উপর্যুপরি কিছু ঘটনার অভিঘাতে আমার স্বভাবতই বিষণ্ণ পুজো আরও ম্লান, আরও দিশেহারা আজ।ভীঈঈঈষণ লম্বা একটা লেখা দিলাম তাই। এমনিতেই বাজে লেখা। একজনও না পড়লে ক্ষতি নেই, শুধু আমার ক্যাথারসিসে একটু সাহায্য করবে এই পোস্ট —
১
দুপুরবেলায় থালার ভাত ভেঙে গর্ত করে তার ভিতরে ট্যালটেলে ডালটা ঢেলেই কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেল লাটু। একটু আগেই যে একপেট খিদে নিয়ে বাড়ি ঢুকে লতাকে হাঁক পেড়েছিল –”জলদি ভাত বাড়ো” বলে, সেটা আর মনেই রইল না। বাসুদেবপুর ইস্কুলমাঠের পাশে বটতলার ভাঙা বেদির নিচে বসে একমনে জুতোর চামড়ার সুকতলায় গুণছুঁচের ফোঁড় গেঁথে দিচ্ছিল যে বুড়ো মুচি, তার অজস্র বলিরেখার আঁকিবুঁকিভরা মুখখানা চোখে ভেসে উঠতে লাগল কেবলই। খাওয়ার কথা আর মনেই রইল না।
লাটু বাসুদেবপুর-হাটতলা রুটে অটো চালায়। ঘরে বউ লতা আর ট্যাঁপারির মতো একরত্তি মেয়ে মাম্পি। মা মরেছিল কোন ছোটবেলায় — তার মনেও নেই মায়ের কথা। বাপ থাকে ডায়মন্ড হারবারে। তার মস্ত মাছের আড়ত। কারবার দেখে ছোটভাই রাজু – সৎভাই অবিশ্যি। বাপ তো আর হবিষ্যি করে বসে থাকেনি মা মরার পরে। গোটা দুই সৎ বোনও আছে তার। লায়েক হওয়া ইস্তক লাটু তার বাপের পাথর বসানো দোতলা বাড়িতেই ছিল মাটি কামড়ে।
রোজ অশান্তি, রোজ চেল্লামেল্লি – শালা!
শেষে পাড়ার হরিদাকে ধরে পড়েছিল –ব”একটা হিল্লে করে দাও না দাদা। এখানে থাকলে পাগলা হয়ে যাব মাইরি।”
হরিদা বাস চালাতো ডায়মন্ড- ধর্মতলা রুটে। ওর হাতেই গাড়ি চালানো শেখা। ক’ দিন বাসের খালাসিগিরি, তারপর হরিদা মারফৎ জগুবাবুর সঙ্গে পরিচয়। জগুবাবুর ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা। অটোর পারমিটও নিয়েছেন।
এই বাসুদেবপুর- হাটতলা রুটে জগুবাবুর আটটা অটো চলে। তারই একটা চালায় লাটু।
জগুবাবু মালিক হিসেবে মন্দ নয়। মাস গেলে হাতে পায় হাজার পাঁচেক। পুজো, ইদ বা বর্ষাকালে বেশি রাত্তিরে কাটা রুটে গাড়ি চালালে বুঝেও কিছু বলেন না। এটুকু উপরি তো ড্রাইভারদের থাকবেই। তবে বছর তিনেক আগে লতাকে দুম করে বিয়েটা করে ফেলার পর থেকে দু’টো পয়সার লোভে বেশি রাতে আর রুট কেটে গাড়ি চালায় না লাটু। লতা আর মাম্পি একলা থাকবে, ভাবতে ভাল লাগে না তার। সংসারের টান? কে জানে শালা।
বেশ চলছিল। কিছুদিন হলো এই অদ্ভুত অন্যমনস্কতা রোগে ধরেছে তাকে। হঠাৎ করেই অচেনা, অজানা কোনো লোক, হয়ত জীবনে একবারই দেখেছে তাকে – তার চিন্তার মধ্যে গুঁতিয়ে ঢুকে পড়ে। আশপাশের বাস্তব ঝাপসা হয়ে আসে। এমনকি লতাও।
লতার সঙ্গে বিয়েটা হঠাৎ করেই হয়ে গিয়েছিল। ভবাকাকা, মানে লতার বাবা (আজও শালা শ্বশুরকে বাবা ডেকে উঠতে পারল না লাটু) জগুবাবুর অটো চালাত। সেই সঙ্গে ছিল সাট্টার নেশা। যা রোজগার, সবটাই সাট্টায় উড়ে যেত তার। লতার মা নিরুপায় হয়ে বাবুদের বাড়ি রান্নার কাজ ধরল। লতারা দুই বোন। বড় বোন মিতা মাধ্যমিক দেওয়ার আগেই ভেগে গেল সব্জিওয়ালা রবির সঙ্গে। ভবাকাকা তেড়িমেড়ি করেছিল ঠিকই, কিন্তু বিনাপয়সায় একটা মেয়ে পার হলো দেখে লতার মায়ের অজান্তে একটা স্বস্তির নিশ্বাসও ফেলেছিল বোধহয়। রবি আর মিতার বিয়েটা সুখেরই হয়েছিল অবিশ্যি। তবে এই ঘটনার পরে লতাকে কিন্তু ইস্কুল থেকে ছাড়িয়ে দিয়েছিল ভবাকাকা।
লতার চেহারায় চটক ছিল। বলতে নেই, এখনো আছে। পাড়ার চায়ের দোকানে বসে অন্যান্য অটোওয়ালাদের সঙ্গে যখন গুলতানি করত লাটু, দেখতো লতা মুদিখানায় বা পুকুরঘাটে যাবার পথে তার দিকে আড়চোখে তাকাতে তাকাতে যায়। তবে ওই তাকানো আর একটু মুচকি হাসি, ঐ পর্যন্তই – আর কোনো পূর্বরাগের সুযোগ তারা পায়নি।
কিছুদিন পরে লতাদের বাড়ি থেকে তাকে ডেকে পাঠানো হলো। গিয়ে বুঝল, ঐ টেপা হাসি আর চোরা চাউনি শুধু তার চোখেই পড়েনি, ভবাকাকার চোখেও পড়েছে।
অমত করার কারণ ছিল না। একখানা আংটি আর নগদ পনের হাজার টাকা লতার মা যোগাড়যন্ত্র করে ঠিকই দিয়েছিল তাকে। তবু, বিয়েটা চুকে যাওয়ার পরে লাটুর মতন আদাড়ে লোকের মনেও একটু সংশয় জেগেছিল। এরা এত তাড়াতাড়ি সব দায় মিটিয়ে ফেলতে চাইল কেন?
বিয়ের কিছুদিন পরে লতাই জানিয়েছিল নিজের মুখে – ”বাবা ভয় পেয়ে গেছল জানো?”
”কিসের ভয়?” অবাক গলায় প্রশ্ন করেছিল লাটু।
”ঐ যে কাউন্সিলার রাম নস্করের বড় ছেলে তপন – ছেলেটা খুব হারামি, জানো” —
”তো?” – লাটুর একগাল মাছি।
”দূর! তুমি কিছু বোঝো না” — একটু বুঝি লজ্জা পেয়েছিল লতা -”বজ্জাতটার খুব প্রেম করার শখ – আমার ওপর নজর পড়েছিল গো” —
এতক্ষণে ভবাকাকার তাড়ার কারণ বুঝেমতে পেরেছিল লাটু। মুখটা একটু ফিরিয়ে বলেছিল – ”ভালই তো হতো। কাউন্সিলারের ছেলে তোমার বর হতো, ওরা কত বড়লোক” — বলতে গিয়ে গলাটা ধরে গিয়েছিল চোরা অভিমানে।
”ধুউউউর”, গায়ে অদ্ভুত একটা মোচড় দিয়ে বলে উঠেছিল লতা, ”কিস্যু বোঝো না তুমি! বিয়ে করতো নাকি? শুধু ফষ্টিনষ্টি করার মতলব! তারপর” — ইঙ্গিতপূর্ণ চোখ ঘুরিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল তপনের অন্তর্নিহিত মনোবাঞ্ছা।
কথা বাড়ায়নি লাটু। ভবাকাকার ব্যাপার বোঝা হয়ে গিয়েছিল তার। এইসব মফস্বলে মেয়ের বদনাম হয়ে গেলে যেমন তেমন গোছের একটা বিয়ে দেওয়াও দুষ্কর।
তা, লাটুর বিয়েটা তাড়াহুড়ো করে হলেও খারাপ হয়নি। শাশুড়ির দেওয়া টাকায় সে শ’খানেক নিমন্ত্রিতকে মাংসভাত খাইয়েছিল। লতাকে ওর মা চারগাছা ব্রোঞ্জের চুড়ি আর একজোড়া কানফুল দিয়েছিল। আর লাটু তার দু’বছরের রোজগারের জমানো টাকায় কিনেছিল একখানা জোড়াখাট, আর কলকাতা গিয়ে কাচের দরজাওয়ালা বড় দোকান থেকে নিজে পছন্দ করে কিনে এনেছিল একখানা লাল টকটকে বেনারসী।
এই জেগে স্বপ্ন দেখার রোগটা তার ধরেছে মাস তিনেক। দিনে দিনে যেন বেড়েই চলেছে। আজকাল লতাও খুব বিরক্ত হয়। আগের বিষ্যুদবারের সকালে লক্ষ্মীপুজোর জন্য লাটুকে বাজারে পাঠিয়েছিল সে। কাঁঠালি কলা, ফুল আর গুড়ের বাতাসা আনার জন্য। লাটু কলা কিনল ঠিকই। তারপর মালা কিনতে ফুলের দোকানে গিয়েই কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেল। তার চোখে ভেসে উঠল আমতলা হাসপাতালের আধময়লা বেডে শোয়া, তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকা এক বুড়ির মুখ। নাকে নল গোঁজা, হাতে স্যালাইনের পাইপ ঢোকানো – বুকটা হাপরের মত উঠছে আর নামছে। ভাবলেশহীন মুখে সাদাটুপি, সাদা শাড়ি পরা এক মাঝবয়সী নার্স বুড়িটার হাতে কি একটা ইঞ্জেকশন ঠুসে দিয়ে চলে গেল। পাশের বেডের বউটা তার স্বামীকে করুণ গলায় প্রশ্ন করল – ‘হ্যাঁগো, বাঁচবে না বুড়ি, তাই না?’
নন্দর মায়ের বুকে ব্যথা হতে লাটুরা কয়েকজন মিলে আমতলা হাসপাতালে গিয়েছিল ভর্তি করতে – তখনই দেখেছিল সেই বুড়িকে। পুজোর ফুল, মালা আর কেনা হয়নি তার সেদিন।
আরও এক দিনের কথা। সেদিন বড় শালী মিতার ছেলের জন্মদিনের নেমন্তন্ন ছিল। বিকেলের পরে আর ট্রিপ খাটবে না, জগুবাবুকে বলেই দিয়েছিল লাটু। সন্ধের মুখে গাড়ি গ্যারেজ করে মালিককে হিসেব বুঝিয়ে দিয়ে, বাড়ি ফিরে বউ আর মেয়েকে নিয়ে জগন্নাথপুর যাবে এমনটাই কথা ছিল। জগন্নাথপুরে মিতার শ্বশুরবাড়ি।
লাস্ট ট্রিপ মেরে ফিরছিল লাটু। কিন্তু চকবাদামতলার মোড়ে এসে সব গোলমাল হয়ে গেল।
”বলো হরি! হরি বোল! বঅঅঅলো হরি! হরিইইই বোল!”
কেউ গেল। কে যায়? চেনা গেল না। রোগা শরীরে জড়ানো নামাবলী আর সাদা চাদরের নীচ দিয়ে দুটি এবড়ো খেবড়ো পা দেখা গেল কেবল।
লাটুর মাথার মধ্যে সব তালগোল পাকিয়ে গেল। সে পিছু নিল শবযাত্রীদের।
আক্রার শ্মশানঘাট। জল ছুঁয়ে গোধূলির মায়াময় আলো। ইতস্তত আগুনের শিখা। ঘাটের পৈঁঠায় বসে এক মেয়েলোক গুনগুন করে কাঁদছিল। অন্যমনস্ক নয়, লাটু কেমন বিহ্বল হয়ে গেল। সে মরে গেলে লতা অমন বিনবিন করে বিলাপ করবে? কেন করবে? আর লাটুকে দেখতে পাবে না, সেই জন্য? নাকি মাসান্তে নিশ্চিন্তির টাকাক’টা হাতে পাবে না, মাছভাত, সিঁদুর আলতা, বাহারি শাড়ি – সব ঘুচে যাবে, তাই? আজকাল অবশ্য কেউ আর ওসব মানে টানে না। ‘দুশ শালা’, নিজেকেই ঝাড় দেয় লাটু, ‘যত্তসব আলফাল চিন্তা’!
রাতে সোহাগের শেষে আদুরে বেড়ালের মত তার ঘেমো বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে কতবার বলেছে লতা, ‘তোমার কিছু হলে আমি কিন্তু বিষ খাব, নয় গলায় দড়ি দেব, কিছুতেই বাঁচতে পারব না গো, কিছুতেই না’– সেসব কী তাহলে মিথ্যে? সাজানো কথা?
আচ্ছা, সত্যিই এমন হয়? ওই যে মেয়েলোকটা ঘাটের পৈঁঠায় বসে গুনগুন কান্না ছেড়ে দিয়ে আছাড়ি পিছাড়ি কাঁদছে এখন, বোঝাই যাচ্ছে ওর কষ্ট হচ্ছে খুব। কিন্তু ও মরে যাচ্ছে না তো?
মানুষ মরে কোথায় যায়? আকাশে? আকাশের ওপারে নাকি অন্য একটা পৃথিবী আছে, ঠাকমা বলত, মনে আছে লাটুর।
আচ্ছা, মরার আগে তো লোকে জানতে পারে না কোথায় যাচ্ছে – মরার পর আপনজনদের এসে জানাতে পারে না কোথায় এলাম – তা হলে ঠাকমা বুড়ি জানল কি করে?
হাবলার মত সদ্য তারা ফুটে ওঠা ছেয়েরঙা আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে রইল লাটু। কোথাও আর যাওয়া হল না তার।
”তুই কি সাধু ফাদু হয়ে যাবি নাকি বে?” সন্ধেবেলার চায়ের দোকানের আড্ডায় শীতল তুলল কথাটা। লাটু আর কী বলবে? চুপ করে থাকা ছাড়া আর কী করার আছে তার?
”নাঃ”– বিড়িতে শেষ লম্বা টান দিয়ে সেটাকে আঙুলের আলতো টোকায় নর্দমায় ফেলে দিল সুখেন – ”লাটু, তুই ভাল ডাক্তার দেখা। তোর বেরেনে সার্কিট লুজ হয়ে গেছে” —
”মানে? আমি পাগল?”– গলায় উষ্মা ফুটিয়ে ছিটকে ওঠে লাটু।
”আহা চটিস কেন? বৌদি বলছিল তো তপনদাকে, আমি তখন গাড়ির চাবি আনতে যাচ্ছিলাম তোর থেকে – ঐ যেবার তুই শ্মশান থেকে ফিরে দু’দিন জ্বরে পড়ে রইলি না, তখন” – সুখেন মোলায়েম গলায় বলে।
লাটু কেমন চুপসে যায়। লতা আবার তপনের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে? তাও আবার তার মাথার গন্ডগোল নিয়ে? তার ঘিলুর মধ্যে পোকা কটকট করে উঠল ফের, কান ভোঁ-ভোঁ করতে লাগল। নিশিতে পাওয়ার মতো সে চায়ের দোকানের বেঞ্চি থেকে উঠে দাঁড়াল। বন্ধুদের প্রশ্নগুলো তার কানে দূরাগত মৌমাছির অর্থহীন গুঞ্জনের মত শোনাচ্ছিল। আস্তে আস্তে সেগুলোও মিলিয়ে এলো। সে হাঁটতে শুরু করল। কোনদিকে, কতদূরে যাবে, তার কোনো হুঁশ রইল না।
২
কাশী।
বৈশাখ মাসের এক তপ্ত সাঁঝবেলায় দশাশ্বমেধ ঘাটের আটকোনা বুরুজের ওপর হাঁটুতে মুখ রেখে বসে আনমনে জলের দিকে চেয়ে ছিল লাটু। আকাশের আলো পুরো মোছেনি, অথচ রাত গড়াচ্ছে আটটার দিকে। এখানে এটাই দস্তুর, লাটু এখন জানে।
আজ প্রায় সাত বচ্ছর হলো, সে বাড়িছাড়া। যে রাতে অনির্দিষ্টের পথে প্রথম পা বাড়িয়েছিল লাটু জানত না কোথায় যাচ্ছে। আজও কি জানে?
সেদিন গভীর রাতে হাওড়া স্টেশনে বাইশ নম্বর প্ল্যাটফর্মে নিজেকে আবিষ্কার করেছিল লাটু। তারপর? তারপর বিন টিকিটে ঝ্যাকড় ঝ্যাকড় করে কন্যাকুমারী। না, ভুল হলো। মাঝে ক’দিন টিকিটবিহীন রেলযাত্রার জন্য হাজতবাস। তারপর ভারতের দক্ষিণ সীমান্ত। সেখানে কিছুকাল উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরির পরে পেট জবাব দিল। দক্ষিণী আহার তার সইল না। পথের ধার থেকে পুলিশ উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিল স্থানীয় হাসপাতালে। লাটু দেখল, ভাষা ঠিক না মিললেও পরিবেশ আমতলা হাসপাতালেরই মতো। রোগের ভোগান্তির একটি সার্বজনীন একঘেয়ে বিষণ্ণ সুর আছে – প্রদেশ বদলালেও সেই আর্ত অনুভব বদলায় না। এটা বুঝতে পেরে লাটুর মনে একটা অচেনা স্বস্তির প্রলেপ পড়ল। কেন? সে জানে না।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে পশ্চিমের পথে চলল লাটু। তামিলনাড়ু থেকে সোজা মহারাষ্ট্রের রত্নগিরি। সেখান থেকে নাসিক হয়ে শিরডি। সেখান থেকে দ্বারকা।
শুদ্ধা ভক্তির মাঝেই কী তবে লুকিয়ে রয়েছে জীবনের অর্থ? স্থানীয় আশ্রমিকদের লক্ষ করে সে। তাদের কৃচ্ছ্রসাধন দেখে, ভক্তি গদগদ সমর্পণ দেখে – কিন্তু মন শান্ত হওয়ার বদলে আরও বিভ্রান্ত হয়ে ওঠে।
সান্ধ্য হিতোপদেশের আসরে নিতান্ত বেমানান ভাবে তার মনে গুনগুন করে ওঠেন কিশোরকুমার – ‘কালকে কোথায় র’বো সে কি কেউ জানে?
বোঝে কী কখনও কেউ জীবনেরই মানে?’
দ্বারকা থেকে লাটু গেল উজ্জয়িনী। সেখান থেকে আজমীর শরিফ হয়ে দিল্লী।
ক্লাস এইট অবধি বিদ্যে যে মানুষের, সে অবলীলায় পরিক্রমা করে ফেলল তার ছেলেবেলায় পড়া ভূগোল বইয়ের ভুলে যাওয়া অনেকগুলি পৃষ্ঠা।
এই অন্তহীন নিষ্ফলা প্রব্রজ্যা তার চুলে পড়ালো জট, চামড়ায় ওঠালো খড়ি। এই ক’বছরে কী কী করেনি লাটু? কুলিগিরি, ঝাড়ুবর্দারি, ট্রাকের খালাসি কিংবা ধাবার বেয়ারার কাজ, ভিক্ষে মায় নিরম্বু উপোস – সবই করেছে সে। মানুষ চিনেছে। অমানুষও। কিন্তু এখনও জানতে পারেনি, এত দুঃখকষ্ট সয়েও কী জন্য বেঁচে থাকে মানুষ? কিসের টানে? কী তার অতুল জীবনীশক্তির রসদ? কিসের জোরে ভেঙে গুঁড়িয়ে যেতে যেতেও যায় না সে? বারবার পড়ে গিয়েও ফের উঠে দাঁড়ায় কোন ক্ষমতায়? সেই ক্ষমতা কী ঈশ্বর? নাকি মানুষ নিজেই? জানা হয়নি লাটুর।
স্রোতের শ্যাওলার মতো ভাসতে ভাসতে একদিন দেখেছিল সে দিল্লী থেকে এলাহাবাদ হয়ে বেনারসে এসে পৌঁছেছে।
আজ আনমনে গঙ্গার কালো জলে নাচতে থাকা নৌকোর আলোগুলোর দিকে তাকিয়ে, তার হঠাৎ খুব বাড়ির কথা মনে হলো। বাড়ি, মাম্পি, জগুবাবুর অটো, তার বাসুদেবপুরের পাড়া, বন্ধুবান্ধব, চায়ের দোকানের আড্ডা – সব কিছু ছাপিয়ে আলো আঁধারি নদীর ছলছলে ঢেউয়ের উপরে ভেসে উঠল লতার মুখ। আগেও মনে পড়েছে অনেকবার। তবে আজ এই মুহূর্তে যে রকম বেসামাল টান অনুভব করল সে, তেমনটি আগে কখনও হয়নি।
এত বছর কী করে বাঁচছে লতা, তাকে ছাড়া? মেয়েকে মানুষ করছে, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে শক্ত হাতে হাল ধরেছে তার ভাসিয়ে দেওয়া সংসারটার? কিসের জোরে? নাকি, লতা আর বেঁচেই নেই? সে নিজে যেমন বলত, তেমন করেই হারিয়ে গিয়েছে পৃথিবীর ভিড়ভাট্টা থেকে? নাহ্, কিছুতেই হতে পারে না। সে যখন আছে, লতাও আছে। আছেই।
পরের দিনই মনস্থির করে ফেলল লাটু। সে বাড়ি ফিরবে। বাড়ি তাকে টানছে।
“দূর ব্যাটা, জীবনের মানে কী মোটা মোটা বইয়ের পাতায় লেখা থাকে রে?’’ – এলাহাবাদের ত্রিবেণী সঙ্গমের ঘাটে বসা জটাজূটধারী সেই বাঙালি সাধুর কথা মনে পড়ে লাটুর।
“তবে কোথায় লেখা থাকে বাবা? এখানে, না?” দুই আঙুলে নিজের ভাঁজপড়া কপালে দুটো টোকা দিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল সে।
সাধুর হাসি চওড়া হয়েছিল। তিনি লাটুর ঝুলে যাওয়া কাঁধদুটো ধরে বলেছিলেন –“এইখানে রে ব্যাটা, তোর নিজের কাঁধে।”
লাটু হাবার মতো তাকিয়ে রয়েছে দেখে ফের হেসে উঠে বলেছিলেন –“নিজের কাঁধে মানুষের সারাজীবনের অভিজ্ঞতার বোঝা চেপে থাকে রে পাগলা – ঐ অভিজ্ঞতাই তাকে শিখিয়ে দেয় এতদিন ধরে কেন সে বেঁচে রয়েছে আর কখনই বা তার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে। সব জানিয়ে দেয় তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া জ্ঞান” – তারপর একটু থেমে অদূরের বিদেশি পর্যটকের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে উঠেছিলেন সাধু, “তোর জীবনের অর্থ আর ঐ ক্যামেরায় ছবি তোলা মেমসাহেবের জীবনের অর্থ এক হবে না, বুঝলি বোকা?”
সবই কি আর স্পষ্টভাবে বুঝেছিল লাটু? কেবল এইটুকু বুঝেছিল, কাঁধটাকে চওড়া করে নিতে হবে আরও। সংসারের দায়িত্ব তাকে টানছে। লতা টানছে তাকে। সে ফিরবে। তাকে ফিরতে হবে।
৩
বাব্বাঃ, কিছুই তো চেনা যাচ্ছে না। বেহালা চৌরাস্তা অব্দি পৌঁছতেই থতমত খায় লাটু। মাথার ওপর মেট্রো রেলের ব্রিজ, নিচে যেন মেলা বসেছে। বাড়ির অটো খুঁজতে গিয়ে দেখল, উন্নয়নের গুঁতোয় অটোস্ট্যান্ডটাই কেমন কোণঠাসা হয়ে গেছে। অটোওয়ালাদের মধ্যে চেনামুখ খুঁজল খানিকক্ষণ – বীরু, অজয়, শীতল, সুখেন – পেলো না। যাঃ শালা, সাত বছর কি এক জন্ম নাকি রে বাপ, কাউকে দেখতে পাচ্ছে না কেন সে? বাসুদেবপুরের অটোয় বসেও নিশ্চিন্ত হতে পারছিল না লাটু। মোড়ে নেমে অটোকে পয়সা দিতে গিয়ে দেখল – ও হরি, এই ছেলেটা তো শানু, জগুবাবুর শালার ছেলে – চিনতেই পারেনি এতক্ষণ। যা ফাঁট হয়েছে শালার! গলায় চেন, চোখে গগলস, চিনবে কেমন করে? শানুও চেনেনি অবশ্য। পরিচিত লোক দেখে মনের আনন্দে আর একটু হলেই নিজের পরিচয় দিয়ে ফেলছিল লাটু। অনেক কষ্টে সামলালো নিজেকে। সক্কলের আগে লতাকে চমকে দিতে চায় সে।
দ্রুত পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটছিল লাটু। স্বস্তির সঙ্গে লক্ষ্য করল যে আগাছার কেয়ারি করা সাতকেলে ইঁটপাতা রাস্তাটার তেমন পরিবর্তন হয়নি। এই তো, সামনের মোড়টা ঘুরলেই তার আর লতার যৌথ খেলাঘর – তার বাড়ি।
আরে বাহ্, কি দারুণ এলইডি ঝুলিয়েছে অ্যাসবেস্টাসের ছাদ থেকে – চমৎকৃত হয়ে গেল লাটু। মেলা লোকজনের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে বাড়ির ভিতরে। এই বাড়িতে লতা আর থাকে না নাকি? ভুরুতে ভাঁজ পড়ে লাটুর। না-ও থাকতে পারে। হয়ত ভবাকাকার কাছে চলে গিয়েছে। সেটাই তো স্বাভাবিক। একলা মেয়েমানুষ, কচি বাচ্চা নিয়ে থাকতে পারে কখনো? কী করে ফেলে যেতে পারল যে লাটু? নিজের পাছায় কষে এক লাথি মারতে ইচ্ছে করে তার।
বোঝাই যাচ্ছে, লতা-মাম্পিরা কেউ আর থাকে না এখানে। তবু লাটু ভাবল, একবার জিজ্ঞাসা করেই দেখা যাক – যদি বর্তমান বাসিন্দারা কোনো খোঁজখবর দিতে পারে তার মেয়ে বউয়ের।
পায়ে পায়ে আলোয় সাজানো দরজার গোড়ায় পৌঁছেই যেন পাথর হয়ে গেল সে। জাফরিকাটা বারান্দায় মেলা লোকজনের মাঝে ও কে? পরনে রক্তের মতো লাল বেনারসী, খুব চেনা – কপালে লাল টিপ আর জগজগে সিঁদুর – হেসে হেসে কথা বলছে একটা অচেনা বউয়ের সঙ্গে। হাতের তেলো দিয়ে চোখটা একটু ডলে নিয়ে ভাল করে তাকিয়ে দেখে লাটু, অচেনা কেন হতে যাবে? ও যে তার বড় শালী, মিতা। এপাশ ওপাশ চোখ ঘুরিয়ে তার শাশুড়ি, ভবাকাকা, এমনকি তার বন্ধু সুখেন, শীতলদেরও আবিষ্কার করে ফেলল লাটু। কিন্তু, ব্যাপারটা কী?
”যাই বল ভাই, তপনাটার দিল আছে! নইলে একটা ধেড়ে মেয়েসুদ্ধু মাগীকে কেউ ঘরে তোলে?”
”আচ্ছা, তপনার বাপ মেনে নিল কী বলে?”
”কিসুই বুঝিস না – এটাই তো ইলেকশন ক্যাম্পেনে ফাটাবে রে! অসহায় বিধবাকে বাচ্চাসুদ্ধু বিয়ে করেছে ছেলে – কি মহান ফেমিলি! এটাও বুঝলি না গান্ডু?”
“বাজে বকিস না। ইলেকশনে যেন আর কোনও ইসু নেই – খামোকা ছেলের লাভ স্টোরি নিয়ে ফাটাতে যাবেই বা কেন? পাবলিক কী গাড়ল?”
”তবুও – বিবাগী পাগলাটার তো সবে গেল মাসে ছেরাদ্দ করেছে। এরই মধ্যে” –
“বউটাও হেভি ঢলানি আছে, মাইরি!”
”না না, শুনছি তো ছেলেবেলা থেকেই পেরেম ছিল তপনার সাথে—”
”এতদিনে পেরেম পেকেছে বলছিস?”
“হ্যা হ্যা হ্যা – যা বলেছিস! ফুলটুস পেকে এখন রস গড়াচ্ছে” –
“অ্যায়, কী কী খাওয়াচ্ছে রে আজ? বিরিয়ানি আর চিকেন কষা করেছে শুনলাম” –
আর শুনতে পারেনি লাটু। তার আগেই ছিটকে এসে পড়েছে বড় রাস্তায়। আবার ছুটতে আরম্ভ করেছে সে। ছুটছে, ছুটছে – ধূসর অতীত, বীভৎস বর্তমান পেরিয়ে কুচকুচে কালো ভবিষ্যতের দিকে ছুটছে সে। কালো? না তো। সে দেখছে, অপার্থিব এক আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে চারদিক। এত আলো যে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। তবু ছুটছে লাটু। সেই উজ্জ্বলতার উৎসের দিকে নির্ভীক, দুর্নিবার গতিতে ছুটছে।
‘কালকে কোথায় র’বো, সে কি কেউ জানে?
বোঝে কী কখনও কেউ জীবনেরই মানে?’
জীবনের মানেটা এক্ষুণি, এইমাত্র জেনে গিয়েছে সে। জেনে গিয়েছে জীবনের অর্থ হচ্ছে – এক বৃহৎ, নিটোল শূন্য।
তাই এক শূন্য থেকে আরেক মহাশূন্যের দিকে ছুটে চলেছে লাটু। মানুষের মতো। সময়ের মতো। পৃথিবীর মতো।
অসতো মা সদগময়
তমসো মা জ্যোতির্গময়
মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়












