প্রায় এক বছর হতে চললেও, অভয়ার নৃশংস হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনায় আমরা এখনো বিচার পাইনি। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একজন ডাক্তারী ছাত্রীর এই নৃশংস হত্যার ঘটনা আপামর জনগণকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। গত ৯ আগস্ট রাতের ঘটনায় গর্জে উঠেছিল সাধারণ মানুষ। আমরা অভূতপূর্ব ভাবে রাজ্যজুড়ে লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদের ঢল নামতে দেখেছিলাম সেই সময়। জুনিয়র ডাক্তারেরা তাদের সহকর্মীর জন্য ন্যায় বিচার চেয়ে ভুখ হরতালে নামল।কর্মবিরতি ডাকলো স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা। সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামলো এই নারকীয় ঘটনার বিচার চেয়ে। পুরোটাই একটা আন্দোলনের রূপ নিল। জন্ম হলো অভয়া মঞ্চের। মঞ্চের তরফ থেকে আন্দোলন জারি রাখতে নিয়মিত মিছিল, প্রতিবাদ সভা, কনভেনশন, মেডিকেল ক্যাম্প, সচেতনতার প্রচার সভা, সবই চলছে গত এক বছর ধরে। রাস্তার এই আন্দোলনের জেরেই আমরা পেলাম নতুন নতুন স্লোগান ’উই ওয়ান্ট জাস্টিস’সহ আরো অনেক কিছু।

সরকার বলছে জাস্টিস পাওয়া হয়ে গেছে। সঞ্জয় রাই কে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় দোষী ঘোষণা করে যাবজ্জীবনের সাজা দিয়েছে শিয়ালদা হাইকোর্ট। কিন্তু এই আই-ওয়াশ মানছে না জনতা, মানছে না অভয়ামঞ্চ। বিচারের নামে এই প্রহসনের বিরুদ্ধে তারা এখনো রাস্তায় আছে। আছে প্রতিবাদের উই ওয়ান্ট জাস্টিসের প্ল্যাকার্ড ধরে। ইতিমধ্যে শক্তি বাড়িয়ে অভয়া মঞ্চ ছড়িয়ে পড়েছে জেলা থেকে প্রান্তিক এলাকায়। নানান গণ সংগঠন ও সাংস্কৃতিক মঞ্চ গুলিকে ঐক্যবদ্ধ করে নানান কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। এই আন্দোলনের ছাতার তলাতেই শ্রেণী ছাড়িয়ে প্রান্তিক মানুষেরও হাত ধরার চেষ্টা চলছে।
এই চেষ্টাতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল গত 20 জুলাই রবিবার। ঐদিন সকাল ১০ টা থেকে প্রান্তিক মানুষের এলাকা মহেশতলার ১৬ বিঘা বস্তিতে একটি মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছিল । তাতে অংশগ্রহণ করেছিল অভয়া মঞ্চের তিনটি সংগঠন। ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরাম, শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা নির্মাণ।
যেকোনো অন্যান্য বস্তির মত এই এলাকাটিতেও দারিদ্র ও সামাজিক বৈষম্যের নিদারুণ ফল হিসেবে নানান রোগ এবং অপুষ্টির দেখা মেলে, যে কারণে আমরা এই দুর্গম এলাকাটিকে মেডিকেল ক্যাম্পের জন্য বেছে নিয়েছিলাম।
১৬ বিঘা বস্তি টি গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ জলা জমির উপর। প্রায় কুড়ি পঁচিশ বছর আগে থেকে সুন্দরবন সংলগ্ন প্রান্তিক এলাকাগুলি থেকে বহু মানুষ কাজের খোঁজে একটুকু মাথা গোজার ঠাই হিসেবে বেছে নিয়েছিল এই জলাভূমিকে। জলের ওপর বাঁশের কাঠামো করে, প্লাস্টিকের সিট, চট ,টিন বা দর্মার বেড়া দিয়ে ছোট ছোট খুপরি তৈরি করে প্রথম বসবাস শুরু করেছিল এই এলাকায়। এখন দু একটা পাকা বাড়ি দেখা গেলেও গোটা এলাকাটাতে বেশিরভাগ বাড়ি বাঁশ আর বেড়ার। বর্ষায় সেগুলি প্রায় জলের তলায় বলা চলে। একেবারেই দিন আনা দিন খাওয়া নানান পেশার মজুর মানুষদের বসবাস এই এলাকায়। রোগ বলতে নানান চর্ম রোগ পেটের রোগ ও আপার রেস্পেটারি সমস্যায় আক্রান্ত এলাকার শিশু থেকে বৃদ্ধ, মায় সাধারণ মানুষ। এদিনের ক্যাম্পে নানান বয়সের প্রায় ৭০ জন রোগী চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পেয়েছেন। যদিও আমরা জানি এই সমস্যা শঙ্কুল এলাকায় মাত্র একবারের জেনারেল ক্যাম্পে রোগীদের রোগের শনাক্তকরণ বা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই আমরা ওই এলাকায় নিয়মিত স্বাস্থ্য ক্যাম্পের চেষ্টা চালাচ্ছি। বর্তমানে স্বাস্থ্য শিক্ষা নির্মাণের কাজের জায়গা গুলির মধ্যে অন্যতম মহেশতলা পৌরসভার ১৬ বিঘা বস্তি। এই এলাকায় স্বাস্থ্য শিক্ষা নির্মাণের কাজ শুরু ২০২৩ থেকে। মূলত মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সচেতনতা ও টিকাকরণ কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তার প্রচারের কাজের মাধ্যমে আমরা ১৬ বিঘাতে পা রাখি। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যে উপলব্ধি করি সমস্যা অনেক গভীরে। ১৬ বিঘার অবস্থান মহেশতলা পুরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ডে, যেটি কলকাতা পুরসভার ৮০ নম্বর ওয়ার্ড সংলগ্ন। কলকাতার এত কাছে হয়েও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুযোগ-সুবিধা কিন্তু তেমন কিছু নেই ওই এলাকায়। গোটা মহেশতলা, বজবজ, পূজালী পুরসভা এলাকায় কোন সরকারি হাসপাতাল নেই। সবচেয়ে নিকটবর্তী সরকারি হাসপাতাল হল বেহালার বিদ্যাসাগর হাসপাতাল। এর পাশাপাশি এলাকার মানুষ মেটিয়াবুরুজ মানে গার্ডেনরিচ স্টেট জেনারেল হাসপাতাল, বাঙুর ও পিজিতে ও পরিষেবা নিতে যান। কিন্তু স্থানীয়ভাবে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য চিকিৎসা কেন্দ্র না থাকায় এখানে প্রাথমিক চিকিৎসা বা আপৎকালীন চিকিৎসা বলতে প্রায় কিছুই নেই। বিপদে-আপদে স্থানীয় কিছু কোয়াক ডাক্তারের ওপরেই ভরসা রাখেন অধিবাসীরা।
১৬ বিঘা বস্তিটি মহেশতলা পুরসভার মোল্লার-গেট ইউপিএসসির অধীনে হলেও পশ্চিমবঙ্গের যেকোনো আরবান প্রাইমারি হেলথ সেন্টাররের মতো এখানেও প্রয়োজনীয় সমস্ত রকম চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়া যায় না। তবে ষোলো বিঘার সবচেয়ে সমস্যার জায়গা হল এখানে নির্দিষ্ট কোন এমন রাস্তা নেই যেটা দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স বা কোনরকম গাড়ি বস্তিতে ঢুকবে, ফলে গর্ভবতী মহিলা সহ যেকোনো অসুস্থ মানুষ রেললাইন পার হয়ে তবেই চিকিৎসার জন্য যেতে পারবে। সেই সঙ্গে বাড়িতে প্রসব, খুব কম বয়সে বিয়ে, কম বয়সে গর্ভবতী হওয়ার মত সমস্যাও ভীষণভাবে আছে।










