আজ আরেকটি মৃত্যু, আয়নার মতো এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল আমাদের। কল্যাণী জে.এন.এম মেডিকেল কলেজের একজন এমবিবিএস ফাইনাল ইয়ার ছাত্রের নিথর দেহ তাঁর কলেজের হোস্টেল রুম থেকে উদ্ধার করা হয়। তিন দিন আগে তাঁকে শেষবার জীবিত দেখেছিল বন্ধুরা আজ দরজা ভেঙে দেখে তাঁর পচাগলা দেহ দেখতে হলো তাঁদের। প্রসঙ্গত আর চারদিন পর এই ছাত্রের এমবিবিএস জীবনের শেষ এবং সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল।
যদিও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের আগে এই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব না। তাও এখনও অবধি যা জানা গেছে তা থেকে যেটা আন্দাজ করা যাচ্ছে সেটা ভয়ানক। জানা যাচ্ছে পরীক্ষায় বসার যোগ্যতা অর্জন করতে না পাওয়ায় মানসিক বিপর্যয়ের কবলে পড়ে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার মত চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই মেডিকেল পড়ুয়া, ভবিষ্যতের ডাক্তার।
যদি এটাই কারণ হয়ে থাকে তাহলে এই মৃত্যু কোনোভাবেই একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির জায়গায় থাকে না, এটি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যাওয়া একটি মেডিক্যাল শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিফলন।
আজ খুব স্পষ্টভাবে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজন আছে,
কে দায়ী? কারা দায়ী?
যে ব্যাচকে পরীক্ষার পরীক্ষাগার বানানো হল, যে ব্যাচকে গিনিপিগের মতো ব্যবহার করা হল, মাত্র ১১ মাসে ৬টি বিশাল ক্লিনিকাল সাবজেক্ট শেষ করতে বাধ্য করা হল, শুধুমাত্র একটি তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার জন্য, যে সিদ্ধান্তের নাম ছিল NExT, যে সিদ্ধান্ত বহু টালবাহানার পর পরিত্যক্ত হলেও তার সমস্ত বোঝা বইতে হল ছাত্রছাত্রীদের।
এই চাপ, এই অনিশ্চয়তা, এই অবিরাম ভয়, এই অমানবিক একাডেমিক সময়সূচি, এই অসংবেদনশীল প্রশাসনিক নীরবতা সব মিলিয়েই তৈরি হয় এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে একজন তরুণ চিকিৎসক ভবিষ্যৎ দেখার আগেই ভেঙে পড়ে এবং তিনদিন ধরে পাশের রুমের বন্ধুর অনুপস্থিতির খবর নেওয়ার মতো মানসিক স্থিতিও অবশিষ্ট থাকেনা।
কর্তৃপক্ষের কাছে এটা হয়তো আরেকটা “একাডেমিক এক্সপেরিমেন্ট”। কিন্তু আমাদের কাছে এটা একটি জীবনের মূল্য। একটি পরিবার আজ সন্তানহারা। বন্ধুরা আজ সারাজীবনের অপরাধবোধ নিয়ে বাঁচবে।
আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, যে সমাজ, যে ব্যবস্থা নিজের ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের এভাবে ভেঙে ফেলে, তাদের কাছ থেকে মানবিক, নির্ভার ও নিরাপদ চিকিৎসা ব্যবস্থা আশা করা ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়।
WBJDF এই মৃত্যুকে নিছক দুর্ভাগ্য বলে মেনে নেবে না।
আমরা চাই, এই ব্যাচের উপর চাপিয়ে দেওয়া একাডেমিক সিদ্ধান্তগুলির পূর্ণ স্বচ্ছ পর্যালোচনা, NExT সংক্রান্ত হঠকারী নীতির জন্য দায়ীদের জবাবদিহি, মেডিক্যাল ছাত্রছাত্রীদের জন্য বাস্তবসম্মত সিলেবাস ও সময়সূচি, এবং সর্বোপরি একটি কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থা, যা কাগজে নয়, বাস্তবে কাজ করবে।
আর একটি জীবন যেন এই নীরব নিষ্ঠুরতার শিকার না হয়।
আজ আমরা শোকবিহ্বল, কিন্তু তা সত্ত্বেও আজ বোধ হয় বেশি প্রয়োজন এই প্রশ্নগুলো করার, জবাবদিহি চাওয়ার।
শোকাহত পরিবারের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা।
বন্ধুদের প্রতি আমাদের সংহতি।










