দেশজুড়ে তুমুল বিতর্ক ও আলোড়নের মধ্যে দিয়ে বিহারে সম্পন্ন হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India or ECI) কর্তৃক নির্বাচনী তালিকার (Electoral Roll or ER) ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision or SIR)’ এর কাজের প্রথম পর্ব সম্পন্ন হল। এরপর হবে অসম, তামিলনাড়ু, কেরল ও পুদুচেরি সহ ১১ টি রাজ্যে যেখানে আগামী দিনে বিধানসভা নির্বাচন রয়েছে, অন্যদিকে কয়েকটি বাদে পশ্চিমবঙ্গ সহ যে রাজ্যগুলি কেন্দ্র শাসক দল বিজেপির দিগ্বিজয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে সেই রাজ্যগুলিতে।
১৯৫১ সালের Representaton of the People’s Act অনুযায়ী নির্বাচনী তালিকার সুনিবিড় সংশোধন হয়, নিয়মিত হওয়া উচিত এবং অতীতেও ১৩ বার হয়েছে (১৯৫২ – ৫৬, ১৯৫৭, ১৯৬১, ১৯৬৫, ১৯৬৬, ১৯৮৩ – ৮৪, ১৯৮৭ – ৮৯, ১৯৯২, ১৯৯৩, ১৯৯৫, ২০০২, ২০০৩ এবং ২০০৪)। কিন্তু এবারের বিতর্ক ও আলোড়ন অনেকগুলি কারণে:
(১) প্রতিবার নির্বাচন কমিশন নিজের মত করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে সংশোধন করে। ডিজিটালাইজেশনের পরবর্তী সময়ে প্রাপ্ত বিভিন্ন সরকারি তথ্য থেকে নিজেদের কাছে থাকা তথ্য ভান্ডার আপডেট করে থাকে যেগুলি জনজীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলে না। এবার নির্বাচন কমিশনের হম্বিতম্বি থেকে শুরু করে সব কাজ ফেলে, জনজীবনকে ব্যতিব্যস্ত করে, অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে, ঠিক নির্বাচনের আগে এই ‘এস আই আর’ প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
(২) এতদিন নির্বাচন কমিশন তথ্য সংগ্রহ করে এটি সম্পন্ন করছিলেন। এবার নির্বাচকদেরই (Electorate) কাগজপত্র দাখিল করে প্রমাণ করতে হচ্ছে যে তাঁরা ভারতের বৈধ নাগরিক এবং নির্বাচক হওয়ার যোগ্য।
(৩) ‘এস আই আর’ এর মাধ্যমে এতদিনকার প্রবল প্রতিবাদে করতে না পারা ‘ জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (National Registers of Citizens or NRC) এবং ‘ জাতীয় জনসংখ্যা পঞ্জি (National Population Register or NPR) ‘ এর কাজ করে নেওয়া।
(৪) UDAI AADHAAR এর মত সর্বজনগ্রাহ্য নথি গ্রহণ না করে এমন অনেক নথি চেয়ে বসা যা সাধারণ মানুষের পক্ষে সংগ্রহ করা বিশেষত ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে যে উদ্বাস্তুরা পরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছেন তাদের পক্ষে সংগ্রহ করা কঠিন অথবা অসম্ভব। কিছু ক্ষেত্রে শীর্ষ কোর্ট পরে ছাড় দিলেও সাধারণের বিশেষ করে গরীব, শ্রমজীবী, পরিযায়ী শ্রমিক ও উদ্বাস্তুদের একটি বড় অংশের ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে নাগরিকত্ব হরণ (Forfeiture of Citizenship) ও বেনাগরিক হয়ে একঘরে হয়ে যাওয়া (Ostracized) বাকি থাকেনা।
(৫) ২০০২ কেই কেন ভিত্তি ধরে ‘ম্যাচিং’ , নির্বাচন কমিশন আজ অবধি সদুত্তর দিতে পারেননি।
(৬) বিহার নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন ও ‘ এস আই আর ‘ এর ভূমিকা। যেখানে প্রায় ৬০ লক্ষ নাগরিকের নাম নির্বাচনী তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে যারা মূলত দরিদ্র শ্রমজীবী দলিত ও একাংশ মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ এবং মূলতঃ বিরোধী দলগুলির ভোটার। বাতিল দের মধ্যে প্রচুর পরিযায়ী শ্রমিক, ভূমিহীন ক্ষেত মজুর এবং উক্ত পরিবারগুলির মহিলারা রয়েছেন।
(৭) বিহার নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ‘এস আই আর’ পরবর্তী নির্বাচনী তালিকায় ব্যাপক Duplication (বিভিন্ন রাজ্যের ও নির্বাচনী কেন্দ্রের তালিকায় একই নাম) ও প্রচুর হিসাব বহির্ভূত ভোটের পরিসংখ্যান সামনে এসেছে যা শাসক দলের জোটের বিরোধীদের ধ্বস নামানো ভোটে পরাজয়ের (Landslide Victory) ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বলেই ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন।
(৮) বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কাজের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব এবং বিরোধীদের ব্যাপক অভিযোগ ও তথ্য সরবরাহের আবেদনকে ক্রমাগত অগ্রাহ্য করে চলা। এমনকি প্রমাণ না রাখার জন্য বুথের ভিডিও কিছুদিন পরেই মুছে ফেলা হচ্ছে।
(৯) বর্তমান নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার অভাব এবং কেন্দ্রের শাসক দলের হয়ে কাজ করে চলার ধারাবাহিক ভূমিকা।
(১০) নির্দিষ্টভাবে মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিতর্কিত ভূমিকা, তার সঙ্গে কেন্দ্র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ সম্পর্ক এবং জ্ঞানেশ কুমারের পরিবারের বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্তি। কেন্দ্র সরকার আইন করে তাকে বিশেষ রক্ষা কবচ দিয়েছেন।
যদিও প্রথম থেকেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস দলের তরফে ‘এস আই আর’ এর প্রবল বিরোধিতা করে আসা হয়েছে, তথাপি জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে বিজেপির প্রধান সহযোগী পশ্চিমবঙ্গের পরাক্রমশালী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্মতি যে ছিল তা তার নিষ্ক্রিয় বিরোধিতা দেখে বোঝাই গেছিল। তিনি যদি মনে করতেন এটি এই রাজ্যে হতে দিতেন না। অতীতে যেমন তাঁর প্রবল বিরোধিতায় এবং প্রশ্রয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান সম্প্রদায়ের একাংশের প্রবল ও হিংসাত্মক বিরোধিতা, বিক্ষোভ, পথ অবরোধ, রেল সহ কেন্দ্র সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে কেন্দ্রের ‘ এন আর সি ‘ এবং ‘ নতুন ওয়াকফ আইন ‘ মুখ থুবড়ে পড়ে। প্রথমটির ক্ষেত্রে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংগঠনের থেকে বলপূর্বক আন্দোলনের নেতৃত্ব কেড়ে নেন এবং দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে সেইসময় রাজ্য সরকারের ব্যাপক নিয়োগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে চাকরিহারা শিক্ষকদের প্রবল আন্দোলন চলছিল । সেটি নিস্তেজ করতে মুর্শিদাবাদ জেলার ধুলিয়ান – শমসেরগঞ্জে ‘নতুন ওয়াকফ আইন’ বিরোধী বড়সড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটানো হয়। পুলিশ প্রশাসন কে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় রেখে টানা তিনদিন দুষ্কৃতীদের দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়কে আক্রমণ করা হয়। দু জন বাম সমর্থক পিতা – পুত্র মৃৎশিল্পী নিহত ও অনেকে আহত হন। হিন্দু সম্পত্তি ভাঙচুর ও লুঠ হয়, হিন্দু দেবস্থান বিনষ্ট হয়, হিন্দু মহিলারা অপমানিত হন এবং বহু হিন্দু পরিবার শরণার্থী হয়ে পার্শ্ববর্তী মালদা ও ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জ ও পাকুড় জেলায় আশ্রয় নেন। পুলিশের গাড়ি, রেলের সম্পত্তি তে অগ্নি সংযোগ ঘটানো হয়। পরে বি এস এফ এসে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেয়। বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় যাদের দিয়ে দাঙ্গা করানো হল তারা সম্ভত জানেন না ওয়াকফ বিষয়টি কি, খায় না মাথায় দেয়? এই ঘটনার পর কেন্দ্র ‘ এন আর সি ‘ এর মত ওয়াকফ নিয়েও পিছিয়ে যায়। বর্তমানে ওয়াকফ নিয়ে কেন্দ্রের কিছুটা মধ্যবর্তী অবস্থানে আসা এবং মুখ্যমন্ত্রীর কিছুটা নরম অবস্থান দেখাচ্ছে অবশেষে এখানেও একটি বোঝাপড়াজনিত সূত্র বেরিয়েছে।
মুখে বিরোধিতা করলেও এবারের পশ্চিমবঙ্গের ‘এস আই আর’ এর আগমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের কাছে অযাচিত সুযোগ নিয়ে আসে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্প, কর্মসংস্থান, আইন শৃঙ্খলা, দুর্নীতি প্রমুখ রাজ্যের মৌলিক বিষয়গুলি না ছুঁয়ে কেবল অ্যাড হকে ও ডোল দিয়ে রাজ্য চালানোয় প্রতিষ্ঠান বিরোধী মনোভাব ক্রমশঃ বাড়ছিল। কেন্দ্রের সাহায্যে তিলোত্তমা হত্যাকাণ্ড চাপা দিতে পারলেও শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি থেকে সরকার ও দল কিছুতেই বেরিয়ে আসতে পারছিল না। ঠিক সেই সময় কেন্দ্র উপহার হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে ‘ এস আই আর ‘ পাঠালো। সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূল সর্বাত্মকভাবে মাঠে নেমে পড়ল। বিজেপির গণভিত্তিহীন রাজ্য নেতারা যখন ‘ এস আই আর ‘ এর মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের ৪০ % মুসলমান ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার দিবাস্বপ্নতে মশগুল সেখানে তৃণমূল নেতা কর্মীরা রাস্তায় নেমে ‘ এস আই আর ‘ এর তীব্র বিরোধিতা করে একদিকে যেমন কংগ্রেস, বাম প্রমুখের থেকে বিরোধী পরিসরটি কেড়ে নিলেন তেমনই ৪০% মুসলমান এবং ৩০% হিন্দু উদ্বাস্তু ভোট কে আশ্বস্ত করলেন। তৃণমূলের পরামর্শদাতা ‘ আই প্যাক ‘ সংস্থার মাধ্যমে তৃণমূলের নিজস্ব ভোটার তালিকা প্রস্ত্ততই ছিল। এবার সারা রাজ্যে শক্তিশালী সংগঠনকে মাঠে নামিয়ে একদম বুথ স্তর অবধি ক্যাম্প করে নির্বাচন কমিশনের নিয়োজিত Booth Level Officer (BLO) দের দিয়েই নিজেদের তালিকাটিকে তারা নথিভুক্ত করলেন। কোন BLO এর পক্ষে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের নির্দেশ অমান্য করা সম্ভব নয়। আসল জায়গায় অনুপস্থিত থেকে বিজেপি নেতারা সংবাদ ও সমাজ মাধ্যমে গর্জন করে শুধুমাত্র আত্মপ্রসাদ লাভ করে গেলেন। এক্ষেত্রেও বাম ও কংগ্রেস তাদের সংগঠনে বাসা বাঁধা জড়তা ও নিষ্ক্রিয়তা যথারীতি বজায় রাখলেন। আর তথাকথিত বিপ্লবীদের কথা নাই বা বললাম। এখন তাদের এই রাজ্যে কিছু নেইও, কিছু করেনও না। একজন মুসলিম ভোটার এবং একজনও বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের নাম বাদ গেলনা যারা ইতিমধ্যে সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে রেখেছিলেন। সুতরাং তৃণমুলের ভোট ব্যাঙ্ক অটুট রইলো। একেবারে সম্প্রতি আসা অথবা যারা ছিদ্র সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করেন তাদের একাংশর অদৃশ্য হওয়াকে দেখিয়ে কিছু কিছু প্রেস বিজেপি নেতাদের খুশি করল মাত্র। বিপদে পড়লেন এবং বাদ পড়লেন হিন্দু শরণার্থীদের এক বড় অংশ যারা বিজেপি ও মতুয়া নেতা এবং মোদিজীর মৌখিক আশ্বাসে ভরসা করেছিলেন। আদালতের রায়ও তাঁদের বিরূদ্ধে গেছে। এদের বেশিরভাগই গরীব, ভূমিহীন, তফসিলি সম্প্রদায়ের। এখন অবধি নাম যা বাদ পড়েছে (৫৭ লক্ষ)সেগুলি মৃত ভোটার (২৪ লক্ষ), কিছু কর্মসূত্রে বাইরে থাকা এবং বাকিটা নানা ধরনের ‘ভুতুড়ে ভোটার (বানানো নাম, এক নাম বিভিন্ন জায়গায়, নিখোঁজ ইত্যাদি)’ যেগুলি সি পি আই এম এর ভোট বিশেষজ্ঞদের সৃষ্টি এবং পরবর্তিতে তৃণমূলের ভোট বিশেষজ্ঞদের হাতে বৃদ্ধি। নিজেদের সরকারি কাজ চালিয়ে এই অল্প সময়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নথি মিলিয়ে কাজের চাপের চাইতেও একদিকে অসহযোগিতামূলক নির্বাচন কমিশন অন্যদিকে রাজ্য সরকার ও স্থানীয় দোর্দণ্ডপ্রতাপ তৃণমুল নেতারা – দুই তরফের প্রবল চাপে কয়েকজন BLO এর দুঃখজনক মৃত্যু ঘটল। তাঁদের কেউ কেউ অসুস্থও ছিলেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বাস্তুদের আতঙ্কের পাশাপাশি অসুস্থতা, বয়সজনিত ও অন্যান্য কারণেও কিছু মৃত্যু ঘটল। কয়েকজন আত্মহত্যা করলেন। তৃণমূলের প্রচার বাহিনী এই ঘটনা গুলিকেও কাজে লাগালো। বিষয়টি বিজেপির বিরুদ্ধেই গেল।
বিহারের ‘এস আই আর’ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখালো সংশোধন নয় এটির আসল লক্ষ্য নির্বাচনে শাসক দলকে জেতানো যদিও বিষয়টি বিহার ও অসমের মত পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, পুদুচেরি ও কেরলে সহজ হবে না। এবার সংশোধনের আরেক গুঢ় উদ্দেশ্য অনুপ্রবেশ চিহ্নিত করা, জনবিন্যাস রোধ করা ইত্যাদি বিষয়ের কারণ, উৎস, উদ্দেশ্য ইত্যাদি বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক।
বিশ্বের সবচাইতে ধনী দেশ ভারতকে দখল ও লুঠ করে ইংল্যান্ড বিশ্বের সবচাইতে ধনী দেশ হয়ে উঠল। বস্ত্র সহ বিভিন্ন শিল্পে বিশ্বের অগ্রগণ্য এবং কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদে পুষ্ট বাংলা ছিল সবচাইতে সম্পদশালী সুবা। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের এই শ্রীবৃদ্ধি সহজে হয়নি। দেশের কৃষক, কারিগর ও জনজাতিরা প্রবল বাধা দিয়েছেন এবং একের পর এক বিদ্রোহ করেছেন। কিন্তু ভারতীয়দের অনৈক্য, ব্রিটিশের ছলচাতুরি ও উন্নত সামরিক শক্তির কাছে সেগুলি পরাজিত হয়। কিন্তু ১৮৫৭ এর মহা বিদ্রোহ তে হিন্দু – মুসলমান কৃষক, কারিগর, কর্মহীন সৈনিক, অপসারিত রাজা – নবাব রা ঐক্যবদ্ধ হয়ে যে সংগ্রাম চালিয়েছিলেন তাতে ব্রিটিশরা ক্ষমতাচ্যুত হয়। পরে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে ব্রিটিশ রা হিন্দু – মুসলমান ঐক্য ধ্বংসের কাজটি শুরু করে এবং তাদের বশংবদ উচ্চবর্ণের রাজা – জমিদার ও আশরফ রাজা – নবাব এবং দুই সম্প্রদায়ের মৌলবাদী ও ধর্মগুরুদের সঙ্গে নেয়। উচ্চবর্ণের হিন্দু, আশরফি মুসলমান ও ধনী পার্সি দের নিয়ে ‘ সেফটি ভালভ ‘ জাতীয় কংগ্রেস গড়া ছাড়াও বিভিন্ন হিন্দু ও ইসলামি সংগঠন গড়ে তোলে এবং মিশ্র বসবাসের এলাকাগুলিতে সম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু করে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে।
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শেষ দিক থেকে ব্রিটিশ শাসকরা মুসলিম লীগ কে কংগ্রেসের সমান গুরুত্ব দিয়ে দ্বি জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পৃথক নির্বাচনী আসন, পরিশেষে পৃথক রাষ্ট্রের দাবি তোলায়। পাশাপাশি হিন্দু মহাসভা ও আর এস এস কেও মদত দিতে থাকে। সেইসময় থেকে ভারতে বড় বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটতে থাকে। পূর্ব বাংলা থেকে বর্ণ হিন্দুরা কলকাতা ও পশ্চিম বাংলায় চলে আসতে শুরু করেন। কিন্তু সবচাইতে বৃহৎ মিশ্র সম্প্রদায় অধ্যুষিত বাংলা ও পাঞ্জাবে ধর্মনিরপেক্ষ জনপ্রিয় আঞ্চলিক শক্তি (বাংলায় ‘ কৃষক – প্রজা পার্টি ‘ ও ‘ সিডিউল্ড কাস্ট ফেডারেশন ‘ এবং পাঞ্জাবে ‘ ইউনিয়নিস্ট পার্টি ‘) ক্ষমতায় থাকায় চল্লিশের দশকের প্রথম দিক অবধি ব্রিটিশের মদতে সাম্প্রদায়িক – কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, হিন্দু মহাসভা রা সুবিধা করতে পারে না। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ, ব্রিটিশ – ইস্পাহানি কৃত দুর্ভিক্ষ ও একের পর এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন করে। বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতায় চলে আসে সাম্প্রদায়িক – কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভা। তাদের দিয়ে ব্রিটিশ শাসকরা সম্প্রদায়িক বিভাজন ঘটিয়ে ১৯৪৭ এ দেশভাগ অর্থাৎ বাংলা ও পাঞ্জাব কে ভাগ করে দেয় এবং অনুগত তাদের হাতেই ভাঙ্গা দেশের শাসনভার অর্পণ করে। গড়ে ওঠে ধর্মনিরপেক্ষ ভারত এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলে ইসলামি পাকিস্তান। দেশব্যাপী দাঙ্গার মধ্যে বিশেষ করে সুরাবর্দি পরিচালিত ৪৬ এর কলকাতা দাঙ্গা এবং ৪৬ এই সংঘটিত নোয়াখালির দাঙ্গায় হিন্দু নিধন পূর্ব বাংলা থেকে হিন্দুদের দলে দলে পশ্চিম বাংলায় চলে আসতে বাধ্য করে।
পাঞ্জাবেও দেশভাগের পর্বে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা ঘটলেও হিন্দু ও শিখ পাঞ্জাবিরা ভারতে থেকে যাওয়ায় / চলে আসায় এবং মুসলমান পাঞ্জাবিরা পাকিস্তানে থেকে যাওয়ায় / চলে যাওয়ায় দুঃখজনক হলেও বিষয়টির একটি স্থায়ী নিষ্পত্তি হয়। কিন্তু বাংলায় ৩০ ও ৪০ এর দশক জুড়ে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভার জমিদার – রাজা – নবাব দের শহুরে এলিট রাজনীতির বিপরীতে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নেতৃত্বে এক বহুজনবাদী রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ফজলুল হক এবং তাঁর নেতৃত্বে বাংলার মুসলমান ও নমঃশূদ্র কৃষক – প্রজারা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। পূর্ব বাংলার হিন্দুদের একটি প্রধান অংশ ছিল নিম্নবর্ণের নমঃশূদ্র কৃষকরা। অত্যাচার, শোষণ ও অবহেলাকারী উচ্চবর্ণের কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার বর্ণ হিন্দু নেতাদের ত্যাগ করে স্বাভাবিক মিত্র মুসলমানদের ‘ মুসলিম লীগ ‘ এর সঙ্গে দেশভাগের পর যোগেন্দ্রনাথ পাকিস্তানে যোগ দেন। তাঁর নির্দেশে নমঃশূদ্র রা পূর্ব বাংলা তে থেকে যান এবং মুসলমান ও নমঃশূদ্র দের মধ্যে দাঙ্গার প্রভাব পড়েনা। কিন্তু জিন্নার মৃত্যু, পাঞ্জাবি উর্দুভাষী মৌলবাদী বাঙালি – বিদ্বেষী শাসকরা পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করে নেওয়ায় যোগেন্দ্রনাথের সিদ্ধান্ত বুমেরাং হয়ে যায়। তাঁকে ভারতে পালিয়ে আসতে হয়। পূর্ব বাংলায় নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের উপর মৌলবাদী রাষ্ট্র ও ইসলামি ঘাতকদের আক্রমণ ও অত্যাচার শুরু হয়। এবার তাঁরাও ভারতে চলে আসা শুরু করেন। ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের বর্ণ হিন্দু শাসকরা তাঁদের আন্দামান, দণ্ডকারণ্য প্রভৃতি দুর্গম জায়গার ক্যাম্পে পাঠাতে থাকেন।
১৯৫০ এ পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলায় মুসলিম লীগ এর নেতা ও গুণ্ডারা ব্যাপক হারে হিন্দু নিধন ও হিন্দু সম্পত্তি দখল করায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি র মধ্যে একটি চুক্তি হয়। এই চুক্তিতে পূর্ব বঙ্গের সংখ্যালঘুদের সমস্যার কোন সমাধান হবে না মনে করে ভারত সরকারের দুই বাঙালি মন্ত্রী, শিল্প মন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং বাণিজ্য মন্ত্রী ক্ষিতীশচন্দ্র নিয়োগী কেন্দ্র সরকার থেকে পদত্যাগ করেন। পরে ভারত সরকার মন্ত্রী অনিলকুমার চন্দ ও চারুচন্দ্র বিশ্বাস কে পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুদের আশ্বস্ত করতে পাঠায়। পাকিস্তান ঐ চুক্তি মানেনা। হিন্দু, বৌদ্ধ, ক্রিশ্চিয়ান, জনজাতিদের উপর নির্যাতন চলতেই থাকে এবং তাঁরা প্রাণ হাতে ভারতে চলে আসতে থাকেন। ১৯৬৪ তে পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে আবার এক হিন্দু বিরোধী বীভৎস দাঙ্গা হয়। বহু হিন্দু পুরুষকে হত্যা এবং নারীকে ধর্ষণ ও বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয়। হিন্দু সম্পত্তি দখল ও লুঠ করা হয়। হিন্দু গৃহ ও দেবস্থান ধ্বংস ও অগ্নি সংযোগ করা হয়। আবার বহু হিন্দু ভারতে চলে আসেন। সেই সময় ভারত সরকার ১৯৫৫ সালে তৈরি হওয়া Citizenship Act এর মাধ্যমে সহানুভূতির সঙ্গে উদ্বাস্তুদের ছয় মাস বসবাসের পর আবেদনের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব (Citizenship) প্রদান করেন, রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করেন এবং তাঁদের ভোটার লিস্টেও নাম ওঠে। ১৯৬৫ এর ভারত – পাক যুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানের সখ্যালঘুদের উপর চাপ বাড়ায়।
১৯৭১ এর বাংলাদেশ যুদ্ধে পাক সেনা এবং তাদের দোসর জামাত, রাজাকার, আল বদর, আল শামস হার্মাদ বাহিনী ৩০ লক্ষ মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং চার লক্ষ নারীকে ধর্ষণ করে যাদের বেশিরভাগ হিন্দু। কয়েক কোটি উদ্বাস্তু মূলত হিন্দুরা ভারতে চলে আসেন। ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে কেন্দ্র সরকার এক কোটি উদ্বাস্তুর দায়িত্ব নেন। ২৬ মার্চ বাংলাদেশ স্বাধীন হলে বেশিরভাগ উদ্বাস্তু বাংলাদেশে ফিরে যান এবং কিছু ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে থেকে যান। একই সরকার ব্রিটিশ আমলের The Foreigners Act ঝুলি থেকে বের করে ১৯৭১ এর ২৯ নভেম্বর Foreigners (Restriction on Pakistani Nationals) Order 1971 বের করে যার ফলে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর যেসব উদ্বাস্তু থেকে যাবেন তাঁদের নাগরিকত্ব ও পুনর্বাসনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হল এবং পরবর্তীকালে বিপদে পড়ে ভারতে গমন আসার পথও বন্ধ করে দেন। ১৯৭১ এর যুদ্ধে শ্রীমতী গান্ধী পাকিস্তানের বিরূদ্ধে কড়া অবস্থান নিলেও ১৯৭২ এর সিমলা চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্থান কে যুদ্ধে দখল পাওয়া জমি ফেরত দেন এবং অত্যাচারী, ধর্ষক, লক্ষাধিক আত্মসমর্পণকারী পাক সেনা কে বৎসরাধিক কাল ভারতে রেখে , খাইয়ে – দাইয়ে পাকিস্তানকে ফিরিয়ে দেন। পাকিস্তান কিন্তু ৫৪ জন ভারতীয় সেনাকে ফিরিয়ে দেয় না।
ইতিমধ্যে ১৯৭২ ও ১৯৭৪ এ ইন্দিরা – মুজিব দুটি চুক্তি হলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, করুণ আর্থিক অবস্থার কারণে হিন্দুদের সঙ্গে বাংলাদেশের মুসলমানদেরও ব্যাপক হারে ভারতে নিরাপত্তা ও রুজি রোজগারের আশায় চলে আসার সূচনা। দেশভাগের সময় খুব অল্প সংখ্যক মুসলমান পরিবার পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ব পাকিস্তানে চলে যান।
১৯৭৫ এ একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সপরিবারে মুজিব হত্যার পর পাক পন্থী মৌলবাদী শাসকরা একের পর এক বাংলাদেশের ক্ষমতা আরোহণের ফলে হিন্দুদের উপর নির্যাতন উত্তরোত্তর বাড়ে। বাধ্য হয়ে অনেকে ভারতে চলে আসতে বাধ্য হন, যাঁরা তা পারেন না তাঁরা হয় ধর্মান্তরিত হন অথবা মানবেতর অত্যাচারিতের জীবন যাপন করতে থাকেন। ১৯৮৮ তে বাংলাদেশকে ইসলামি দেশে রূপান্তরিত করা হয় এবং ১৯৯২ তে ভারতে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর বাংলাদেশে হিন্দুরা প্রবলভাবে অত্যাচারিত হন। আবার ২০২৪ এর জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে পাকপন্থী তালিবানী এবং জামাত – রাজাকার রা ক্ষমতায় এসে হিন্দু, বৌদ্ধ, জনজাতি, আহমদি, বাউল, ফকির দের উপর ভয়ানক নির্যাতন শুরু করে। এর ফলে হিন্দু উদ্বাস্তুদের ভারতে আসার যে ঢল নামে ভারতের বিজেপি সরকার তা বি এস এফ কে দিয়ে প্রতিহত করলেও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয় না। স্বাধীনতার পর পূর্ব পাকিস্তানে যে ২৯% এর মত হিন্দু বাস করতেন তা কমে দাঁড়াল ৭% অর্থাৎ বর্তমান ১৭ কোটি। বাংলাদেশের জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় সোয়া এক কোটি।
বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় থেকে পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস সরকার হিন্দু উদ্বাস্তু দের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। বামরা একসময় ‘ সম্মিলিত কেন্দ্রীয় উদ্বাস্তু পরিষদের (UCRC) ‘ এর অধীনে উদ্বাস্তুদের নিয়ে আন্দোলন করলেও ক্ষমতায় এসে জ্যোতি বসুর, যার আদি বাড়ি পূর্ব বাংলার ঢাকা জেলায়, নেতৃত্বে ১৯৭৮ – ৭৯ এ মরিচঝাঁপি দ্বীপে সহায় সম্বলহীন দরিদ্র হিন্দু উদ্বাস্তুদের, যাঁরা ছিলেন দলিত সম্প্রদায়ের, উপর পুলিশ ও গুন্ডাদের সংগঠিত করে নৃশংস আক্রমণ ও গণহত্যা সংঘটিত করেন। অথচ তারা অর্থনৈতিক কারণে বাংলাদেশ থেকে ক্রমাগত আসা মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের ভোট ব্যাঙ্ক হিসাবে গড়ে তোলেন। তৃণমূল ক্ষমতায় এসেও একই প্রক্রিয়া চালিয়ে যায়। ফলে পশ্চিমবঙ্গের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা শেখ শাজাহানের মত বাংলাদেশ থেকে আসা সি পি আই এম ও তৃণমূলের বড় নেতা হয়ে ওঠা অপরাধী চোরাচালানী মাফিয়াদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
ওদিকে অসমের ছাত্র ও গণ আন্দোলনকে সামাল দিতে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ‘ অসম চুক্তি ‘ করেন এবং সেই চুক্তি মোতাবেক অসমের নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষায় Citizenship (Amendment) Act 1985 নিয়ে এলেন যেখানে অসমে উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব পাওয়ার কাট অফ ডেট হয়ে গেল ১৯৭১ এর ২৪ মার্চ এবং যাঁরা ১৯৬৬ – ‘৭১ অবধি এসেছেন তাঁদের নথিভুক্তির আগে ১০ বছর বসবাসের (Waiting Period) শর্ত আরোপিত হল। দেখা যাচ্ছে সর্বত্র বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ভারতে চলে আসা উদ্বাস্তুদের বেনাগরিক করে দেওয়া হল। রাজীব গান্ধী র কংগ্রেস সরকার Citizenship (Amendment) Act 1986 নিয়ে এসে নাগরিকত্ব র নিয়মাবলী আরও কঠোর করলেন যেখানে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে ছিল ভারতে কোন শিশু জন্মালে সে ভারতের নাগরিক হবে। নিয়ম পাল্টে করা হল নাগরিকত্ব পেতে ভারতে জন্মানো কোন শিশুর বাবা অথবা মায়ের একজনকে ভারতের নাগরিক হতে হবে। নরসীমা রাও এর কংগ্রেস সরকার Citizenship (Amendment) Act 1995 নিয়ে এসে নাগরিকত্ব আইনকে আরও কঠোর করে দিলেন।
হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী বিজেপি নেতা বাজপেয়ীর এন ডি এ সরকার এসে ১৯৪৬ এর কালা Foreigners Act এর উপর ভিত্তি করে Foreigners ( Report to The Police) Order, 2001 বের করে অনুপ্রবেশকারীদের (পড়ুন উদ্বাস্তুদের) ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর (Push Back বা Deportation) এবং যতক্ষণ না তা হচ্ছে তাঁদের আটকে রাখার কথা (Detention) বললেন। আবার তাঁর সময়েই এল ভয়ংকর Citizenship (Amendment) Act 2003। যেখানে আরও এগিয়ে এই উদ্বাস্তু দের অবৈধ অভিবাসী (Illegal Migrant) বলা হল এবং তাঁদের দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হল। খুলনার জামাই প্রণব মুখার্জির নেতৃত্বে বিরোধী কংগ্রেসীরা এই বিল সমর্থন করলেন। সংসদে বাম সহ কোন বাঙালি সাংসদ এর বিরোধিতা করলেন না। একই সঙ্গে NRC এবং NPR করার সিদ্ধান্তও ঐ সময় নেওয়া হল। অথচ Displaced Persons Rehabilitation and Compensation Act 1954 এবং Citizenship (Amendment) Act 2004 তৈরি করে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লি, রাজস্থান, গুজরাট প্রভৃতি রাজ্যে বসবাসকারী
পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ ও জৈন শরণার্থীদের নাগরিকত্ব, ক্ষতিপূরণ ও সার্বিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হল। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে ইসলামি মৌলবাদীদের দ্বারা নির্যাতিত প্রাণ হাতে করে ভারতে আসা বাঙালি হিন্দু মূলতঃ দলিত সমপ্রদায়ের উদ্বাস্তুরা নতুন করে বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে গেলেন।
২০০৩ এর বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তু বিরোধী কালাকানুন এর বিরূদ্ধে ‘ উদ্বাস্তু সংগ্রাম পরিষদ ‘, ‘ অল ইন্ডিয়া রিফিউজি ফ্রন্ট ‘ প্রমুখ এবং মতুয়া ধর্মাবলম্বীদের একাংশ আন্দোলন শুরু করেন। যার ফলশ্রতিতে Citizenship (Amendment) Act 2019 (CAA) প্রবর্তন হল যেখানে বলা হল আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ভারতে শরণার্থী হয়ে চলে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, জৈন, পার্সি রা আবেদনের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব পেতে পারেন। এর বিরূদ্ধে একদিকে অসমে অন্যদিকে অন্যত্র তৃণমূল, কংগ্রেস, বাম, নকশাল, মুসলমান সম্প্রদায় প্রবল আন্দোলন শুরু করল। ফলে ২০২৪ এ এটি রুল হলেও কেন্দ্র সরকার পিছিয়ে গেলেন। ফলে ১৯৭১ এর পরে চলে আসা সমস্ত হিন্দু উদ্বাস্তুদের যাঁদের বেশিরভাগ দরিদ্র কৃষিজীবী নমঃশূদ্র, রাজবংশী দলিত সম্প্রদায়ের নাগরিকত্ব আটকে রয়েছে। অন্যদিকে অসম জুড়ে যে NRC হল যাতে প্রায় ১৯ লক্ষ নাগরিককে বেনাগরিক ঘোষণা করা হল যার মধ্যে ১৪ লক্ষ র বেশি বাঙালি হিন্দু যাঁদের এক বড় অংশ দলিত উদ্বাস্তু। এদের অনেককে ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখা হল, অনেককে পুশ ব্যাক করা হল। বাকিদের জীবনেও নেমে এল বিপর্যয়। নমনি অসমে বাংলাদেশ থেকে এসে থেকে যাওয়া মুসলমান সম্প্রদায় কাগজপত্র তৈরি রাখায় এবং বদরুদ্দীন আজমলের নেতৃত্বাধীন ‘ অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট ‘ দলের ছত্রছায়ায় সংগঠিত থাকায় তাঁদের বিশেষ ক্ষতি হয় নি।
এত বড় এক জনপ্রিয় কাজ করার জন্য বিজেপি অসমের ক্ষমতায় চলে এল।
আর অনুপ্রবেশ? পশ্চিমবঙ্গ – বাংলাদেশ সীমান্তের ৪০৯৭ কিমি দৈর্ঘ্যর মধ্যে ৫৬৩ কিমি কাঁটাতারের বেড়াহীন। কোন জায়গায় বাংলাদেশ বাধা দিচ্ছে, কোথাও রাজ্য সরকার জমি দিচ্ছেন না, কোথাও বা কেন্দ্রের গড়িমসি। এছাড়াও রয়েছে অসংখ্য নদী – নালা – হাওড়। আর সংবাদ মাধ্যমে পারস্পরিক যতই দোষারোপ করা হোক কেন্দ্রের বি এস এফ – রাজ্যের পুলিশ – দালাল – স্থানীয় পঞ্চায়েত সবাই ভাইভাই টাকা নিয়ে মানব পাচার ও চোরাচালানের ইন্ধন দিতে।
এই হল ‘এন আর সি’, এস আই আর’, ‘সিটিজেন আমেন্ডমেন্ডস বিলস’ প্রভৃতির মাধ্যমে দলিত বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুদের বিতারণের ও বেনাগরিক করার যাবতীয় খুড়োর কল।








