“সেদিনও সবাই জানতো তো কিছুটা পথ হেঁটে কেউ কোন গন্তব্যে পৌঁছবে না। কোথাও ছিল না কোন সিলভার লাইনিং। তবু সে রাতে কেউ ঘরে থাকতে পারেনি। মেধাবী এক মেয়ের নৃশংস তম খুন, মৃত্যুর আগে বা পরে ভয়ঙ্করতম অত্যাচার, এক মুহূর্তে ছিঁড়ে ফেলেছিল আরও অনেক মেয়ের দৈনন্দিন কোকুন, ভুলিয়ে দিয়েছিল আজীবনের মেয়েজন্মের শান্ত হয়ে থাকার পাঠ । চৌকাঠ–অন্দর, বাইরের পৃথিবী সামলে, ল্যাপটপ গুছিয়ে, হাতের হলুদের দাগ শাড়ির কোনায় মুছতে মুছতে গলি পেরিয়ে রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছিল তারা। অফিস ফেরত তরুনী, যুবতী মায়ের সঙ্গে হাত ধরে একরত্তি, প্রথম বার মিছিলে আসা মধ্যবয়সিনী, ওয়াকিং স্টিক হাতে বা হুইল চেয়ারে বৃদ্ধা । মাথায় গনগনে আগুন আর গলায় রাত দখলের চিৎকার … শহর–গ্রাম–মফস্বল এমন জাগরণ দেখেনি আগে। মাঝ্ রাতে , ফাঁকা চৌরাস্তার মাঝখানে, দগদগে পোস্টার হাতে দাঁড়িয়ে ঠায় একা তরুণী। সেই মুহূর্তে মিছিলে জারা হাঁটছে, তারা ত হাঁটছেই। যারা হাঁটছে না, তারাও হাঁটছে । গমগম করছে একটাই শ্লোগান, “উই ওয়াণ্ট জাস্টিস “[1]
বিগত আট মাস ধরে চলমান এই আন্দোলন সমাজ ও রাজনীতির অনেক শিকড়কে নাড়িয়ে দিয়েছে । সমাজের অনেক রুদ্ধদ্বারের মুখ খুলে গেছে। নারী আন্দোলন এবং প্রান্তিক লিঙ্গযৌনতার মানুষ দের আন্দোলন এক বিশেষ মাত্রা লাভ করেছে। প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার মানুষের যোগদান এই আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারণ ।
এই অভূতপূর্ব জন জাগরণ থেকে বোঝা যায় যে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পুলিশ, প্রশাসন , আদালত প্রতি বিপুল সংখ্যক মানুষের বিশ্বাস টলে গেছে । আধিপত্যের বিরুদ্ধে জমতে থাকা ক্ষোভ স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায় ছিল। রাত দখলের আহ্বান ছিল সেই স্ফুলিংগ। তিলোত্তমার নারকীয় নির্যাতন ও হত্যার প্রেক্ষিতে দুর্নীতি গ্রস্ত এবং বিকৃতমনস্ক অধ্যক্ষ র ‘অত রাতে কী করছিল ?’ মন্তব্য তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। রিমঝিম সিংহ, শতাব্দী দাস, মহাশ্বেতা সমাজদার এবং অন্যান্য দের ‘reclaim the night, reclaim the right’ এর উদাত্ত আহবানে কলকাতা সহ পশ্চিম বাংলায় গত ১৪ অগাস্ট এর রাত ভারতের গণআন্দোলনের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
১৪ অগাস্ট ঐতিহাসিক রাতদখল। পথে নামে প্রায় গোটা দেশ । আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া বা ইংল্যান্ডের লিডসের আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় বাংলায় বহমান আন্দোলনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে ‘Reclaim the Night, Reclain the Right’-
“আমরা যারা ১৯৪৭ সাল দেখিনি- স্বাধীনতার দিন দখল দেখিনি- আমরা যারা মশালের আগে রেখেছিলাম উনুন ও দেশলাই কে …তারা কেউ এই স্বাধীনতার আগের রাতে ঘরে ছিল না। কেউ চোখের জল মোছেনি – কেউ আগুন নেভায়নি – কেউ বসে থাকেনি – সবাই পা মিলিয়েছিল – সবাই সশব্দে বা নিঃশব্দে শ্লোগান দিয়েছিল – সবাই হাতে হাত রেখেছিল। … অগ্নিবিন্দু কে কী ভাবে মশাল রূপ দিয়েছিল তারা- তারা সব রাত দখল করেছিল …”[2]
সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে মহানগরের গন্ডি ছাড়িয়ে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে, অন্যান্য রাজ্যে, এমন কি দেশের সীমানা ছড়িয়ে প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে। মহিলাদের সুরক্ষা দেবার নামে নাইট ডিউটি বন্ধ করার পরিকল্পনা আগুনে ঘি ঢালে।
এই অভূতপূর্ব আলোড়নে চিকিৎসক তথা নাগরিক সমাজের আন্দোলনের পাশাপাশি বয়ে চলেছে নারী আন্দোলনের ধারা। এই কয়েক মাসে এমন বহু মহিলা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন যারা আগে কখনো রাস্তায় নামেন নি,কোনদিন কোন মিছিলে যোগ দেন নি ।
২০০৭ এ রিজওয়ানুর হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় গড়ে ওঠা নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ, ২০১২ তে দিল্লিতে নির্ভয়া কাণ্ডের প্রতিবাদে আন্দোলন কে ছাপিয়ে গেছে মেয়েদের রাত দখলের কর্মসূচি এবং পরবর্তী নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ, যেখানে ধর্ষিতা ও নিহত চিকিৎসকের প্রতি সহমর্মিতার পাশাপাশি উঠেছে ন্যায়বিচারের দাবি । বাংলা তথা পৃথিবীর ইতিহাসে ধর্ষণের প্রতিবাদে এত দিন ধরে বার বার এত মানুষের পথে নামার নিদর্শন বিরল। ২০২৪ এর আগে ২০০৪ এ মনিপুর এবং ২০১২ র দিল্লি তে ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন বৃহৎ গণ জাগরণের চেহারা নিয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ এর আন্দোলন পূর্ববর্তী গণজাগরণের তুলনায় ব্যাপকতর এবং অনেক বেশি শক্তিশালী। বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী অধ্যাপক সুজাত ভদ্র এই প্রতিবাদ কে ২০০৬-৭ সালে আমেরিকার কালো নারীর অধিকারের সংগঠক Tarana Burke এর ভাষায় ‘empowerment by empathy’ বলে উল্লেখ করেছেন।
ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস বলেছেন পিতৃতন্ত্রের সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে ঘটে গিয়েছিল নারীর মহান ঐতিহাসিক পরাজয় (Origins of the family, private property and The State) । কেট মিলেট তাঁর ধ্রুপদী গ্রন্থ Sexual Politics এ লিখেছেন অমিত শক্তিশালী, আপাত-অমোঘ পিতৃতন্ত্রের শোষণ থেকে মুক্তি শুধু নারীরই অভীষ্ট নয়, মানবতার মুক্তির জন্যেই পিতৃতান্ত্রিক শোষণের অবসানের প্রয়োজন। আর্থ সামাজিক অবস্থান, বয়স, পোশাক, চেহারা কোন কিছহুই ধর্ষণের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা দিতে পারেনা। নারী দেহের উপর পুরুষের এই বলপ্রয়োগ সর্বত্র নারীর অধিকার কে বিপন্ন করে রাখে।
ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জেহাদ তাই অভয়া আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য । ২০২৪ এর ৯ ই অগাস্ট আর জি কর হাসপাতালে পাশবিক যৌন অত্যাচারের শিকার হয়ে দুর্নীতির যূপ কাষ্ঠে, শহীদ তরুণী চিকিৎসকের মৃত্যুর ২ মাস ১৯ দিন পর, ২৮ শে অক্টোবর গড়ে ওঠা অভয়া মঞ্চের দশ দফা দাবীর প্রথম দাবী অভয়ার ধর্ষণ ও খুনের ন্যায় বিচার এবং দ্বিতীয় দাবী টিই হল নারী ও প্রান্তিক যৌনতার মানুষের সুরক্ষা।
অভয়া আন্দোলনে শুরু থেকেই ধর্ষক- শাসকের সমীকরণ কে চিহ্নিত করে ক্ষমতাতন্ত্র কে করা হয়েছে। ‘শাসক তোমার কিসের ভয়, ধর্ষক তোমার কে হয়’, ‘ধর্ষক কে লুকায় কে, প্রশাসন/ চোদ্দ তলা আবার কে’, ‘রাষ্ট্রই ধর্ষক’- এই সব স্লোগান পোস্টার গ্রাফিতি প্রাথমিক রূপরেখা নির্মাণ করেছে এই আন্দোলনের ।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ষণ কোন যৌন লালসার প্রকাশ নয়। ক্ষমতাতন্ত্রের আধিপত্য ও আস্ফালন এবং এক ই সঙ্গে সচেতন যৌন হিংসার প্রকাশ। ধর্ষণ একটি সচেতন হুমকি দেখানোর প্রক্রিয়া যার দ্বারা পুরুষ নারীর জন্য আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে। কোন সন্দেহ নেই অভয়া হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রীয় মদতে ঘটা একটি প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা কাণ্ড, যার মূলে আছে দীর্ঘ দিনের দুর্নীতি চক্র । পুরুষ চিকিৎসক হলেও তাকে খুন হতেই হত। যৌন লালসা চরিতার্থ করা এখানে মূল উদ্দেশ্য ছিলনা। কিন্তু তাও ধর্ষণ হয়েছে। এই ভাবেই অভয়া কাণ্ড মিশে যায় জয়নগর যাত্রাগাছি জয়গাঁও উন্নাও হাথরস এবং আরো অজস্র ধর্ষণ এবং হত্যার সঙ্গে । লিঙ্গ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্ষণ কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির দীর্ঘমেয়াদি ফসল, যে সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রে বিভাজনের মধ্যে দিয়ে পুরুষ এবং নারীর নির্মাণ করে- একদিকে দুর্বল অসহায় আজ্ঞাবাহী নারী যাকে শোষণ এবং ভোগ করা যায়, অন্য দিকে প্রভুত্ববাদী প্রবল পরাক্রান্ত পুরুষ যে ক্ষমতার ধ্বজা প্রতিষ্ঠা করে নারীর শরীর , মন ও শ্রমে। এই সাংস্কৃতিক নির্মাণে তাই গণ্ডী ভেঙ্গে বেরনো মেয়েরা শাসিত হয়, সে শাসন কখনো শোষণ, কখনো দমন, কখনো ধর্ষণ। অন্তর্মুখী সংবেদনশীল কোমল স্বভাবের পুরুষ ‘মেয়েলি’ বলে উপহাসের পাত্র হয়। তাই মেয়েদের শ্রমের অমর্যাদা আর যৌন হেনস্থা এক ই মুদ্রার দুইটি পিঠ- লিঙ্গ অসাম্যই এর উৎস । এই কারণেই অভয়ার জন্য লড়াইয়ে নাগরিক আন্দোলনের পাশাপাশি লিঙ্গ রাজনৈতিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া জরুরি, আমরা শুধু একজন অভয়ার জন্য লড়ছি না, ভবিষ্যতে অভয়া হবার সম্ভাবনা কে ধ্বংস করা এই আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্য। লিঙ্গ রাজনৈতিক সচেতনতার প্রসার ছাড়া শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুধু নাগরিক আন্দোলন গড়ে তুলে লাভ নেই। আবার একই সঙ্গে শুধু লিঙ্গ রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে ধর্ষণকেই একমাত্র আক্রমণের লক্ষ্য এবং আলোচ্য করে ফেলার মধ্যেও একটা রাজনীতি আছে, যে রাজনীতি এক বায়বীয় লক্ষ্যের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানায় এবং চরম দুর্নীতির উপর গড়ে ওঠা ক্ষমতাসীন শাসক দলের থ্রেট কালচার কে পল্লবিত হবার সুযোগ দেয়। লিঙ্গ রাজনৈতিক আন্দোলন আর নাগরিক আন্দোলনের ঐক্যবদ্ধ লক্ষ্য হওয়া উচিত দুর্নীতি-সন্ত্রাসতন্ত্র এবং লিঙ্গ-অসাম্য।
আর জি কর ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজ্যসরকার তড়িঘড়ি ‘অপরাজিতা মহিলা ও শিশু বিল’ পেশ করেছে। এই বিল যৌন হিংসা প্রতিরোধ করতে চেয়েছে শাস্তির কঠোরতা বাড়িয়ে। ধর্ষণ ও হত্যার ন্যূনতম শাস্তি করা হল ফাঁসি। শাস্তি কঠোর হলেই অপরাধের হার কমেনা। আসল প্রয়োজন ছিল অপরাধের প্রতিরোধ আর সহজে অভিযোগ করার ব্যবস্থা। যৌন হিংসা প্রতিরোধ এবং কর্মক্ষেত্রে আভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির সম্পর্কে এই বিল কোন মন্তব্য করেনি।
অভয়া আন্দোলন প্রথম থেকেই শুধু ধর্ষকের শাস্তির দাবিতে থেমে থাকেনি। উঠে এসেছে লিঙ্গসংবেদী বেশ কিছু দাবি- সব কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় ICC (Internal Complaint Cell), সংগঠিত ও অসংগঠিত কর্মক্ষেত্রে এবং রাস্তা ঘাটে নারী সুরক্ষার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা, victim blaming কে আইনের আওতায় আনা, সমস্ত কর্মক্ষেত্রে এবং রাস্তা ঘাটে নারী ও প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার মানুষ দের জন্য রাত দিন ব্যবহারের শৌচালয়, কর্মরতা নারী দের জন্য কর্মস্থলের পাশে সরকারি ক্রেশ চালু করা ইত্যাদি। এর সঙ্গে রাত দখল ও পরবর্তী কর্মসূচির মাধ্যমে ছিল রাতের সাথি প্রকল্প বিরোধী ঘোষণা – ‘সব পরিসর কে মেয়েদের পরিসর, সব সময়কে মেয়েদের সময়, সব পথ কে মেয়েদের হাঁটার মত পথ’ করে তোলার দাবি।
এই আন্দোলনে বিপুল সংখ্যক মেয়েদের অংশগ্রহণ নারী পুরুষের বিভাজন রেখা গুলি কেই চ্যালেঞ্জ করেছে। তাই রাতের সাথি প্রকল্প ঘোষণা করে মেয়েদের রাতে ঘরের বাইরে কাজের অধিকার কে যখন সরকার কেড়ে নিতে চায় নিরাপত্তার অজুহাতে তখন মেয়েরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে । রাতদখলকারী মেয়েদের এই দুর্জয় সাহস কে বুঝতে গেলে মেয়েদের অন্য লড়াই গুলোর দিকে একটু নজর দেয়া দরকার। সরকার এবং মালিক পক্ষের বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে আশা কর্মী, মিড ডে মিল কর্মী, চা বাগানের মহিলা কর্মী এবং বিভিন্ন ছোট বড় ট্রেড ইউনিয়নে মেয়েদের বিরামহীন সংগঠিত আন্দোলন ছাড়াও বিভিন্ন গ্রাম শহরতলি তে চোলাই মদের ঠেক ভেঙ্গে দেওয়া অসংগঠিত মেয়েদের লড়াই রাত দখল আন্দোলনের রাস্তা প্রস্তুত করেছে।
২০২৪ সালের ২৮ শে অক্টোবর অভয়া মঞ্চ গড়ে উঠেছে নাগরিক সংগঠন গুলির মত বিনিময়ের মাধ্যমে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারণা ভেঙ্গে ফেলে নতুন নির্মাণের জন্য শিক্ষা শিবির অত্যন্ত জরুরি। ইতিমধ্যে দুইটি শিক্ষা শিবির আয়োজন করেছে অভয়া মঞ্চ। ১ ডিসেম্বর ২০২৪ ভারতসভা হলে লিঙ্গসাম্য রাজনীতির শিক্ষা শিবিরে শ্রমজীবী মানুষের উপস্থিতি এবং অংশ গ্রহণ চোখে পড়ার মত। স্বাতী ভট্টাচার্য লিখছেন – “বহু বহু দিন পরে ফের শ্রমজীবী মানুষের অপরিমিত, নিহিত শক্তি কে জাগরিত করে তা থেকে নিজের গতিশক্তি আহরণ করতে চাইছে নাগরিক আন্দোলন … শহরের সংগঠকদের ডাকে যখন এক অঘ্রাণের বিকেলে গ্রামের মেয়েরা ভারত সভায় বলেন ‘ আমরা বাড়তি পাঁচশো টাকা সরকারের কাছ থেকে ভিক্ষা চাই না, আমাদের পরিশ্রমের সম্মান চাই ‘, যখন দাবি করেন ‘আমরা যেন যখন ইচ্ছা বাড়ি ঢুকতে পারি, কেউ যেন আমাদের নামে কিছু বলতে না পারে’, তখন পথের একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সংহতির মাধ্যমে সাম্য- এই পথ নতুন নয়, তবু প্রতি প্রজন্মকে নতুন করে সে পথ তৈরি করতে হয়।”
শহরের বড় মেডিক্যাল কলেজে নিরাপত্তার অভাবকে সর্বত্র মেয়েদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে যুক্ত করে থ্রেট আর রেপ কালচারের অবসানের দাবি তে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে রাজপথ থেকে আলপথে । শহুরে এলিট আন্দোলনের গণ্ডী ছাড়িয়ে দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন একান্ত ভাবে প্রয়োজনীয় ।
অভয়া মঞ্চ শুধুমাত্র একজন অভয়ার বিচারের জন্য গঠিত হয়নি, আর অভয়া না হতে দেয়াই এই মঞ্চের অন্যতম লক্ষ্য। তাই এই মঞ্চের অন্যতম প্রধান দাবী হল নারী সুরক্ষা। এই নারী সুরক্ষার প্রশ্নে অভয়া মঞ্চ অবিরাম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং যাবে। এই ভাবেই আর জি করের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে কোন্নগর, শুলুংগুড়ি এবং বাংলার প্রতি প্রান্তে। অভয়া আন্দোলন মিশে যাচ্ছে প্রত্যন্ত জেলা ও গ্রামের আন্দোলনে।
সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজ, রাজার হাট, ব্যারাকপুর, চন্দননগর, কোন্নগর, ক্যানিং, গরফা এবং হরিদেবপুরে নারীনির্যাতন ও ধর্ষণ বিরোধী কার্যকলাপে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা নিয়েছে অভয়া মঞ্চ। রাজার হাটের যাত্রাগাছি, গৌরাঙ্গ নগর, শুলুঙ গুড়ি, জগৎপুর এবং সংলগ্ন এলাকা জুড়ে নারী সুরক্ষা বৃদ্ধি এবং অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধের দাবিতে অভয়া মঞ্চ বৃহত্তর বিধান নগর বিগত কয়েক মাস ধরে কাজ করে আসছে। এলাকার মানুষের সঙ্গে আলাপ আলোচনা এবং প্রচারের মাধ্যমে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করছে এই মঞ্চ। একাধিক বার স্থানীয় থানা এবং বিধান নগর কমিশনারেট অভিযান করে ডেপুটেশন দিয়েছেন এই মঞ্চের সদস্যরা। কোন্নগরে প্রতিবন্ধী নাবালিকার খুনের প্রতিবাদে রাজ্য প্রতিবন্ধী সম্মিলনী ও ‘প্রচেষ্টা’নামক সংস্থার সঙ্গে যৌথ ভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি নিয়েছে অভয়া মঞ্চ। ক্যানিং এ কার্যত শাসক দলের চক্রব্যুহে ঢুকে ধর্ষিত নিহত কিশোরীর বিচারের জন্য লড়াই শুরু করেছে অভয়া মঞ্চ বৃহত্তর দক্ষিণ এবং বেহালা প্রতিবাদী মঞ্চ। জনচেতনা মঞ্চ, জনসংস্কৃতি, বিজ্ঞানমনস্ক, অভয়া মঞ্চ বৃহত্তর দক্ষিণ, বেহালা প্রতিবাদী মঞ্চ, বৃহত্তর বারাসাত অভয়া মঞ্চ, বৃহত্তর সিঙ্গুর অভয়া মঞ্চ, বৃহত্তর জলপাইগুড়ি অভয়া মঞ্চ – অভয়া মঞ্চের সহযোগী বিভিন্ন সংগঠন ও মঞ্চগুলির সাহায্যে জেলা গুলিতে ছড়িয়ে পড়ছে অভয়া মঞ্চের প্রতিবাদ কর্মসূচি ।
অভয়া মঞ্চ শুধু রাজ্যের অভ্যন্তরে নয়, সারা দেশ ব্যাপী প্রতিমুহূর্তে ঘটে চলা যৌন নির্যাতন এর বিরুদ্ধে লড়াই এই মঞ্চের। কেরালায় মহেশতলা অঞ্চলের চারজন নারী শ্রমিকের ভয়াবহ নির্যাতনের তদন্ত করতে মহেশতলা ষোল বিঘা বস্তি বাঁচাও সংগ্রামী মণ্ডলীর সঙ্গে কেরালায় গেছে অভয়া মঞ্চের একটি প্রতিনিধি দল। আর্থিক এবং আইনী সহায়তা নিয়ে ষোল বিঘা বস্তি বাঁচাও সংগ্রামী মণ্ডলীর পাশে আছে অভয়া মঞ্চ। কর্ণাটকে শ্রীক্ষেত্র ধর্মস্থল মঞ্জুনাথ স্বামী মন্দির সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরে ঘটে চলা ভয়াবহ নারী ঘাতী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিবৃতি মারফৎ সারা দেশের শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন প্রতিবাদী মানুষ এবং গণতান্ত্রিক ও মহিলা সংগঠন গুলির কাছে জনমত ও গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছে অভয়া মঞ্চ । অভয়াহত্যার ন্যায়বিচারের দাবি তে গড়ে ওঠা এই মঞ্চ রাজ্য এবং দেশের প্রতিটি প্রান্তে নারী সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ । এই লক্ষ্যপূরণে সন্ত্রাস সংস্কৃতির অবসান আবশ্যিক শর্ত ।
“বাংলার আকাশে এখনও অন্ধকার। নিবিড় রাত… একটা অন্ধকার রাতের পরিবর্তে জ্বলে ওঠে বহু আলো। রাতদখলের দ্রোহ গাথা রচনা করে মেয়েরা… এই রাত দখল কেবল একরাতের স্পর্ধা নয়, প্রতিরাতের গল্প হোক”। [3]
শুধু সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন হলেই ধর্ষণ বা নারীনিগ্রহ বন্ধ হয়ে যাবে এমন নয়। ক্ষমতাতন্ত্রের আমূল পরিবর্তন ছাড়া নারী সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা সম্ভব নয়। যে সংস্কৃতি নারীকে ভোগ্য পণ্য ভাবতে শেখায় তার উৎপাটন ছাড়া ধর্ষণ রোধ করা সম্ভব নয়। সামাজিক দুর্নীতি আর লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সংঘর্ষের পাশাপাশি নতুন চিন্তা ও সংস্কৃতির জন্ম – এই ভাবেই নির্মাণের পথে এগিয়ে চলেছে অভয়া মঞ্চ-
উন্মুখ সৃষ্টির বেদনায় কাঁপে মাটির রোমকূপ/ ভয়ের চাঁদোয়া ছিঁড়ে ভুইফোড় বর্শার মতন/
মাথা তোলে কৃষ্ণচূড়া, লালে লাল আবীর গুলাল/ কাফির তীব্র তানে অকাল বসন্ত আসে, মুক্তির বোধন।“[4]
________________________________________________
[1] চিরশ্রী দাশগুপ্ত, ‘মধ্যরাতে ডাকলে দিও সাড়া’, অদিতি বসু রায় (সম্পাদিত), ১৪ ই অগাস্ট
[2] অদিতি বসু রায় , ১৪ ই অগাস্ট (blarb.)
[3] চিরশ্রী দাশগুপ্ত, ‘মধ্যরাতে ডাকলে দিও সাড়া’, অদিতি বসু রায় (সম্পাদিত), ১৪ ই অগাস্ট
[4] দেবাশিস গোস্বামী, ‘ নীল নগরীর বুকে কৃষ্ণচূড়া’
পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত কর্মচারী সমিতি সমূহের যৌথ কমিটির ‘পঞ্চায়েত দিশা’-র ২৫তম বর্ষ ৩য় সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত।









