১৯৮৪ সালে ডিসেম্বর মাসে ভোপালের ইউনিয়ন কার্বাইড এর কারখানা থেকে লিক করে বেরিয়ে আসে মিখাইল আইসোসায়ানেট নামের বিষাক্ত গ্যাস। হাইড্রোজেন সায়ানাইড এর থেকে ৫০০ গুন শক্তিশালী এই গ্যাসের প্রকোপে কত হাজার মানুষ মারা গেছিলেন তার কোনো হিসেব নেই। মিউনিসিপ্যালিটি ১৫,০০০ শবদেহ সরিয়ে ছিল। তৎকালীন কংগ্রেস সরকার ওই সংস্থার কর্ণধার কে প্রাইভেট প্লেনে ভারত ছেড়ে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে।
ডাঃ পুণ্যব্রত গুণ ভোপালে প্রথম যান ১৯৮৫-র ২রা জুলাই, জ্যোতির্ময় সমাজদারের সঙ্গে। ঠিক এক মাস আগে ৩রা জুন ইউনিয়ন কার্বাইড প্রাঙ্গণে ‘গণ-হাসপাতাল’-এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপণ করেছিল জনস্বাস্থ্য সমিতি। গ্যাসপীড়িতদের দুটি সংগঠন—জাহরিলী গ্যাস কান্ড সংঘর্ষ মোর্চা, নাগরিক রাহত আউর পুনর্বাস কমিটি, বোম্বের ট্রেড ইউনিয়নগুলির ট্রেড ইউনিয়ন রিলিফ ফান্ড এবং ইউনিয়ন কার্বাইড কর্মচারী সংঘ মিলে জনস্বাস্থ্য সমিতি গড়ে তোলেন।
ভোপালের গান্ধী মেডিকাল কলেজের ফরেন্সিক বিভাগের প্রধান ডা হীরেশ চন্দ্র ’৮৪-র ৩রা ডিসেম্বরই গ্যাসকান্ডে মৃতদের শবব্যবচ্ছেদ করে সিদ্ধান্তে আসেন—সায়ানাইড বিষ আছে গ্যাস-আক্রান্তদের শরীরে। তাঁর সুপারিশ ছিল জীবিত গ্যাস-আক্রান্তদের থায়োসালফেট দেওয়া হোক। ইউনিয়ন কার্বাইড কর্পোরেশনের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া-স্থিত কারখানার প্রধান মেডিকাল অফিসার ৪ঠা ডিসেম্বর এক টেলেক্স-বার্তায় বিষ-গ্যাসের প্রতিষেধক হিসেবে সোডিয়াম থায়োসালফেট ব্যবহার করতে বলেন। ৮ই ডিসেম্বর বিখ্যাত জার্মান বিষবিদ ম্যাক্স ডন্ডেরার-এর মত ছিল একই রকম। সে সময় ভারতে সোডিয়াম থায়োসালফেট তৈরি হত না, তাই তিনি রেখে গেলেন ১০হাজার এম্পুল ঐ ইঞ্জেকশন। বিরোধিতা করেন ভোপালের সরকারী চিকিৎসকরা, নানাভাবে যাঁরা কার্বাইডের প্রসাদধন্য। থায়োসালফেটে গ্যাস-পীড়িতদের অবস্থার উন্নতি হওয়া মানে বিষ-গ্যাস মিশ্রণে সায়ানাইডের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়ে যাওয়া—এতে কার্বাইডের criminal responsibility অনেকগুণ বেড়ে যায়, অনেক বেশি ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয় কার্বাইড।
’৮৫-জানুয়ারী, ফেব্রুয়ারী, এপ্রিলে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকাল রিসার্চ-এর বারবার সুপারিশেও টলে না সরকারী স্বাস্থ্য-দপ্তর। তাই গ্যাসপীড়িতের নিজস্ব উদ্যোগে জন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে থায়োসালফেট দেওয়া। এ কাজে উদ্যমী ছিলেন কলকাতা মেডিকাল কলেজে ডাঃ গুণের পরের ব্যাচ, তখন যাঁরা ইন্টার্ন। ইন্টার্নশিপ থেকে ছুটি নিয়ে ২-৩ জনের দলে এসে তাঁরা কাজ করতে লাগলেন। দিনে প্রায় দেড়শ’ জনকে ইঞ্জেকশন দেওয়া হতে থাকল, রোগীরা উপকার পেতে থাকলেন, কার্বাইডের বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড় হতে থাকল। হত্যাকারী কার্বাইড শাস্তি পায়নি, অথচ আক্রমণ নেমে এল জন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ওপর। ২৪শে জুন রাতে ডাক্তার-সহ ৩১জন স্বাস্থ্যকর্মী গ্রেপ্তার হলেন, কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হল, স্বাস্থ্য-দপ্তর কেন্দ্রে সোডিয়াম থায়োসালফেট সরবরাহ বন্ধ করে দিল।
এই পর্যায়েই ডাঃ গুণের প্রথম ভোপাল যাওয়া সে সময় উনি হাউসস্টাফশিপ করছেন। এর পর আগস্টে হাউসস্টাফশিপ শেষ। ২১শে আগস্ট দ্বিতীয়বার উনি গেলেন সঙ্গে দশদিনের জন্য ডা দেবাশিস চক্রবর্তী। স্বাস্থ্যকেন্দ্র নতুন করে খোলা হল ২৫শে আগস্ট। ২৮শে আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে নির্দেশ দিলেন জন স্বাস্থ্য কেন্দ্রকে থায়োসালফেট সরবরাহ করতে।
পরবর্তী কালে ভোপাল ইউনিয়ন কার্বাইড গ্যাস বিপর্যয়ের ৩৪তম বার্ষিকীতে দুর্ঘটনার উত্তরজীবীদের চারটি সংগঠন সাংবাদিক সম্মেলনে অভিযোগ করেন যে ভারত সরকার ওইসব ক্রিমিনাল কর্পোরেটদের আরো বেশি উৎসাহ উদ্যম এর সাথে রক্ষা করছে এবং ভিকটিমদের প্রতি আরো বেশি উদাসীন হয়ে পড়েছে যেদিন থেকে মাননীয় মোদীজি প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেছেন।
সংগঠনগুলি বলে যে মোদীজি যখন ২০০৮ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তখন গুজরাট কেমিক্যালস এর সাথে ইউনিয়ন কার্বাইড এর বর্তমান মালিক ডাও কেমিক্যালস গাঁটছড়া বেঁধে কারখানা খোলার চেষ্টার দিন থেকেই ওদের সাথে মধিজির “বিশেষ সম্পর্ক” আছে। আমেরিকা দর্শনের সময় ২০১৫ সালে মোদীজি ওই ডাও কেমিক্যালস এর সিইও কে বিশেষ ডিনার ও ফটো সেশনে আমন্ত্রণ করেন।
‘ভোপাল গ্যাস পীড়িত মহিলা কর্মচারী সংঘ’ এর সভাপতি রশিদা বিই বলেন “আগামী দু মাসের মধ্যে ডাও- দুপন্ট ট্রাইফারকেশন মধ্যে দিয়ে ইউনিয়ন কার্বাইড এর অবলুপ্তি ও অদৃশ্য হয়ে যাওয়া আটকাতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এখনো অবধি কোনোরকম পদক্ষেপ নেয় নি। ২০১৪ সালের মে মাস থেকে ডাও কেমিক্যালস কে ভোপাল জেলা আদালতের পাঠানো সমন উপেক্ষা। করা চলছে।
‘ভোপাল গ্যাস পীড়িত মহিলা পুরুষ সংঘর্ষ মোর্চার সভাপতি নবাব খান অভিযোগ করেন “সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ইউনিয়ন কার্বাইড এর কারখানা থেকে লিক করা গ্যাস এর ফলে এখনো মানুষ অসুস্থ হচ্ছে ও মারা যাচ্ছে কিন্তু ভোপাল পীড়িতদের মেডিক্যাল রিহ্যাবিলিটেশন এর জন্য সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া সুপারিশগুলির ৮০% এখনো কার্যকর করা হয় নি। ওই টাকা চলে যাচ্ছে রাস্তা বানাতে, পার্ক তৈয় করতে”
‘ভোপাল গ্রূপ ফর ইনফরমেশন এন্ড একশন’ এর রচনা ধীঙরা বলেন ” কংগ্রেস বা ভাজপা, কোনো সরকারই গত আট বছরে আর্জেন্ট শুনানির জন্য কোনো আর্জি দাখিল করেনি এবং ১.২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবিতে জমা দেওয়া কিউরেটিভ পিটিশন সুপ্রিম কোর্টে এক ইঞ্চিও এগোয় নি। এটা পরিষ্কার যে সরকার আমেরিকান করপোরেশনগুলির স্বার্থ রক্ষার জন্য সবরকম ভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে।
বিখ্যাত ডাক্তারি ম্যাগাজিন ল্যানসেট এর দূষণ ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কমিশনের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর প্রথম পাঁচটি কারণের মধ্যে শিল্প দূষণ কে দায়ী করা হয়েছে। “ভোপালের মতো শিল্প দূষণের ৯০% এর জন্য দায়ী হচ্ছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য এর প্রতি কর্পোরেট দুনিয়ার ক্রিমিনাল উদাসীনতা। দূষণ কমাতে গেলে তাকে প্রকৃত নামে সম্বোধন করতে হবে ‘কর্পোরেট ক্রাইম’ এবং সেইভাবেই এর মোকাবিলা করতে হবে।”
কাল আমাদের স্বাধীনতা দিবস। আজ মধ্যরাতে ডাঃ গুণের নেতৃত্বে অভয়া মঞ্চের ডাকে রাত দখল কর্মসূচি আছে সোশ্যাল ক্রাইমের বিরুদ্ধে। এর আগেই ডাঃ গুণ পুলিশ প্রশাসনের হেনস্থার শিকার। যেমন তাকে বহুদিন আগে ভোপালে হতে হয়েছিল। তাতে উনি দমে যান নি। উনি সাহসী মানুষ, উনি অভ্যস্ত কর্পোরেট ক্রাইম ও সোশ্যাল ক্রাইমের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে লড়তে।
কাল নানান জায়গা থেকে দেওয়া হবে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ। জানি না সেই ভাষণে কি থাকবে।আদৌ আশা করি না এমন কিছু সাহসী বক্তব্য থাকবে যা স্বাধীন ভারতের সাহসী নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ করবে। একটা নয়া উপনিবেশবাদের আধিপত্যের অংশীদার হিসেবে কেন্দ্র বা রাজ্যের শাসক শ্রেনীর বর্তমান মুহূর্তের একমাত্র কাজ তো ডাঃ গুণের মতো মানুষজনের সাহস এর প্রকাশকে দমিয়ে রাখা।
রাত দখলের কর্মসূচির মধ্যে অভয়া আন্দোলনের আয়োজকদের কাছে অনুরোধ আজ মাঝরাতে কোথাও ডাঃ গুণ, পূন্যব্রত গুণ, আমাদের সকলের প্রিয়, সকলের শ্রদ্ধার পূণ্যদা’র হাত ধরে তোলা হোক আমাদের তেরঙ্গা পতাকা। আমাদের মতো ভীতু মানুষজনের কাছে ওই পতপত করে ওড়া পতাকাটা হয়ে উঠুক সাহসের শেষ নিশান, প্রতিবাদের শেষ প্রতীক।












দারুন লেখা। সত্যিই এই ক্রিমিনাল উদাসীনতা।
শহরে, রাজ্যে সর্বত্র। এটাই ছড়িয়ে সকল মননেও।
বিশেষ এই প্রাদেশিক শহরগুলোয়। কলকাতা র মতোন প্রাণচাঞ্চল্য আর কোথায়! কলকাতার মতো প্রতিবাদী।তবে এই জায়গাটাও এই কলকাতাও আস্তে আস্তে নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে মোদী বিভীষিকা দিয়ে।