এই আন্দোলনে আমার একমাত্র পরিচয় হোলো –
‘একটি মাথা, দুটি পা,
যেথা বিপ্লব সেথা যা।’
আমার মতন আরো অনেক আপাত পরিচয়হীন সহমর্মী মানুষ এক বুক আবেগ নিয়ে সুবিচারের দাবীতে এই অভূতপূর্ব জনজাগরণে শামিল হয়েছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে “জাস্টিস ফর অভয়া”র অর্থ এখন আর শুধুমাত্র এই নৃশংস খুন-ধর্ষনের কিনারায় আবদ্ধ নেই। প্রকৃত খুনিদের, তাদের আশ্রয়দাতাদের, প্রমাণ লোপের কারিগরদের শনাক্তকরণ এবং শাস্তিদানের দাবীর মাধ্যমে এর অর্থ, তার সাথে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত, সমাজ সংস্কারের দাবীতে উন্নীত। এই আন্দোলনের শিরদাঁড়া যেমন প্রতিবাদী চিকিৎসকেরা, তেমনই এর হৃদয় অবশ্যই সহমর্মী জনগণের।
গত ১০ই আগস্ট থেকে প্রত্যক্ষ ভাবে এই আন্দোলনে যুক্ত হবার সুবাদে চিকিৎসা সহ বিভিন্ন পেশার ও শ্রেণীর মানুষের নানান ধরনের মত, অভিমত, আশা নিরাশার সাক্ষী হবার সুযোগ হয়েছে। সেই সবের ভিত্তিতে একজন অচিকিৎসক হিসেবে এই আন্দোলন নিয়ে ব্যক্তিগত ভাবনাগুলি প্রকাশের চেষ্টা করছি।
স্বাধীনতা দিবসের প্রাককালে রাত দখলের কর্মসূচি থেকে ডাক্তারদের আন্দোলন রূপান্তরিত হয়েছিল এক ঐতিহাসিক জন জাগরণে, যা দীর্ঘ দুমাস পেরিয়েও এখনো পূর্ণ মাত্রায় বহাল।
বহু বাঁধা বিপত্তি সত্বেও দ্রোহের কার্নিভালের অভাবনীয় সাফল্য এবং বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রগুলিতে তার জয়জয়কার নিঃসন্দেহে আন্দোলনের প্রতি বৃহৎ সংখ্যক নগরবাসীর সমর্থনের পরিচায়ক। বিশেষত যেহেতু মুনাফালোভী সংবাদ মাধ্যমগুলো তাদের গ্রাহক সংখ্যা বিচার করেই খবর পরিবেশন করে।
অসংখ্য বনধ, রাস্তা রোকো, ইত্যাদি সমাজ স্তব্ধকারী কর্মসূচী অবলম্বন করে ক্ষমতায় আসা এই শাসক সর্ব প্রথম সেগুলোকেই নিষিদ্ধ করেছে। ক্রমে ক্রমে শাসকের অনুগামীদের দৌরাত্ম্যে এই রাজ্যে এমন একটা ভয়ের বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছে যে মানুষের স্বাভাবিক মতপ্রকাশের জায়গা হারিয়ে গেছে। এই আন্দোলনে এখন অবধি যেটা বড় প্রাপ্তি সেটা হোলো যে অন্তত শহর কলকাতা এবং তার আশেপাশের বেশির ভাগ জায়গাতে খোলাখুলি সরকারের সমালোচনা করার একটা পরিসর তৈরি হয়েছে।
জনগণের এই আন্দোলনের প্রতি আবেগের কারণগুলি যা পর্যবেক্ষণ করলাম তা হোলো –
১) অভয়া হত্যা ও ধর্ষণের ভয়াবহতা এবং তাতে প্রশাসনের ন্যক্কারজনক ভূমিকা।
২) ঋতচেতা অভয়ার দুর্নীতির সাথে আপোসহীন লড়াইয়ে মৃত্যুবরণ তাকে জনমানসে যথার্থ ভাবেই শহীদের মর্যাদা দিয়েছে। সবার হৃদয় উদ্বেলিত তার জন্য।
৩) কলকাতার বুকে বিখ্যাত সরকারী হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় একজন মহিলা চিকিৎসকের সাথে ঘটে যাওয়া এরকম ভয়ঙ্কর অপরাধ সবাইকে আতঙ্কিত করেছে তাদের নিজেদের এবং কাছের মানুষদের নিরাপত্তার ব্যাপারে l
৪) চিকিৎসক ফ্র্যাটারনিটি তাঁদের একজনের প্রতি ঘটে যাওয়া নৃশংস অন্যায়ে স্বাভাবিক ভাবেই একাত্মবোধ করে সংঘবদ্ধ হয়েছেন প্রতিবাদে।
৫) পাশাপাশি মেয়েরাও একাত্মবোধ করেছেন এই নারী নির্যাতনে। যার প্রতিফলন ঘটেছে ১৪ই অগস্টের রাত দখলের ডাকে এবং ক্রমাগত তার পরবর্তীতেও।
৬) স্বাস্থ্য দপ্তরের নানান দুর্নীতি এবং থ্রেট কালচার দূরীকরণে এবং হাসপাতালে সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবীতে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য কর্মীরা শুধু নয়, আপামর জন সাধারণ স্বাস্থ্য পরিষেবার গ্রাহক হিসেবে সোচ্চার হয়েছেন।
৭) এই আন্দোলন দলীয় পতাকাবিহীন এবং সেজন্যই যে কোনো দলের সমর্থকদের এতে শামিল হতে কোনো অসুবিধে হয়নি।
৮) জুনিয়র ডাক্তারদের কর্ম বিরতির সময় মেডিকেল কলেজের সিনিয়র ডাক্তাররা অধিক দায়িত্ব নেওয়ায়, হাসপাতাল পরিষেবা থেমে থাকে নি। সাথে অভয়া ক্লিনিকের ব্যানারে পরিষেবা জনগণের মন ছুঁয়েছে।
৯) অভয়া কান্ডের পরেও জয়নগরের মতো আরো কতগুলো ঘৃণ্য ধর্ষণ, খুনের কাণ্ড এবং তাতে পুলিশ প্রশাসনের অসন্তোষজনক ভূমিকায় জনরোষ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
১০) অতীতের পার্ক স্ট্রীট, কামদুনি, হাঁসখালি, সন্দেশখালি, বগটুই, ইত্যাদি পৈশাচিক ঘটনায় শাসকের নিন্দনীয় ভূমিকা; বিভিন্ন চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি, নিয়োগে বেনিয়ম, রেশন দুর্নীতি, কয়লা পাচার, গরু পাচার, ইত্যাদি নানান ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ; TET পাস করা চাকরী প্রার্থী, DA আন্দোলনকারী ও নানান বিষয়ে প্রতিবাদীদের সাথে শাসকের অসংবেদনশীল আচরণ; ইত্যাদি এতদিনের সম্মিলিত পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে এই আন্দোলনে।
১১) এই রাজ্যের দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রত্যেকটা কেস যেগুলোতে CBI তদন্ত করছে তার বেশিরভাগই সদর্থক পরিণতি পায়নি। সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া কেসগুলোও কালক্ষেপের শিকার। তাই তদন্ত ও বিচারের সর্বোচ্চ স্তম্ভ দুটোর ওপর আস্থা হারানো মানুষের বিপ্লব ছাড়া আর গতি নেই।
১২) আমরণ অনশনে একের পর এক চিকিৎসক সংকটজনক অবস্থায় উপনীত হওয়া সত্বেও এই ফ্যাসিষ্ট শাসক আগের কেসগুলোর মতোই নিরুত্তাপ, নির্মম। তাই জনরোষ বাড়ছে।
১৩) আনাচে কানাচে কথাবার্তায়, আলোচনায়, স্লোগানে, স্পিরিটে যা পরিস্ফুট তা হোলো যে এই বিপুল স্বতঃস্ফূর্ত জন সমর্থনের সাথে সম্পৃক্ত আছে দিন বদলের স্বপ্ন, যা অনেকেই মনে করেন সরকার বদলেই সম্ভব।
এমতাবস্থায় ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ এবং অনুভবগুলি ব্যক্ত করছি, যার দায় অন্য কারুর নেই।
একটা প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের মোকাবিলা করতে গেলে কিছু রাজনীতি তো এসেই যায়। সেটা না হলে তো শাসক আন্দোলনকারীদের পক্ষেই থাকতো, অন্যায়কারীদের প্রশ্রয়-আশ্রয় দিত না। চিন্তাশীল মানুষের রাজনৈতিক চেতনা থাকবেই, সেটা সংসদীয় গণতন্ত্রের মধ্যে হোক বা তার বাইরে হোক। যাঁরা এই আন্দোলনে শামিল তাঁদের সবার ভেতরেও রাজনৈতিক সত্ত্বা থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই এই আলোচনা কখনোই অরাজনৈতিক হতে পারে না।
এই অভূতপূর্ব গণ অভ্যুত্থানে তিনটে শ্রোতের সঙ্গম ঘটেছে :
– জুনিয়র ডাক্তারদের সংগঠন (WBJDF)
– সিনিয়র ডাক্তারদের সংগঠন (JPD) ও বৃহত্তর ডাক্তার সমাজ
– আপামর জন সাধারণ
প্রত্যেকের ব্যাপারেই আলাদা করে কিছু বলতে চাই।
জুনিয়র ডাক্তারদের সংগঠন (WBJDF) এর প্রতি
তাঁরাই আন্দোলনের মুখ এবং মানুষের আবেগ তাঁদের প্রতি সব চাইতে বেশি। তাঁদের সতীর্থ এই ন্যক্কারজনক প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধে প্রাণ দিয়েছেন, তাঁরা নিজেরা দিনের পর দিন এই জঘন্য থ্রেট কালচারের ভুক্তভুগী এবং প্যারাডক্স এটাই যে তাঁদের ফ্রেটারনিটিই ঘৃণ্য অপরাধে শামিল। এই লড়াই তাঁদের জীবন মরণের, অস্তিত্বের। সাথে হাসপাতালের সুচারু পরিষেবার দাবীও যুক্ত। তাঁদের মহৎ উদ্যেশ্য এবং মরণপণ লড়াইকে কুর্নিশ জানাই, যদিও স্ট্র্যাটেজি নিয়েও কিছু বলার আছে।
১) আন্দোলনের পক্ষে থাকা প্রত্যেক সহমর্মী মানুষকেই দেখেছি জুনিয়র ডাক্তারদের আমরণ অনশনের বিপক্ষে। মহৎ উদ্দ্যেশ্যে জীবন পণ সংগ্রাম জনমানসে তাঁদের স্থান স্বাধীনতা যোদ্ধাদের পর্যায় নিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু এই নির্লজ্জ, নিষ্ঠুর শাসকের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে তাঁরা নিজেদের মূল্যবান জীবন সংকটে ফেলুন সেটা কেউ চান না। কারণ এই ফ্যাসিষ্ট শাসকের নির্মমতা সম্প্রতিক কালেও পরিলক্ষিত হয়েছে অনশনরত DA বা চাকরিপ্রার্থী আন্দোলনকারীদের ক্ষেত্রে।
২) JDF এর এই স্বাস্থ্যজগৎ শোধনকারী দলীয় পতাকাহীন (অরাজনৈতিক নয়) সংগ্রাম তাঁদের অধিকার এবং তাঁদের অবশ্যই কোনো দায় নেই এই ফোকাস থেকে এক বিন্দুও সরে আসার, বিরুদ্ধ প্রচার বা প্রত্যাশা যাই থাকুক না কেন।
৩) এই আন্দোলনে তাঁদের মূলধন যে বিপুল জন সমর্থন সেটা তাঁরা বারে বারে স্বীকার করেছেন। যাঁরা পাশে আছেন তাঁদেরও রাজনৈতিক মত আছে এবং বেশির ভাগই কোনো না কোনো শাসক বিরোধী দলকে ভোট দিয়ে এসেছেন। তাই দলমত নির্বিশেষে দলীয় ঝান্ডাহীন মানুষের অন্তর্ভুক্তি এই আন্দোলনকে শক্তি জোগাবে। যোগদানকারীরা কোন রাজনৈতিক রঙের সে বিচারে গিয়ে তাদের এন্ট্রি দিতে হলে কিন্তু আরেক রাজনীতি করা হয়।
এই অতি শিক্ষিত আন্দোলনকারীরা নিশ্চয়ই ওয়াকিবহাল যে Set Theory তে দুটি কনসেপ্ট আছে-
– mutually exclusive (একটি Set এ কোনো বিশেষ সদস্য উপস্থিত থাকলে আরেক সদস্য অবশ্যই সেটায় থাকবে না এবং উল্টোটাও)
– independent (একটি set এ কোনো একজন সদস্য আছে কি নেই তাতে অন্যজনের সেখানে থাকায় কিছু যায় আসে না)।
অতএব mutually exclusive হওয়াটা স্বাধীনতা নয়, বরং এক ধরনের নির্ভরতা। তাই mutually exclusive হবার দায়টা দলীয় রাজনীতির মানুষেরাই নিন না, আন্দোলনকারীদের নেবার কি দায় পড়েছে?
৪) বক্তব্য রাখার এবং কর্মসূচী ঘোষণার ব্যাপারে বারে বারে সিনিয়র ডাক্তারদের কর্মসূচীর সাথে কোথাও না কোথাও সংঘাত বেঁধেছে, যেটা জনগণের চোখে পড়ছে। সেটায় এরকম একটা ধারণা তৈরি করছে যে ডাক্তারদের নিজেদের মধ্যেই যদি বোঝাপড়ার অভাব থাকে, তাহলে এনারা বৃহত্তর স্বার্থ দেখবেন কেমন করে।
৫) জুনিয়র ডাক্তাররা কি নিজেরাও বিশ্বাস করেন যে প্রশাসনিক পদে যাঁরা আসীন এই অপরাধগুলোর জন্য তাঁরাই দায়ী? দেখা গেল তো গোয়েল কে সরিয়ে ভার্মার মতন দলদাসই আসেন। তেমনি নিগমকে সরালে আরো কোনো নিগমতর আমলার পথ সুগম হবে।
ব্যাকরণগত তদন্ত বা বিচার ব্যবস্থায় প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত কাউকেই দোষী সাব্যস্ত করা যায় না, কিন্তু আন্দোলন তো সেই ব্যাকরণ মেনে চলে না।আজ নিজেদের জীবন বাজি রেখেও শাসকের অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য, বক্রোক্তিই প্রাপ্ত হচ্ছেন তাঁরা। ঋজু শিরদাঁড়ায় শাসকের মমতা কি দাবী করা যায়? তাঁরা এইসব প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ ও দুর্নীতির জন্য আর কবে সরাসরি শাসককে, অর্থাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং পুলিশমন্ত্রীকে দায়ী করবেন? আর কবে?
৬) যে কোনো দাবীকে তীব্রতর করতে হলে তাকে এক ধাপ থেকে পরের ধাপে নিয়ে যেতে হয়। রাজ্য পুলিশের ওপর আস্থা হারালে যেমন CBI তদন্তের দাবী। সমস্যাগুলো সাংবিধানিক পদাধিকারীদের বা সংস্থার নজরে আনার মধ্যে কোনো রাজনীতি থাকা উচিত নয়। এইরকম একটা অচলাবস্থায় যেখানে তাঁদের দাবীগুলো নিয়ে রাজ্য সুপ্রিম কোর্টে অসত্য তথ্য দিচ্ছে, সেখানে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠন হওয়া National Task Force কে সরোজমিনে আসল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে বলা যেতে পারে। রাজ্যপালের কাছে যেমন ডেপুটেশন জমা দেওয়া হয়েছে, দেশের রাষ্ট্রপতির কাছেও সেরকম জমা দেওয়া যেতে পারে। এগুলো তাঁদের দাবী আদায়ের লড়াইয়ের ভিত আরো শক্ত করবে।
সিনিয়র ডাক্তারদের সমন্বয় সংগঠন (JPD) এর প্রতি
১) তাঁদের বিভিন্ন বক্তব্যে দেখেছি যে তাঁরা নিঃশর্ত ভাবে জুনিয়রদের সমর্থন করবেন এই অঙ্গীকার করেছেন। তাঁরা পাকা মাথার মানুষ তাই এর ব্যত্যয় কিছু দেখা যায়নি। অন্তত জনসমক্ষে নেতৃস্থানীয়রা সলিডারিটি দেখিয়ে চলেছেন। তাই কর্মসূচীতে স্বাতন্ত্র্য থাকলেও দাবী বা আন্দোলনের অভিমুখের বিষয়ে তাঁদের আলাদা কোনো মতবাদ দৃশ্যত নেই। একসাথে চলার ক্ষেত্রে এটা খুবই জরুরী।
২) তাঁদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার নিরিখে তাঁরা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারেন যে এই আন্দোলনেরও একদিন সমাপ্তি ঘটবে কিছু কিছু সাময়িক পদক্ষেপের দ্বারা, যা নিঃসন্দেহে এই আন্দোলনের তীব্রতার ফসল। অনমনীয় চাঁদ সওদাগররাও হয়তো এই চরম প্রতিহিংসাপরায়ণ মনসার বামহস্তে পুজো করতে বাধ্য হতে পারেন সন্তানসম লখিন্দরদের প্রাণ ও ক্যারিয়ার বাঁচানোর তাগিদে। বিষধর সাপগুলো কিন্তু সমাজের মধ্যেই আবার ঘোরাফেরা করবে ও ফনা তুলবে মনসার প্রশ্রয়ে।
৩) আবেগী জুনিয়ররা সততার সাথে অনশনে গিয়ে সংকটজনক অবস্থায় ICU তে ভর্তি হচ্ছেন সে নিয়েও বিদ্রুপ শুনতে হচ্ছে। কাল ICU তে বেড না পাবার দায়ও তাঁদের ওপর ন্যস্ত হতে পারে, যেভাবে কর্মবিরতির সময় বহু মৃত্যুর মিথ্যা দায় এনাদের ওপর চাপানো হয়েছিল। এছাড়া তাঁদের কারুর কিছু হলে (যেটা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়) তার দায়িত্ব JDF শুধু নয় JPD র ওপরেও বর্তাবে। বৃহত্তর সহমর্মী জনসমাজ এতো সিনিয়র জুনিয়রদের বিভাজন বা নিঃশর্ত শর্তের মর্ম বোঝে না, তাই তারাও সিনিয়রদের দুষবে।
এমতাবস্থায় উপরিউক্ত জুনিয়র সিনিয়র সব সংগঠনের কাছেই বিনীত অনুরোধ
এটা নিশ্চয়ই সবাই মানবেন যে দলীয় পতাকাহীন হয়ে আন্দোলনটা আপাত ভাবে হলেও, দলীয় রাজনীতি অনেকেরই মনে আছে। তার কঙ্কাল অনেকের নানাবিধ অবস্থানে গণ মাধ্যমে বেড়িয়ে পড়ছে। তাতে শাসকের হাত শক্ত হচ্ছে।
সামাজিক অবক্ষয়ের সাথে তাল রেখেই ডাক্তারদের মধ্যে দুর্নীতির সুযোগ ও ব্যাপকতা অত্যন্ত বেশি। পাবলিকের সাথে সরাসরি সংযোগ বলে সেটা তাদের কাছে আরো সুস্পষ্ট। আজ যে জনগণের সমর্থন আছে কাল সেটা সমগ্র ডাক্তার কমিউনিটির বিরুদ্ধে চলে যেতেই পারে। তখন আর একবার এই মাত্রার বিপ্লব সংগঠিত করা প্রায় অসম্ভব।
এমতাবস্থায় সবাই মিলে এই সন্তানতুল্য জুনিয়র ডাক্তারদের আমরণ অনশনের শিডিউল থেকে সম্মানজনক ভাবে ফিরে আসার রাস্তা বের করুন এবং আন্দোলনকে জিইয়ে রাখুন, তীব্রতর করুন, যতক্ষণ না অভয়ার সুবিচার মেলে এবং রোখা যায় দুর্নীতি ও থ্রেট কালচার।
আপামর জনসাধারণের প্রতি
এই আন্দোলনের কলেবর ও হৃদয় অবশ্যই এনারা। তাই তাঁদের কুর্নিশ জানাই। তাঁরা ডাক্তারদের এই বুক চিতিয়ে লড়াইয়ে অবদমিত সাহসটা ফিরে পেয়েছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামসম আবেগে ভেসেছেন, সমাজ বদল ও দিন বদলের স্বপ্ন দেখছেন।
আন্দোলনের এতদিন পরে সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত ডাক্তারদের মধ্যে কিছু অভ্যন্তরীণ বিভাজনে ও রাজনীতিতে এনারা যথেষ্ট বিভ্রান্ত এবং আশাহত। তাঁদের কাঙ্খিত ফলাফল লাভের আগেই আন্দোলন স্তিমিত বা সমাপ্তি হবার সম্ভবনায় এবং আশঙ্কায় তাঁরা ভীত।
কিন্তু তাঁদের মনে করাতে চাই যে –
– সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, নিজেদের বাসস্থানে, কর্মক্ষেত্রে, চলার পথে সর্বত্রই নানাবিধ থ্রেট কালচার বিদ্যমান। বেশির ভাগ মানুষই সেই থ্রেটের কাছে আত্মসমর্পিত।
– গ্রামে, শহরতলিতে তার প্রকাশ ভয়ানক, যা কলকাতাবাসীদের কল্পনাতীত। কোন কোন টিভি চ্যানেল দেখা যাবে থেকে শুরু করে কার কার সাথে মেশা যাবে পর্যন্ত সবই শাসক অনুগামীদের নিয়ন্ত্রণে। অনেক ক্ষেত্রেই নিজের ভোটটা যদি আদপে দেওয়া যায় তাহলেও সেটা দিতে হয় তাদের সামনে তাদেরই নির্দেশ অনুযায়ী।
– কলকাতার বুকে হওয়া শিক্ষক নিয়োগের নির্লজ্জ দুর্নীতির বা ন্যায্য DA বঞ্চনার আন্দোলনে কোনো অভয়া নিধন হয়নি বলে তা আজও উপেক্ষিত।
– সন্দেশখালী, হাঁসখালি, ইত্যাদির আন্দোলন কলকাতায় সে ভাবে পৌঁছোয়নি আর এই “ডাক্তারদের” আন্দোলনও সেখানে নয়। কলকাতা বা শহরাঞ্চলে তুলনামুলক নিরাপদ স্থানে বসে যত বড় বড় কথাই বলা হোক না কেনো যে এই সংগ্রাম জনগণের, অধিকাংশ গ্রামাঞ্চলেই এর প্রভাব সীমিত, এটা শুধুই “ডাক্তারদের” বলেই প্রচারিত।
– গত তেরো বছরের নিজেদের অপারগতা শুধুমাত্র এই আন্দোলনের সাফল্যের ওপর নির্ভরশীল করলে কিন্তু ঠকতে হবে। চলমান এই আন্দোলনের তীব্রতার মেয়াদ ফুরোতেই পারে ডাক্তারদের নির্ধারিত দাবীর আংশিক পূরণে। তখন তাঁদের দায়ী করা অনুচিত হবে।
তাই সত্যিকারের দিনবদল আনতে গেলে সামগ্রিক সিস্টেম ও সমাজের মেরামতির ভার বৃহত্তর সমাজের পক্ষ থেকে নিতে হবে যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে। কারণ নেতৃত্ব ছাড়া বিপ্লব দিক খুঁজে পায় না। ডাক্তাররা তাতে অংশগ্রহণ করবেন এই সমাজের সদস্যের পরিচয়ে। চা শ্রমিক থেকে চাকরিপ্রার্থী, ডাক্তার থেকে DA আন্দোলনকারী, ইত্যাদি, সমস্ত বিক্ষুব্ধ বঞ্চিত মানুষের ক্রোধকে একত্রিত করতে হবে। এটাই হয়তো সঠিক সময় সেই বৃহত্তর আন্দোলনের সূচনার।
সর্বত্র প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিই যেখানে সামাজিক অবক্ষয়ের মুখ্য কারণ, সেখানে এর সমূলে বিনাশ করতে হলে গণতান্ত্রিক উপায়েই এই ফ্যাসিষ্ট দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের পরিবর্তন সর্বাগ্রে প্রয়োজন। পরবর্তীতেও ক্লেদ জমতে না দিয়ে বারংবার সরকার পরিবর্তনের অভ্যেস তৈরি করতে হবে এই রাজ্যে। কিন্তু আপাতত কি ভাবে এটা সম্ভব হতে পারে সেটা বুঝতে অক্ষম হচ্ছি। সংসদীয় গণতন্ত্রে থাকা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির ভেতরে এতো মতভেদ, ঘাত, অন্তর্ঘাত, “তার-বেলা-তন্ত্র” (whataboutery), যে anti incumbency votes কে একত্রিত করে পরিবর্তন এনে দিনবদলের স্বপ্ন অধরাই না থেকে যায়। গণতন্ত্রের “চার দেয়ালের খাঁচায়” আটকে থাকা মস্তিষ্ক মৌসুমী ভৌমিকের একটি গানের শেষ পংক্তিগুলোর মতন ভাবা প্র্যাকটিস করে –
“..কেউ যদি আজ অন্য কথা
বলতো তবে বেশ তো হতো,
নতুন কোনো পাহাড় যদি
চুড়োর দিকে টেনে নিতো”।










যুক্তিনিষ্ঠ, বলিষ্ঠ ও প্রাঞ্জল লেখা। খুব ভালো।
সংহত, যুক্তিপূর্ণ ও আন্তরিক লেখাটি বাস্তব, এবং স্বপ্নও দেখায়।