পাকিস্তানে blasphemy law বা ধর্মীয় অবমাননা মামলায় সাক্ষী সাবুদ বিশেষ লাগে না। কারণ, সাক্ষী দিতে গিয়ে কী বলেছে বলতে গেলেই তো ‘অপরাধ’ সংগঠিত হয়ে যাবে! তাই, ‘অভিযোগ’ই যথেষ্ট, প্রমাণাভাবে ছাড়া পাওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই। অপ্রমাণ যদি করতে হয়, তাহলে তার দায়িত্ব পুরোপুরি অভিযুক্তের। নিঃসন্দেহে, খুবই কঠিন কাজ.. শুধু অন্য ধর্মের নয়, একই ধর্মের মানুষও আইনগতভাবে এর আওতার বাইরে নয়।
বাংলাদেশে এরকম আইন না থাকলে কি হবে, একটা সেকশন অনেক দিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছিল’ এই কারণে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আনতে যা পাকিস্তান ছাড়াও সৌদি আরব, ইরান, আফগানিস্তান প্রভৃতি দেশে আছে। বাংলাদেশের সেই অ়ংশ যাদের পুনর্মূষিক হবার মানে পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তনের অভীপ্সা বড়োই প্রবল, তাদের বিষয় অবশ্য স্বতন্ত্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতালাভ কি তাদের কাছে সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্যের প্রতীক, সেটা ঠিক জানা নেই। যেমন জানা নেই একাত্তরে বিশ থেকে ত্রিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা, আর ২ থেকে ৫ লক্ষ নারীর উপর অত্যাচার, সেই বিষয়ে তাদের বক্তব্য সঠিক ভাবে কী!! সম্ভবতঃ পাকিস্তানের আদলেই বলবে, সংখ্যাটা অতিরঞ্জিত!
যাক, কী করা যাবে? সমস্যাটা তো আর আজকের নয়। বা়ংলাদেশের যাদের নিয়মিত সংযোগ আছে, বেশ কয়েক বছর ধরেই তারা জানাচ্ছিলেন, পরিস্থিতি ক্রমশঃই খারাপের দিকে যাচ্ছে, কারণ সাম্প্রদায়িক শক্তি ও জনগণের মধ্যে তার প্রভাব ছিল ক্রমবর্দ্ধমান। তাই, বা়ংলাদেশের এই পরিবর্তন আর যাই হোক একেবারে অপ্রত্যাশিত কখনোই নয়।
ক্ষমতায় থাকাকালীন শেখ হাসিনা হয়তো ভেবেছিলেন, পরিস্থিতি যতোই খারাপ হোক, উনি ঠিক ম্যানেজ করে নেবেন। আসলে, অনেক দিন ক্ষমতায় থাকলে যা হয় আর কি! স্তাবক ও চাটুকারদের কথাই বেশি মধুর বা যুক্তিযুক্ত মনে হয়, ঘটনার সঠিক বাস্তবোচিত বিশ্লেষণের থেকে।
সে আর কী করা যাবে? কিন্তু, যার জন্য বাংলাদেশে দীপুচন্দ্র দাসকে প্রাণ দিতে হলো, মৃত্যুর আগে কি সে সত্যিই বুঝতে পেরেছিল’, ঠিক কী কারণে তার উপর প্রাণঘাতী হামলা হলো?? মনে হয় না!! কারণ, এই অবস্থায় পুরো উন্মাদ না হলে নিশ্চয়ই কেউ বাংলাদেশে থেকে ইসলামের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু সম্পর্কে কটূক্তি করবে, এটা তো চিন্তারও অতীত। সত্যি করে বলতে গেলে, বিভিন্ন সময়ে কটূক্তির অজুহাতে যতো হামলা, দাঙ্গা, প্রাণহানির ঘটনা নানা সময়ে হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, পরবর্তী কালে দেখা গেছে তার অধিকাংশই একান্তই গুজব, ভুয়ো ও অতি উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে প্রচারিত।
তবে, এই blasphemy এর ইতিহাস কিন্তু অনেক পুরোনো এবং এ বিষয়ে কোনো ধর্মেরই একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠিত নয়।
স্বয়ং যীশু খ্রীষ্টের বিরুদ্ধে ইহুদি পুরোহিতদের অভিযোগই ছিল ঈশ্বরের বিরুদ্ধাচারণ বা blasphemy (নিজেকে ঈশ্বরের পুত্র বলা), আর রোমান অথোরিটির অভিযোগ ছিল sedition বা রাষ্ট্রদোহ! মানে একই সঙ্গে blasphemy ও sedition!!
আবার, পরবর্তী সময়ে ধর্মীয় অনুশাসন না মানার কারণে এই খ্রীষ্টধর্ম ও চার্চের ভূমিকাই হয়ে ওঠে অতি মারাত্মক।
অত্যাচারিতদের সুদীর্ঘ তালিকায় আছেন বিজ্ঞানী, সমাজকর্মী, মহান দেশপ্রেমিক এবং চিকিৎসকও।
তাদের একজন হলেন Michael Servetus, ষোড়শ শতাব্দীতে মানব শরীরবিদ্যায় যার অসাধারণ জ্ঞান ও ব্যুৎপত্তির অন্যতম অবদান ছিল pulmonary circulation এর সম্যক ধারণার প্রতিষ্ঠা।
প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাতের কারণে প্রটেস্টান্ট ও রোমান ক্যাথলিক আলাদা আলাদা করে তাকে প্রাণদণ্ড দেন। জেনেভায় তাকে জীবন্ত পোড়ায় জন ক্যালভিনের অনুগামীরা, আর প্যারিসে তাকে না পেয়ে তার লেখা বইএর বহ্নুৎসব করে চার্চপন্থী ক্যাথলিকরা!!
ভারতবর্ষে পর্তুগীজ অধিকৃত অঞ্চলে Inquisition এর নামে যে ভাবে মানুষের প্রচলিত খাদ্যাভাস, ভাষা, সংস্কৃতির উপর ঘোরতর অত্যাচার হয়েছিল, তার সমান্তরাল উদাহরণ বোধহয় ভারতবর্ষেও বিশেষ পাওয়া যাবে না। যে কারণেই হোক, বর্তমান হিন্দুত্ববাদীরা এই বিষয়ে ততটা সোচ্চার নয়। হতে পারে, তারা অনেক বেশি focused ভারতের মোগল শাসনের অধ্যায় নিয়ে!! মোগল অধ্যায় বললেও বোধহয় ভুল হবে, আলোচ্যসূচীতে দৃষ্টি নিবদ্ধ মূলতঃ বাবর থেকে ঔরঙ্গজেব পর্যন্ত ; তার আগের সুলতান পর্ব এবং ঔরঙ্গজেব পরবর্তী মোগল শাসকগণ এ বিষয়ে রীতিমতো অবহেলিতই বলা যায়।
গোয়া ও দমনে পর্তুগীজ Inquisition এর হাত থেকে শুধু স্থানীয়রাই নয়, এমনকি স্বদেশী বা ইউরোপিয়ানদেরও রেহাই ছিল না। ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগীজ চিকিৎসক Garcia d’Orta যিনিই সম্ভবতঃ প্রথম পুস্তকাকারে প্রকাশ করেন Indian drugs and medicines শিরোনামে স্থানীয় plants and herbs সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য স়ংকলন(যা সম্ভবতঃ ভারতে ছাপা প্রথম পুস্তকাবলীর অন্যতমও বটে), জীবনকালে কোনো ক্রমে এই নিগ্রহ এড়াতে পারলেও পরবর্তী সময়ে তার দেহাবশেষ কবর থেকে তুলে পোড়ানো হয়। তার ভগিনী অতটা সৌভাগ্যবান ছিলেন, তাকে পোড়ানো হয় জীবন্ত!প্রসঙ্গতঃ তারা স্পেন থেকে ভারতে পালিয়ে আসেন স্পেনীয় Inquisition এড়াতে ; ইহুদি থেকে খ্রীষ্ট ধর্মে প্রবেশ করলেও, অভিযোগ তারা নাকি লুকিয়ে ইহুদি আচার আচরণ পালন করতেন। তার আগেও একই অভিযোগে প্রথমে শ্বাসরোধ ও পরে আগুনে দগ্ধ করে মারা হয়েছে গোয়ায় পর্তুগীজ চিকিৎসক Jeronimo Diasকে।
পরবর্তী শতাব্দীতে ফরাসী চিকিৎসক Charles Dellon কোনোক্রমে পর্তুগীজ জেল থেকে মুক্তি পান ফরাসী রাজতন্ত্রের হস্তক্ষেপে। তার লেখা পুস্তক থেকেই ইউরোপ জানতে পারে গোয়া ও দমনে Inquisition এর প্রকৃত রূপকে।
অবশ্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও নানা ভাবে চালু ছিল খ্রিষ্টীয় blasphemy law, মধ্যযুগ পেরিয়ে এমনকি একবিংশ শতাব্দী পর্যন্তও, যদিও তা ছিল অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত!!
অবশ্য অসুবিধা নেই,ততক্ষণে ব্যাটন উঠে গেছে অন্য এক সম্প্রদায়ের হাতে; ভালো জিনিসের ঐতিহ্য রক্ষা যতোই কষ্টকর হোক, খারাপ জিনিসের উত্তরাধিকার হবার দাবিদারের অভাব হয় না তাছাড়া, খারাপ জিনিস সব সময়েই খুব সংক্রামক, highly contagious…..
আর, আমাদের ভয়টা সেখানেই……
এটা ঠিক যে গ্রীক শব্দ blasphemy (slandering) এর সঙ্গে আব্রাহামিক ধর্মগুলির পরিচিতিই বেশি। বৌদ্ধ, জৈন ও হিন্দু ধর্ম তুলনামূলক ভাবে অনেক পিছিয়ে। তো তাতে কী হয়েছে?! এখন তো রাজনীতি, ধর্ম, সামাজিক আচরণ, সব কিছুতেই কড়া প্রতিযোগিতা চলছে ‘কে কতো খারাপ হতে পারে’!! থিমটা হলো, ‘তুমি অধম হইলে, আমি আরও অধম হইবো না কেন’??
অধমত্বের শিরোপা লাভের এই ব্যাকুলতা আমাদের কতো দূর বা কতো নীচে নিয়ে যাবে সত্যিই জানি না।
বাংলাদেশে ধর্ম বা ধর্মীয় গুরুর অপমান হয়েছে কি হয়নি জানার কোনো উপায় নেই। না হবার সম্ভাবনা শতকরা নিরানব্বই দশমিক নয় নয়। কিন্তু একান্ত যদি কোনো কটূক্তি করেই থাকে, তাহলে খুন করে ফেলতে হবে?? এই অধিকারটা কে দিলো?
অধিকার কেউ দেয় না, এটা সম্পূর্ণতঃই আধিপত্যবাদের চরম প্রদর্শন। নানা ভাবে নানা রূপে এর প্রকাশ ঘটে, তা সে blasphemy এর নামেই হোক বা অন্য কোনো শব্দবন্ধকে মাধ্যম করেই হোক। মূল জিনিসটাই হলো নিরীহ দুর্বলের উপর ‘সবল’ বলে নিজেকে জাহির/প্রমাণ করার আস্ফালন!দীপুচন্দ্র দাসকে নির্মমভাবে খুন করা একশো বার নয়, হাজার বার অন্যায়। কিন্তু, পরিযায়ী শ্রমিক বাচ্চা ছেলেটা, বয়সে দীপুর থেকে বোধহয় অল্প ছোট, তাকে হত্যা করাটাকে কী বলবো?!
দুটোকে এক করা নিশ্চয়ই যাবে না। পরিমাণগত(quantitative) তফাৎ তো অবশ্যই আছে, তফাৎ আছে রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতিতে। কিন্তু গুণগত (qualitative) ভাবে?
সেই তো একই জিনিস, ‘টারগেটেড পপুলেশন’কে ভীত সন্ত্রস্ত রাখা অনির্দিষ্টকালের জন্য, শুধুমাত্র নিজের/নিজেদের ক্ষমতা জাহির করার জন্য…….
আর এই সব কিছুর পিছনে সব সময়েই স্বার্থ তো অবশ্যই আছেই, কারুর না কারুর………….










