আমার চারপাশে বিদগ্ধ মানুষ গিজগিজ করছে। তাঁদের বিশাল বিদ্যা, বিচক্ষণতা ইত্যাদি দেখে আমার মুখ সর্বদা “Wow” অভিব্যক্তিতে হাঁ হয়ে থাকে। তাঁদের রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ দেখেও আমি হাঁ হয়ে যাই প্রায়শই।
সাম্প্রতিক ফ্লাই দুবাইয়ের ঘটনাটার কথাই ধরা যাক। ঘটনার প্রাথমিক খবর জানাজানি হতেই একপক্ষ যেমন ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের তত্ত্বটাকে লুফে নিল খুব তাড়াতাড়ি (তদন্ত আরেকটু এগোতে দিয়ে লুফে নিলে কিছু বলার থাকত না), আরেকটি পক্ষ (যার একাংশ নিজেদের বামপন্থী বলে দাবি করে, কিন্তু যাদের আমি সখের বামপন্থী মনে করি) ততোধিক দ্রুততায় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খাড়া করতে শুরু করল। তারাও তদন্ত আরেকটু এগোতে দিয়ে বক্কা দিলে কিছু বলার থাকত না। ষড়যন্ত্র তত্ত্বের স্বার্থে কিছু ফেক পোস্ট শেয়ার করা হল। সেরকম মিথ্যার বেসাতি করা এক ব্যক্তিকে প্রশ্ন করেছিলাম, “এই খবরটা কোথায় পেলেন? জেরুজালেম পোস্টে তো ছিল না!” তিনি আমার মন্তব্যে “হা হা” তাচ্ছিল্য দিয়ে আলাদা পোস্ট করলেন, যার বক্তব্য হল, যারা সত্যের আশ্রয়ে থাকার কথা বলছে, তারা হয় “চাড্ডি”, নয় “গা*”। বক্তব্যের উদ্দিষ্ট ব্যক্তি আমি, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। অন্য কিছু লোক তাঁকে গালি দিয়েছিল, তাতে তিনি বিশেষ কিছু মনে করেননি, কারণ গালি খেতে তিনি অভ্যস্ত। কিন্তু আমি সত্যের প্রতি আগ্রহ ব্যক্ত করায় তিনি উত্যক্ত হয়েছেন, কারণ সত্যের প্রতি আগ্রহে (একে সত্যাগ্রহ বলে কিনা জানি না) বেশিরভাগ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বেরই অনাগ্রহ এবং অ্যালার্জি আছে। অনেকেরই অন্তরে নাথুরাম বাস করে। (আমি অবশ্য গান্ধী নই, গান্ধীবাদীও নই সেভাবে।)
এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বা অবিশ্বাস নিয়ে আমার বিরাট কোনো মৌলিক আপত্তি নেই। “নেতানিয়াহুকে বিশ্বাস করিতে হইবে”, এই মর্মে কোনো সারমন আমাকে দেয়নি কোনো দেবদূত। নেতানিয়াহু আমার চোখে ভদ্রলোকের পরাকাষ্ঠা, যাঁর “এক কথা”। ঊনিশশ নব্বইয়ের দশক থেকে তিনি বলে চলেছেন, “ইরান আর ছয় মাসের মধ্যেই পরমাণু বোমা বানিয়ে ফেলবে।” ২০২৬-এও সেই কথার বিন্দুমাত্র নড়চড় হয়নি। সুতরাং এই ব্যক্তি এবং তাঁর রাজনীতিকে আপনি দশবার প্রশ্ন বা সন্দেহ করুন (বিশেষত নির্বাচনের আগে)।
কিন্তু আক্রান্ত এবং আহত এক ভারতীয় পাইলট, যিনি অন্তত সেই মুহূর্তে নিজের কাজটি করে মানুষের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন (সে ইহুদি প্রাণ আপনার যতই অপছন্দের হোক না কেন), তাঁকে ট্রোল না করে নিজেদের রাজনৈতিক ভাষ্য প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছিল না? যে বিদ্বজ্জনেরা তাঁর পদবী নিয়ে বিদ্রূপ করে “ডেঙ্গুর মশা”, ” কছুয়া জ্বালাও মচ্ছর ভাগাও” ইত্যাদি বললেনি, তাঁদের কাঁঠালপাতা চেবানো Capra aegagrus hircus ছাড়া কিছুই মনে হল না। আমি নিজেকে অপদার্থ মনে করি। আপনাদের দেখে ভরসা পাই যে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপদার্থ নই।
সৌভাগ্যক্রমে আমার পরিচিতদের মধ্যে যে কজন বামপন্থী সক্রিয়ভাবে আন্দোলন বা মানুষের জন্য কাজ করেন, তাঁরা কেউ এই ধরনের কুৎসিত মন্তব্য করেননি এবং এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নির্মাণে ঝাঁপিয়ে পড়েননি (অন্তত আমার চোখে পড়েনি)। কয়েকজন সখের এবং ঢপের ছদ্মবাম, যাঁদের বপু আরামকেদারায় এবং কাজকর্ম ফেসবুকে সীমাবদ্ধ, তাঁরা শেয়ার মার্কেটে খাটানো টাকায় স্কচ খেতে খেতে এই বিলাসিতাগুলো করেছেন। তাঁদের এই মহান কর্মের জন্য মাঠেঘাটে খেটে ঘেমে নেয়ে বাড়ি ফেরা তথাকথিত সেকুমাকুরা আরও একচোট খিস্তি খাবে। কী আর করা যাবে?
(এই অব্দি পড়ে ক্রুদ্ধ হয়ে এই ধরনের বিদগ্ধ প্রাণীরা আমাকে যদি আনফ্রেন্ড করে দেন, তাহলে বেঁচে যাই।)
উল্টোদিকে আরেকটি দল আছে, যারা দেশের স্বার্থে কুটোটি না নেড়ে ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের কাঁধে চড়ে দেশপ্রেমিক সাজতে চাইছে। আরে ভাই, ক্যাপ্টেন একাই রোজ ডাবল সেঞ্চুরি করে ম্যাচ জেতাবে আর তুমি পরপর গোল্ডেন ডাক করে ফোকটে টিমে থাকবে শুধু সস্তা বিভেদকামী ছ্যাঁচাড়ামির জোরে? এই বোধটুকু নেই যে একটি ঐক্যবদ্ধ দেশই শক্তিশালী দেশ, বহুধাবিভক্ত দেশ, অন্তঃকলহে জর্জরিত দেশ দুর্বল হয়ে যায়? ভারতের প্রতিযোগিতা পাকিস্তান বা বাঙলাদেশের মতো প্রায় অস্তিত্বহীন দেশের সঙ্গে হতেই পারে না। প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত নিদেনপক্ষে চীনের সঙ্গে। “ককরোচ নহি, মচ্ছর বনো” জাতীয় সস্তা স্লোগানের দ্বারা বা কোনো একজন ভ্রষ্ট আমলাকে আড়াল করার দ্বারা সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এই বোধটুকু নেই কেন হে ঢপের দেশপ্রেমিক? ঢপের বামপন্থীদের সঙ্গে আপনাদের তফাৎ কী? রাজনৈতিক শিবির আলাদা, কিন্তু ‘নিয়ত’ তো একই।
ককরোচ জনতা পার্টি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতাদের আমি এক কথায় বিশ্বাস করি না আর। বিশেষত আমেরিকার গন্ধ গায়ে লেগে থাকলে বিশ্বাস করার আগে আশিবার শুঁকে দেখি। (যদিও মূল ধারার রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তুলনা করলে ককরোচ নেতারা এখনো তেমন খারাপ কিছুই করেনি বলা চলে।) কিন্তু আরশোলাদের আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিয়েছে যে জেনজিরা, তাদের অবজ্ঞা করার প্রবণতাকে আমার অপরিণামদর্শিতা বলেই মনে হচ্ছে। এদের অবজ্ঞা বা ঘৃণা করতে যাব কেনি ভায়া? এরাই তো আমাদের ভবিষ্যৎ। আমার মেয়ে একজন জেনজি। “ক্ষুদ্রতম গেঞ্জি” বলি তাকে, কারণ জেনজি ব্র্যাকেটের শেষ বছরে তার জন্ম। আমি মরে যাবি, ওরা বেঁচে থাকবে, এটাই তো আশা করি। ওদের অগ্রাহ্য করব কোন যুক্তিতে? কোনো জ্ঞানেশ কুমার কখনও সন্তানের থেকে প্রিয় হতে পারে?
যারা দেশের শিক্ষাদীক্ষা শেষ করেছে, যারা দেশের কর্মসংস্থান শেষ করেছে, যারা দেশের মানুষের সামাজিক সুসম্পর্ক শেষ করেছে… সংক্ষেপে যারা যারা আমার সন্তানের পথে কাঁটা বিছিয়েছে বিভিন্ন পদ্ধতিতে, তাদের কাউকে সমর্থন করার প্রশ্ন আসে না৷ অপ্রিয় কথা বলতে গিয়ে সবপক্ষের সব ধান্ধাবাজকে চটানোর ফলে শুধু ফেসবুকে নয়, বাস্তব জীবনেও যদি বন্ধুর সংখ্যা শূন্য হয়ে যায়, তাহলেও কিছু যায়-আসে না, কারণ বাপের প্রাথমিক কর্তব্য সন্তানকে বাঁচানো। আমার বৃদ্ধা মা বিছানায় শুয়ে আজও আমার মঙ্গল কামনা করে। আমারও যতক্ষণ জ্ঞান থাকবে, সন্তানের মঙ্গলকামনা করব। বামপন্থী, ডানপন্থী, মধ্যপন্থী, উগ্রপন্থী, ধান্ধাপন্থী যেকোনো Sus scrofa domesticus, যে আমার সন্তানের প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে চাইবে, ক্ষমতায় কুলোলে এক বাপ তাকে গুঁড়ো করে দেবে। ক্ষমতায় না কুলোলে অভিশাপ দিয়ে মরে যাবে। পৃথিবীর ইতিহাসে এর চেয়ে সরল এবং সত্যি গল্প আর কিছু নেই।











