দিন দশেক আগের কথা। মাঝবয়েসী লম্বা লিকলিকে চেহারার এক ভদ্রলোক চেম্বারে ঢুকলেন। নেশাতুর ঘোলাটে চোখ।পেট ফোলা। দেখে মনে হলো নিয়মিত মদ্যপানের অভ্যেস রয়েছে। সাথে জাঁদরেল সহধর্মিণী। চেম্বারে ঢুকে দাঁড়িয়ে আছেন দেখে বসতে বললাম। ভদ্রলোক ঘাড় নাড়িয়ে বললেন, বসবো না। আমি কিঞ্চিৎ অবাক হয়ে সহধর্মিণীর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই ভদ্রমহিলা বললেন- বসতে অসুবিধা হচ্ছে বলেই তো আপনার কাছে এসেছি।
ধাতস্থ হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে? পেছনে ফোঁড়া?
ভদ্রমহিলা ডানহাতের তর্জনীর ডগা তুলে ধরে এক গাঁট নিচে বুড়ো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন- এই এত্তখানিক দূরে আছে ডাক্তারবাবু। বেশ ব্যথা।
আঙুলে ব্যথা বলে বসতে অসুবিধা হচ্ছে ! অবাক হয়ে ভদ্রলোকের হাতগুলো পরীক্ষা করতে যেতেই ভদ্রমহিলা আমার নির্বুদ্ধিতায় একপ্রকার ধমক দিয়েই বললেন -হাতে নয়। পায়খানার দ্বারের ভেতর এক গাঁট ভেতরে ব্যথা।
এতক্ষণে তর্জনীর গাঁট নির্দেশের মর্মার্থ বুঝতে পেরে, উগরে ওঠা হাসিটাকে কোনোমতে গিলে নিয়ে বাইরে যথাসম্ভব গাম্ভীর্য বজায় রেখে জিজ্ঞেস করলাম, কবে থেকে ব্যথা?
ভদ্রলোক বললেন, তিনদিন আগে বন্ধুদের সাথে পিকনিকে গেছিলাম। প্রায় হাফ কেজি কচি পাঁঠার ঝোল খাওয়ার পরদিন পায়খানাটা এঁটে গেছিলো। একটু বেশি চাপ দিতেই শক্ত পায়খানার সাথে রক্ত বেরিয়ে এসেছিলো সকালে। তারপর থেকে ব্যথাটা শুরু হয়েছে। ভাবলাম সেরে যাবে। তাই ওষুধ দোকানে জিজ্ঞেস করে কয়েকটা ওষুধ খেয়েছিলাম৷ কিন্তু পায়খানা করতে গিয়ে চাপ দিলেই অসহ্য ব্যথা হচ্ছে। এখন এমন অবস্থা, বসতেও পারছি না। পায়খানা তো করতেই পারছি না তিনদিন ধরে।
পরীক্ষা করে বুঝলাম শক্ত পায়খানার চাপে পায়খানার দ্বার কেটে গিয়ে বিপত্তি। চিকিৎসা পরিভাষায় ‘অ্যানাল ফিসার’। পাইলসের থেকে আলাদা এ রোগ। প্রথমত: ব্যথা কমিয়ে পায়খানা নরম করতেই হবে। তা না হলে বারবার শক্ত পায়খানার দাপটে মলদ্বার কেটে গিয়ে অ্যানাল স্ফিংটারগুলোকে প্রতিবর্ত প্রক্রিয়ায় আরও চেপে ধরে পায়খানা হতেই দেবে না। ফলত: মলত্যাগ আরও কঠিন হয়ে পড়বে। দ্বিতীয়ত: অ্যানাল স্ফিংটারের সংকোচন পেশিকে খানিক শিথিল করে রাখতে হবে ক্যালসিয়াম চ্যানেল বন্ধ করার মলম ও অ্যানাস্থেটিক জেল ব্যবহার করে। তৃতীয়ত: উষ্ণ গরম জলে খানিক পভিডোন আয়োডিন লোশন দিয়ে মলদ্বার চুবিয়ে রাখতে হবে, চিকিৎসা পরিভাষায় যাকে আমরা সিজ বাথ বলি। এছাড়াও অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে বাকি প্রয়োজনীয় ওষুপধপত্র সঠিক ভাবে প্রয়োগ করতে হবে। সাথে পায়খানা নরম রাখার জন্য ভোজ্য ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার বেশি খাওয়ার পরামর্শ খুবই জরুরী। না হলে সেরে ওঠা রোগটাই আবার শক্ত পায়খানার চাপে পুনর্মূষিকভব হয়ে ওঠার সম্ভাবনা যথেষ্ট। সেক্ষেত্রে আবার অপারেশন করা ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না। 
ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে থেকেই ডানহাতের তর্জনীর ফাঁকে প্রেসক্রিপশন সংগ্রহ করে বেরিয়ে গেলেন।
গতকাল যখন এম.বি.বি.এস ছাত্রদের ক্লাস নেওয়ার জন্য গাড়ী নিয়ে বেরিয়েছি, সিগনালে ভদ্রলোককে দেখতে পেলাম। আমাকে দেখতে পেয়ে হনহনিয়ে হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। উনার হাঁটা দেখেই বুঝেছি, ব্যথা আর নেই। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই প্রশ্ন করলেন – বুঝতেই পারছেন, এখন তো শীতকাল। পিকনিকের মরশুম। কতদিন এভাবে থাকতে হবে ডাক্তারবাবু।?
অ্যাক্সিলারেটরে পা চেপে অবাক হয়ে বললাম, ‘যতদিন না পুরোপুরি সেরে উঠছেন’। নালেঝোলে বাঙালির নিখাদ খাদ্যপ্রেমে আমার ডানহাতের তর্জনীর একগাঁট নিচটা অজান্তেই হঠাৎ ঝনঝনিয়ে উঠলো।









