“ভালস্ট্রাসের ব্যারিকেডে আজ পর্যন্ত একুশটি, মানে একবিংশতি আক্রমণ চূর্ণ হইয়াছে। এবার বোধ হয় ট্যাংক আসিবে।”
সপ্তমীর গভীর রাতে মোবাইলের পর্দায় যাদবপুরের বামপন্থী বই এর স্টলে হামলার লাইভ দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, যেন ব্যারিকেড নাটকের ভালস্ট্রাসের দৃশ্য বাস্তবের মঞ্চে অভিনীত হচ্ছে। ট্যাংক না হলেও বুলডোজার এসেছিলো, গুলি না হলেও নির্বিচারে চলেছিল লাঠি, বিশাল পুলিশ বাহিনী এবং RAF বারবার চেষ্টা করছিল স্টল গুলো গুঁড়িয়ে দিতে।
শহরের অন্য প্রান্তে তার কয়েক ঘন্টা আগে এক পূজামণ্ডপে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন, সেই আতঙ্ক আর শোকের মুহূর্তে পুলিশ প্রশাসনের পর্যাপ্ত কোনো সহায়তা মেলেনি, অথচ বইয়ের স্টল ভাঙতে পুলিশের সংখ্যায় কোনো ঘাটতি দেখা যায় নি! তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানুষের হাতে আক্ষরিক ভাবে বই হয়ে উঠেছিল আয়ুধ, যা আসলে যেকোনো অস্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। বই হাতে নিয়ে বুক চিতিয়ে তাঁরা মানব-বন্ধন রচনা করেছিলেন। ছাত্র-ছাত্রী, বিভিন্ন বামপন্থী দলের নেতা-কর্মী আর বই-প্রেমী সচেতন মানুষের সেই যুথবদ্ধ সাহসের দুর্জয় ব্যূহ ভেদ করতে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল রাষ্ট্রীয় বাহিনী। কিন্তু শহর ও রাজ্য জুড়ে আরো অসংখ্য বাম-প্রগতিশীল বই-বিপণি আক্রান্ত ও বিধ্বস্ত হয়েছে, পদদলিত হয়েছে চিরায়ত সাহিত্য-রাজনীতি-দর্শনের গ্রন্থ, বই বাঁচাতে গিয়ে লাঞ্ছিত ও প্রহৃত হয়েছেন অগণিত প্রতিবাদী মানুষ।
বাংলার বুকে বইয়ের ওপর এরকম আক্রমণ সম্পূর্ণ বেনজির এক ঘটনা। অতীতে স্বাধীন চিন্তায় লাগাম পড়ানোর দৃষ্টান্ত যে নেই একথা বললে সত্যের অপলাপ হবে, বই, নাটক, সিনেমা ইত্যাদি নিষিদ্ধ করার একাধিক উদাহরণ আছে সব জমানাতেই, কিন্তু এরকম নগ্ন ও প্রত্যক্ষ সন্ত্রাস, বইয়ের স্টলে রাষ্ট্রীয় ও দলীয় বাহিনীর এরকম সার্বিক বর্বর আক্রমণ অতীতের যেকোনো জমানাতে অভাবিত ও অকল্পনীয় ছিল।
ফ্যাসিবাদের ধ্বজাধারী, হিটলার-মুসোলিনির সাক্ষাৎ মন্ত্রশিষ্য, বিজেপি-আরএসএস এর বইয়ের ওপর আক্রমণ অবশ্য কোনো নতুন ঘটনা নয়। ২০১৬ সালে কেরালায় বামপন্থী নেতা এ কে গোপালন এর নামাঙ্কিত এক গ্রন্থাগার আরএসএস এর গুন্ডাবাহিনী পুড়িয়ে দিয়েছিল, যা পরে সাধারণ মানুষের অর্থ-সহায়তায় আবার গড়ে তোলা হয়েছে। আসলে অন্যান্য দক্ষিণপন্থী, স্বৈরাচারী দল তথা মতাদর্শের থেকে বিজেপি-আরএসএস অনেকটাই আলাদা, আগমার্কা ফ্যাসিবাদী দল হিসেবে এদের প্রধান প্রকল্পই হলো মানুষের মগজে কারফিউ। চিন্তা-চেতনা-শিক্ষা-সংস্কৃতির সমস্ত পরিসরকে এরা দখল করতে চায় এদের মিথ্যা ও মিথের বিকল্প ন্যারেটিভ দিয়ে। যুক্তি-তর্ক দিয়ে নিজেদের ভিত্তিহীন মিথকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় বলে সন্ত্রাস ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এরা মানুষের চোখের সামনে থেকে সুস্থ মানবিক চেতনা ও আদর্শের সমস্ত অভিজ্ঞান মুছে ফেলতে চায়। বই-স্টলের সংঘর্ষ তাই দুই বিপরীত ন্যারেটিভের সম্মুখ-সমর।
ভারতের বেশির ভাগ অঞ্চলে গৈরিক ফ্যাসিবাদ এই মুহূর্তে বেশ কোনঠাসা, সংঘ-পরিবারের রাজনৈতিক অশ্বমেধের ঘোড়া মুখ থুবড়ে পড়েছে শিবাজী পার্ক থেকে যন্তর- মন্তর এর রণক্ষেত্রে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের দাঁত-নখ বের করে মরণকামড় দিতে উদ্যত হলেও তাদের মৃত্যুঘন্টা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। পশ্চিম ভারত আর গোবলয়ের সাবেক ঘাঁটিতে নিজেদের বিপর্যস্ত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সদ্য দখল করা বাংলাকে সংঘ পরিবার তার নতুন শক্তিকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। মুক্ত, উদার, প্রগতিশীল চেতনা ও মননের গৌরবময় ঐতিহ্য নিয়ে বাঙালির গর্ব ধুলোয় মিশিয়ে সাম্প্রদায়িক আগ্রাসী হিন্দুত্বের ধ্বজা উড়েছে এ রাজ্যের বুকে। ক্ষমতায় আসার পর থেকে ঢেউয়ের মতো একের পর এক আঘাত হানা হয়েছে বাঙালির উদার ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির প্রতিটি পরিসরে। সম্পূর্ণ বন্দেমাতরম গাইবার ফতোয়া, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের larger than life ভাবমূর্তি নির্মাণের তুমুল আয়োজন, স্মরণীয় মুসলিম ব্যক্তিত্বের নামাঙ্কিত রাস্তা, সৌধ ইত্যাদির নাম বদল, আর এ সব ছাপিয়ে গেছে স্কুল কলেজে নরেন্দ্র মোদির জন্মোৎসব পালন উপলক্ষে `নমো-গাথা’ নাটকের বাধ্যতামূলক অভিনয়। প্রত্যেক ক্ষেত্রে শিক্ষক-অধ্যাপক সমাজ, যাঁরা কিনা আমাদের চিন্তা-চেতনার কারিগর আর জ্ঞান-সংস্কৃতি চর্চার পুরোহিত, মুষ্টিমেয় কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে তাঁদের প্রশ্নহীন আনুগত্য গভীর লজ্জা ও হতাশাজনক। রাজ্য সরকারের এই প্রকল্প গুলো ছিল শিক্ষকসমাজের আনুগত্য পরীক্ষা ও আদায়ের একেকটি ধাপ, প্রায় বিনা বাধায় সে কাজে তারা সফল হয়েছে, যা নিশ্চিতভাবেই তাদের বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিয়েছিলো বই-বিরোধী অভিযানে। নমো-গাথা নাটক নিয়ে এমনকি কোনো সরকারি নির্দেশিকা জারি হয় নি, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যক্ষদের সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমের যোগাযোগ আর নাটক অভিনয়ের দিনক্ষণ ইত্যাদির বিশদ তথ্য জানানোর জন্যে গুগল ফর্ম পাঠানো হয়েছিল। সামান্য আত্মসম্মান থাকলে এহেন অলিখিত ফরমান অগ্রাহ্য করা যেত, কিন্তু সাধারণভাবে শিক্ষাজগত জুড়ে নৈতিক ঋজুতার সামান্যতম আভাসও চোখে পড়ে নি। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে এরকম বশম্বদ, প্রতিবাদহীন জড়পিণ্ডে পরিণত করার বেশ অনেকটা দায় নিশ্চয় সদ্য-বিগত তৃণমূলী মাফিয়া-রাজের ওপর বর্তায়, কিন্তু সবটুকু দায় তাদের দিলে ভুল হবে। তার আগের দীর্ঘ সংসদীয় বাম জমানা স্বাধীন চিন্তার বীজ বপন, সাম্প্রদায়িকতার সুপ্ত বিষ নির্মূল করার কাজে ব্যর্থ হয়েছে, ভোটবাক্সের হিসেবের বাইরে প্রসার ঘটাতে পারে নি বামপন্থী চেতনার, যা প্রশ্নহীন আনুগত্যের সম্পূর্ণ বিপ্রতীপ। আনুগত্যের অভ্যাস মেরুদণ্ডে স্থায়ী বক্রতার সৃষ্টি করে, নুয়ে পড়া মাথা রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন নিরপেক্ষভাবে `কর্তার ভূত’ এর নিরাকার ভয়ে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে।
তবে ভরসার কথা এই যে, ভগ্ন বইয়ের দোকান আর পদদলিত, ছিন্নভিন্ন বইয়ের ছবি বোধহয় ঘুমন্ত চেতনার গভীরে অবশেষে আঘাত করতে পেরেছে। অন্তত পুজোর দিনগুলোয় বই বাঁচাতে গণ-প্রতিরোধ এরকম আশা জাগিয়েছে। এই প্রতিরোধে হাতে হাত মিলিয়ে পাশাপাশি লড়েছে সমস্ত বামপন্থী দল নিজেদের ছোটোখাটো মতভেদ দূরে সরিয়ে রেখে, যা সার্বিক বাম গণতান্ত্রিক ঐক্যের জন্যে এক উজ্জ্বল দিশা দেখায়।
“একটুখানি সাহস, …দরকার একটুখানি সাহস। একটুখানি মেরুদন্ড সোজা করে চোখে চোখ রেখে কথা বলা। একটু সাহস যে একটি স্ফুলিঙ্গ, জানেন?” (ব্যারিকেড, উৎপল দত্ত)
সাহসের অগ্নিকণা দাবানল হয়ে নেমে আসুক মিছিলের পথে, ছোট্ট এক টুকরো কালো মেঘ থেকে যেমন জন্ম নেয় আকাশ-কাঁপানো দুরন্ত কাল বৈশাখী, মৃদু আলাপের গভীরে লুকিয়ে থাকা সুর যেমন সহসা গর্জে ওঠে গমক তানের রুদ্রস্বরে।
ফ্যাসিবাদী শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহসী সুনামি এ রাজ্য দেখেছিলো ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের সময়, তার পর SIR বিরোধিতায় পথে নেমেছে ও নামছে মানুষ, তবে বাকি দেশের তুলনায় এখানে এই আন্দোলন এখনো কিছুটা দুর্বল। বাংলা হয়তো এক্ষেত্রে দেশকে পথ দেখাতে পারে নি, কিন্তু সমস্ত দেশের বাম-গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির সঙ্গে পা মিলিয়ে পথে নামুক বাংলার মানুষ, `আর বিলম্ব নয়’…











