পুঞ্চা ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এক শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর হামলা, হেনস্থা ও ভয় প্রদর্শনের ঘটনায় আমরা গভীর উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
একটি Neurotoxic Snake Bite-এর মতো অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ চিকিৎসাজনিত পরিস্থিতিতে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা নিঃসন্দেহে মর্মান্তিক। শোকাহত পরিবারের যন্ত্রণা আমরা উপলব্ধি করি। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ একজন কর্তব্যরত চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী কিংবা হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকের উপর শারীরিক ও মানসিক আক্রমণের মাধ্যমে হতে পারে না।
অভিযোগ অনুযায়ী, পুঞ্চা BPHC-তে কর্তব্যরত মহিলা চিকিৎসক ও BMOH-কে ঘিরে ধমক, নিগ্রহ এমনকি মারধরের ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয়, যিনি ডিউটিতেও ছিলেন না, তাকেও জনরোষের মুখে পড়তে হয়েছে। মহিলা চিকিৎসককে চুলের মুঠি ধরে টানার অভিযোগও সামনে এসেছে। অথচ হাসপাতালে দেখা যায়নি ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপস্থিতি। এই ধরনের ঘটনা শুধু চিকিৎসক সমাজের নিরাপত্তাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় না, সমগ্র স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপর ভয়ের আবহ তৈরি করে।
অভয়া আন্দোলনে অভয়ার খুন-ধর্ষনের বিচার যেমন আমাদের দাবি ছিল, তেমনই দাবি ছিল দ্বিতীয় কোনো অভয়ার ঘটনা যাতে আর না ঘটে। দাবি ছিল চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীরা যেন সুস্থ ও নিরাপদ কাজের পরিবেশ পান, নির্ভয়ে কাজ করতে পারেন। অথচ অভয়ার ঘটনার আগেও যেমন বারবার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর আক্রমণ নেমে এসেছে, এখনও সেই পরিস্থিতির কোনো বাস্তব পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। সরকার বদলের পর মানুষ আশা রেখেছে হাসপাতালগুলোতে অন্তত ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, বিশেষ করে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি স্তরের হাসপাতালগুলোতে। কিন্তু পুঞ্চার ঘটনার পর আমরা আশঙ্কিত হচ্ছি যে পূর্বতন ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে কিনা! আমরা সরকারের কাছে সদর্থক ভূমিকা আশা করছি এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দোষীদের চরম শাস্তি ও পরিকাঠামোর পরিবর্তন যাতে হয় সেই বিষয়ে।
চিকিৎসায় গাফিলতি আদৌ আছে কি না, তা তদন্তের বিষয়। ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে enquiry committee গঠনের কথা জানা গিয়েছে। আমরা দাবি জানাই, নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ্যে আনা হোক। কিন্তু কোনো মৃত্যুর পরই চিকিৎসকদের উপর মব ভায়োলেন্স ও দুষ্কৃতীদের তাণ্ডব আসলে সামগ্রিক ভাবে আইনের শাসনের অভাব ও অরাজক অবস্থাকেই নির্দেশ করে।
দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের মনে একটি বিপজ্জনক ধারণা তৈরি করা হয়েছে। মৃত্যু মানেই চিকিৎসকের গাফিলতি, হাসপাতালের সমস্ত সমস্যার জন্য দায়ী শুধুমাত্র চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীরা। অথচ হাসপাতালের দুর্বল পরিকাঠামো, পর্যাপ্ত কর্মীবলের অভাব, নিম্নমানের ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অবহেলার দায় যারা বহন করে, তাদের জবাবদিহি খুব কমই হয়। বরং সেই দায় এড়াতেই সমস্ত ক্ষোভ ঠেলে দেওয়া হয় সামনের সারিতে কাজ করা স্বাস্থ্যকর্মীদের দিকে।
West Bengal Junior Doctors’ Front স্পষ্টভাবে জানাতে চায়, হাসপাতালের রোগী পরিষেবা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। চিকিৎসকদের উপর হিংসা বন্ধ না হলে স্বাভাবিক স্বাস্থ্য পরিষেবা বজায় রাখা ক্রমশ অসম্ভব হয়ে উঠবে।
আমাদের দাবিগুলো স্পষ্ট:
• চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর হামলাকারী সমস্ত দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনানুগ ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
• প্রতিটি হাসপাতালে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত, উপযুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ভয়হীন কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
• হাসপাতালগুলিতে যথাযথ পরিকাঠামো, মানসম্মত ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী নিশ্চিত করতে হবে।
• পর্যাপ্ত সংখ্যায় চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করতে হবে।
• স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বল পরিকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার জন্য দায়ী দুর্নীতিগ্রস্ত ও উচ্চপদস্থ আধিকারিকদেরও তদন্তের আওতায় এনে জবাবদিহি ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা আক্রান্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশে আছি।
হিংসার বিরুদ্ধে, নিরাপদ স্বাস্থ্যব্যবস্থার পক্ষে
West Bengal Junior Doctors’ Front











