গেল মঙ্গলবার সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, চোখে পিঁচুটি কেটে চোখ প্রায় বন্ধ হবার জোগাড়। জল দিয়ে চোখ ধুয়ে মনে হলো কনজাংটিভাইটিস হয়েছে। প্রয়োজনীয় চোখের ড্রপ দিয়ে একখান কালো চশমা আঁটিয়ে নিলাম। সকালে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের কাজ করে বিকেলে কোলকাতা গেলাম। তীব্র দাবদাহে বারবার বাতানুকূল যন্ত্রের আবেশ নেওয়া যে মোটেও সুখপ্রদ হয়নি তা পরের দিন সকালেও চোখের পিঁচুটিতে চোখ ঢেকে যাওয়ায় হাড়েহাড়ে অনুভব করছি। সাথে আবার যোগ দিয়েছে হালকা গলা ব্যথা। ফ্যারিংক্স হালকা লাল হয়ে আছে। চোখের ড্রপ দিচ্ছি। গরম নুন জলে গার্গলও চলছে। এ্যান্টিঅ্যালার্জিক ট্যাবলেটও চলছে। এরপরেও রীতিমতো ক্লাস নিচ্ছি, চেম্বার করছি। দু তিন দিন অবধি সেরকম কিছু না হলেও চতুর্থ দিনে দুপুরে খাবার পর গলা ব্যথাটা যেন চাগাড় দিয়ে উঠলো। অসহ্য ব্যথা। ঢোঁক গেলা তো দূরঅস্ত। কথা বলতেই পারছি না। গলার বাইরে থেকে ভয়েস বক্সের জায়গায় হাত দিলেও ব্যথা অনুভব করছি। সময় নষ্ট না করে অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যথার ওষুধ খুব কষ্ট করে গলায় চালান করলাম। গরম নুন জলে লেবুর রস ফেলে অল্প অল্প করে খেতে শুরু করলাম। কারণ ততক্ষণে বুঝে গেছি, ভাইরাল ল্যারিনজাইটিসে ভুগছি আমি। চোখের পিঁচুটি থেকে শুরু করে অসহ্য গলা ব্যথা। এক্ষেত্রে গারগল করে কিচ্ছুটি লাভ নেই। নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ দাদার পরামর্শ অনুযায়ী স্টেরয়েড শুরু করলাম। সাথে এক্কেবারে কথা না বলার চরম নিদান।
আমার দুশ্চিন্তা বাড়লেও শেষের পরামর্শে আমার চিকিৎসক স্ত্রী যাইপরনাই খুশি।
শুরু হলো অ্যাবসোলিউট ভয়েস রেষ্টের কঠিন প্রত্যবেক্ষণ।
ভাইরাল ল্যারিনজাইটিস, মূলত রাইনোভাইরাস, প্যারাইনফ্লুয়েঞ্জা, অ্যাডেনোভাইরাস, রেসপিরেটরি সিন্সিটিয়াল ভাইরাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস এসবের জন্য হয়ে থাকে।
ভাইসারের আক্রমণ ছাড়াও অনেকসময় পেটের অ্যাসিড রিফ্লাক্স হলে বা জোরে কথা বললে এমনকি ইনহেলার ব্যবহারেও হতে পারে।
১। স্টীম ইনহেলেশান, গরম জল খাওয়া, সম্পূর্ণ ভয়েস রেষ্ট বাধ্যতামূলক। ফিসফিসিয়ে কথা বললেও লাভের থেকে ক্ষতিই বেশি। ভয়েস রেষ্ট না নিলে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হতে পারে।
২। ইনফ্ল্যামেশন জনিত ব্যথা কমাতে প্যারাসিটামল ও কিছুক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত ভাবে স্টেরয়েড ব্যবহার করা যেতে পারে।
৩। সেকেন্ডারি ইনফেকশন কমাতে কিছু ক্ষেত্রে পেনিসিলিন গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিকও দেওয়া যেতে পারে।
যদিও এ রোগ সময়ের সাথে সাথে কমে যায় তাও নিশ্চিত হতে আমার শিক্ষক নাক কান গলা বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে ল্যারিংগোস্কোপি করে আনলাম। সংক্রমণজনিত পরিবর্তন ছাড়া বিশেষ কিছু নেই। নিশ্চিন্ত হলাম। এবার শুধু সুস্থ হওয়ার প্রতীক্ষায় দিন গোনা।
এ ক’দিন ছাত্রদের পড়ানো নেই, রোগীর কষ্টের কথা শোনা নেই। নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে শুধুই পড়ে চলা। মেডিকেল জার্নাল ছাড়াও সাহিত্যের রসাস্বাদনও করে চলেছি সারাদিন ধরে। দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততার রোজনামচায় নিরবিচ্ছিন্ন এ আপাত শান্তি, নিয়মিত রোগীদের চিন্তায় ব্যকুলও বটে। তবে আমার কণ্ঠরোধে সবচেয়ে খুশি হওয়া আমার চিকিৎসক স্ত্রী বাবা লোকনাথের পায়ে ফুল দিয়ে কি বিড়বিড় করলো কে জানে!










