চে, তোমার মৃত্যু আমাকে আর অপরাধী করে দেয় না।
আমার ঠোঁট শুকনো হয়ে আসে ঠিকই, কিন্তু সেটা সকাল থেকে সন্ধ্যে অবিশ্রান্ত ঘোরাঘুরির ফসল, বুকের ভেতরটা ফাঁকা, আত্মায় অভিশ্রান্ত বৃষ্টিপতনের শব্দ আমি আর শুনতে পাই না, অভাবের সংসারে দুবেলা দুমুঠো অন্ন যোগানোর দায়ে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা থেকে শীঘ্র পতনের ওষুধ অথবা বাংলা মদ ফেরি করতে হয় যে আমাকে। তোমার মৃত্যু নয় চে, দিনের শেষে সেলসের ফিগার থেকে জন্ম নেয় আমার বিষণ্ন দীর্ঘশ্বাস। বলিভিয়ার জঙ্গলে নীল প্যান্টালুন পরা তোমার ছিন্নভিন্ন শরীর আর তোমার খোলা বুকের মধ্যখান দিয়ে নেমে যাওয়া লাল রক্তের রেখা নাকি লাল পাতলুন আর নীল রক্ত সব কেমন গুলিয়ে যায় আজকাল। তোমার চোখ দুটি চেয়ে আছে আর সেই দৃষ্টি এক গোলার্ধ থেকে অন্য গোলার্ধে ছুটে আসার চেয়েও তীব্রবেগে ছুটে আসছে ম্যাকডোনাল্ড ফ্র্যাঞ্চাইজির দোকান সেই হ্যানোভার থেকে হ্যানয় অবধি, ভিয়েতনামের পবিত্র মাটি আজ ভিজে যাচ্ছে কোকাকোলার বোতল থেকে ফুঁসে ওঠা রসে। চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দিচ্ছে না আর।
শৈশব থেকে মধ্য যৌবন পর্যন্ত দীর্ঘ দৃষ্টিপাত। আমারও কথা ছিল হাতিয়ার নিয়ে তোমার পাশে দাঁড়াবার আমারও কথা ছিল জঙ্গলে কাদায় পাথরের গুহায় লুকিয়ে থেকে সংগ্রামের চরম মুহূর্তটির জন্য প্রস্তুত হওয়ার আমারও কথা ছিল রাইফেলের কুঁদো বুকে চেপে প্রবল হুঙ্কারে ছুটে যাওয়ার আমারও কথা ছিল ছিন্নভিন্ন লাশ ও গরম রক্তের ফোয়ারার মধ্যে বিজয়-সঙ্গীত শোনাবার-কিন্তু আমার বড্ড দেরি হয়ে গেছে, বিপ্লব না করে প্রেম করে ফেলেছি, যার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে পোয়াতি বউটার মুখ চেয়ে বিপ্লবের বদলে আমায় রোজগারে নামতে হয় কারণ আমার ঘরে জমানো টাকা নেই, শাসালো শ্বশুর নেই, রোজগারে বউ নেই। সেলস ম্যানেজারের সব অপমান সয়ে মুখ নিচু করে থাকি, আমি হেরে যাই প্রতিদিন, আমি মেনে নিই সবকিছু, আমি ট্রেনের জানলার পাশে, নদীর নির্জন রাস্তায়, ফাঁকামাঠের আলপথে, শ্মশানতলায় আকাশের কাছে, বৃষ্টির কাছে বৃক্ষের কাছে, হঠাৎ-ওঠাঘূর্ণি ধুলোর ঝড়ের কাছে আমার শপথ শোনাই কাল আরো দশ বোতল বেশি বেচব ওষুধ অথবা বাংলা মদ, আমার কিছু এসে যাচ্ছে না, আমি প্রস্তুত হচ্ছি, আমি সব কিছুর নিজস্ব প্রতিশোধ নেবো আমি। আবার ফিরে আসবো আমার হাতিয়ারহীন হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়েছে কেবল ভিড় বাসের রড ধরার জন্য। শক্ত হয়েছে চোয়াল কেবল আগামী কাল বেচাকেনার ফিগারের কথা ভেবে, তোমার কথা ভেবে নয় চে। পেটের ভাত যোগানোর দায়ে সারাটা বছর সময় দিতে না পারলেও একটা দিন ফেরিওয়ালার ঝোলা তুলে রেখে এখনও নিয়ম করে বুথে বসে স্লিপ বিলি করি, জনগণতান্ত্রিক চা খাই, এটা ওটা গল্প করি পুরোনো দিনের সাথীদের সাথে আর মনে মনে বারবার বলে যাই চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয় নি।
আমি এখনও প্রস্তুত হতে পারি নি, আমার অনবরত দেরি হয়ে যায়, আমি এখনও সুড়ঙ্গের মধ্যে আধো-আলো ছায়ার দিকে রয়ে গেছি,আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে চে তবুও তার মাঝে যখন আকাশ বাণীতে শুনতে পাই শহীদ বেদীটা লাথি মেরে ভেঙে ফেলা হয়েছে তখন মাথার ভেতর কেমন দমকা পাগল হাওয়া খেলে যায়। হুংকার দিয়ে ওঠে কেউ, রইল ঝোলা, চললো ভোলা। তুমি আজ জন্মাতে গেলে কেন চে ? আর জন্ম নিলেই যদি তাহলে সুখী নিরুপদ্রব এমডি মেডিসিন এর জীবন ছেড়ে ঐভাবে মরতেই বা গেলে কেন ? কারণ তুমি তো জানতে যে তোমার মৃত্যু আমাকে আমাদের অনিবার্য ভাবেই অপরাধী করে দেয় চে।
১৪ই জুন, চে গুয়েভারার জন্ম দিবস










