আলিপুর বডিগার্ড লাইন-এ পুলিশের সভায়, মাননীয়া, দেখলাম, হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলছেন – “কুত্তা ভোঁখে হাজার…”। মাননীয়ার এই এক মহৎ গুণ। চট করে কম কথায় শ্রোতার মনে সকলের সামাজিক অবস্থানটি যথাযথভাবে গেঁথে দিতে পারেন।
অতএব, শোনামাত্র আমি বুঝে গেলাম, আমরা যারা বিচারের দাবি অনর্গল করেই চলেছি, অনাচারের বিরুদ্ধে নিরন্তর সরব হয়েই রয়েছি – আমরা সকলেই ‘কুত্তা’! তবে ভরসার কথা এটুকুই,, স্বয়ং মাননীয়াই স্বীকৃতি দিলেন, যে, অন্তত সংখ্যার বিচারে আমরা আর অগ্রাহ্য করার জায়গায় নেই, কেননা তাঁরই কথানুসারে, আপাতত
আমরা ‘হাজার’!
এমনিতে এই রাজ্যে, সাধারণভাবে, জনগণ অত্যন্ত অনুপ্রাণিত – অনুপ্রেরণার বাড়াবাড়িতে কেউ কেউ নিজেদের বাড়তি অনুপ্রেরণা অপরের মধ্যে ঢেলে দিতে গিয়ে ‘ছোটখাটো ভুল’ করে বসছে – আমলা পুলিশ সিভিক-দের অনুপ্রেরণার বহর তো বলাই বাহুল্য – তবু মুখ্যমন্ত্রী সম্ভবত আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছেন। নইলে, এমন চমৎকার পারফরম্যান্স-এর পরেও পুলিশের উদ্দেশে বলতে পারেন : “আপনাদের বাইরে থাকতে হবে ‘কোল্ড’ আর ভিতরে ভিতরে হতে হবে ‘বোল্ড’”! (বলাই বাহুল্য, এইখানে ‘বোল্ড’ শব্দটি মাননীয়ার উচ্চারণনৈপুণ্যে যেমনই শুনতে লাগুক, শব্দটি ইংরেজি বানানের bowled নয়, একেবারে আটপৌরে bold.)
তো একটু চোখকান খোলা রাখলেই মুখ্যমন্ত্রী দেখতে পেতেন, মেয়ের খুন-ধর্ষণের পরে শোকগ্রস্ত ভগ্নহৃদয় বাপ-মায়ের মুখ টাকা দিয়ে বন্ধ করার চেষ্টা করার মতো কাজ করতে হলে বহিরঙ্গে cold আর ভিতরে bold – যে বেপরোয়া দুঃসাহস সম্পূর্ণ বিবেকবর্জিত হতে পারার সঙ্গে সঙ্গে বাই-ওয়ান-গেট-ওয়ান-ফ্রি অফারেই আসে – এই দুই না হলে হয় না। এবং মাননীয়া এ-ও দেখতে পেতেন, যে, তাঁর পুলিশ-প্রশাসনে এই গুণের অধিকারী কিছু কম জন নন। বিনীত গোয়েল থেকে পূর্বতন ডিসি নর্থ, অথবা লালবাজারে বিকেলবেলায় একমুখ ব্যঙ্গের হাসি নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বসা ইন্দিরাদেবী, কিংবা জয়নগর কুলতলি অঞ্চলের স্থানীয় থানার ওসি বা বারুইপুরের ডিসি ঢালিসাহেব – একেবারে দিকে দিকে প্রান্তে প্রান্তে থানায় থানায় চৌকিতে চৌকিতে – খুন-ধর্ষণের প্রমাণলোপাটই বলুন বা ধর্ষককে প্রোটেকশন দেওয়ার গুরুদায়িত্ব, অথবা ধর্ষিতার পরিবার-পরিজনের মুখ টাকা দিয়ে বন্ধ করা ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানো লোকজনের বিভিন্নভাবে হয়রানি করানো, সবক্ষেত্রেই মাননীয়ার পুলিশ সিদ্ধহস্ত। যাকে বলে, এক্কেবারে নিপুণভাবে বাইরে কোল্ড এবং ভিতরে ভিতরে ভয়ঙ্করভাবে বোল্ড।
তো সে যা-ই হোক, সরবতার দরুণ মাননীয়ার কাছে ‘কুত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া আমারই কিছু সন্তানতুল্য জুনিয়র ডাক্তার ধর্মতলায় ধর্ণায় বসেছে – তাদের মধ্যে ছ’জন অনশন শুরু করেছে – যেহেতু মাননীয়ার মতো করে অনশনের কৃৎকৌশল তাদের জানা নেই, এবং যেহেতু আমার ছেলেমেয়েদের সঙ্গীসাথীদের দক্ষতাও মাননীয়ার পারিষদবর্গের সঙ্গে তুলনীয় নয়, অতএব এক উৎকণ্ঠিত সিনিয়র ‘কুত্তা’ হিসেবে গতকাল গভীর রাত্তিরে ধর্মতলায় গিয়েছিলাম।
দেখলাম, মানবিক কলকাতা পুলিশ ধর্নামঞ্চ তথা অনশন মঞ্চের পাশে কিছুতেই বায়োটয়লেট বসাতে দেবেন বা। রাত দেড়টা নাগাদও তাঁর কাছে অনুনয়-বিনয় করা হলো। কিন্তু তিনিও বাইরে কোল্ড ও ভিতরে বোল্ড – সামান্য দাবিটুকু তিনি কিছুতেই মানলেন না। উপরন্তু যখন বলা হলো, যে, নিকটবর্তী শৌচালয় অবধি পৌঁছাতে পারা অনশনকারীদের শারীরিক অবস্থায় মুশকিল হতে পারে, তিনি আমাদের বোঝাতে চাইলেন যে অনশনে অত কিছু অসুবিধে হয় না। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মাঝেমধ্যেই দাবি করেন, যে, চেনাপরিচিতদের টুকটাক অসুস্থতার চিকিৎসা তিনি নিজেই করে ফেলেন – তাঁর অনুপ্রেরণায় তাঁর অনুগত পুলিশ যে ডাক্তারদেরই ডাক্তারি শেখাবে, এতে আর আশ্চর্যের কী আছে?!
ও হ্যাঁ, এ-ও দেখলাম, তৃতীয়া কি চতুর্থীর রাত্তিরেই বেশ কিছু মানুষ (অন্যান্য বছরের তুলনায় সংখ্যায় নগণ্য, অবশ্যই) ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে পড়েছেন। বাইকের পেছন বা গাড়ির জানালা থেকে কৌতূহলী চোখগুলো ধর্ণামঞ্চের দিকে আড়চোখে চেয়ে কী ভাবছিল, হাসতে হাসতে নিজেদের মধ্যে ঠিক কী কথা চালাচালি করছিল, কে জানে!
অবশ্য উৎসব-মুখর এমন অনাবিল আনন্দের রাজ্যে সুখশান্তিতে বাস করতে পারা প্রজাকুল ঠিক কী ভাবে, কেমন করে ভাবে – চীৎকার-চেঁচামেচি করে শান্তি বিঘ্নিত করা ‘কুত্তা’ হয়ে তার খবর আমি পাব কোত্থেকে!










