১
অঘ্রাণের শেষ। সরু আলপথের দু’ধারে দিগন্তবিস্তৃত ক্ষেতের ফসল কেটে নেওয়া সারা। যেদিকে দু’চোখ যায়, হালকা হলদে রঙের নাড়া পড়ে রয়েছে মাঠ জুড়ে। সুমিত সাবধানে পা ফেলছিল। বাসরাস্তা থেকে গ্রামের পথের গোড়ার দিকটা চওড়া ছিল মোটামুটি — অন্তত নিশ্চিন্তে হাঁটার মতো প্রশস্ত। কিন্তু বংশীর মোড় থেকে যখন রাস্তা দু’ভাগ হয়ে গেল, বিপদ আরম্ভ হলো তার। মোড় থেকে সোজা পথটা চলে গিয়েছে কাঁকরহাটি গাঁয়ের দিকে। ওটি বড় জনপদ — পোস্ট অফিস, ব্যাঙ্কের গ্রাহক সেবা কেন্দ্র, একটা প্রাইমারি আর একটা হাইস্কুল রয়েছে। ফি বিষ্যুদবারে বড় হাট বসে। কিন্তু সুমিতের গন্তব্য ওদিকে নয়। বংশীর মোড় থেকে যে নাবাল পথটা ধানক্ষেত আর ইতস্তত জড়াজড়ি করে থাকা কয়েকটা ভূতুড়ে বাঁশবাগানের পাশ দিয়ে আনমনে চলে গিয়েছে দক্ষিণপানে, তার প্রান্তসীমায় যে ছোট্ট গাঁ-টির অবস্থান, সে সেখানেই যাবে।
গ্রামের নাম বিল্বপদ্মপুর। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার এই অখ্যাত, দুর্গম গাঁয়েই সুমিতের আদি বাড়ি — ঠাকুরদাদার ভিটে।
“বড়দা দিল্লি চলে গেলেন, বাড়ির কোনও বিলিব্যবস্থা না করেই। তোমার দিদি তো লখনৌ থেকে এই পোড়া দেশে ফিরবেনই না বলে লিখে দিয়েছেন — এই অজ পাড়াগাঁয়ে পচে মরব কেবল আমি? তোমার অত ভাল চাকরি থাকতেও?”
মায়ের ভারি গলার গঞ্জনা আজও কানে বাজে সুমিতের। যদিও ‘মা’ বলতে একটা লালপাড় সাদা জমির তাঁতের কাপড় ঘেরা মুখ, কপালে গোল টাকার মতো বড় সাইজের সিঁদুরের টিপ আর নাকের ঝলমলে পাথরটা বাদ দিয়ে বিশেষ কিছু স্মৃতি আর নেই আজ। ওটুকুও কি আছে? নাকি নিউটাউনের আকাশছোঁয়া ফ্ল্যাটটায় রীণার ‘পূজা রুমে’ ফ্রেমে বাঁধানো যে অস্পষ্ট ছবিটা অনাদরের ধুলো মেখে পড়ে থাকে বছরের বেশির ভাগ দিন, মনের মধ্যে সেইটের কোনও আবছা প্রতিফলনকেই সে মায়ের স্মৃতি বলে ধরে নিয়েছে এতকাল? তার চোদ্দ বছর বয়সে মা চলে গিয়েছে ছুটির টানে — এখন সুমিত চুয়াল্লিশ।
অঘ্রাণের রোদেও তাপ রয়েছে যথেষ্ট। তবে সেইসঙ্গে একটা মোলায়েম উত্তুরে বাতাসও ঘুরপাক খাচ্ছিল মাঠে — তাই সুমিতের ফর্সা লালচে কপালে মুক্তোদানার মতো ঘামের বিন্দুগুলো জমে উঠেই মিলিয়ে যাচ্ছিল শীতল হাওয়ায়। মা যেন গড়গড়ে মোটা তাঁতের আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দিচ্ছিল ঘেমো, ক্লান্ত মুখটা।
আপনমনে হেসে ফেলল সুমিত। বয়স বাড়লে কি অকারণেই সেন্টিমেন্টাল হয়ে যায় মানুষ?
রীণা তেমনই বলেছিল। “এই ফালতু ইমোশনগুলো তো তোমার ছিল না কখনো! আত্মীয়স্বজন বলতে কেউ নেই যেখানে, পাড়া-প্রতিবেশী কারোর সঙ্গে কোনও যোগাযোগই নেই তোমাদের, সাইক্লোন ফাইক্লোনে বাড়িটাই ভেঙে পড়ে গেছে কিনা জানা নেই — সেখানে যাওয়ার জন্য হঠাৎ নেচে ওঠার কোনও মানে হয়?”
রীণা সুমিতের স্ত্রী। অসুস্থ শ্বশুর, বছর বারোর কিশোর ছেলে অন্তু আর বাইরে বাইরে ট্যুর করে বেড়ানো মাল্টিন্যাশনালের ব্যস্ত এগজিকিউটিভ স্বামীর সংসারটাকে একা হাতে সামলে রাখা সুদক্ষা গৃহিণী তার সহধর্মিণী। ভাবতে ভাবতেই সুমিতের কপালে ছোট্ট ভাঁজ ফুটে ওঠে। সহধর্মিণী? রীণাকে তার সহধর্মিণী বলা চলে কি? তাহলে তো সে বুঝতে পারত, কোন ব্যাকুলতা তার স্বামীকে তাড়িয়ে নিয়ে ফিরেছে এই ক’দিন — কোন দুর্বোধ্য টানে আজ তিরিশ বত্রিশ বছর পরে সে ফিরছে তার ঠাকুরদাদার বাড়িটার কাছে?
লখনৌয়ের পিসি বিয়ের পর থেকেই আর কোনও যোগাযোগ রাখেননি। জ্যাঠামণি ঘাটশিলার হিন্দুস্থান কপার কোম্পানির উচ্চপদস্থ অফিসার ছিলেন। সেখানকার কোয়ার্টারে থাকলেও ছুটিছাটা কিংবা পুজোপার্বণে তিনি আসতেন সপরিবার। যদিও পরে অন্য চাকরি নিয়ে দিল্লির কাছে নয়ডায় বদলি হয়ে যাওয়ার পরে জ্যাঠামণির সঙ্গে সংযোগ কমে এসেছিল তাদের। ওই বিজয়া আর নতুন বছরে একখানা করে চিঠি — ব্যস! বাবা সরকারি চাকরি করতো রাইটার্সে। বড় চাকরিই করত নিশ্চয়। নইলে কলকাতায় সুমিতের বড় ইশকুলের বোর্ডিংএর খরচ চালাবার মতো পয়সা পেতো কোথা থেকে? অবিশ্যি সেই চাকরি বজায় রাখতে ট্রেন, বাস, সাইকেল ঠেঙিয়ে রোজ ডালহৌসি থেকে বিল্বপদ্মপুর পৌঁছতে রাত্তির ন’টা বেজে যেত, শুনেছিল বাবারই কাছে। সারাটা দিন বাড়িতে মা দুটো শুকো ঝি আর একটা বারোমাসের কাজের মেয়ে নিয়ে একলা থাকত। তখন নাকি গ্রামে বিজলিও আসেনি।
এখন? এখন এসেছে কি? চোখ কুঁচকে সামনের দিকে তাকায় সুমিত। গ্রামের চৌহদ্দিতে ঢুকে পড়েছে বলেই মনে হচ্ছে। সামনেই একটা পাকা বাড়ি — তার ঢালাই করা ন্যাড়া ছাদের মাথায় গোটা চারেক সোলার প্যানেল বসানো, বারোটার রোদ্দুর ঠিকরোচ্ছে তার উপর। সুমিত চোখ সরিয়ে নেয়। আলপথটা গাঁয়ের মধ্যে ঢুকে এখন একটা সভ্যগোছের ইঁটপাতা পথ হয়ে গিয়েছে। এপাশে ওপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু বাড়িঘর নজরে পড়ে তার। বেশির ভাগই পাকা বাড়ি – চালটা অবশ্য টালি বা অ্যাসবেস্টসের। মাঝে মধ্যে দু’একটা মেটে একচালাও চোখে পড়ে — বিবর্ণ, শ্রীহীন। মাথার উপরের খড় পচে ঝুলছে, বাহির দেওয়ালের ফেটে যাওয়া শুকনো মাটির মতো দারিদ্র্য লেপে আছে সর্বাঙ্গে। প্রায় প্রতিটি বাড়ির সঙ্গেই একফালি করে ক্ষেত রয়েছে — নতুন শীতে সেখানে ফুল্লমুখী কপির চারা আর বেঁটে বেগুনগাছ চোখে পড়ে। কারও চালে লতিয়ে রয়েছে কুমড়োলতা বা বারোমেসে লাউ, কারোর বাড়ি লাগোয়া এঁদো ডোবার ধারে ঝুঁকে রয়েছে বুড়ি আমগাছ — দামে ভরা পুকুরের জলের আয়নায় নিজেকে দেখতে না পেয়ে ভারি বিরসবদন। সুমিত বেলগাছ চেনে না, তাই বুঝতে পারল না, এত গাছগাছালির মধ্যে গ্রামের নাম সার্থক করে কোনও বিল্ববৃক্ষ এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে কিনা। পুকুর, ডোবাগুলোয় চোখ চালিয়ে পদ্ম দূর অস্ত, শাপলা-শালুকের খোঁজও পেলো না তার শহুরে চোখ। এই শীতের মুখে তাদের দেখা মেলা ভার।
সুমিত পা চালালো। কাঁধের কিটব্যাগটা ভারি লাগছে বড্ড। সোয়েটারটা খুলে ফেলতে পারলে ভাল হতো। এতকাল পরে কিছুই চেনা লাগছে না তার। বাবার দেওয়া পথনির্দেশটুকুই ভরসা।
সুমিত বিল্বপদ্মপুর আসতে চায় শুনে হাইপ্রেশার আর শ্বাসকষ্টের অসুখে ভোগা পঁচাত্তর বছরের অশক্ত বাবার ঘোলাটে চোখ দুটো আশ্চর্য উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল — “বাস থেকে নেবে মেঠো রাস্তা ধরে কিছুদূর গেলেই সাহাদের আমবাগান। সেটা ছাড়ালে একটা থান দেখতে পাবি — বনবিবির থান বলে ওটাকে। ঠিক তার উল্টোদিকে একটা বুড়ো অশথগাছের নিচে আধভাঙা এক দেউল দেখবি — মনসা মায়ের মন্দির ছিল এককালে। সেই মনসাতলা পেরিয়ে ডাইনে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় পড়বে। তার পাশেই একটা লাইব্রেরি। ওটা তোর ঠাকুর্দার নামে, জানিস তো? অম্বরনাথ স্মৃতি পাঠাগার। কত বই যে এককালে দান করে দিয়েছিলাম সেখানে —
লাইব্রেরির পিছনে একটা বড় দিঘি আছে। আমরা বলতাম ভুজঙ্গের বিল। তার ধার দিয়ে রাস্তা আছে। ওপাশে গেলেই আমাদের ভিটের পাঁচিল দেখতে পাবি। আগে এলারঙের ছিল, এখন বোধহয় রঙটঙ সব নষ্ট হয়ে গেছে — ”
অনেক কথা একসঙ্গে বলে বাবার বোধহয় হাঁপ ধরে গিয়েছিল।
“একটু চুপ করো না বাবা, কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে তোমার”–সুমিতের গলার উদ্বেগ বাবাকে স্পর্শই করলো না মোটে। একটু দম নিয়ে ফের বলতে আরম্ভ করল –“তোর জ্যাঠামণি, পিসি কেউই সে বাড়িতে আর ফিরে আসেনি বুবাই। দাদা দিল্লিতে সেটল করে গাঁ-কে ভুলেই গেল। আর মিতু তো বিয়ের পর থেকেই —
তোর মা যতদিন বেঁচে ছিল উঠোনের তুলসীতলায় প্রদীপ দেখিয়ে গেছে প্রত্যেক সন্ধেবেলায়। তার পর আর” — বাবার দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছিল সুমিতের চোদ্দতলার ডুপ্লে ফ্ল্যাটের বাতাস।
“জেনে রেখো বুবাই, কেবল রক্তমাংসের মানুষ নয়, ভিটেমাটিও কিন্তু জ্যান্ত হয়। আমাদের গাঁয়ের বাড়িও তোমার পরমাত্মীয়। তোমার মা গিয়েছেন, জ্যাঠা, পিসি কেউই আর বেঁচে নেই। মাই ডেজ আর নাম্বারড টু — কিন্তু আমিও যখন থাকব না, তোমরা কিন্তু একলা হবে না। ঐ বাড়িটা থাকবে তোমাদের পরমাত্মীয় হয়ে। তোমরাও থেকো তার জন্য। মনে রাখবে, তুমি ছাড়া, আমার নাতিবাবু ছাড়া তারও রক্তের সম্পর্কিত আর কেউ রইল না।”
রাত্রে বিছানায় শুয়ে রীণা ঠোঁট বেঁকিয়েছিল বাবার বলা কথাগুলো শুনে –“তোমার ইচ্ছে হলে যাও সেখানে, দেখে এসো রাজকীয় উত্তরাধিকার। আমার ছেলের বয়ে গেছে ধাপধাড়া গোবিন্দপুরে গিয়ে পোড়ো বাড়ির সঙ্গে আত্মীয়তা ফলাতে।”
চাবি যদিও ছিল সঙ্গে, তবু শেষ পর্যন্ত একার সামর্থ্যে কুলোলো না। দু’পাঁচজন সহৃদয় প্রতিবেশী জুটিয়ে তিনদশকের পুরোনো মর্চেধরা তালাটা খুলতে পারল সুমিত। ভাগ্যিস গাঁয়ের লোকের কৌতূহল বেশি — তাই একতলা বাড়ির সবক’টা জানলা দরজাই চেষ্টাচরিত্র করে খোলা গেল, তার একার সাধ্যে কখনোই যা সম্ভব হতো না। দু’চারটে উইয়ে খাওয়া জানলার পাল্লা অবিশ্যি আসুরিক চেষ্টার অভিঘাত সইতে না পেরে জখম হলো ভালই, তা কি আর করা যাবে। সব গ্রামে দু’একজন মাতব্বর ব্যক্তি থাকেন, এখানেও জুটে গেলেন কয়েকজন। এঁরা নাকি ছোটবেলায় বাবার কোলে কাঁধে চড়েছেন বিস্তর, মায়ের হাতের রান্নাও খেয়েছেন — সেই অধিকারে দুপুরবেলা তাঁদেরই একজনের ঘরে ‘চাট্টি ডালভাতের’ হুকুমও অক্লেশে করে ফেললেন — সুমিতের ওজর আপত্তির তোয়াক্কাই করলেন না।
যাকগে, রীণার তৈরি করে দেওয়া স্যাণ্ডুইচগুলো না হয় আধপচা হয়ে নিউটাউনেই ফেরত যাবে আজ, এই ভেবে সুমিত ক্ষান্ত দিল আপাতত।
কীটদষ্ট দেওয়াল আর ভগ্নপ্রায় কড়িবরগার ঘরগুলো প্রায় শূন্য — আসবাবপত্তর নেই বললেই চলে। কেবল পুবদিকের ঘরের কোণে একটা ঢাউস দেরাজ রাখা আছে, দেখলো সুমিত। দেরাজ অবশ্য ফাঁকাই থাকবে, তবু কি ভেবে টানাগুলো খুলে একবার পরীক্ষা করে দেখার ইচ্ছে হলো তার।
সেই খালি দেরাজের একেবারে নিচের টানায় নিতান্ত অপ্রত্যাশিতভাবে একটা হাতঘড়ি আবিষ্কার করে ফেলল সে। বহুকালের পুরোনো একটা ওমেগা রিস্টওয়াচ। ঘড়িটা হাতে নিতেই ছেলেবেলায় বাবার রোমশ, শক্তিমান কবজিটা ধরার অনুভূতি হলো যেন।
“কত্ত গাড়ি আসচে যাচ্চে বাবা, এই রাস্তা পেরোবো কি করে?”
পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ বছর আগের ক্রিসমাসের এসপ্ল্যানেড সাক্ষী ছিল একটি ভীরু বালকের কাঁদো কাঁদো মুখে বলা কথাগুলোর।
“এই নে, শক্ত করে ধর আমার হাতটা, ঠিক পেরিয়ে যাব দেখবি! কত লোকে পেরোচ্ছে, ভয় কি বাবা?”
তার মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে। নাইন্টি পার্সেন্ট নম্বর, চারটে লেটার। বাবা আদর করে হাতঘড়িটা খুলে পরিয়ে দিতে যাচ্ছে তাকে, আর সে নাক সিঁটকে বলছে –.”ইশ, এই বস্তাপচা ঘড়ি আমি নেবই না। আমার একটা গোল্ডেন টাইটান চাই।”
বাবার মুখটা ম্লান হয়ে যাচ্ছে — বড় আদরে মুঠোয় চেপে ধরছে ঘড়িটা।
“এটা তো শুধু ঘড়ি নয় বুবাই, এটা একটা এয়ারলুম। ম্যাট্রিক পাশ করার পরে বাবা দিয়েছিল আমাকে, আমি তোকে দিলাম, তুই তোর সন্তানকে দিবি –”
জেদি ঘোড়ার মতো পা ঠুকে সুমিত বলেছিল, “না! এটা তো খারাপই হয়ে গেছে — তোমাকে প্রায় প্রত্যেক মাসেই সারাতে দিতে হয়। আই ওয়ন্ট আ ব্র্যাণ্ড নিউ টাইটান! এটা ফেলে দিও!”
ঘড়ির আবছা কাঁচটা রুমালের খুঁট দিয়ে পরিষ্কার করার চেষ্টা করে সুমিত। অবাক হয়ে দেখে নিচের সাদা ডায়ালের নীলচে কাঁটাগুলো এখনো কেমন চকচক করছে। কানের কাছে নিয়ে এসে প্রাণপণে টিকটিক শব্দটা শোনার চেষ্টা করে সে। তারপর হেসে ফেলে নিজেরই বোকামিতে।
মূল্যহীন বটে, তবে অবাক আবিষ্কারটা বাড়ি গিয়ে দেখাতে হবে বাবাকে। খুশি হবে কি বাবা? হঠাৎ পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে যেমন অবাক আর খুশি হয়ে ওঠে মানুষ?
২
ফেরার ট্রেন জয়নগর মজিলপুর ছাড়াতেই ব্যস্তসমস্ত হয়ে বেজে উঠল সুমিতের মুঠোফোন।
“হ্যালো” —
ও প্রান্তে রীণার উদভ্রান্ত গলা শোনে সুমিত, “তুমি কতদূরে?””কেন? কি হয়েছে?”
স্ত্রীর উৎকণ্ঠা চারিয়ে যায় সুমিতের শরীরেও। “বাবাকে হসপিটালে অ্যাডমিট করতে হলো। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। এখন আইসিইউতে আছেন।
তুমি ঢাকুরিয়াতে নেমে যেও — আমি গাড়িটা পাঠিয়ে দিচ্ছি তারককে দিয়ে। সোজা হাসপাতালে চলে আসবে। আমি এখানেই আছি অন্তুকে নিয়ে।”
কর্পোরেট হাসপাতালের শীতল আইসিইউ। তেরোশো একত্রিশ নম্বর বেডের ঘেরা রেলিংএ হাত ছোঁয়াতেই চমকে উঠে আঙুল সরিয়ে নিল সুমিত — এত ঠাণ্ডা, ছ্যাঁক করে লাগল চামড়ায়।
নানা নল আর মনিটরে বিপর্যস্ত বাবার মুখটা খুব মন দিয়ে দেখতে চেষ্টা করে সে।
“বাবা, ও বাবা –”
সাড়া নেই।
বাবার কপালটা কি একটু কুঁচকে উঠল? বাবা কি শুনতে পেলো তার ডাক? মুখ তুলে বাবার মাথার কাছে রাখা মনিটরটার সংখ্যাগুলো আনমনে দেখল সুমিত। ৬৪, ৩২, ৮৯ — অর্থহীন সংখ্যাগুলো কোনও দিশা দেখাচ্ছে না তাকে। সেদিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকতে থাকতে কেমন গরম লাগতে শুরু করল তার হঠাৎই। হাতটা কি খুব বেশি ঘেমে যাচ্ছে? আশপাশের বেড, নানা রকম বিচিত্র ধ্বনি তোলা ডিজিটাল ডিসপ্লে, নীল পোশাকের সিস্টারদের খটখটে পায়ে হাঁটাচলা, সব কেমন আবছা হয়ে আসছে না? সে কি অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে? না, না, এখনই হুঁশ হারালে চলবে না তার — বাবাকে জানাতে হবে না, পৈতৃক ভিটে থেকে কোন অমূল্য ‘এয়ারলুম’ উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে সে?
গলায় আওয়াজ ফুটছে না, তবু শরীরের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে চেঁচাতে চেষ্টা করল বুবাই, সেই ছেলেবেলার মতো — “বাবা, শুনতে পাচ্ছো বাবা? তোমার সেই ওমেগা ঘড়িটা আমি দেশের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছি গো — দেখবে না? ও বাবা, বাবা –”
আর বলতে পারে না সুমিত। কানের ভিতর ঝিঁঝিপোকাদের জলসার শব্দ বেড়ে যায়, চারপাশ ঘোর হয়ে আসে কালবৈশাখীর সাঁঝবেলার মতো, রট আয়রনের ঠাণ্ডা, নৈর্ব্যক্তিক রেলিং পিছলে যায় তার ঘর্মাক্ত করতল থেকে।
দশ বছর পরে ফের বিল্বপদ্মপুরের বাসস্টপে নামল সুমিত। এবারে একা নয়, অন্তু এসেছে তার সঙ্গে। রীণাকেও আনতে চেয়েছিল, কিন্তু স্ত্রীর অনাগ্রহ দেখে আর জোর করতে পারেনি সে।
“বছর বছর সেই পোড়োবাড়ির মেনটেনেন্স খাতে এতগুলো করে টাকা চলে যাচ্ছে — চুপচাপ সহ্য করছি। এখন এই বয়সে হাটুরে ট্রেন বাস ঠেঙিয়ে সেই অজ গাঁয়ে আমাকে সশরীরে নিয়ে না ফেললে চলছে না তোমার? বলিহারি সেন্টিমেন্ট!”
অন্তুকে একবার বলতেই অবশ্য রাজি হয়ে গিয়েছিল সে। আসলে বাবার স্বাস্থ্য নিয়ে সর্বদাই উদ্বিগ্ন থাকে সুমিতের সদ্য ডাক্তারি পাশ করা ছেলে। দশ বছর আগে দাদু চলে যাওয়ার রাতেই বাবার হার্টব্লকের দুর্ঘটনাটা ভুলতে পারে না অন্তু। ভাগ্যিস হাসপাতালেই ঘটেছিল ব্যাপারটা। তাই সঙ্গে সঙ্গে ভর্তি করে পেসমেকার বসিয়ে সামাল দেওয়া গিয়েছিল। উফ, কি দিনই গিয়েছে তখন! মা একা হাতে সামলেছিল সবকিছু। খোকামামা আর দিদা যখন খবর পেয়ে আসানসোলের মামার বাড়ি থেকে এসে পৌঁছলো, তখন বাবার ক্রাইসিস অনেকটাই কেটে গিয়েছে, দাদুর শেষ কাজও হয়ে গিয়েছে। অন্তুর মনে আছে, মা নিজে শ্মশানে গিয়ে সব কাজকর্ম করেছিল – পাড়াপড়শির শত অনুরোধেও মুখাগ্নির ঝামেলায় ফেলতে দেয়নি ছেলেকে।
“ঐ দ্যাখ বাপি, মনসাতলা এসে গেলাম। আর একটু এগোলেই প্রাইমারি ইশকুল। তারপর সেই দিঘি” — বাবার গলার অনাবিল উচ্ছ্বাস অন্তুকে ফিরিয়ে আনে বর্তমানে।
“টায়ার্ড লাগছে না তো বাবা? বাসস্টপ থেকে অনেকটা পথ হেঁটে এলে কিন্তু”–
“আরে দূর!” — বুকভ’রে নিশ্বাস নিয়ে আনন্দিত স্বরে বলে সুমিত,
“কি ফ্রেশ এয়ার দেখছিস? হরেকরকম পলিউশনে মরে যাওয়া কলকাতা শহরে পাবি এমন তাজা হাওয়া?”
মাথা নাড়ে অন্তু। সত্যিই, একফোঁটা ধোঁয়া ধুলোরও অস্তিত্ব নেই যেন কোত্থাও। সময় থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে এখানে। আলপথের দু’ধারে বর্ষাশেষের চকচকে সবুজ দিগন্তলীন ধানক্ষেত, জড়াজড়ি করে থাকা বাঁশবাগান, টইটুম্বুর ঘরোয়া পুকুরে আপনমনে খেলা করা পাতিহাঁসের দল, ধোয়ামোছা ঝকঝকে আকাশে ফটফটে সাদা তুলোর মতো আদুরে মেঘ সব — কিচ্ছু যেন বদলায়নি।
দশ বছর ধরে শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে যাওয়া বিল্বপদ্মপুর পালটায়নি এতটুকুও।
ভুজঙ্গের বিলের ধারে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে বাপ-ছেলে। বিলের একটা পাশ জুড়ে অজস্র গোলাপি-সাদা শাপলা ফুটেছে, আর পাড়ময় মাথা দোলাচ্ছে শুভ্র কাশের চামর। অন্তুর মুখ থেকে আপনিই বেরিয়ে আসে –“বাহ্! চমৎকার!”
“শরতের মুখে মুখে আসার জন্য এমন সুন্দর দৃশ্য দেখতে পেলাম, বুঝলি! আগেরবার এসে ধুধু বিল আর ন্যাড়া মাঠই দেখেছিলাম কেবল!”
ছেলেকে তাড়া দেয় সুমিত –“চল, চল, পা চালিয়ে চল। আমরা পৌঁছে গিয়েছি প্রায়। ঐ যে তোর দাদুর বাড়ির পাঁচিল দেখা যাচ্ছে!”
অন্তু মুখ ফিরিয়ে তাকায় বাবার দিকে। তারপর গভীর গলায় বলে —
“শুধু আমার কেন, ও বাড়ি তো তোমারও দাদুর বাড়ি, বাবা।”
কাছের পড়শি চাঁদু নস্করদের খবর দেওয়াই ছিল। ওঁরাই দায়িত্ব নিয়ে ঘরদোর যথাসম্ভব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখেন। কুণাল বলে একটি ছেলে কাজ করে সুমিতের অফিসে, জুনিয়র স্টাফ। তারও পৈতৃক বাড়ি এদিকে। সে-ই মেরামতির ঠিকাদার জুটিয়ে দিয়েছিল একজন — চাঁদু নস্কর আর গাঁয়ের দু’চারজন মাতব্বরের তত্ত্বাবধানে সেই ঠিকাদার মোটামুটি কাজ চালানো গোছের রিপেয়ারিং করে দিয়েছিল বাড়ির। জখম ছাদ বদলানো তো সহজ নয় — তবু, ভাঙা দরজা জানলাগুলোর সারাই, মেঝের গর্ত সিমেন্ট দিয়ে বোজানো, দেওয়ালের নতুন প্লাস্টার আর চুনকাম — এইসব মোটামুটি ঠেকনা দেওয়া কাজ হয়েছে এই ক’বছরে। সুমিতেরই উদ্যোগে গত শতকের প্রাচীন এই বাড়ি আজও মাটির উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে — মিশে যায়নি ধুলোয়।
পুবদিকের ঘরের দেরাজের টানা খুলতে খুলতে সুমিত শুনতে পায়, বাবা বলছে -“বাড়িও একজন চরিত্র বুবাই, জ্যাঠা-পিসির মতোই আমাদের আত্মীয়। অবহেলা করলে সে-ও মনে আঘাত পায়, তোর আমার আনন্দে সামিল হয় সে-ও। মানুষের সঙ্গে তার তফাৎ এই, যে বাড়ির কথাগুলো আমরা শুনতে পাই না। বা, শুনলেও বুঝতে পারি না। কিন্তু তারও মন আছে রে, চাইলে সে মন স্পর্শও করা যায় বৈকি!”
সুমিত শার্টের বুকপকেটে হাত ঢুকিয়ে বার করে আনল একটা শতাব্দীপ্রাচীন ছোট্ট জিনিস। ওমেগা রিস্টওয়াচ। খুব সাবধানে, পরম যত্নে তাকে নিচের ড্রয়ারে রেখে দিয়ে দেরাজ বন্ধ করল সে।
পিছন থেকে অন্তু বলে উঠল — “এটা কি করলে বাবা? কেন করলে?”
“বাবার স্মৃতিচিহ্নকে তার নিজের জায়গায় ফিরিয়ে দিলাম বাপি।”
অন্তুর গলা বন্ধ হয়ে এলো আবেগে — “লাস্ট দশ বছর ধরে দাদুর জন্য মন খারাপ করলেই তুমি ঘড়িটা মুঠোয় নিয়ে বসে থাকো। এখন তোমার মনকেমন করলে কি করবে বাবা? কেন রেখে দিয়ে যাচ্ছো এটাকে?”
দু’পা এগিয়ে ছেলের দুই কাঁধে নিজের ভারি হাত দুটোকে রাখে সুমিত — যেন পরখ করে নিতে চায় অন্তুর কাঁধ কতটা শক্তপোক্ত, কতটা উপযুক্ত হলো জীবনের ভার বইবার জন্য।
তারপর গলাটা সামান্য পরিষ্কার করে নিয়ে কেটে কেটে উচ্চারণ করে –“তোকেও আমি একটা দায়িত্ব দিয়ে যেতে চাই বাপি। ঠিকমতো পালন করা চাই কিন্তু!”
অন্তু ছিটকে উঠে বলে –“হোয়াট ননসেন্স! দিয়ে যেতে চাও মানে? কোথায় যাবে তুমি? তুমি কি ভাবলে, তোমাকে আমি এমনিই চলে যেতে দেব?”
হাহা করে প্রাণখোলা হাসি হেসে ওঠে সুমিত, হাত বাড়িয়ে ঘেঁটে দেয় অন্তুর ঝামরে ওঠা চুল। “দূর বোকা, এক্ষুণি কোথাও যাচ্ছি নাকি আমি? যখন যাব, তখনকার কথা বলছি।”
“সে যখন যাবে, তখন যাবে — তাই বলে এখন এসব কথা কেন?” অন্তুর রাগ পড়েনি একটুও।
সুমিত ফের ধরে ফেলে ছেলের কাঁধ। তারপর গভীর গলায় বলে —
“আমার বাবার স্মৃতি আমি আমাদের এই পৈতৃক বাড়িতে গচ্ছিত রেখে গেলাম বাপি। আমি চাই, যখন আমি থাকব না, তখন আমার কোনও স্মৃতিচিহ্নও তুই এ বাড়িতে গচ্ছিত রেখে যাবি — জানিয়ে যাবি তোর সন্তানকে। এই বাড়িটার যত্ন নিস। ভেঙে পড়ে যেতে দিস না, তোর মা যা-ই বলুক। জানবি, যতদিন এই বাড়ি রয়েছে, তোর ঠাকুর্দা, ঠাকুমা, জ্যাঠাদাদু, পিসিঠাম্মা, বাবা, সবাই — সক্কলে রয়েছে তোর সঙ্গে। আজীবন থেকে যাবে তারা।”
অন্তু বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। বাবার অনুচ্চকিত আবেগ ফল্গুর মতো তিরতির করে ছড়িয়ে যাচ্ছিল তার শিরায় উপশিরায়। সেও যেন অনুভব করছিল, এই জরাজীর্ণ শতায়ু বাড়ি, তার বাইরের শ্যামলা গ্রাম্য প্রকৃতি, বিল্বপদ্মপুরের আকাশ বাতাস যেন কি এক অকারণ পুলকে শিহরিত হয়ে উঠেছে — তার অনুরণন ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। সে শক্ত করে চেপে ধরল সুমিতের হাত। “বলে দিও বাবা, দাদুর রিস্টওয়াচের পাশে কি রেখে দিলে খুশি হবে তুমি — আমি তাই রাখব। তুমি শুধু বলে দিও।”
সুমিতের হাসি চওড়া হয়। তারপর অন্তুর ডানহাতটা নিয়ে সে তার বুকের বাঁ দিকে রাখে। “আমি চলে যাওয়ার পরে এই পেসমেকারটা খুলে নিস বাপি আমার শরীর থেকে। ঐ বন্ধ দেরাজের ড্রয়ারে বাবার বন্ধ হাতঘড়ির পাশে আমার বন্ধ হার্টঘড়িটাকে রেখে দিস। মাঝে মাঝে এসে দেখে যাস, আমি, তোর দাদু, এই বাড়িটা — সব্বাই কত শান্তিতে, কত আনন্দে রয়েছি এখানে।”









