১৫ আগস্ট, ২০২২-এ জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারতবাসীকে “পঞ্চ প্রাণ”-এর ব্যাপারে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন – নাগরিক হিসেবে ভারতবাসীকে তাদের কর্তব্য পূর্ণ করতে হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কর্তব্য পালন করলে তবেই অধিকারের প্রশ্ন আসে। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর মতো সংবাদপত্রে তিন বছর আগে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছিল “হোয়াই ইন্ডিয়া অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড নিড গান্ধী” (অক্টোবর ২, ২০১৯)। সেখানে তিনি গান্ধীকে উদ্ধৃত করে লিখেছিলেন – “অধিকারের প্রকৃত উৎস হচ্ছে কর্তব্য। যদি সবাই আমরা কর্তব্য পালন করি তাহলে অধিকার কোন দূরের বস্তু থাকবেনা।”
প্রসঙ্গত, গান্ধীকে নিয়ে এইচ জি ওয়েলসের অভিজ্ঞতার কথা বলা যেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি যুদ্ধের লক্ষ্য-সংক্রান্ত “বিল অফ রাইটস”-এর জন্য সমর্থন চেয়েছিলেন। গান্ধী তাঁকে “বিল অফ রাইটস”-এর পরিবর্তে একটি সার্বজনীন চার্টার অফ ডিউটিজ লিখতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। এখানে এসে গান্ধী এবং বর্তমান ভারত নায়ক মিলে যান।
আরেকটি তথ্যও উল্লেখ করা দরকার। মে ২৬, ১৯৪৭-এ Julian Huxley-কে একটি চিঠিতে গান্ধী লিখেছিলেন জুন ৮, ১৯৮৭-এ হরিজন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল) – “[T]he very right to live accrues to us only when we do the duty of citizenship of the world. From this one fundamental statement, perhaps it is easy enough to define the duties of man and woman, and correlate every right to some corresponding duty to be first performed. Every other right can be shown to be usurpation hardly worth fighting for.” [https://www.mkgandhi.org/articles/gondutiesrights.php]
ফলে এরকম এক প্রেক্ষিতে মোদি এবং গান্ধী সমস্তত্ব মিশ্রণের মতো মিশে যাবেন, এর মধ্যে আশ্চর্যের কিছু নেই। এবং ভারতের তরফে একে সম্যকভাবে ব্যবহারও করা হবে।
ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক সংবিধান এবং আইন মেনে নিয়মিত ট্যাক্স দেয়, সামাজিক জীবনযাপন করে, ভিন্নধর্মের প্রতি সহনশীলতা দেখায়, যাদের সন্তানেরা সামরিক বাহিনীতে উৎসর্গীকৃত, প্রশাসনকে সহযোগিতা করে, করে এসেছে, তারা কি দেশের প্রতি কর্তব্য পালন করছে? তারা কি অধিকারের কথা বলবে?
সহজ কথা হল, ভারতবাসীকে অধিকারের পরিবর্তে প্রথমে কর্তব্যের পাঠ নিতে হবে। এরকম একটি প্রসঙ্গ কেন ঘুরে ঘুরে আসছে? সাধারণ ভারতবাসীর মনে এ প্রশ্ন আসা নিতান্ত স্বাভাবিক। ঘটনাচক্রে, ১ আগস্ট, ২০২২-এ সেসময়ে ভারতের সদ্য প্রাক্তন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এন ভি রামান্না হিদায়াতুল্লা ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটির কনভোকেশনে এক বক্তৃতায় ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন – “যে মানুষেরা তোমাদের কাছে পৌঁছুতে পারছেনা তাদের কাছে যাও। যেসব সামাজিক ইস্যুগুলো রয়েছে সেগুলো বোঝো, এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হও এবং তাদের স্বপক্ষে দাঁড়াও। মানুষকে তার অধিকার সুরক্ষিত রাখার জন্য শিক্ষিত করো এবং যেখানে সম্ভব সেখানে তাদের আইনী পথ দেখাও।” (হিন্দুস্তান টাইমস, “কন্সটিটিউশন মেন্ট ফর এভরি সিটিজেন অফ ইন্ডিয়া”, আগস্ট ১, ২০২২)
কর্তব্য এবং অধিকারের মধ্যে পছন্দ করার ক্ষেত্রে ভারতের নীতি-নির্ধারকদের নতি (গ্র্যাডিয়েন্ট) এখন কর্তব্যের দিকে।
এখানে দুয়েকটি অপ্রিয় বিষয় আমাদের ভাবায়। প্রথম, নতুন যে “ফরেস্ট (কনজার্ভেশন) রুলস, ২০২২” পার্লামেন্টের অনুমোদন পেয়েছে, সেখানে অরণ্যের অধিকার অনাদিকাল ধরে যে জনজাতিরা অরণ্যবাসী এবং অরণ্য সংরক্ষণ করে তাদের হাত থেকে হারিয়ে গেছে। তারা কি নিয়ে ভাববে – অধিকার কিংবা কর্তব্য? দ্বিতীয়, সংশোধিত শ্রম আইনে (২০২২) ‘মাইগ্র্যান্ট” শ্রমিকদের অধিকার কি সুরক্ষিত হবে? তৃতীয়, “এসেনশিয়াল কমোডিটিজ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২০” অনুযায়ী প্রান্তিক কৃষক এবং মহাশক্তিধর মালিকের মধ্যে কার কর্তব্য এবং কার অধিকার রক্ষিত হবে? এসব প্রশ্নের সমাধান জিডিপির বৃদ্ধি দিয়ে হয়না।
এই ২ ধরনের অর্থনীতির মধ্যে পার্থক্য সহজেই চোখে পড়বে।
কতকগুলো গোড়ার বিষয় আমরা ভাবার চেষ্টা করি। কর্তব্যের ধারণা কার্যত জড়িয়ে আছে প্রজার অস্তিত্বের সাথে। প্রাক-আধুনিক সমাজ থেকে আধুনিক সমাজে উত্তরণ প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রিক ক্ষেত্রে প্রজা সত্তার কর্তব্য থেকে নাগরিক সত্তার অধিকারে উত্তরণ, এবং তার স্বীকৃতি লাভ। জন রলসের মতো নীতিবাদী দার্শনিক তাঁর এ থিওরি অফ জাস্টিস গ্রন্থে বলছেন – “একটি সর্বোচ্চ প্রসারিত সকলের জন্য সমান বনিয়াদি লিবার্টির ব্যবস্থার মধ্যে প্রতিটি ব্যক্তির সমান অধিকার থাকতে হবে, যা অন্যের লিবার্টির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।” সমাজ আধুনিক হয়ে ওঠার ভিত্তিতে রয়েছে এ ধারণাগুলো। উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দিতে জার্মান সমাজতাত্বিকদের ব্যাখ্যায়, গেমাইনশাফট (gemeinschaft) এবং গেজেলশাফট (gessellschaft)-এর মতো দুটি ধারণা পাওয়া যায়।
প্রথমটি কৃষি সমাজ তথা কৌম সমাজ এবং দ্বিতীয়টি আধুনিক শিল্পনির্ভর সমাজ বোঝায়। পার্থ চ্যাটার্জি দুটি ধারণার পার্থক্য নিয়ে বলছেন, “সমাজ ব্যক্তির আগে, সমাজের দাবীই প্রধান। সে সমাজে ব্যক্তিসত্তা স্বীকৃত হতে পারে না, এমন নয়। কিন্তু ব্যক্তিসত্তা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের স্থান বৃহত্তর সামাজিক প্রয়োজন ও নিয়মের বশবর্তী।” আমরা কি গেজেলশাফট-এর যুগে থাকলেও গেমাইনশাফট-এর মতাদর্শকে অনুপ্রবিষ্ট করতে চাইছি?
এনগ্র্যাফটেড মডার্নিটির যে যাত্রা ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রিক উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সেখানে সমস্ত ভারতবাসী হয়ে উঠলো নাগরিক, খানিকটা হঠাৎ করেই। লক্ষ্যণীয় যে জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে ইউরোপ শতাধিক বছর ধরে ধীরে ধীরে একটু একটু করে যেভাবে গড়ে উঠেছে ভারত সেসমস্ত ধাপ অতিক্রম করেছে সামান্য কয়েক দশকে। ফলে ইউরোপের গুরুত্বপুর্ণ দেশগুলোতে যেভাবে ঐতিহাসিকভাবে প্রথমে ব্যক্তির অভ্যুদয়, পরবর্তীতে রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের সহাবস্থান, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সমাজ জীবনে সেকুলারিজমের যে পরিসর তৈরি হয়েছে তা ভারতে হয়নি। যেভাবে চার্চ এবং রাষ্ট্র পৃথক হয়েছে, যেভাবে রাষ্ট্রিক জীবন থেকে অপসৃত হয়ে ধর্মানুগত্য ব্যক্তিগত রুচি এবং পরিসরের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ঐতিহাসিকভাবে ভারতে সেসব অনুপস্থিত। বিভিন্ন সামন্ত রাজ্যে বিভক্ত ভারত নামের ভৌগোলিক ভুখন্ডে সামন্ত রাজা, উদীয়মান বৃহৎ শিল্পপতি শ্রেণী, ব্যবসায়ী, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ এবং ওকালতি ও ডাক্তারির মতো বিভিন্ন স্বাধীন পেশার ব্যক্তিদের উপনিবেশের বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থে রাজনৈতিক এবং সামরিক সংগ্রামের বিভিন্ন সফলতা ও ব্যর্থতার চিহ্ন বহন করেছে ১৯৪৭ পরবর্তী স্বাধীন ভারতবর্ষ।
এধরনের বিভিন্ন সময়-চিহ্নের স্থায়ী ছাপ নিয়ে যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং একক ব্যক্তির একক ভোটাধিকার চালু হল সেগুলো মূলত সমাজের উপরের স্তরের ক্ষমতা চিহ্ন। রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যক্তি-সমাজ-কৌম-রাষ্ট্র-নাগরিকতার সম্পর্ক নতুন করে রচিত হয় ১৯৪৭ পরবর্তী ভারতবর্ষে।
শিল্প বিপ্লবোত্তর ইউরোপে সমাজ এবং কৌমের ধারণা খসে গেছে প্রায় তিন’শ বছর জুড়ে। ডেমোক্রাসির স্বর্ণযুগে সিভিল সোসাইটির সবল, জোরালো উপস্থিতির সময় আধুনিকতা নির্মিত নাগরিকতার ভাষ্য ছাড়াও আরও অনেক স্বর, কণ্ঠ, আত্মপ্রকাশ করে – অশ্রুত থেকে শ্রুত হয়ে ওঠে, অদৃশ্য থেকে দৃশ্যমানতার স্তরে উঠে আসে। এক্ষেত্রে ১৯৬০-৭০-এর দশকের প্যারিসের ছাত্র বিদ্রোহ, আমেরিকায় তীব্র ভিয়েতনাম যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে “অন্য এক পৃথিবী সম্ভব”, “অক্যুইপাই ওয়াল স্ট্রিট” বা গ্রেটা থুর্নবার্গের পরিবেশ নিয়ে আন্দোলন সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এরকম একটি পরিসরে নাগরিক হবার ধারণার সাথে নাগরিক না-হবার কিংবা অ-নাগরিকের ধারণাও সামাজিকভাবে মান্যতা, গ্রাহ্যতা পায়। বহু ভাষ্যের নির্মাণ হতে থাকে।
কিন্তু যদি জাতি-রাষ্ট্র তৈরিই হয় প্রভুত্বকারী সামন্ত রাজা ও এর উপযোগী মানসিকতা, জায়মান শিক্ষিত নাগরিক সমাজ, বৃহৎ পুঁজি এবং ছোট বা স্বাধীন পুঁজির মধ্যেকার অসংখ্য বাস্তব দ্বন্দ্বকে অমীমাংসিত রেখে? যদি গড়ে ওঠে জাতিস্বত্তার প্রশ্নকে সমাধানের আওতায় না এনে? রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রবণতাটি তাহলে সবসময়েই কেন্দ্রাভিমুখী হয়। প্রান্ত এখানে প্রান্তিক, কখনো ব্রাত্যও বটে।













“কিন্তু যদি জাতি-রাষ্ট্র তৈরিই হয় প্রভুত্বকারী সামন্ত রাজা ও এর উপযোগী মানসিকতা, জায়মান শিক্ষিত নাগরিক সমাজ, বৃহৎ পুঁজি এবং ছোট বা স্বাধীন পুঁজির মধ্যেকার অসংখ্য বাস্তব দ্বন্দ্বকে অমীমাংসিত রেখে? যদি গড়ে ওঠে জাতিস্বত্তার প্রশ্নকে সমাধানের আওতায় না এনে? রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রবণতাটি তাহলে সবসময়েই কেন্দ্রাভিমুখী হয়। প্রান্ত এখানে প্রান্তিক, কখনো ব্রাত্যও বটে।”
এইটি সারাৎসার।
প্রান্ত বরাবরই ব্রাত্য তোমার সমাজে। এইটে মানো তো?
তোমার দেশে engrafted modernity, গোদের ওপর বিষফোঁড়াবৎ ইদানীং দক্ষিণপন্থী পুঁজি মৌলবাদ রাষ্ট্রবাদ থাবা বসিয়েছে, সে চায় প্রশ্নাতীত আনুগত্য। অতএব “কথা বোল না, কোন শব্দ কোর না, ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন” তোমার পরিস্থিতি, তোমার পরিণতি।
এর পাণ্ডা ফেকু মহারাজ যে কর্তব্য গীত গাইবেন এবং অধিকারকে তুশ্চু করবেন, এ আর বিচিত্র কি?