ঘটনা ১: বছর পনেরোর ছেলেটিকে তার মা নিয়ে এসেছিলেন। কথা বলবেন কী, শুধুই কাঁদছিলেন। বলছিলেন, আমার সাতকূলে কেউ নেই। ওর বাপ মরে গেছে দশ বছর আগে। আমি চার বাড়ি কাজ করি। ছেলেটারে পড়াচ্ছি। কিন্তু শেষ দুমাস ধরে ছেলে কেমন নেতিয়ে যাচ্ছে। রোজ জ্বর আসে, খেতে পারে না। দু’পা হাঁটলে হাঁপিয়ে যায়। স্কুলে যেতে পারে না।
কাগজ পত্র দেখলাম। স্থানীয় একাধিক হাতুড়ে ডাক্তার নানা রকম এন্টিবায়োটিক দিয়েছেন জ্বরের জন্য। জ্বর কমেনি, বা কমলেও দু’চারদিন বাদে ঘুরে এসেছে।
ভদ্রমহিলা কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, যা পয়সা জমিয়েছি, দু’মাস ধরে দামী দামী ওষুধ কিনতেই শেষ হয়ে গেছে। কী করব জানিনা। সবাই বলছে, হাসপাতালে ভর্তি করে দিতে।
ছেলেটি খুক খুক করে কাসছে। স্থানীয় সরকারি হাসপাতাল থেকে কফ পরীক্ষা করতে বলা হল। যক্ষ্মা ধরা পড়ল। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ছয় মাস ওষুধ খেল। এক পয়সাও লাগল না। ছেলেটি পরের বছর মাধ্যমিক পাশ করার পর তার মা মিস্টি নিয়ে এলেন। বললেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দাদা দিদিদেরও মিস্টি খাইয়ে এসেছি।
ঘটনা ২: আমাদের মেডিকেল ক্যাম্পে দেখাতে এসেছেন- মধ্যবয়স্ক লোকটি ভ্যান চালান। মুখ চেনা। কোমরের ব্যথায় ১ মাস ধরে ভ্যান চালানো বন্ধ। নানা রকম ব্যথার ওষুধ খেয়েছেন। সাময়িক ব্যথা কমেছে, তারপর যেকে সেই। ডাক্তার দেখাতে এসেছেন কোনোমতে লাঠিতে ভর দিয়ে।
বললাম, কোমরের একটা এক্সরে অন্তত করুন।
তাঁর কাছে এক্সরে করার মতও পয়সা নেই। বললেন, এক মাস কোনো কাজ করিনা। আমার উপার্জনেই সংসার চলে। বউ বাধ্য হয়ে দু বাড়ি ঝি’র কাজ নিয়েছে। কিন্তু মাস না পোহালে তো কেউ মাইনে দেবে না।
অনেক করে বোঝনোর পর মিউনিপ্যালিটি হাসপাতাল থেকে একটা এক্সরে করে আনলেন। মেরুদণ্ডের নীচের দিকের দুটি কশেরুকা একেবারেই ভেঙে চুপসে গেছে। অথচ তিনি বলছেন, এর মধ্যে তেমন কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। বললাম – এখুনি আর জি করে গিয়ে দেখাতে হবে।
তিনি কথা শুনলেন। আর জি কর হাসপাতালে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর তাঁর বোন টিবি ধরা পড়ল। ওষুধ শুরু হলো। মেরুদণ্ডে অপরেশন হলো। বছর দুয়েক কেটে গেছে, তিনি আর ভ্যান চালাতে পারেন না। তবে দিব্যি নিজের পায়ে হাটেন। অন্য জীবিকা খুঁজে নিয়েছেন। ওভারব্রীজের পাশের ফুটপাতে সস্তা প্লাস্টিকের জিনিস বিক্রি করেন।
ঘটনা ৩: এক সিস্টার দিদি মাতৃত্বকালীন ছুটির পর সবে যোগ দিয়েছেন পানিহাটি হাসপাতালে। মাসদুয়েক ডিউটি করার পরই মাঝে মাঝে জ্বর আসা শুরু হলো। সাথে ডানদিকের উপর পেটে ব্যথা। আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করে পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়ল। কিন্তু অপরেশনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এক্স রে করতেই বিপত্তি। ডানদিকের ফুসফুস অর্ধেকটাই প্রায় জলে ভর্তি। হাসপাতালেই জল বের করা হলো। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর বোঝা গেল টিউবারকুলার প্লুরাল ইফিউশন। আটমাসের বাচ্চা আর যক্ষ্মা রোগ দুই ধাক্কায় তিনি মানসিক ভাবে ভেঙে পড়লেন। তবে তা সাময়িক। নয়’মাস ওষুধ খেয়ে দিদি একেবারে সুস্থ হয়ে গেলেন।
এরকম ঘটনার কথা বলে শেষ করা যাবে না। সবসময় ফলাফল অবশ্য এতো ভালো হয় না। কারণ রোগটার নাম যক্ষ্মা। তবে নিয়মিত ওষুধ খেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগ ভালো হয়ে যায়। আর ওষুধ না খেলে বা অনিয়মিত খেলে ফলাফল একটাই- মৃত্যু। শুধু রোগীর মৃত্যুতেই ঝামেলার শেষ নয়, মৃত্যুর আগে রোগী আরো বহুজনকে যক্ষ্মা রোগাক্রান্ত করে যাবেন।
তবে এতোদিন অবধি কারও যক্ষ্মা ধরা পড়লে ঘাবড়ে যেতাম না। রোগীকে নিকটবর্তী সরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দিতাম। কারণ জানতাম একবার যদি রোগী ন্যাশনাল টিউবারকিউলোসিস এলিমিনেশন প্রোগ্রামের তত্ত্বাবধানে চলে যায়, তাহলে স্বাস্থ্যকর্মী দাদা দিদিরা ঠিক তাঁকে ছ’মাস বা ন’মাস ওষুধ খাওয়াবেন। রোগী কোনো কারণে ওষুধ নিতে না আসলে বাড়ি পর্যন্ত ধাওয়া করবেন। রোগীর বাড়ির লোকেদেরও শারীরিক পরীক্ষা হবে। এবং পুরোটাই হবে বিনাপয়সায়।
তবে ইদানীং কারও যক্ষ্মা ধরা পড়লে মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে যাচ্ছে। কারণ এর পর কী করব জানিনা। সরকারি যক্ষ্মা ওষুধের সরবরাহ একেবারেই অনিয়মিত বেশ কয়েকমাস। বাইরে থেকে কিনতে বলব? অধিকাংশ ওষুধের রোখানেই রাখে না। অনেক খুঁজে পাওয়া গেলেও এত দাম দিয়ে কেনা অনেকের ক্ষেত্রেই অসম্ভব। আর বিশেষ করে যক্ষ্মা হয় গরীব মানুষদেরই বেশি।
আমরা যতই প্রাণপণে আমাদের দেশকে একটি উন্নত দেশ বলে দাবী করি, শুধু জনসংখ্যায় নয় গরীব মানুষের সংখ্যাতেও আমরা পৃথিবীতে প্রথম। ডিজিটাল ইন্ডিয়া এই সব গরীব মানুষের অস্তিত্ব যতটা সম্ভব আড়ালে রাখতে চায়। সেই সঙ্গে আড়ালে রাখতে চায় তাদের সব সমস্যাকেও। অতএব যক্ষ্মা নিয়ে হইচই হবে না, এটা নিশ্চিত। প্রধানমন্ত্রী নিজেই ২০২৫ সালে যক্ষ্মা রোগের এলিমিনেশনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছেন। হয়ত খাতায় কলমে সেটা হয়েও যাবে। আর আমরা হতভাগ্য চিকিৎসকেরা রোজই নতুন নতুন যক্ষ্মার কেস নির্ণয় করব। এবং বুঝে উঠতে পারব না, এই রোগীদের কিভাবে চিকিৎসা করব। অনিয়মিত চিকিৎসায় রোগী মারা যাবেন, ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা বাড়বে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে অন্যদের মধ্যে। তবু আমরা যক্ষ্মার ওষুধ সরবরাহের দাবীতে সরব হব না, কারণ মানুষগুলি গরীব।
আমার দুই চিকিৎসক ভাই গান বেঁধেছে, এই যক্ষ্মা রোগ নিয়ে। দয়া করে গানটা ছড়িয়ে দিন। মানুষ জানুক এই ভারতবর্ষের মধ্যে আছে আরেকটা ভারতবর্ষ।










