বেশ কিছুদিন অসুস্থ থাকার পর আজ রাত ২টা ৩০ মিনিটে বিদ্যাসাগর নিকেতন, বিধান নগরে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তার প্রয়াণে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তবুও কিছু মানুষের মৃত্যু শুধু শোকের নয়, তাদের জীবন ও সংগ্রামকে ফিরে দেখারও মুহূর্ত। ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তেমনই একজন মানুষ—যার দীর্ঘ সংগ্রামী জীবন, মানবিক সংবেদনশীলতা এবং নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার আমাদের কাছে চিরকাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
বেলঘরিয়া হাই স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে তিনি আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়তে ভর্তি হন। তখন সত্তরের দশক। বাংলার রাজনৈতিক আকাশ উত্তাল। নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ছে ছাত্র-যুবসমাজের মধ্যে। শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হয়ে দলে দলে তরুণ যোগ দিচ্ছেন নবগঠিত সিপিআই(এমএল)-এ। সেই উত্তাল সময়েই ডাক্তারি পড়তে পড়তে ভাস্কর হয়ে উঠলেন একজন কমিউনিস্ট বিপ্লবী।
তার রাজনীতি শুধু তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে কাছ থেকে জানা, তাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়া এবং তাদের সংগ্রামের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার তাগিদ তাকে নিয়ে গিয়েছিল টেক্সম্যাকো ও মহিনী মিলের শ্রমিক বস্তিতে। শ্রমিক পরিবারের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল তার নিবিড় সম্পর্ক। সেই সময়ের বহু শ্রমিক ও তাদের পরিবারের যে সদস্যরা আজও বেঁচে আছেন, তাদের স্মৃতিতে ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ও মুখ আজও অমলিন।
সত্তরের দশক ছিল রক্তাক্ত রাজনৈতিক সংঘাতের সময়। সিপিআই(এম) ও নকশালপন্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ ছিল প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। সেই সময় দুই দলেরই বহু তরতাজা ছাত্র-যুবক প্রাণ হারিয়েছেন। সেই উত্তাল সময়েই আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন বিপিএসএফের (তখনও এসএফআই গঠিত হয়নি) আক্রমণে ভাস্কর গুরুতর জখম হয়েছিলেন। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন তিনি।
এরপর এল ১৯৭২ সাল। ততদিনে আন্দোলনের বহু নেতা-কর্মী শহিদ হয়েছেন, অনেকে কারারুদ্ধ। সেই বছরই স্পেশাল ব্রাঞ্চের হাতে গ্রেফতার হন ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। লকআপে তার ওপর চালানো হয়েছিল অকথ্য নির্যাতন। সেই নির্যাতনের চিহ্ন শরীরে দীর্ঘদিন বহন করতে হয়েছে। অবশেষে ১৯৭৭ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর, বামফ্রন্টের রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, পাঁচ বছর কারাবাসের পর অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দীদের মতো ভাস্করও জেল থেকে মুক্তি পায়।
জেল থেকে বেরিয়ে সে সিপিআই(এমএল)-এর কোনও গোষ্ঠীর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেনি। নকশালপন্থী আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ বিভাজন তাকে কতটা হতাশ করেছিল, কিংবা বাম রাজনীতির প্রতি তার অনাস্থা কতটা তৈরি হয়েছিল—তার উত্তর হয়তো তার নিজের কাছেই ছিল। কিন্তু তার রাজনৈতিক ভাবনার পরিবর্তন কখনও তাকে মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। বরং এক নতুন পরিসরে তিনি শুরু করেছিলেন আর এক লড়াই—মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও মুক্তির লড়াই।
সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হয়ে উঠল তার জীবনের অন্যতম ব্রত। যৌনকর্মীদের অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি নিজেকে নিয়োজিত করলেন। তাদের মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকার, সম্মান ও স্বীকৃতির প্রশ্নে তিনি ছিলেন আন্তরিক ও আপসহীন। সমাজের চোখে যারা প্রান্তিক, যাদের কথা বলার মানুষ কম, তাদেরই আপনজন হয়ে উঠেছিলেন ভাস্কর।
একই সঙ্গে বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদী চিন্তার প্রসারে তিনি হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে প্রকাশ করতে শুরু করেছিলেন ‘উৎস মানুষ’ পত্রিকা। একসময় পত্রিকাটি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানচেতনা, যুক্তিবোধ ও কুসংস্কারমুক্ত মনন গড়ে তোলার কাজে এই উদ্যোগ হয়ে উঠেছিল এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
স্বাস্থ্য আন্দোলনের সূচনাপর্বেও তিনি যুক্ত হয়েছিলেন ড্রাগ অ্যাকশন ফোরামের সঙ্গে। জীবনের শেষ পর্বে তিনি যুক্ত ছিলেন নদিয়ার মদনপুরে মানসিক স্বাস্থ্য ও মানসিক রোগীদের নিয়ে কাজ করা ‘মানস’ উদ্যোগের সঙ্গে। পরিবেশ আন্দোলন থেকে শুরু করে পথশিশুদের নিয়ে কাজ—সমাজের নানা ক্ষেত্রে তার সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। মানুষের যন্ত্রণা তাকে বিচলিত করত, মানুষের অসহায়তা তাকে টেনে নিয়ে যেত কাজের ময়দানে। যেখানে গিয়েছেন, সেখানেই নিজের আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও আপন করে নেওয়ার ক্ষমতায় মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনের এই দীর্ঘ পথচলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের জন্য লড়াই করার পথ একটিই নয়।
রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সাংগঠনিক পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়েও মানুষের মুক্তি, মর্যাদা ও অধিকারের প্রশ্নে আজীবন নিজেকে নিয়োজিত রাখা যায়। বিপ্লবের স্বপ্ন তার জীবনে এক নতুন মানবিক লড়াইয়ের রূপ নিয়েছিল। সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রেও ছিল মানুষ—বিশেষত সেই মানুষগুলি, যাদের সমাজ বারবার অবহেলা করেছে, দূরে ঠেলে দিয়েছে।
আজ তার প্রয়াণে অসংখ্য নিপীড়িত নারী-পুরুষ, শিশু এবং তার সান্নিধ্যে আসা অগণিত মানুষ হারালেন এক আপনজনকে। আমরা হারালাম এমন একজন মানুষকে, যিনি নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়ে গিয়েছেন—সংগ্রাম শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য নয়, মানুষের জীবনকে আরও মর্যাদাপূর্ণ, মুক্ত ও মানবিক করে তোলার জন্যও।
একটি জীবন থেমে গেল। কিন্তু তার স্মৃতি, তার কাজ, মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস থেমে থাকবে না। আগামী দিনের সংগ্রামী মানুষ, মানবতাবাদী কর্মী এবং নিপীড়িত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তার জীবন বারবার ফিরে আসবে প্রেরণা হয়ে।
কমরেড ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, আপনার সংগ্রামী জীবন আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের চেতনায়, আমাদের লড়াইয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।
কমরেড ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, লাল সেলাম।
নবেন্দু দাশগুপ্তের ফেসবুক শ্রদ্ধার্ঘ










