সরকারি হাসপাতালে কাজ করেছি, সব মিলিয়ে প্রায় ৩৫ বছর, বিভিন্ন জায়গায় অনেকগুলি হাসপাতালে। সবচেয়ে বেশি দিন ছিলাম চন্দননগরে। তবে, যেখানেই থাকি, সে ২-৩ বছরই হোক বা তার বেশিই হোক, হাসপাতালে কোনো ঘটনা ঘটবে আর সে সম্বন্ধে বিন্দুবিসর্গ কিছুই জানবো না, এ কোনো দিন কখনো সম্ভব নয়।
বস্তুতঃ, জানার জন্য কোনো পরিশ্রম করতে হতো না। অস্বাভাবিক কিছু ঘটলে, নার্সিং স্টাফ/গ্রুপ ডি স্টাফ/ অস্থায়ী কর্মী /রোগীর বাড়ির লোক/স্পেশাল অ্যাটেনডেন্ট/দালাল/ হাসপাতালে দায়িত্বে থাকা রাজনৈতিক কর্মী, কেউ না কেউ স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই বলতো সত্যি করে কী ঘটেছে। দালাল শুনে চমকে যাওয়ার কিছু নেই। জীবনের বেশিরভাগটাই কাজ করেছি মফস্বলে। সেখানের দালালদের সঙ্গে কোলকাতার বড় হাসপাতালের দালালদের পার্থক্য অনেক,ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক লেনদেন দুয়ের মাপকাঠিতেই। ব্যক্তিগত স্বার্থের বিষয় না থাকলেও তাদের কাছ থেকে অনেক ইনফরমেশন পাওয়া যেতো, এমনকি অনেক দু নম্বরি কাজকর্মের।
তাই, হাসপাতালের মধ্যে যেখানে যাই ঘটুক, ২৪ ঘন্টার মধ্যে তার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যাবে না, এ ছিল প্রায় অসম্ভব!!
খুব অবাক লাগলো, যখন আর জি করের ঘটনার কিছু ভাসাভাসা ছবি ও প্রচুর উত্তর না পাওয়া প্রশ্নাবলী ছাড়া আর কিছুই আমরা পেলাম না আর জি করের ছাত্র,সিনিয়র/জুনিয়র ডাক্তার, নার্সিং স্টাফ, কর্মী, সিভিক কর্মী, কারুর কাছ থেকে। এটা ঠিক তাদের অনেকেই আন্দোলনে অ়ংশগ্রহণ করেছেন, ‘অভয়া’র উদ্দেশ্যে ‘রাজপথ না ছাড়ার’ বার্তা পাঠিয়েছেন লাগাতার ভাবে। কিন্তু, এখনো পর্যন্ত কেউই এগিয়ে আসেন নি অন্ততঃ প্রকাশ্যে, সত্যিই কী ঘটেছিলো সেই রাত্রে সেটা জানাতে। হতে পারে CBIকে জানিয়েছেন, আবার নাও হতে পারে। অবশ্য CBI যে শোনার জন্য খুব আগ্রহান্বিত ছিল, এমনটাও বোধহয় ঘটনা নয়। প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গাঙ্গুলী মহাশয় তো সরাসরি আঙ্গুল তুলেছেন CBI এর দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারের দিকে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যপ্রমাণ পেয়েও তা ব্যবহার না করা বা ধ্বংসের জন্য।
প্রাক্তন CBI অধিকর্তা ও রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ডঃ উপেন বিশ্বাস একবার ABP Ananda এ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,তাঁকে আর জি করের সঙ্গে যুক্ত একজন জানিয়েছেন, সেখানের অন্ততঃ পঞ্চাশ জন জানেন, সত্যি করে কী ঘটেছিলো। পঞ্চাশ জন কিনা জানিনা, কিন্তু অন্ততঃ সেদিন ডিউটিতে থাকা নার্সিং স্টাফ, ডাক্তার এবং ডিপার্টমেন্টের অন্যান্য ডাক্তার বিশেষতঃ যাদের অধীনে মেয়েটি কাজ করতো, তারা জানবে না, সেটা হতেই পারে না। সোজাসুজি বলছি, বিভাগীয় যে শিক্ষকরা জানার চেষ্টাই করেন নি বা জেনেও না জানার ভান করেছেন, তাদের আর যাইহোক শিক্ষক হওয়ার কোনো অধিকার নেই।
কিছুদিন আগে বাড়ির কাছে পার্কে বিলম্বিত মর্নিং ওয়াকে গিয়ে হঠাৎ এক জুনিয়র ডাক্তার নেতা ও ABP Ananda এর এক পরিচিত সা়ংবাদিকের সঙ্গে দেখা। ডাক্তার নেতাকে বললাম, তুমি তো আর জি করেরই ছাত্র। প্রমাণ না হয় পুলিশ লোপাট করেছে, কিন্তু তা বলে জানা যাবে না কে বা কারা খুনি? আর কিছু না হোক, নামগুলো প্রকাশ্যে আসুক। সাংবাদিককেও জিগ্যেস করলাম, অতীতে অনেক বার যেমন জেসিকা লাল মার্ডার কেসে সংবাদ মাধ্যমের ভূমিকা ছিল অসাধারণ, সেই investigative journalism কি এখন আর হয় না? দুজনেই তাদের মতো করে উত্তর দিল, কিন্তু ঠিক পরিষ্কার বক্তব্য পেলাম না, অন্ততঃ আমার দিক থেকে মোটেই সন্তোষজনক লাগলো না। কী আর করা যাবে?!
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে, নতুন মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন আর জি করের প্রায় বন্ধ হওয়া ফাইল আবার খোলা হবে, সাসপেন্ডেড হয়েছেন তিনজন সিনিয়র পুলিশ অফিসার। পরবর্তী কালে কী হবে জানিনা, অন্ততঃ এই মুহূর্তে হাসপাতালগুলিতে ‘থ্রেট কালচার’ চালানোর মতো ক্ষমতা কারুর আছে বলে তো মনে হয় না। পুলিশ /CBI তাদের আগের ভূমিকা আমূল পাল্টিয়ে কী তদন্ত করবে জানা নেই,রাজ্যে পুলিশের নাহয় ‘বস’ পাল্টেছে, CBI এর তো ‘বস’ কেন ডিরেক্টরও পাল্টায় নি।
কিন্তু, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে হাসপাতালের ডাক্তার -সিস্টার -কর্মচারী, এরা তো এগিয়ে আসুক সত্যকে প্রকাশ্যে আনতে। আর কিছু নাহোক, আমরা অন্ততঃ সত্যটা জানতে পারি, কে/কারা/ কীকারণে/কীভাবে খুন করেছে, কেনই বা বিগত সরকারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিত্ব নিজের রাজনৈতিক ক্ষতির বিশাল সম্ভাবনা সত্বেও এতো বিরাট ঝুঁকি নিলেন অপরাধীদের আড়াল করতে, সেই তথ্যগুলো তো সামনে আসুক। নির্বাচনে তৃণমূলের ব্যাপক পরাজয়ে আর জি কর কাণ্ডের ভূমিকা নিশ্চয়ই কম নয়। এতো বড় ঝুঁকি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কী কারণে নিলেন, কাকে/ কাদের বাঁচাতে? এই তথ্যগুলো তো জানা সত্যিই জরুরি। অবশ্যই জরুরি সঞ্জয় রাইকে আবার নতুন করে জেরা করা, তার সত্যিই কী ভূমিকা ছিল কোন প্রেক্ষিতে, সেটা নতুন করে জানার প্রয়োজন অবশ্যই আছে।
তবে, সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, যারা জেনেও এতো দিন মুখ খোলেন নি, তাদের এবার সরব হবার। This is high time..
এখনও যদি বলতে না পারেন, তাহলে আর কবে বলবেন???










