(এক)
“যে যত পড়ে, সে তত মূর্খ হয়”।
সত্তরের দশকে রাজনীতির জগতে এই কথাটা বেশ নাড়া ফেলেছিলো। বহু তর্কাতর্কি ও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু বর্তমান সময়ে কিছুকিছু ‘শিক্ষিত’ মানুষের মনোভাব সেই কথাটাকেই মান্যতা দিচ্ছে কিনা, সেই সন্দেহ বেশ জোরদার হয়ে উঠছে!
“যে যত পড়ে”, এখানে ‘পড়া’-র একটা ভূমিকা আছে। অর্থাৎ কেতাবি জ্ঞান। যে কোটিকোটি মানুষের জীবনে পড়ার সুযোগই ঘটেনি, তাঁদের কথা এখানে আসছেই না। অথচ সেইসব মানুষগুলো কাজের ক্ষেত্রে অসাধারণ জ্ঞানী; মানবিক মূল্যবোধ তাঁদের জীবনযাত্রার মধ্যেই প্রকট। নিজের অভিজ্ঞতা, পারিবারিক ঐতিহ্য, পারিপার্শ্বিক প্রভাব ইত্যাদি বহুকিছু থেকেই এঁরা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠেন। শিকার, কৃষি, শিল্প, নির্মান, কলাবিদ্যা ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে এঁদের সম্মিলিত ও গভীর জ্ঞানভাণ্ডারের সঙ্গে কেতাবি শিক্ষার কোনও তুলনাই হয় না। অথচ, কেতাবি শিক্ষায় ‘উচ্চ-শিক্ষিত’ মানুষ প্রায়শই এইসব মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেই অভ্যস্ত।
কেতাবি শিক্ষায় এরকম অতি-শিক্ষিত ‘বিজ্ঞানী’ মহলের কিছু মন্তব্য সম্প্রতি আমাকে হতবাক করে দিয়েছে! পৃথিবীর যাকিছু ‘খারাপ’, তাকে সমালোচনা করতে এঁরা যথেষ্ট তৎপর। কিন্তু ‘ভালো’ কীভাবে করা যাবে? এই প্রশ্নেই এঁদের পাণ্ডিত্য ফাঁস!
“জন্মের পরে যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, প্রযুক্তির অগ্রগতি, বিজ্ঞানের সাফল্য দেখেই চলেছি। মানবতার অধোগতি সমান্তরাল ভাবেই হয়ে চলেছে। তাই এখন আর নতুন করে কিছু ভাবতে ইচ্ছে করেনা। স্বপ্ন দেখা তো অবাস্তব। রুজিরুটি আর বুড়ো বয়সে একটা বাসস্থান, দুমুঠো ভাতের সংস্থান কি করে হবে, সেগুলোই সুনিশ্চিত করার চেষ্টা করে চলেছি। ফিদেল কাস্ত্রর শুরু এবং শেষে স্বর্গ নরক তফাত। ভেনেজুয়েলাও তাই। কোন সমাজ পরিবর্তন হয়েছে? কিছুই হয়নি। অকল্পনীয় খারাপ হয়েছে।” – কথাগুলো সম্প্রতি লিখেছেন জনৈক প্রবাসী বাঙালি বিজ্ঞানী। এই বক্তব্য দেখে ‘শিক্ষিত’ মহল থেকে লিখিত মন্তব্য এসেছে, “সম্পূর্ণ সহমত।”
কোনও সমাজে কিছুই যখন পরিবর্তন হয়নি, বরং “অকল্পনীয় খারাপ হয়েছে” (!), তখন সবকিছু খারাপের বুদ্ধিদীপ্ত সমালোচনা করতে করতে খাও-পিও-জিও দর্শনে নিজেরা গা ভাসানোই তো বুদ্ধিমানের কাজ! সমাজে নারীর সমানাধিকার, মানুষের কাজের অধিকার, চিকিৎসার অধিকার, শিক্ষার অধিকার, খাদ্যের অধিকার, বেঁচে থাকার অধিকার (Right to Life) – সবই বোধহয় “প্রযুক্তির অগ্রগতি আর বিজ্ঞানের সাফল্য”-র ফলাফল! কারণ, সমাজে তো নাকি “কিছুই হয়নি”; বরং “অকল্পনীয় খারাপ হয়েছে”! শ্রমজীবী মানুষের সংগঠিত চেষ্টা, গৌরবোজ্জ্বল লড়াই, অকুতোভয় আত্মত্যাগ, অগণ্য প্রাণবিসর্জন ইত্যাদির ফলেই যে পরজীবী ‘অতি-শিক্ষিত’ মানুষেরা বেঁচেবর্তে থাকার সুযোগটুকু অন্তত পেয়েছেন, সেই ন্যূনতম কৃতজ্ঞতা বোধটুকুও এঁদের হারিয়ে গেছে! এইসব মানুষের নামের পাশে ‘ডিগ্রী’ আছে; কর্মক্ষেত্রে খ্যাতিমান ‘পদ’ আছে; সমাজে ‘শিক্ষিত’ পরিচয় আছে; পারিবারিক জগতে ‘গর্ব’ করার আনন্দ আছে। ফলে, এঁদের আত্মস্বার্থসর্বস্ব ও সমাজবিমুখ মতামতের বিষময় সামাজিক প্রভাব নেহাতই উড়িয়ে দেবার মতো না।
কঠিন-কঠোর সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে এঁদের কোনও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। কাগজে পড়া লেখা পত্তর, কেতাবে পড়া প্রবন্ধ, হয়তো কোনো ক্ষেত্রে একটু সামাজিক সমীক্ষার ব্যতিক্রমী ‘অভিজ্ঞতা’। ব্যাস্। এটুকুই এঁদের সামাজিক পুঁজি! খাদ্যের অভাবে উপোসের অভিজ্ঞতা এদের নেই; শতশত বছর ধরে চলে আসা কদর্য সামাজিক বৈষম্যের জ্বালা এরা উপলব্ধি করে না; কর্মহীনতার যন্ত্রণা এদের ভোগ করতে হয় না…। এঁদের সবই কেতাব থেকে সংগৃহীত জ্ঞান।
কিন্তু যাঁরা বই পড়ার সুযোগটুকুও পান নি? কোন দেশে, কবে, কীভাবে, কতটুকু ‘পরিবর্তন’ হয়েছিলো তা যাঁরা জানতেও পারেন নি? কবে আবার “অকল্পনীয় খারাপ” হলো, তা বুঝতেও পারেন নি! সমাজের প্রতিটি অন্যায়, অবিচার, শোষণ, বৈষম্য, নিপীড়ন, অত্যাচার ইত্যাদির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে না তুলে যাঁদের সামনে বাঁচার কোনও রাস্তাই নেই? “লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করেই বাঁচতে চাই” – এটা যাঁদের কাছে কোনোরকম শেখা বুলি না, বরং প্রতিদিন-প্রতিমুহূর্তে বেঁচে থাকার একমাত্র রাস্তা? কেতাবি পাণ্ডিত্য-বিলাস কোনোভাবেই যাঁদের খাবার যোগায় না, বাস্তবে শারীরিক কঠিন-কঠোর পরিশ্রমই যাঁদের বেঁচে থাকার একমাত্র মূলধন, তাঁরা কীভাবে বাঁচবেন?
(দুই)
অতি-শিক্ষিত মানুষেরাই সবরকম সামাজিক অন্যায়ের সমর্থক হিসাবে কদর্য ভূমিকা পালন করেন। জনবিরোধী রাষ্ট্রের, সরকারের, প্রতিষ্ঠানের স্তাবকতাই এঁদের অস্তিত্ব রক্ষার নিরুপদ্রব পথ। কথায়, লেখায় ও কাজে। সামন্তবাদী, পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী, বিকৃত সমাজবাদী – সব ভাবনাচিন্তার সামাজিক খুঁটি হিসাবেই এঁরা ভূমিকা পালন করেন। রাষ্ট্র-প্রভুরা কখনোই চায় না, মানুষ খারাপ সমাজের বদলে ভালো সমাজের স্বপ্ন দেখুন; অন্যায়-সিক্ত সমাজটা বদলের জন্য চেষ্টা করুন। তারা সবসময়েই চায়, সর্বাঙ্গে ক্লেদ ও দুর্গন্ধযুক্ত সমাজটাই বেঁচেবর্তে থাকুক; তাতেই তাদের স্বার্থরক্ষার ষোলোকলা পূর্ণ হয়। মেহনতী কোটিকোটি জনগণ তাতে উচ্ছন্নে গেলেও রাষ্ট্রপ্রভুদের আর তাদের স্তাবক ‘শিক্ষিত’ বাহিনীর কিছুই যায় আসে না। নিজেদের আর্থিক স্বার্থ, খাও-পিও-জিও’র সুখ, পারিবারিক মোচ্ছবের স্বচ্ছলতা, ইত্যাদি বিষয়ই কেবলমাত্র তাঁদের বিচার্য বিষয়।
বাঙালির শ্রেষ্ঠ মনীষা এবং বিশ্বমানবতার উজ্জ্বল প্রতীক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি অতি পরিচিত উক্তি হলো, “অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।” অর্থাৎ রবীন্দ্র-চেতনা অনুযায়ী অন্যায়কারী রাষ্ট্রপ্রভু, তার সেবাদাস সরকার, আর তাদের সহ্যকারী ‘অতি-শিক্ষিত’ স্তাবকবৃন্দ একই পাপের অংশীদার। প্রভুরা অপরাধ চালিয়ে যেতে চায়, আর তার স্তাবকরা “সমাজব্যবস্থার বদল ঘটানোর চেষ্টা করে কোনও লাভ নেই” – এই দাসত্বের তত্ত্ব ছড়িয়ে, বিষাক্ত ব্যবস্থাটাই টিঁকিয়ে রাখার কাজ করে। তবে পাণ্ডিত্যের আলখাল্লা গায়ে চাপিয়ে। সেইদিক থেকে বিচার করলে, স্তাবকরা আরও ক্ষতিকর। কারণ শত্রুদের চেনা-জানা যায়, কিন্তু ‘প্রগতিশীলতা’র ভড়ং দেখানো স্তাবকদের চেনা যথেষ্ট মুশকিলের!
ইতিহাস আমাদের শেখায়, যেখানে যবে যতটুকুই সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে, তা সরাসরি মেহনতী জনগণের পরিশ্রমের ফসল। সমাজের উপরতলার পাণ্ডিত্যের অবদান তা নয়। যাঁদের রক্ত-অশ্রু-ঘাম দিয়ে সেই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে, তাঁরা সমাজের নিচের তলার মানুষ। তাঁরাই পরিবর্তনের মূল শক্তি। তাঁদের বেশিরভাগই লাইব্রেরী-গবেষণাগার ইত্যাদি ‘শিক্ষার জগৎ’ থেকে সহস্র যোজন দূরের বাসিন্দা। তাঁদের কর্মক্ষেত্র মাঠ-ঘাট-বন্দর, পাহাড়-সমুদ্র-মরুভূমি, কৃষি-শিল্প-জঙ্গল-খনি। তাঁরাই সামাজিক অগ্রগতির প্রকৃত কারিগর। আর তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ মহল সেই স্রষ্টাদের ব্রাত্য করেই রেখেছেন লিখিত ইতিহাসে। সেই অগ্রগতির জন্য কোনও-না-কোনও শিক্ষিত মাতব্বরের নামই জায়গা করে নিয়েছে দলিল-দস্তাবেজে; আসল কারিগররা খুব বেশি হলে হয়তো একটা ‘সংখ্যা’ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে মাত্র!
“প্রযুক্তির অগ্রগতি” নিয়ে কেতাবি পণ্ডিতরা যে আদিখ্যেতা দেখান, তা-ও তাদের সমাজবিরোধী বোধবুদ্ধির পরিচয়। মানুষ যখন আগুন জ্বালাতে শিখলো, সেই প্রযুক্তি ছিলো মানবসভ্যতায় অগ্রগতির প্রথম মাইলফলক; দ্বিতীয় মাইলফলক নিঃসন্দেহেই ‘চাকা’ আবিষ্কার। এসব তো আদিম মানুষের অবদান। কিন্তু ‘আধুনিক’, ‘উন্নত’, ‘সভ্য’, ‘গণতান্ত্রিক’ রাষ্ট্রপ্রভুদের হাতে “প্রযুক্তির অগ্রগতি” কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে? বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য অনুবীক্ষণ যন্ত্র সহ বিভিন্ন রকমের যন্ত্রপাতির আবিষ্কার নিশ্চয়ই হয়েছে। কিন্তু সাথেসাথেই, পারমানবিক সহ ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্রের ভাণ্ডার এতো বিপুলহারে বেড়েছে, গবেষকদের মতে, তা দিয়ে গোটা পৃথিবীটাকে প্রায় দশবার ধ্বংস করে ফেলা যায়! পৃথিবীজুড়ে “প্রযুক্তির অগ্রগতি” ঘটিয়ে যুদ্ধাস্ত্র তৈরির জন্য মোট যে অকল্পনীয় অর্থ ব্যয় করা হয়, তা দিয়ে সারা পৃথিবীতে খাদ্যহীনতা বস্ত্রহীনতা গৃহহীনতা চিকিৎসাহীনতা শিক্ষাহীনতা ইত্যাদি সমস্যা চিরদিনের মতো দূর করা যেতো। কিন্তু নিদেনপক্ষে প্রতিটি শিশুর জন্যেও খাদ্য শিক্ষা চিকিৎসা আজও নিশ্চিত করা যায় নি! গ্রহ-গ্রহান্তরে গিয়ে “প্রযুক্তির অগ্রগতি” দেখিয়ে আত্মতুষ্টির সুযোগ ঘটেছে বটে, কিন্তু প্রতিটি মানুষের জন্য স্বাস্থ্য আর মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু করা সম্ভব হয় নি। “প্রযুক্তির অগ্রগতি”-র ফলে একটি বোতাম টিপে লক্ষলক্ষ মানুষকে হত্যা করা সম্ভব হয়েছে; কিন্তু “একটিও মানুষ না খেয়ে মরবে না” – এমন গ্যারান্টি আজও তৈরি করা গেলো না। শিল্পবিপ্লবের ফলে এমন আধুনিকতম মারনাস্ত্র তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, যা দিয়ে কোটিকোটি মানুষ হত্যা করা হয়েছে ও হচ্ছে! এই মুহূর্তে চলমান রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা ইসরায়েল-প্যালেস্তাইন দানবীয় ধ্বংসযজ্ঞ অথবা আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের সম্ভাবনা, ইত্যাদি সবকিছুরই মূলে রয়েছে এই “প্রযুক্তির অগ্রগতি”। এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হয়েছে, দশ হাজার কিলোমিটার দূরেও তা আঘাত হানতে পারে। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীদের সীমাহীন লোভ, দুনিয়াজোড়া আধিপত্য বিস্তারের বর্বর বাসনা, আর অবিরাম যুদ্ধের হুঙ্কার, – নিজেরা বাঁচার তাগিদে একেরপরএক দেশকেও বাধ্য করছে যুদ্ধপ্রস্তুতি চালাতে। মুনাফাবাজদের মুনাফার ও আধিপত্যের লক্ষ্যে ছাড়া, সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের দিকে তাকিয়ে, ‘মহান শিল্পবিপ্লব’(!)-এর ধারাবাহিকতায় কোনও কিছুই তৈরি হয় না। একে কী “প্রযুক্তির অগ্রগতি” বলা যায়, নাকি মানবজাতির স্বার্থের বিচারে, অকল্পনীয় অধোগতি-ই বলা উচিত?
(তিন)
দুনিয়া জুড়ে এই সবরকম অধোগতিই ‘অতি-শিক্ষিত’ জনেদের মানসিক সমর্থন পেয়েছে! এঁদের কু-যুক্তির ধারাবাহিকতায় ‘ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ’-ও অবশ্যম্ভাবী, যেখানে বলা হবে –
১) ভারতবর্ষে ব্রিটিশ-সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই হয়েছে; ২) ভিয়েতনামে মার্কিন-সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম হয়েছে; ৩) চীনে জাপ-বিরোধী মুক্তিসংগ্রাম হয়েছে; ৪) রাশিয়ায় জার-বিরোধী স্বাধীনতার সংগ্রাম হয়েছে; – এবং সবক্ষেত্রই প্লাবিত হয়েছে অগণ্য মানুষের অশ্রু-ঘাম-রক্তে। সবই ঠিক। কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের কারো কারো বক্তব্য, “কোন সমাজ পরিবর্তন হয়েছে? কিছুই হয়নি। অকল্পনীয় খারাপ হয়েছে।” ব্রিটিশ, মার্কিন, জাপানি, জার … সব মানবসভ্যতা-বিরোধী শাসকের স্তাবকতাই এইসব ‘শিক্ষিত’ ব্যক্তিবর্গের বেদনাদায়ক ও নিরাপদ আশ্রয়! কিন্তু আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী যেদিকে মোড় নিচ্ছে, একেরপরএক ইউরোপীয় দেশ এখন মার্কিন দাদাগিরির বিরুদ্ধে যেভাবে অবস্থান নিতে বাধ্য হচ্ছে, তাতে ‘শিক্ষিত’ (!) সমাজও হয়তো নতুন বিপদে পড়ে যেতে পারে। “কিছুই হয়নি” তত্ত্ব তখন কাজ দেবে তো!
লক্ষ্যনীয় বিষয়, প্রতিক্রিয়ার শক্তি কীভাবে প্রগতিশীল শিবিরে প্রভাব বিস্তার করে! অতি-বাম, আধা-বাম, সিকি-বাম, ভোটুরে বাম, ‘প্রগতিশীল’ … সবরকম মানুষেরাই কীভাবে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের স্তাবক হয়ে ওঠে! এঁরা নিজেদের অতীত, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পারিবারিক ঐতিহ্য, সবকিছু থেকে নির্বিবাদে ১৮০° ঘুরে যায়! পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শিবির থেকে এসে কেউ কিন্তু সমাজতান্ত্রিক শিবিরে যোগ দেয় না। তবে বহু ‘শিক্ষিত’ এবং জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিষয়ে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল সমাজবাদী মানুষ প্রতিক্রিয়াশীল শিবিরকে শক্তিশালী করার দায়িত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নেয়! অর্থ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, খ্যাতি, পদ, যশ … নানা কিছুই বিভিন্ন জনের কাছে আকর্ষণের বিষয় হয়ে ওঠে। অধঃপতিত, অসামাজিক ও মূল্যবোধহীনতার গ্লানি এঁদের বিবেককে স্পর্শই করে না!
আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় ‘শিক্ষিত’ হওয়া সহজ, কিন্তু ‘মানুষ’ হওয়া মুশকিল। ‘ডিগ্রী’ লাভের তাড়না যতো প্রবল, ‘মনুষ্যত্ব’ অর্জনের তাগিদ ততোই ক্ষীণ। মানবিক মূল্যবোধ ‘সিলেবাসে নেই’! জনস্বার্থ রক্ষার শিক্ষা হর্তাকর্তাদের মগজেও নেই। ধনী ও দরিদ্র-র স্বার্থ নিয়ে পক্ষ বাছাই করা তথাকথিত নিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থায় অসম্ভব। যাঁরা যত বেশি ‘শিক্ষিত’ হন, মূল সমাজ থেকে তাঁদের ততো বেশি দূরত্ব গড়ে ওঠে! যেনতেনপ্রকারেন ধনীদের তথা জনবিরোধী রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বার্থ রক্ষাই শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক চরিত্র হয়ে রাইলো, ব্রিটিশ আমল থেকেই। ‘স্বাধীনতার অমৃত্ মহোৎসব’-এর গর্বও তা পাল্টাতে পারে নি! কোটিকোটি শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ রক্ষা নিয়ে এখানকার শিক্ষাব্যবস্থা ভাবতে শেখায় না; মুষ্টিমেয় ধনীর আর তাদের স্বার্থ রক্ষাকারী রাষ্ট্রযন্ত্রের সেবা করাই ‘শিক্ষা’-র কেন্দ্রীয় লক্ষ্য। আর, ‘দেশের স্বার্থ’ নিয়ে কোনোরকম দুর্বলতার বদলে ‘বিদেশ’-এর প্রতি নানা অজুহাতে প্রেমে মশগুল হয়ে থাকাও আধুনিক শিক্ষার অনিবার্য পরিণতি হয়ে উঠেছে! মানবপ্রেমী শুভবুদ্ধির জগৎ থেকে পা-পিছলে আত্মপ্রেমী দুর্বুদ্ধির পাল্লায় পড়া, তাই এতো ‘স্বাভাবিক’।
‘উচ্চশিক্ষা’র মাধ্যমে কুশিক্ষা যখন মানুষকে দিকভ্রান্ত করে; স্বাধীন জনমুখী চিন্তাভাবনা গড়ে তোলার বদলে মানুষকে মেরুদন্ডহীন আর আত্মস্বার্থসর্বস্ব করে তোলে; একদা রাষ্ট্রবিরোধী ব্যক্তিকে যখন জনবিরোধী রাষ্ট্রের সেবাদাসে পরিণত করে; – তখন “যে যত পড়ে, সে তত মূর্খ হয়” – কথাটার তাৎপর্য নিয়ে সত্যিই নতুন করে ভেবে দেখা দরকার।।










অতি সমৃদ্ধ লেখা, তীক্ষ্ণ লেখণী