পাক – ভারত যুদ্ধ ১: সীমান্ত সংঘর্ষ, ছায়া যুদ্ধ (Proxy War), অন্তর্ঘাত (Saboutage) এবং মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ (Terrorist Attack) ছাড়াও ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সৃষ্ট ভারত এবং পাকিস্তান – বিভাজিত দুই দেশের জন্মলগ্ন থেকে মোট ছয়বার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ( Full – fledged War) হয়েছে।
এরমধ্যে প্রথমবার স্বাধীনতার পরপরই ১৯৪৭ এ। কাশ্মীর রাজতন্ত্র তখনও স্বাধীনতা বিসর্জন দেয় নি। মহম্মদ আলি জিন্নাকে যে পাকিস্তানের টোপ দেখিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী মৌলবাদী মুসলমান শক্তিকে ‘ লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান ‘ শ্লোগানে উত্তেজিত করে এবং উপমহাদেশ জুড়ে, বিশেষত পাঞ্জাব ও বাংলায়, ভয়ংকর রক্তস্নাত সম্প্রদায়িক দাঙ্গা, খুন , ধর্ষণ, লুঠপাট, অগ্নি সংযোগ ঘটিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা জিন্নার ভাষায় তাদের পোকায় কাটা পাকিস্তান (Moth – eaten Pakistan) উপহার দিল। হতাশ ক্ষুব্ধ জিন্না উপজাতি সশস্ত্র হানাদারদের সামনে রেখে পাক সামরিক বাহিনীকে দিয়ে কাশ্মীর আক্রমণ করালেন। উপজাতি মিলিশিয়া ও সাদা পোশাকের সেনার মিলিত সশস্ত্র হানাদাররা গণহত্যা, গণধর্ষণ, অগ্নি সংযোগ ও ধ্বংসের তাণ্ডব চালিয়ে বারামুল্লা ছাড়িয়ে শ্রীনগরের উপান্তে চলে এসেছিল। রাজার সেনা এবং শেখ আবদুল্লা র নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবকরা প্রতিরোধের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। তখন কাশ্মীর রাজ হরি সিং ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ডাকতে বাধ্য হলেন। ভারতীয় সেনারা এসে পাক হানাদারদের প্রতিহত করে শ্রীনগর বিমানবন্দর রক্ষা করলেন। হানাদার রা পিছু হটল।
কিন্তু ভারতীয় সেনারা তাদের শেষ অবধি তাড়া করে সীমান্ত পার করে দিল না। আসলে নেহরু – প্যাটেলের নেতৃত্বে তদানীন্তন ভারত শাসকদের প্রধান লক্ষ্য ছিল কাশ্মীরের ভারতভুক্তি এবং ভূস্বর্গ কাশ্মীর উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ। ফলে পাকিস্তান কাশ্মীরের প্রায় ৩০% এলাকা দখল রাখতে পারল যেখান এখন তার দুটি প্রদেশ – আজাদ কাশ্মীর (ভারতীয় পরিভাষায় Pak Occupied Kashmir অথবা POK) ও গিলগিট – বাল্টিস্তান। অন্যদিকে কাশ্মীরের রাজা হরি সিং কে বম্বেতে নির্বাসিত করে নাবালক রাজপুত্র কর্ণ সিং – র মাধ্যমে ৫৫% কাশ্মীরের ভারতভুক্তি হল ২৬ অক্টোবর, ১৯৪৭। বাদবাকি কাশ্মীরের ১৫% এলাকা আকসাই চিন ১৯৬২ এর চিন – ভারত যুদ্ধে চিন দখল করে নিল।
পাক – ভারত যুদ্ধ ২ থেকে ৫: সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে দমনমূলক একনায়কতন্ত্রী শাসন কায়েম করে উচ্চাকাঙ্ক্ষী জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৬৫ তে ভারত আক্রমণ করে কিছু এলাকা দখল করে নিলেন। কংগ্রেসের লাল বাহাদুর শাস্ত্রী তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ভারতীয় সেনারা পাল্টা মার দিয়ে পাকিস্তানী সেনাদের তাড়া করে পাকিস্তানের বিশাল এলাকা দখল করে লাহোর অবধি পৌঁছে গেলেন। আকাশ যুদ্ধেও ভারতীয় বায়ু সেনারা মার্শাল অর্জন সিং এর নেতৃত্বে পাকিস্তানকে নাস্তানাবুদ করল। শেষমেশ মার্কিন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন কে ধরে তাসখন্দে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করে আইয়ুব খান মান বাঁচালেন এবং ভারত সব জমি ফেরত দিল।
১৯৭১ এও জেনারেল ইয়াহিয়া খান – জুলফিকার আলি ভুট্টোর পাকিস্তান প্রথমে আক্রমণ করলেও কংগ্রেসের ইন্দিরা গান্ধীর প্রধানমন্ত্রীত্বে এবং ফিল্ড মার্শাল মানেকশ – র পরিচালনায় ভারতীয় সেনা পাকিস্তানকে নাস্তানাবুদ করে দেয় এবং পূর্ব পাকিস্তানে থাকা ৯০ হাজার পাক সেনা আত্মসমর্পণ করে। পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন বাংলাদেশে পরিণত হয় এবং ভারত পশ্চিম পাকিস্তানের অধিকৃত সমস্ত জমি ও যুদ্ধ বন্দীদের ফেরত দেয়।
কাশ্মীরের উত্তর সীমায় নিয়ন্ত্রণ রেখার কাছে রণকৌশলগত সিয়াচেন হিমবাহর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে ১৯৮৪ থেকে ২০০৩ অবধি দীর্ঘস্থায়ী এবং পৃথিবীর সবচাইতে উচ্চতম স্থানে বরফের মধ্যে এক ভয়ানক যুদ্ধ চলে। যুদ্ধে এবং চরম আবহাওয়ায় দুপক্ষের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। ইন্দিরা গান্ধী থেকে অটল বিহারী বাজপেয়ী এই পর্বে ভারতে আটজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। শেষমেশ ভারত সিয়াচেন হিমবাহের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।
১৯৯৯ তে বন্ধুত্বপূর্ণ আবহে হঠাৎ করে পাক জেনারেল পারভেজ মোশারফের চক্রান্তে পাক সেনা কার্গিলের গুরুত্বপূর্ণ পর্বত চূড়া গুলি দখল করে নেয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী তখন বিজেপির অটল বিহারী বাজপেয়ী। ভারতীয় সেনারা অতিকষ্টে এবং অনেক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে দিয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডগুলি পুনর্দখল করে এবং পাকিস্তানকে পরাস্ত করে। প্রতিটি যুদ্ধেই ভারতীয় বায়ু ও স্থল সেনা এবং কিছু ক্ষেত্রে ভারতীয় নৌ সেনা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে, অন্যদিকে ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেও পড়ে।
ভারত – পাক যুদ্ধ ৬: ২০২৫ এর এই যুদ্ধে এযাবৎ কালের মধ্যে ভারত প্রথম আক্রমণ করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বহুল প্রচারিত ‘ অপারেশন সিঁদুর ‘ নামক এই যুদ্ধে ভারত বা পাকিস্তান অপরের কোন জমি দখল তো দূরের কথা সীমানা ছাড়িয়ে এক ইঞ্চিও ঢুকতে পারেনি। নিজেদের জমির মধ্যে থেকে মর্টার ছোঁড়া ছাড়া স্থল বাহিনীর কোন ভূমিকা ছিলনা। চারদিনের এই ক্ষণস্থায়ী যুদ্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে অমীমাংসিত অবস্থায় থেমে যায়। ভারত ও পাকিস্তান উভয়ে উভয়ের অনেক ক্ষয়ক্ষতি করেছে দাবি করলেও কেউ স্বীকার করে না।
অতীতের সমস্ত যুদ্ধে ভারতের বায়ু ও স্থল সেনার এবং ১৯৬৫ ও ১৯৭১ এর যুদ্ধে নৌ সেনা – তিন সেনা বাহিনীর বিরাট অবদান থাকলেও এইবারের যুদ্ধে প্রথমদিন বায়ু সেনা ব্যবহার হলেও বাকি সময় দুই দেশ নিজের সীমানার মধ্যে থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুঁড়ে যুদ্ধ চালায়। ভারতকে নিজস্ব উৎপাদন ব্রহ্মস ইত্যাদি ছাড়াও ফরাসি, ইসরায়েলি ও মার্কিনী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন এবং রুশ ইত্যাদি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা ব্যবহার করতে দেখা যায়। পাকিস্তানের ছিল মূলত চিনা ও তুরস্কের ড্রোন এবং চিনা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা।
মধ্য এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের রণাঙ্গন: ইরান যুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বোমা দিয়ে ইরানের প্রচণ্ড ক্ষয়ক্ষতি করতে পারলেও রাশিয়া, চিন ও উত্তর কোরিয়ার প্রযুক্তি সহায়তায় ইরান ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩২ টি বিকেন্দ্রিভূত সামরিক কমান্ড থেকে তার পাহাড় মরুভূমির বুকে লুকোনো বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভান্ডার থেকে একের পর এক ভয়ংকর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুঁড়ে মার্কিন অত্যাধুনিক নৌবহরকে হরমুজ প্রণালী থেকে দূরে ওমান উপসাগরের দক্ষিণে সরে যেতে বাধ্য করে; বাহরিনে অবস্হিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহর সহ ইরাক, কুয়েত, কাতার, আরব আমিরশাহী, সৌদি আরব, জর্ডান প্রভৃতি দেশে অবস্হিত আধুনিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে তছনছ করে দেয়; আমীর শাহী, সৌদি, ইসরায়েল সহ মার্কিন বান্ধব দেশগুলির প্রচুর ক্ষতিসাধন করে; হরমুজ প্রণালী, পারস্য উপসাগর এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি পাল্টে দেয়।
পূর্ব ইউরোপে গত পাঁচ বছর ধরে যে ভয়ংকর ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে সেখানেও রাশিয়ার আগ্রাসন ও ধ্বংসকার্যর মূল অস্ত্র নিজের এবং উত্তর কোরিয়া ও ইরানের তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রতিরোধ ও প্রতি – আক্রমণেরও প্রধান অস্ত্র মার্কিন ও ন্যাটোর সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। দেখা যাচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন এসে যুদ্ধের প্রক্রিয়াটাই পাল্টে দিয়েছে।
আফগান যুদ্ধ এবং হ্যান্ডি মিসাইলের জনপ্রিয়তা: মানুষ বুদ্ধিমান জীব। অন্যদেশ ও সেখানকার সম্পদ দখল করার অথবা নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্যও সে নিত্য নতুন অস্ত্র এবং যুদ্ধ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি আবিষ্কার করে এসেছে। অতীতে ইউরোপ এবং চিনে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাথমিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতের টিপু সুলতান ব্রিটিশ দের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বারুদ ঠাসা রকেট ব্যবহার করেছিলেন। এভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়তে থাকে। আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র (Missile) যুদ্ধক্ষেত্রে প্রথম ব্যবহার করেন নাৎসি জার্মানি দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়। এরপর থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়তেই থাকে। তৈরি হয় Space Trajectory যুক্ত অর্থাৎ ছাড়ার পর পৃথিবীর মহাকাশ ছাড়িয়ে উঠে গিয়ে তারপর পৃথিবীর বুকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আছড়ে পড়া Guided Ballistic Missiles এবং ভূপৃষ্ঠ থেকে নির্দিষ্ট উচ্চতা দিয়ে সোজা গিয়ে লক্ষ্যবস্তু কে আঘাত হানার Guided Cruise Missiles।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় ক্ষেপণাস্ত্রের অগ্রভাগের প্রথাগত এবং পারমাণবিক বিস্ফোরক (Conventional and Nuclear Warheads)। এর সঙ্গে Surface to Surface, Surface to Air, Air to Surface, Air to Air, Anti – Tank, Anti – Ship, Anti – Satellite, Surface to Water, Water to Surface, Water to Air, Under Water … বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন। বাড়তে থাকে তাদের যাত্রাপথের পাল্লা, গতি ধ্বংস করার ক্ষমতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চিন, ফ্রান্স, ব্রিটেন, উত্তর কোরিয়া, ইসরায়েল, ভারত ৫০০০ কিমি এর বেশি পাল্লার Inter- Continental Ballistic Missiles (ICBM) তৈরি করতে সক্ষম হয়। এরমধ্যে কোনটি শব্দের গতিবেগ সেকেন্ডে ৩৪৩ মিটারের চাইতে দ্রুতগামী (Supersonic), আবার কোনটি শব্দের গতিবেগের পাঁচ গুণেরও বেশি দ্রুতগামী (Hypersonic)।
১৯৯১ এর উপসাগরীয় যুদ্ধে মার্কিন ও ব্রিটেন Tomohawk Missile ও Predetor Drone দিয়ে ইরাককে ছারখার করে দেয়।
কিন্তু এই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ব্যবহার বেশি জনপ্রিয়তা পায় ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ আফগানিস্তানের যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। তখন টিভি খুললেই পাগড়ি ও আলখাল্লা পরিহিত পাখতুন মুজাহিদিনদের দেখা যেত মার্কিন, চিন ও পাশ্চাত্যের দেওয়া ল্যান্ড রোভারে চড়ে কাঁধে বা হাতে AK – 47, AK – 74 স্বয়ংক্রিয় অ্যাসল্ট রাইফেল, Dsh K Heavy Machine Gun, 82 mm Mortar, RPG 7 Rocket Propelled Granades ইত্যাদি মারণাস্ত্র নিয়ে সোভিয়েত সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে চলেছে। কিন্ত তাদের Signature Style ছিল FIM 92 Stinger SAMs (Surface to Air Missiles) যেগুলি কাঁধ থেকে ছুঁড়ে তারা নিচু থেকে ওড়া সোভিয়েত যুদ্ধ বিমান ও হেলিকপ্টার ধ্বংস করে দিতে পারত।
ড্রোনের সালতামামি: ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের কর্মপদ্ধতি প্রায় এক যদিও ক্ষেপণাস্ত্র আরও দূরগামী, ভারী, বড় আকৃতির, ধ্বংস ক্ষমতাও বেশি। কিন্তু ড্রোন আরও অত্যাধুনিক যাকে আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে অল্প খরচে, অল্প জায়গায়, সহজে এমনকি AI ইত্যাদির প্রয়োগে দূর নিয়ন্ত্রণে নিখুঁত ভাবে, সুবিধামত, অনেক দূর অবধি, শত্রুর চোখকে ফাঁকি দিয়ে, দ্রুতগতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে পাঠিয়ে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটানো অথবা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফিরিয়ে আনা যায়। যুদ্ধের ক্ষতিসাধন ছাড়াও অনেক গঠনমূলক ভাল কাজেও ড্রোন এর প্রবল ব্যবহার। তাই ড্রোন বিজ্ঞানের একদম প্রাথমিকটুকু সংক্ষেপে সেরে নেই।
ড্রোন বা মানববিহীন যান (Unmanned Aerial Vehicle অথবা UAV) Aerodynamics, Physics এবং Advanced Engineeing – বিজ্ঞানের তিনটি শাখার চমৎকার সংমিশ্রণ। মূলে নিউটনের গতি সংক্রান্ত তৃতীয় সূত্র। প্রতিটি ক্রিয়ার রয়েছে একই মাত্রার প্রতিক্রিয়া। ড্রোনের ক্ষেত্রে প্রপেলারগুলি নিচের দিকে বাতাস কাটার ফলে উপরের দিকে একটি শক্তি (Lift) তৈরি হয় এবং এর ফলেই ড্রোন আকাশে ঘুরতে (Hover) পারে। এবার সূক্ষ্ম পরিমাপ ও সঠিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ড্রোন উপরে – নিচে সামনে – পিছনে উড়ে যেতে, ভেসে থাকতে পারে। এবার ড্রোনের (Quadricopter) চারটি রোটেটর এমনভাবে বাঁকিয়ে (Curved) তৈরি করা হয় যে তাদের বক্র ঘূর্ণন (Curved Rotation) ড্রোনকে বাতাস কাটিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রপেলরগুলির ঘূর্ণনজাত শক্তি (Thrust), অন্যদিকে থাকে বাতাসের বাধা (Drag) এবং ড্রোনের নিজস্ব ওজন (Weight)। এগুলির সঠিক ভারসাম্যে ড্রোন উড়ে চলে। ড্রোনের আরও তিনরকম গতিবিধি রয়েছে। উলম্ব অক্ষ (Vertical Axis) ধরে ঘূর্ণন (Yaw), সামনে – পিছনে ঘূর্ণন (Pitch) এবং পাশাপাশি ঘূর্ণন (Roll)। এই পারস্পরিক বলগুলিকে দক্ষতার সঙ্গে নিরপেক্ষ (Torque) করা হয়। দীর্ঘক্ষণ ওড়ার ক্ষেত্রে ড্রোনে বিশেষ ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়।
ড্রোন বিভিন্ন প্রকারের রয়েছে। এখানে আমাদের বিষয়বস্তু যুদ্ধের (Combat অথবা Fighter অথবা Battlefield) ড্রোন (Unmanned Combat Aerial Vehicle অথবা UCAV)। শত্রুর কোন লক্ষ্যে আঘাত বা বিস্ফোরণ করার ড্রোনের কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও যুদ্ধে ব্যবহৃত হয় নজরদারির Surveillance Drone, পুনরুদ্ধারের Reconnaissance Drone, অব্যর্থ লক্ষ্যভেদী High – value Targeted Drone, আত্মঘাতী Loitering Munition Drone, নৌপথে শত্রুর পেতে রাখা মাইন সরানোর Mine Sweeping Drone ইত্যাদি। Remote Controlled থেকে Radio Controlled থেকে AI Operated Automated Drone বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থারও অগ্রগতি ঘটে। প্রয়োজন অনুযায়ী Heavy, Medium অথবা Light Payload রাখা হয়। আধুনিক Advanced Electronic Warfare (EW) – র অঙ্গ এখন ড্রোন। বায়ু সেনার ফরমেশনেও দেখা যায় একটিমাত্র Manned Aircraft, তার নেতৃত্বে বাদবাকি সব UCAV বা ড্রোন। এদের বলে Loyal Wingman Drones।
ড্রোনের বিস্তৃতি: আধুনিক ড্রোনের জন্ম ও বিস্তার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্ররও বিকাশ সেখানে। Lee এবং Forest এই দুই বিজ্ঞানীকে ড্রোনের সূচনাকারী বলা হয়। ১৯৪০ – ‘ ৭০ বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে ড্রোনের বিকাশ হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং প্রয়োগ হয় বিভিন্ন রণাঙ্গনে। সমর ড্রোনকে আরও উন্নত করে তোলে ইসরায়েল ১৯৭৩ – ৮২ পর্যায়ে এবং প্রয়োগ করে আরব দেশগুলির সঙ্গে যুদ্ধে। ইতিমধ্যে ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, চিন প্রমুখ এই প্রযুক্তি পেয়ে গেছে বা অর্জন করে ফেলেছে। মার্কিনের UCAV (TD), X 47 সিরিজের প্রায় সমকক্ষ Stealth UCAV বানিয়ে ফেলেছে চিন। বর্তমানে ইরান সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোন প্রযুক্তি করায়ত্ব করে এবং বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করে মধ্য এশিয়ার যুদ্ধের দিক পরিবর্তন করে দিয়েছে। এছাড়াও তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়া, গ্রিস প্রভৃতি দেশ ড্রোন প্রযুক্তি রপ্ত করে সামরিক উৎপাদনে সাফল্য দেখিয়েছে। ব্রিটেন বানিয়ে ফেলেছে অত্যাধুনিক ISTAR এবং BAE Systems Taranis ড্রোন। ইসরায়েল Elbit System এর মাধ্যমে বানিয়ে ফেলেছে Hermes ড্রোন সিরিজ। তুরস্কের ভাড়ারে Tai anka, Tai aksungur, Byraktar kizilelma প্রমুখ ড্রোন সিরিজ।
ক্ষেপণাস্ত্র বা মিসাইলের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া বাদ দিয়ে চিন এগিয়ে গেছে। মার্কিন J – UCAS, N – UCAS সিরিজের প্রায় সমকক্ষ Hongdu GJ 11, Feihongh FH 97, 97 A বানিয়ে ফেলেছে চিনের China Aerospace Science & Technology Corporation ও Chengdu Aircraft Industry Group। উত্তর কোরিয়াও (DPR Korea) রাষ্ট্রায়ত্ত Aeronautical Technology Complex প্রভৃতির মাধ্যমে Sayetbyol 4, 9; Kumsong, Hwasong প্রমুখ দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বানিয়ে ফেলেছে। ভারতের রয়েছে Agni সিরিজ। ইরান বানিয়ে ফেলেছে Shaheed, Arash প্রমুখ দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সিরিজ।
সুতরাং আধুনিক যুদ্ধে দেখা যাচ্ছে তুরুপের তাস হয়ে যাচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে অত্যাধুনিক ড্রোন। হামাস – ইসরায়েল যুদ্ধে আমরা টিভির পর্দায় দেখেছি হামাস মিলিশিয়ারা হঠাৎ হঠাৎ করে তাদের সুড়ঙ্গের ঘাঁটি থেকে বেরিয়ে হাল্কা ফোল্ডেড লঞ্চার থেকে ইসরায়েলের দিকে কিভাবে দ্রুত ড্রোন নিক্ষেপ করে পালিয়ে যাচ্ছেন। ইউক্রেন যুদ্ধে দেখা যাচ্ছে পড়ে থাকা কৃষি ক্ষেত ও ঝোপ জঙ্গলে লুকিয়ে রাখা লঞ্চার থেকে কিভাবে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ছোড়া হচ্ছে রাশিয়ার উদ্দেশ্যে। ইরান যুদ্ধে দেখা গেল পাহাড়, মরুভূমি, অরণ্য, শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত লুকোনো লঞ্চার থেকে কিভাবে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়া হচ্ছে মধ্য এশিয়ার মার্কিন ঘাঁটি ও সহযোগী দেশগুলির দিকে। এরসঙ্গে রুশ ও চিনা উপগ্রহ সেগুলিকে জোগাচ্ছে লক্ষ্যবস্তুর নিখুঁত খবর। ড্রোনের ভাল ভান্ডার থাকলে আধুনিক যুদ্ধে অনেক সুবিধা হচ্ছে। তাই কামাল করে দিচ্ছে আধুনিক ড্রোন। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া এমন দ্রুতগামী ড্রোন ছুঁড়ছে যে সেগুলিকে ধরা (Intercept) এবং নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হচ্ছেনা। এমনকি হিজবুল্লা, হুথি, হামাস প্রমুখ ইসলামি মিলিশিয়ারাও বিপুল পরিমাণ সামরিক ড্রোন করায়ত্ব করেছে এবং নিয়মিত ব্যবহার করছে। এমনকি মেক্সিকো, কলম্বিয়ার ড্রাগ কার্টেল গুলিও।











