আমি যখন বের হই তখনো দিনের ঘুম ভাঙেনা পুরোপুরি। অথচ ওই সকালেও পাড়ার মোড়ে আমার খুপরির সামনে বেশ কয়েকজন মাঝবয়সি এবং বয়স্ক মহিলা বসে থাকেন।
এটা আমি প্রতিদিনই দেখি। এই খুপরিতে আমি বেলা দশটায় ঢুকব। প্রায় সাড়ে চার ঘন্টা তাঁরা বসে থাকবেন। নিজেদের মধ্যে সুখ-দুঃখের গল্প করবেন। ব্যাগ থেকে পান বের করবেন। কুঁচো সুপারি, সস্তা জর্দার কৌটো। যত্ন করে পানে চুন লাগাবেন। তারপর নিজেদের মধ্যে ভাগ করে খাবেন।
এসব আমার দাঁড়িয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সময় নাই। সকালের চেম্বার শুরু করি ছটা থেকে। কোনোদিন দোহাড়িয়ায়, কোনোদিন নাটাগড়ে। ঘড়িতে বাধা জীবন। এক চুলও এদিক-ওদিক হওয়ার জো নেই।
এইসব মধ্যবয়স্ক বা বয়স্ক মহিলাদের সাথে জীবন খুব বেশি সদব্যবহার করেনি। অনেকের স্বামী নেই, অনেকের স্বামী থেকেও নেই৷ কেউ কেউ বাণপ্রস্থের বয়সে আসক্ত শরীরে খেটে খাচ্ছেন। কেউ দৈনিক খোরাকির বিনিময়ে পুত্র পুত্রবধূর নিত্য গঞ্জনা শুনছেন। তবু তাঁরা বেঁচে আছেন এবং অন্তরে এক স্নেহের প্রবাহকে ফল্গুধারার মতো বাঁচিয়ে রেখেছেন।
এনাদের ডাক্তারের ফিজ দেয়ার ক্ষমতা নেই। এবং সেটা স্বীকার করতে লজ্জাও পান না। তবে মুশকিলের ব্যাপার হলো ফিজের বদলে এনারা নানা রকম জিনিসপত্র দিয়ে ঋণমুক্ত হতে চান। সেসব জিনিসপত্র হলো কচুর লতি, লাউ ডগা, হাঁসের ডিম, কাঁচকলা, পাকা পেঁপে ইত্যাদি। এসব জিনিসপত্র নেওয়ায় আমার রীতিমতো আপত্তি আছে। কারণ তাতে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার দরজা-জানালাহীন ছোট্ট খুপরি সব্জির দোকানে পরিণত হবে।
আবার না নিলেও বিপদ। এনারা এমন সেন্টিমেন্টাল বক্তব্য রাখেন – জবাব দেওয়া মুশকিল।
তবে দীর্ঘদিন ধরে এসব সামলাতে সামলাতে অভ্যাস হয়ে গেছে। কোন দেবী কিসে সন্তুষ্ট হন সেটা জেনে গেছি। তবু মাঝে মাঝে অবাক হতে হয়।
আজ যেমন ভোর বেলায় বেরচ্ছিলাম বারাসাত সিটিজেন ফোরামে মেডিকেল ক্যাম্প করার জন্য। বাড়ির বড় গেট খুলতেই দেখি কপালে রসকলি আঁকা দুজন খটখটে বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছেন।
আমাকে দেখে বললেন, আচ্ছা ডাক্তার বাবা, তোমাদের গেটের আড়ালে বসে চাড্ডি চিড়ে ভিজায়ে খেয়ে লেব? সেই ময়না থেকে আইছি। বড্ড ক্ষুধা পাইছে।
আমি বললাম, এখানে কেন? আপনারা তো চেম্বারের সামনে বসেই খেতে পারতেন। ওখানেই তো খান।
এক বৃদ্ধা হেসে বললেন, হ্যাঁ রাধামাধব, ওখানেই খাই। কিন্তু একটা সমস্যা হইয়াছে যে।
এইসব সমস্যা টমস্যা আমার আর ভালো লাগেনা। সারাদিন এত সমস্যা দেখি, দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। সমস্যা দেখলেই মনে হয় পালিয়ে যাই। হতাশ ভাবে বললাম, কী সমস্যা হলো আবার?
সমস্যা হলো বাকি যারা এয়েচেন, তারা সব মুছলমান। ওদের সাথে মিলেমিশে খাই প্রতিদিন। কিন্তু এখন মুছলমানদের রোজা চলছে। ওরা সব উপোস করছে। অভূক্ত লোকের সামনে কী করে বসে খাই। এদিকে আমরা সুগারের রোগী। কিছু না খেয়ে মাথা ঘুরছে।
বললাম, নিশ্চিন্তে বসে খান। যাওয়ার সময় গেটটা শুধু টেনে দিয়ে যাবেন।










