোপ থেকে এশিয়ায় জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্যের সহজ পথ ভূমধ্যসাগর – সুয়েজ খাল – লোহিত সাগর – আরব সাগর। ফলে বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থনীতির উপর এর প্রভাব সাংঘাতিক ও সুদূর প্রসারী।
গোপন বোঝাপড়া: সেনা প্রধান আসিফ মুনিরের নেতৃত্বে পাকিস্তান বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্ব পেতে খুবই সচেষ্ট। তারা একদিকে যখন ইরান – মার্কিন মধ্যস্থতায় অংশ নিচ্ছে আবার মধ্য প্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরানের বৈরী এবং ইসলামি দুনিয়ায় নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক চুক্তি করেছে যে দুজনের কেউ আক্রান্ত হলে অন্যজন এগিয়ে আসবে। সাম্প্রতিক উপসাগরীয় যুদ্ধে সৌদি ইরানের দ্বারা আক্রান্ত হলে পাকিস্তান কিন্তু এগিয়ে আসে নি, আবার হুথিরা সৌদি আক্রমণ করলেও সৌদির সাহায্যে এগিয়ে আসছে না পাকিস্তান। কিছুদিন আগে মক্কাতে তুরস্ক – সৌদি – পাকিস্তান অনুরূপ আরেকটি সামরিক চুক্তি করে। যাকে অনেকে ইসলামিক ন্যাটোর সূচনা বলেছিলেন। সৌদির বর্তমান বিপদে তুরস্ক বা পাকিস্তান কিন্তু এবারও নীরব।
১৯৯১ পর্বের উপসাগরীয় যুদ্ধে বুশ ও ব্লেয়ারের নেতৃত্বাধীন মার্কিন – ব্রিটিশ যৌথ বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র হানায় ইরাককে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করলেও ২০২৫ – ‘ ২৬ এর উপসাগরীয় যুদ্ধে ট্রাম্পের নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর বিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা বর্ষণে ক্ষয়ক্ষতি করলেও ইরানের সামরিক শক্তিকে দমাতে পারেনি, ইরানি নেতৃত্বর অপসারণ ঘটাতে পারেনি, ইরানে গ্রাউন্ড অপারেশনের সাহস দেখায় নি, বরং ইরানের শিয়া মৌলবাদী সামরিক নেতৃত্বকে আরও সংহত করে দেয়। উল্টে রাশিয়া, চিন ও উত্তর কোরিয়ার প্রযুক্তি কৌশলে প্রস্তুত তাদের অফুরন্ত মিসাইল ও ড্রোন ভান্ডার, বিকেন্দ্রিকৃত যুদ্ধ কৌশল এবং নৌ গেরিলা লড়াইয়ে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নাজেহাল করে দিয়েছে। মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, বাহরিনে থাকা পঞ্চম নৌবহর সহ মধ্য প্রাচ্যের আটটি দেশে থাকা ১৬ টি মার্কিন ঘাঁটি র প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, বহু মার্কিন সেনা মারা গেছে এবং যুদ্ধে মার্কিন অর্থ ভান্ডার নিঃশেষিত হয়েছে। মধ্য প্রাচ্যের মার্কিন নিরাপত্তা আশ্রয়ে থাকা দেশগুলিকেও নিরাপত্তা দিতে পারেনি ‘ মহাশক্তিধর ‘ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
হুথিদের হাতে মার্কিনের দীর্ঘদিনের আশ্রিত ও বিশ্বস্ত মিত্রদেশ এবং বাণিজ্য সহযোগী সৌদি আরব যখন আক্রান্ত হল তখনও ট্রাম্পের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার পাশে না দাঁড়িয়ে হুথিদের সঙ্গে গোপন বোঝাপড়া করল যে তারা হুথিদের কার্যকলাপে বাধা দেবে না, পরিবর্তে লোহিত সাগরে মার্কিন ও ইসরায়েলি জাহাজগুলিকে হুথিদের ছেড়ে দিতে হবে। আসলে আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরান যুদ্ধে মুখ পোড়ানো ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে কোন দূরবর্তী দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে পা বাড়াতে চাইছে না।
অগত্যা তাই সৌদি আরব ওমানের মাধ্যমে ইরান কে অনেক উৎকোচ দিয়ে হুথিদের থামানোর চেষ্টা করছে।
কিন্ত তাতেও কি বিভিন্ন স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যুদ্ধের ছুটি হবে?
২২.০৯.২০২৬












