উত্তুঙ্গ অভয়া আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ২৮শে অক্টোবর ২০২৪ সিনিয়র চিকিৎসক ও নাগরিক সমাজের উদ্যোগে, নাগরিক সংগঠন গুলির মত বিনিময়ের মাধ্যমে তৈরি হয় অভয়া মঞ্চ। অভয়া আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবার অন্যতম কাণ্ডারি এই মঞ্চ। গত দু বছরে ঘাস্ফুল পদ্মফুল সব ধরণের শাসকের বিরুদ্ধতা সত্ত্বেও, কালচক্রের অমোঘ নিয়মে রাজপথমুখী জনস্রোত গৃহমুখী হবার পরেও অভয়া আর অভয়ারা হারিয়ে যায় নি, আঁধার রাতের মশাল হয়ে তারা আজ ও জেগে আছে পথের লড়াইয়ে, আজ ও অভয়ার বিচারের দাবিতে প্রতিবাদীকণ্ঠ গর্জে উঠছে, রাজ্যের সব অভয়াদের বিচারের জন্য লড়াই চলছে রাজপথ থেকে আলপথে, শহুরে এলিট আন্দোলনের গণ্ডী ছাড়িয়ে এখন গ্রামে মফস্বলে শ্রমজীবী পরিবারের ধর্ষিত মেয়ের জন্যেও বিচারের আওয়াজ উঠছে, – এর পিছনে অভয়া মঞ্চের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জেহাদ, ‘Reclaim the Night and Reclaim the Right’ – রাত দখল আর অধিকার প্রতিষ্ঠার আহবান শহর নগর গ্রামে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে দেওয়া অভয়া মঞ্চের অন্যতম লক্ষ্য। অভয়া মঞ্চের অন্যতম প্রধান দাবী হল নারী সুরক্ষা। এই নারী সুরক্ষার প্রশ্নে অভয়া মঞ্চ অবিরাম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং যাবে। নিরাপত্তাহীনতায় জয়নগর যাত্রাগাছি জয়গাঁও উন্নাও হাথরস কাঠুয়া , রাজার হাট, ব্যারাকপুর, চন্দননগর, কোন্নগর, দত্তপুকুর, ক্যানিং, বারুইপুর, গাইঘাটা এক হয়ে যায় রাজধানী শহরের নামী সরকারী হাসপাতলের সঙ্গে। এই ভাবেই আর জি করের আন্দোলন মিশে যায় প্রত্যন্ত জেলা ও গ্রামের আন্দোলনে।
গঠন মূলক মত বিনিময়ই অভয়া আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারণা ভেঙ্গে ফেলে নতুন নির্মাণের জন্য এই দু’বছরে তিনটি শিক্ষা শিবির আয়োজন করেছে অভয়া মঞ্চ। ১ ডিসেম্বর ২০২৪ নারী ও প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের অধিকার লিঙ্গসাম্য রাজনীতি নিয়ে আয়োজিত সফল শিক্ষা শিবিরের পর ২০ ডিসেম্বর ২০২৪ মহাবোধি সোসাইটি হলে অনুষ্ঠিত হয় স্বাস্থ্যের অধিকার নিয়ে অভয়া মঞ্চ আয়োজিত দ্বিতীয় শিক্ষা শিবির। ২৯শে জুন ২০২৫ মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অভয়া মঞ্চের তৃতীয় শিক্ষাশিবির অনুষ্ঠিত হয়।
অভয়া মঞ্চের উদ্যোগে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যেমন খিদিরপুর, বোলপুর, জলপাইগুড়ি, ১৬ বিঘা বস্তি, সোনারপুর প্রভৃতি জায়গায় নিয়মিত আয়োজন করা হয়েছে “অভয়া ক্লিনিক” নামক স্বাস্থ্য শিবিরের। কেন্দ্রীয় কর্মসূচি ছাড়া বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের অসংখ্য কর্মসূচি হয়েছে গত দু’বছরে যেখানে মঞ্চের সদস্য এবং বহু সাধারণ প্রতিবাদী মানুষ অংশ নিয়েছেন।
অভয়া মঞ্চ এবং অভয়া আন্দোলন এক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় ২০২৬ এর নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণার পর। এই নির্বাচনে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে পানিহাটি কেন্দ্র। যদিও নির্বাচনের আগে সাত আট মাসের ঘটনা ও রাজনীতির গতিপ্রকৃতি দেখলে বোঝা যায় অভয়া হত্যাকে তুরুপের তাস করে বজরংপন্থীদের বিজয় প্রায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে গিয়েছিল। অধরা বিচারের আশায় গেরুয়া ধারণ করলেন অভয়ার মা – পানিহাটি কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী হলেন শ্রীমতি রত্না দেবনাথ । আপাত অর্থে এ এক বিরল সংকট – সন্তানহারা পিতামাতা অসহায় ভাবে ঘুরছেন এক দরজা থেকে আরেক দরজায়। গেরুয়া রাজ্যে নারীনির্যাতনের ভয়াবহ ইতিহাস আর পরিসংখ্যান অজানা না থাকলেও ক্ষমতা না হলে বিচার পাওয়া যাবেনা এই সত্যকে অমোঘ বিবেচনা করে ৫৬ ইঞ্চি আর তার সহকারীর (যাদের টিকির দেখাও পাননি তাঁরা চেষ্টা করেও) পদতলে আত্মসমর্পন করলেন রত্না দেবনাথ এবং শেখর দেবনাথ। যে ব্যবস্থায় বিচার পাবার পূর্বশর্ত ক্ষমতা সেখানে গণতন্ত্র চরম ব্যর্থ। গণতান্ত্রিক ব্যর্থতাকে কার্যত স্বীকার করে নিয়েই সহানুভূতি ভোটে পানিহাটি কেন্দ্রে জয়ী হলেন শ্রীমতী রত্না দেবনাথ। অভয়া আন্দোলনের প্রতিবাদী জোয়ারে পানসি ভাসিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় এল বিজেপি। এটা তাৎপর্যপূর্ণ যে প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে শ্রীমতি দেবনাথের আক্রমণের মূল লক্ষ্য অভয়া আন্দোলনের সংগঠক এবং বামপন্থী কর্মীরা। তৃণমূলের বিরুদ্ধে দাগা কামানের চেয়েও বেশি শক্তিশালী কামান দাগতে চাইছেন তাদের বিরুদ্ধে যারা বিচারের আন্দোলনটা কে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। এই হত্যা এবং প্রমাণ লোপাটের সঙ্গে তৃণমূল সরাসরি যুক্ত এবং , সুয়ো মোতো আর সি বি আই এর মুষিক প্রসব বিজেপির অঙ্গুলি হেলনে- এ কথা এখন সবাই জানে। তবু আক্রমণের নিশানা হলেন জুনিয়র ডাক্তার, অভয়া মঞ্চ এবং বামপন্থীকর্মীরা যারা তৃণমূল এবং বিজেপি বিরোধী, যারা দলীয় পতাকা আর পরিচয় ছাড়াই অভয়ার লড়াইয়ে আছেন পুরোদস্তুর। আসলে রাষ্ট্রের ক্ষমতার চাপে অসহায় শ্রীমতি দেবনাথ, হয়তো অসহায়তার কথা উপলব্ধি না করেই আক্রমণ সাজাচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে যারা বিচার আনতে বদ্ধপরিকর। বিচার আনার প্রচেষ্টাতে জল ঢেলে, অভয়া মঞ্চকে ঘিরে যে গণ আন্দোলন গড়ে উঠেছে গত দু’বছরের বেশি সময় ধরে সেই আন্দোলনকে সমূলে উৎপাটিত করার চেষ্টাতেই বিজেপির পানিহাটির চাল। যাদের অঙ্গুলি হেলনে বিচার অধরা হল, যাদের কাছে বিচারের জন্য সাক্ষাৎ ভিক্ষা করেও প্রত্যাখ্যাত হলেন, অসহায় মা বাবা সেই ক্ষমতার স্তম্ভকে আঁকড়ে ধরেই বলীয়ান হতে চাইছেন! আসিফা, বিলকিস বানো এবং আরো অসংখ্য নির্যাতিত মেয়ের রক্তে রাঙা হাতকে আশ্রয় করেছেন অভয়ার বিচারের জন্য।
নির্বাচনী ফল ঘোষণার ঠিক দু’মাস পর ২০২৬ এর ৪ঠা জুলাই বারুইপুরের সূর্যপুরে একটি নয় বছরের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাবালিকাকে গণধর্ষণ করে খুন করা হয়। পুলিশে অভিযোগ জানানোর পরেও পুলিশ কোন পদক্ষেপ নেয়নি বলে পরের দিন ৫ তারিখ গ্রামবাসীরা নিজেরাই সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অপরাধীদের ধরিয়ে দেয় এবং একটি পুকুর থেকে মৃতদেহ উদ্ধার করে। কিন্তু স্থানীয় বিজেপি নেতার নির্দেশে পুলিশ অভিযুক্ত চারজনকে ছেড়ে দেয়। জানা যাচ্ছে অভিযুক্ত চারজন শাসক দলের ঘনিষ্ঠ। এরপর ক্ষুব্ধ জনতার গণ পিটুনিতে চারজন অভিযুক্তদের মধ্যে ইন্দ্রজিৎ তাঁতি নামে একজন মারা যায়। এই ঘটনাকে সামনে রেখে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী সাম্প্রদায়িক উস্কানিমুলক মন্তব্য করেন। এর তিন দিন পর, ৮ ই জুলাই অন্যতম অভিযুক্ত প্রভাস মন্ডল, যে তদন্তের জন্য জরুরি তথ্য দিয়ে রাজসাক্ষী হতে রাজি ছিল তাকে গভীর রাতে নির্জন জায়গায় গুলি করে মেরে ফেলা হয়। সরকারের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে বলা হয় এনকাউন্টার ডেথ! ১২ জুলাই রাতে বারুইপুরে প্রতিবাদী সি পি আই এম নেতা, শিক্ষক লাহেক আলিকে ২৭ টি ধারা দিয়ে গ্রেফতার করা হয়। লাহেক আলিই এই নির্মম খুন ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত করছিলেন!
তৃণমূল বিরোধী হাওয়াকে কাজে লাগিয়ে, অভয়ার বিচারের দাবিকে নির্বাচনী প্রচারে সামনে রেখে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু যে দল অন্য রাজ্যগুলিতে ধর্ষিতাকে রক্ষা না করে ধর্ষকদের মাথায় সুরক্ষার ছাতা ধরে, যাদের রাজ্যে হাথরস, উন্নাও, কাঠুয়ার নির্যাতিতাদের বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে, সে দল যে নারী সুরক্ষার পরিবর্তে আধিপত্যবাদী পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠা করবে এটা অজানা ছিল না। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই আজ সমাজে ধর্ষণ এক নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সমস্ত বয়সের নারী ট্রান্স ক্যুয়ার বা প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষেরা ধর্ষকামী অত্যাচারের শিকার। নতুন সরকার আসার পর কয়েক মাসে অসংখ্য ধর্ষণের খবর এসেছে সংবাদ মাধ্যমে। খবরে আসেনি এমন ঘটনাও ঘটেছে নিশ্চয়।
অভয়া মঞ্চ স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদ বিরোধী মঞ্চ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল নির্বাচনে পানিহাটি দামামার অভয়া মঞ্চ বিজেপি প্রার্থী রত্না দেবনাথের প্রার্থী হবার সিদ্ধান্ত নিয়ে কোন মন্তব্য করেনি, অভয়া মঞ্চের বিরুদ্ধে পরিচালিত এবং পরিকল্পিত কোন আক্রমণের জবাব অভয়া মঞ্চ দেয়নি। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ঘটনায় বিধায়ক রত্না দেবনাথের অমানবিক এবং অসংলগ্ন প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা অভয়া মঞ্চের দায়িত্ব নয়, এর সঙ্গে শাসক দল বিজেপির সম্পর্ক থাকতে পারে কিন্তু অভয়া আন্দোলনের কোন সম্পর্ক নেই। অভয়া মঞ্চ মনে করে রত্না দেবনাথ আর জি করের নিহত ধর্ষিত চিকিৎসকের মা, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাঁর অবস্থান বিরোধী শিবিরে হলেও নির্যাতিতার মা’র প্রতি মঞ্চের সহমর্মিতা অটুট। কিন্তু অভয়া আজ আর কোন বিশেষ পারিবারিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। অভয়া আন্দোলন গড়ে উঠেছিল স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষে, অভয়া নামকরণ এক প্রতিবাদী চিকিৎসক ডক্টর তাপস ফ্রান্সিস বিশ্বাসের। এই আন্দোলন কোন ব্যক্তি বা পরিবারের দ্বারা পরিচালিত হতে পারেনা। এই আন্দোলন প্রতিবাদী জনতার। রাজনৈতিক পালাবদল অভয়া অভয়া মঞ্চকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে পারেনি। নারীনির্যাতনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে অভয়া মঞ্চ।
অভয়া হত্যা মামলার বিচার নিয়ে কেন্দ্র রাজ্য মিলে ট্র্যাপিজের খেলা চলছে। suo moto cognizance দিয়ে সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে গিয়ে জল ঢালার চেষ্টা, CBI এর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অকর্মণ্যতা, জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস আর প্রতিবাদী মানুষের লড়াই এ মামলা সুপ্রিম কোর্ট থেকে হাই কোর্টে আনা গেলেও শুনানী শেষ না করেই ডিভিশন বেঞ্চে পাঠিয়ে দেওয়া এবং আইনী ব্যবস্থার দীর্ঘসুত্রিতা – সব মিলিয়ে আইনী লড়াই এ এই মুহূর্তে খুব আলো দেখা যাচ্ছেনা। এই অন্ধকার কে সরাতে পারে গণ আন্দোলনের জোয়ার। কোর্টে সহজে বিচার হয়ে যাবে আর কোর্ট ই শেষ কথা বলে দেবে – এই বিশ্বাসে অভয়া মঞ্চ তৈরি হয়নি। ‘বাধা যত কঠিন হবে লড়াই তত তীব্র হবে’ – এই প্রত্যয় থেকেই গড়ে উঠেছে অভয়া মঞ্চ।
শুধু সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন হলেই ধর্ষণ বা নারীনিগ্রহ বন্ধ হয়ে যাবে এমন নয়। ক্ষমতাতন্ত্রের আমূল পরিবর্তন ছাড়া নারী সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা সম্ভব নয়। যে সংস্কৃতি নারী কে ভোগ্য পণ্য ভাবতে শেখায় তার উৎপাটন ছাড়া ধর্ষণ রোধ করা সম্ভব নয়। সামাজিক দুর্নীতি আর লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সংঘর্ষের পাশাপাশি নতুন চিন্তা ও সংস্কৃতির জন্ম – এই ভাবেই নির্মাণের পথে এগিয়ে চলেছে অভয়া মঞ্চ। নির্বাচনে দেবনাথ পরিবারের শিবির বদল এবং নতুন সরকার গঠন অভয়া মঞ্চকে দিশাহীন করতে পারেনি। এই সময়েই বারুইপুর,দুর্গাপুর, নিমতা, ব্যারাকপুর, গরফা, উত্তরপাড়া , হাওড়া, যাদবপুর, গড়িয়া, ঝাড়গ্রাম এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে নিরলস লড়াই করে চলেছে, লিঙ্গ সাম্যের আন্দোলনে এ অগ্রণী ভুমিকা নিচ্ছে অভয়া মঞ্চ।
অভয়ার ন্যায়বিচার, ভয়ের রাজনীতির অবসান, স্বাস্থ্যের অধিকার এবং লিঙ্গ সাম্যের দাবি – অভয়া আন্দোলনের এই মূল দাবিগুলি কে নাগরিক পরিসরে প্রসারিত ও শক্তিশালী করতে অভয়া মঞ্চ দৃঢ়সংকল্প। সার্বজনীন স্বাস্থ্যের দাবি এবং সংঘর্ষের পাশাপাশি নতুন চিন্তা ও পরিকাঠামোর নির্মাণ – অভয়া আন্দোলনের অগ্রগতি সার্বজনীন স্বাস্থ্যের আন্দোলনের সঙ্গে গভীর ভাবে সম্পর্কযুক্ত। লিঙ্গসাম্যের আন্দোলন সমাজের সামাজিক অর্থনৈতিক বৈষম্যবিরোধী অন্যান্য আন্দোলনগুলির থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। চিকিৎসা দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে শহীদ হয়েছেন চিকিৎসক অভয়া। তাই সার্বজনীন স্বাস্থ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই এর শরিক অভয়া মঞ্চ। এর পাশাপাশি শিক্ষা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার সংগ্রামে সহযোগী শক্তি হিসাবে থাকতে প্রস্তুত অভয়া মঞ্চ।পদযাত্রা, বিবৃতি, সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী একাধিক কর্মসূচি নিয়েছে মঞ্চ। শুধু বিবৃতি নয়, রাস্তায় নেমে বিজেপি সরকারের গৈরিকীকরণ নীতির তীব্র বিরোধিতা করছে অভয়া মঞ্চ।
অ্যাকাডেমির দেওয়ালে গেরুয়া রং এর প্রলেপ ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান গেরুয়া তাণ্ডবের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে অভয়া মঞ্চের যোদ্ধারা উল্লেখযোগ্য ভুমিকা নিয়েছেন।
ককরোচ দলের কেন্দ্রীয় শিক্ষা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের সংহতিতে কলকাতায় ও উত্তরবঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে অভয়া মঞ্চ। ২০২৬ এর চরম অগণতান্ত্রিক ট্রান্সজেন্ডার আইন বিরোধী লড়াই এ সক্রিয়ভাবে আছে অভয়া মঞ্চ। জীবন ও জীবিকার সংগ্রামে হকার উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনে শামিল হয়েছেন অভয়া মঞ্চের সদস্যরা।
রাজ্যে দেশে এক ঘোরতর শ্বাসরোধকারী সন্ত্রাস। রাজ্যের বিজেপি সরকারের হাতে ধর্মের কুঠার, কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের হাতে SIR এর মুষল। ফ্যাসিবাদের রথ এগিয়ে চলেছে।
আইন কানুন নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে সরকার এবং প্রশাসন। সরকারের বিরুদ্ধে সামান্যতম প্রতিবাদ করলেই গ্রেফতার করা হচ্ছে বহু নিরপরাধ মানুষকে। বাঙ্গালির শারদোৎসবে সনাতনী উৎসবের জয়ডঙ্কা বেজেছে। প্রশাসনিক ব্যর্থতার বলি হয়েছে ১৯টি প্রাণ। গণতান্ত্রিক বামপন্থী গোষ্ঠীর বুকস্টল ভাঙ্গাই ছিল পুজোয় রাজ্য প্রশাসনের প্রধান কাজ।
এই ক্রান্তিলগ্নে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির সংহত ঐক্য ছাড়া বিজেপির জয়রথ ঠেকানো অসম্ভব। জার্মানি ইতালির ইতিহাস দেখিয়েছে ফ্যাসিবিরোধী গণতান্ত্রিক শক্তির অনৈক্য আর দুর্বলতা কী ভাবে নাৎসিবাদ আর ফ্যাসিবাদের পথ প্রশস্ত করেছে। সাম্প্রতিক বাংলা তথা ভারতে ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য এই সময়ের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পর গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা মঞ্চ হিসাবে অভয়া মঞ্চের দায়িত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। লিঙ্গসাম্য ও সচেতনতার প্রসার এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যের সংগ্রামে অগ্রণী যোদ্ধা অভয়া মঞ্চ। অভয়া মঞ্চ ঐক্যে বিশ্বাসী। ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে লিঙ্গসাম্য ও স্বাস্থ্যের অধিকাররক্ষা মঞ্চ হিসাবে নিজেকে সংহত ও প্রসারিত করতে চায় অভয়া মঞ্চ। তাৎক্ষণিক আবেগে এই মঞ্চ তৈরি হয়নি। তাই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন অথবা শিবিরবদল অভয়া মঞ্চের আন্দোলনকে থামিয়ে দিতে পারবে না । লিঙ্গবৈষম্য থেকে লিঙ্গ সাম্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে অর্থনৈতিক সাম্যের দিকে যাত্রাই অভয়া মঞ্চের প্রতিজ্ঞা– “আমাদের যেতে হবে দূরে, বহুদূরে…“










