গত কয়েকদিন ধরে সমাজমাধ্যম যা নিয়ে সরগরম, সেই বিষয়ে দু’চার কথা বলতে এলাম।
সেই কোন শিশুকালে আগরপাড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের সিমেন্টের পোস্ট আর লোকাল ট্রেনের কামরায় পিতপিতে পাতলা কাগজে সাঁটা বিজ্ঞাপনে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা ‘ঋতু বন্ধে’ দেখে মাকে মানে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। মা অস্পষ্ট স্বরে কিছু বলে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল মনে আছে। আর ঋতুকে ‘সিজন’ ভাবা হাবলি আমি আকাশপাতাল ভাবতে বসেছিলাম, এই দুটি শব্দের মধ্যে নিষিদ্ধ কি আছে?
আমার মিশনারি ইশকুলের ক্লাস নাইনে একদিন শ্রেণীকক্ষে ঢুকে দেখেছিলাম দেওয়ালজোড়া কালো ব্ল্যাকবোর্ডে আঁকা রয়েছে ফ্যালোপিয়ান টিউব এবং ওভারি সহ আস্ত জরায়ুর ছবি। অথচ সেটি বায়োলজির ক্লাস ছিল না। আমার মতো ভীরু, অতিমনোযোগী দু’চারজন ছাত্রী বাদে বাকি সহপাঠিনীদের রিনরিনে হাসি আর গুঞ্জন কানে আসছিল। ডেস্কে ডাস্টার ঠুকে আমাদের প্রবল ব্যক্তিত্বময়ী ক্লাসটিচার মিস দেবযানী লাহিড়ি বলে উঠেছিলেন — ইফ ইউ ফাইণ্ড ইট হিলারিয়াস, ইউ আর লাফিং অ্যাট দ্য ফাউণ্ডেশন স্টোন অফ মাদারহুড।
কিন্তু আমার গল্প আপাতত থাক। আমার মতো শহুরে কিংবা মফস্বলী, শিক্ষার আলো পাওয়া, সুরক্ষিত কৈশোরের মেয়েদের কথা সবাই জানি। যাদের কথা অনেক, অনেক পরে সরকারি স্বাস্থ্যদফতরের চাকরি করতে করতে জেনেছি, তাদের কথা শোনাই বরং।
গ্রামে চাকরি করতে যাওয়ার সময় সেখানে আমার ব্যবহৃত ব্র্যাণ্ডের স্যানিটারি ন্যাপকিন পাওয়া যায় কিনা, সেই চিন্তায় যখন ভুরুতে ভাঁজ, তখন কল্পনা করতে পেরেছি কি যে অবমানবীর জীবনযাপন করা ইটভাটার নারীশ্রমিক মাসের ঐ কয়েকটা দিন কি ব্যবহার করেন? ছাইমাখা নোংরা কাপড়! কারণ ছাই রক্ত শুষে নেয় তাড়াতাড়ি।
পনের ষোলো বছরের অন্তঃসত্ত্বা কিশোরী প্রথমবার দেখাতে এসেছে হাসপাতালে। পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখি, যোনিমুখে বীভৎস ইনফেকশন। শাশুড়ি বা সঙ্গী আত্মীয়া নির্বিকার। এরকম তো কতই হয় মেয়েদের। হয়, আবার সেরেও যায়। স্রাবের কাপড় ধোয়ার জন্য সাবান কোথায় অত? ঐ একটু জলকাচা করে নিয়েই ফের ব্যবহার করা দস্তুর — যদ্দিন না ছিঁড়ছে।
আরো পরে শুনলাম মহারাষ্ট্রের চিনিকলের নারী শ্রমিকদের কথা। প্রতি মাসে মাসিকের হ্যাপা আর অনাহূত প্রেগন্যান্সির ঝামেলা এড়াতে পঁচিশ তিরিশ বছর বয়স্ক মহিলারাও করিয়ে ফেলছেন টোটাল হিস্টেরেকটমি উইদ বাইল্যাটারাল স্যালপিংগো উফোরেকটমি — সাদা কথায়, জরায়ু-ডিম্বাশয় সব ফেলে দিচ্ছেন। না রহেগা বাঁশ, না বজেগা বাঁসুরি! বারে বারে মজুরি কাটা যাওয়ার হাত থেকে তো বাঁচবেন। সংগঠিত কর্মক্ষেত্রে (সরকারি/বেসরকারি যা-ই হোক না কেন) মাতৃত্বকালীন ছুটি, চাইল্ড কেয়ার লিভ, গর্ভপাতজনিত ছুটি, এমন কি কোনও কোনও সংস্থায় মাসিকের অস্বস্তি/যন্ত্রণাজনিত ছুটিও এখন সহজলভ্য, কিন্তু তার বাইরে যে বিশাল অসংগঠিত ক্ষেত্রের নারীশ্রমশক্তি রয়েছে, তাদের কথা কে ভাবেন? আমি আপনি ভাবি নিজেদের অল্পবয়সী গৃহসহায়িকাটির পিরিয়ডসের সময়কালীন ব্যথাবেদনার কথা?
এবারে আসা যাক মেয়েদের এই শারীরবৃত্তীয় ঘটনাবলীকে পুরুষেরা কি নজরে দেখতেন/দেখেন সেই বিষয়ে।
আমরা যখন ডাক্তারির ছাত্রী, তখন মেন্সট্রুয়েশনকে অভিহিত করা হতো — ‘উইপিং অফ দ্য ডিস্যাপয়েন্টেড ইউটেরাস’ বলে। অর্থ? ঠিক যে বয়সে একটি মেয়ের মেনার্কি হয়, মানে সে প্রথমবার ঋতুমতী হয়, তার জরায়ু মানসিক এবং জৈবিকভাবে তৈরি হয়ে যায় একটি ভ্রূণকে গ্রহণ করতে। যদি তা না হয়, হতাশ জরায়ু তার সমস্ত অভ্যর্থনা এবং সাজসজ্জা রক্তিম ক্রন্দনে ভাসিয়ে দেয় — সেটাই ঋতুচক্র।
কাব্যিক বর্ণনা সন্দেহ নেই, কিন্তু প্রথমদিন শুনেই ঘেন্না এবং অসহায় রাগে আমার মাথায় আগুন জ্বলে উঠেছিল। মনে হয়েছিল স্ত্রীরোগ এবং মাতৃত্বের এই ভার্শনটি নিশ্চিত একজন পুরুষের মস্তিষ্কপ্রসূত, নয়ত কষ্টকর বিষয়ে এমন অসংবেদ সম্ভব নয়।
ইউটেরাস বা জরায়ুতে ফাইব্রয়েড জাতীয় টিউমার হলে অপারেশন করে তা বাদ দিলেও ফিরে ফিরে আসার প্রবণতা থাকে – অন্তত যতদিন না মেনোপজ হচ্ছে।
একবার অপারেশন এবং একবার হরমোন থেরাপি করার পরে আমার জরায়ু-টিউমার যখন তৃতীয়বারের জন্য ফিরে এলো, আমার এক চিকিৎসক দাদা সহাস্যে মাকে বলেছিল — মাসি, ইউটেরাস ফাঁকা থাকতে পছন্দ করে না, আইদার দেয়ার শুড বি আ বেবি অর এনি আদার গড ড্যামনড থিং!
শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত ঘরের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি যদি এইরকম হয়, তা হলে দুর্ভাগা প্রান্তিক মেয়েগুলোর দুর্গতি যে আরও কত গভীর, সে বিষয়ে অনুমান করতে সমাজবিদ্যার পণ্ডিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
অবস্থা হয়ত অনেকটাই বদলেছে এখন। বছর কয়েক আগে একটি বাংলা বাণিজ্যিক ছবিতে (সম্ভবত ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’) নায়ক তার কিশোরী প্রেমিকার জন্য ওষুধের দোকান থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনে নিয়ে আসছে, ঋতুস্রাবের প্রথম দিনের অসহ কষ্টে তাকে যথাসম্ভব শুশ্রূষা দেওয়ার চেষ্টা করছে, এমন দেখানো হয়েছিল।
কোনও স্বনামধন্য মানুষের নিজের রক্ষণশীল মানসিকতা থাকতেই পারে — এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কিন্তু মতপ্রকাশে অসাবধানতা বাঞ্ছনীয় নয়। কারণ নামজাদা মানুষের কথা গড়পরতা লোকজন মন দিয়ে শোনেন — সেখানে স্ববিরোধিতার লক্ষণ দেখলে তাঁরা বিভ্রান্ত হয়ে যান। যিনি নারীর শাঁখা, সিঁদুর, সুচারুরূপে পরিহিত শাড়ির সনাতনী প্রকাশের সমর্থক, তিনি নামের শেষে স্বামীর পদবির পরিবর্তে বিখ্যাত পিতার পরিচয়ে পরিচিত হতে ভালবাসলে আমজনতা একটু ঘেঁটে যায় বৈকি। আধুনিকতা আর অপসংস্কৃতির মধ্যস্থিত লক্ষণরেখাটা সংশ্লিষ্ট মেয়েটিকেই বিচার করতে দিলে ভাল হয় না কি? শহুরে মেয়েরা খোলামেলা পোশাক পরছে, প্রকাশ্যে দোকান থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনছে বা বাপ-ভাইকে দিয়ে আর পাঁচটা সাধারণ জিনিসের মতো আনিয়ে নিচ্ছে, এটা দেখে পুরুষের ধাতুদৌর্বল্য প্রকট হয়ে ওঠে? তারপরে তাদের অবৈধ কামেচ্ছার শিকার হয় গ্রামের মেয়েরা? শৈশব থেকেই গুড টাচ আর ব্যাড টাচের শিক্ষা সম্পূর্ণ পাশ্চাত্য? ভারতীয় সংস্কৃতিতে তা খাপ খায় না, প্রয়োজনও নেই? এইসব অতিসরলীকরণ করলে নামী মানুষের সম্মান খর্ব হয়, তা কি তাঁরা সত্যিই বোঝেন না?
বেশ কয়েক বছর আগে একটি বলিউডি ছবির সংলাপ দিয়ে লেখা শেষ করি।
সুভাষ ঘাই নির্দেশিত ‘পরদেশ’। তাতে অপূর্ব অগ্নিহোত্রী অভিনীত এনআরআই চরিত্রটি সনাতন ভারতীয় নারীর প্রতীক নায়িকাকে ব্যঙ্গ করে বলছে — ভারত এমন একটি দেশ যেখানে নারীপুরুষের স্বাভাবিক মেলামেশায় সবসময় বাধা দেওয়া হয়, খোঁয়াড়ের গরুর মতো মেয়েদের এক দিকে আর ছেলেদের অন্যদিকে বেঁধে রাখা হয় যাতে মিশতে না পারে, কিন্তু সন্তানের জন্ম দেওয়ার বেলায় তোমরা পৃথিবীতে এক নম্বর — সেখানে তোমাদের কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নেই!











ডাঃ সুকন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ জানাই খুব স্পষ্ট ভাষায় একটি সামাজিক সমস্যার কথা তুলে ধরার জন্য। শহরের মেয়েদের একটা অংশ উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ পেলেও খেটে খাওয়া সাধারণ পরিবারের মহিলাদের অনেকেই এসবের সুযোগ পাননা। মহারাষ্ট্রের মহিলাদের ঘটনা পড়ে ও সেই বিষয়ে কয়েকটি কথা লিখতে বসে বারংবার নিজের দিকে আঙ্গুল তুলেছি। এমন লেখা আরও লেখা হোক।