পুলিশ আর সেনাবাহিনী দিয়ে জনগণের সঙ্গে লড়াই করে জিততে পারেনি কোনো দেশের সরকার। প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় হয়ত রাষ্ট্রের চরম দমন পীড়নের ফলে কিছুটা পিছু হতে হয়, কিন্তু তার প্রতিক্রিয়ায় ততটাই শক্তি অর্জন করে জনতার প্রতিরোধ, যতটা রাষ্ট্র দমনের ক্ষেত্রে কঠোর হয়। এটাই সারা বিশ্বের ইতিহাস দেখিয়েছে, আজ অথবা আগামীকাল শাসককে মাথা নত করতেই হয়। তাই জনগণের ক্ষোভ অসন্তোষ দেখা দিলে আলোচনা একমাত্র পথ। আলাপ গণতন্ত্রে রাস্তা খুলে দেয়। সরকারের বোঝা উচিত তারা জনগণের শাসক নন। তারা জনগণ দ্বারা নির্বাচিত। তাই জন অসন্তোষ ঘটলে অসন্তোষের কারণ অনুসন্ধান করে জনগণের আস্থা ফেরানো সরকারের কাজ। সেটাই চেয়েছিল বারংবার প্রশ্ন ফাঁসে হতাশ, বিরক্ত, ক্ষুব্ধ যুব সমাজ। কিন্তু তাদের “ককরোচ” বলে অবজ্ঞা করার মাশুল দিতে হল আজ সরকারকেই। রাজ্যে রাজ্যে নির্বাচনে প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়েও বিজেপি সরকারকে আজ মাথা নত করতে হল দেশের যুবসমাজের কাছে।
কারণ? এটা বিরোধীদলের রাজনীতি নয় যে মানুষ নানা মতে ও ব্যাখ্যায় অবস্থানে বিভক্ত হয়ে সরকারকে সুবিধে করে দেবে। নিট ইস্যুতে জনগণ দলমত নির্বিশেষে ককরোচ বলে অবজ্ঞার শিকার হওয়া ক্ষুব্ধ যুব গোষ্ঠীকে সমর্থন জানিয়েছে আগামী দিনে নিজেদের সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। জনগণের মন ও যুব সমাজের ভাষা বুঝতে দেরি করে মোদি সরকার ব্যর্থ হয়েছে। অযথা জল ঘুলিয়ে পরিস্থিতিকে তারা জটিল থেকে জটিলতর করে শেষে গোটা দেশে অসন্তোষ ছড়িয়ে ফেলেছে। গোটাটাই মোদি অমিত শাহের চরম রাজনৈতিক ভুল।
সোনম ওয়াংচুক ও ছাত্রদের পিছনে দেশবাসীর সমর্থন কতখানি সেটা না বুঝতে পেরে উল্টে পুলিশ দিয়ে দমনের পদক্ষেপ নিয়ে তারা ক্ষেপিয়ে তোলে গোটা দেশের যুব সমাজকে। শেষ পর্যন্ত তারা যে ভুল বুঝতে পেরে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা করিয়েছেন তাতে বাঁচল তাদের মান। সরকার ও যুব সমাজের উভয়ের জন্যই এই সিদ্ধান্ত আপাতত সংঘর্ষ বিরতি থেকে সমাধানের রাস্তা দেখালো।
কিন্তু কথা আরও আছে, থাকবেও। সোনাম ওয়াংচুক এবং ককরচ জনতা পার্টির আন্দোলন নিট নিয়ে হলেও আজ সারা দেশের যুব সমাজ যেভাবে পথে নেমেছে সেটা শুধুই নিট প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে নয়। দেশের যুব সমাজের সামনে কোনো রাস্তা নেই সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার, আন্দোলনকারীদের বেশিরভাগের বক্তব্য তাই। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বেকারি এই সরকারের আমলে। সর্বোচ্চ প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা থেকে নিয়োগ দুর্নীতি এই সরকারের বিরুদ্ধে। এসব অমীমাংসিত প্রশ্ন থেকেই গেল। শিক্ষাকে যেভাবে বাণিজ্যকরণ করে ছাত্রদের উচ্চশিক্ষা ও জীবিকা অর্জনের স্বপ্ন থেকে দেশের বৃহত্তর যুব সমাজকে দূরে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে, এবার সেই নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন হবে কি না? শুধু একজন মন্ত্রী সরলে ব্যবস্থা বদলে যায় না। প্রয়োজন গোটা সিস্টেম বদল।
এই আন্দোলনের ফলে এর আগে কেন্দ্রীয় শিক্ষা সচিব এবং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির ৪২ জন আধিকারিক ও কর্মীকে সরানো হয়েছে, তাতে কি প্রশ্ন ফাঁসের দুর্নীতির মূল উৎপাটন হতে পারে? কখনোই নয়।কারণ, এই দুর্নীতির উৎস খোদ সরকারের নিজের নীতি যা থেকে জন্ম হয় দুর্নীতি চক্রের নিত্য নতুন কুশীলব। আর লোকের চোখ ঘোরাতে যাকে তাকে গ্রেপ্তার করে লোকদেখানো অ্যাকশন নেওয়া হয়েছে এতকাল, গত ২০২৪ সালে গ্রেপ্তার মূল অভিযুক্তকে শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দিতে হল। সিবিআই আদালতে জানিয়েছে তারা কোনো প্রমাণ পায় নি।অর্থাৎ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার যে অ্যাকশন নিয়েছে সেটাই অর্থহীন, জানাচ্ছে সিবিআই। তাহলে দুর্নীতি বন্ধ হবে কি করে,এবার সেটাই করে দেখাক সরকার। যুব সমাজ সেটাই চায়। তাই মধ্যরাত্রে যুব সমাজের উদ্দেশ্যে ফেসবুক লাইভে এসে ফার্স্ট ট্রাক কোর্ট বানিয়ে অপরাধীর চূড়ান্ত শাস্তির কথা ঘোষণা করে লাভ নেই কারণ অপরাধী বলে যাকে ধরা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে তো প্রমাণই পাওয়া যাচ্ছে না! সরকার আরো দেখুক তদন্ত করে নিজেরা দুর্নীতির শিকড় কোথায়!
রাষ্ট্র ও বিচারপতির অশুভ সংযোগে জন্ম নেওয়া ককরোচ জনতা পার্টি কি তাহলে আগামী দিনে বিজেপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হয়ে উঠবে? এটা রাজনৈতিক প্রশ্ন। এখনও তারা দেশের রাজনীতির অংশ হতে চায় নি। রাষ্ট্র চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে নি। এমনকি মোদি সরকারের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে নি। তারা এখনও কেবল সরকারের প্রশাসনিক ত্রুটি বিচ্যুতি মেরামতির দাবি জানাতে পথে নেমেছে। কিন্তু এসব মেরামতি উপর উপর। গোটা সিস্টেম যেখানে দুর্নীতির আখড়া, আগা – পাশ-তলা বদল করে ঝাঁকিশুদ্ধু বিসর্জন না দিলে কতকাল তারা দেশের ছাত্রদের জন্য সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা নেওয়া, পরীক্ষার পর নম্বর দেওয়া, মার্কশিট ঠিক মতো দেওয়ার মতো ন্যূনতম কাজটাও ঠিক মতো করবে? নিট প্রশ্ন ফাঁসের পর কিন্তু বিভিন্ন বোর্ড পরীক্ষায় এবং সিবিএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে এরকম করেই পরীক্ষার নম্বরদান, ভুল মার্কশিট নিয়ে নানা অভিযোগ এসেছে। এসব নিয়ে জমছে ছাত্রদের ক্ষোভ। তারাও এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগে ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্ররা তার বিচার পায় নি। তাই ব্যাপারটা এত ছোট না যে একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে বা সকল ছাত্র আগামীকাল থেকে নিরাপদ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থা পাবে। তাই যে আন্দোলন ছাত্র যুবদের শুরু হয়েছে তার শেষ এখানেই নয়।

সংবিধান ও গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা রেখেই ককরোচ জনতা পার্টি চেয়েছিল জনগণের কাছে একটি দায়বদ্ধ সরকার, যাঁরা নৈতিকতা, সমতা ও ন্যায্যতার প্রশ্নে ছাত্র স্বার্থ, আইন ও নাগরিকের অধিকারের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে। তাই নিট নিয়ে সংস্কার ছাড়াও তারা শুরুতে আরও দাবি রেখেছিল। সেগুলো কি সরকার মেনে নেবে? আপাতত তাদের যন্তর মন্তরে জমায়েত থেকে তোলা প্রধান তিনটে দাবীই সরকার মেনে নিলো।
১/-ধর্মেন্দ্র প্রধানের শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা।
২/-আত্মহত্যাকারী নিট পরীক্ষার্থীদের কম্পেনসেশন প্রদান।
৩/- আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে করা কেসগুলোর উইথড্রয়াল।
এরপর পরীক্ষা ও সেই সংক্রান্ত আর বাকী দাবীগুলোর কি হবে?
১/- ছয়মাসের মধ্যে গত এক যুগের প্রশ্নপত্রের লিকেজ ও রিক্রুটমেন্ট ফেইলিওর নিয়ে পার্লামেন্টে সরকারের শ্বেতপত্র প্রকাশ।
২/-পাবলিক পরীক্ষাজনিত বর্তমান আইনগুলোর আমূল পরিবর্তন।
৩/- ইন্ডিপেন্ডেন্ট পরীক্ষা নিয়ামক ও ন্যাশনাল এক্সামিনেশন ভেন্ডার অথরিটি গঠন।
৪/-বাধ্যতামূলক অডিট পরীক্ষা গ্রহণকারী এজেন্সীগুলোর ও একটি অপরিবর্তিনীয় বাৎসরিক পরীক্ষা সূচীপত্র।
৫/-ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সী(এনটিএ) অবলুপ্তি ও একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ন্যাশনাল টেস্টিং কমিশন গঠন।
৬/-ছাত্রছাত্রীদের আইনগত অধিকারের চার্টার গঠন করা।
৭/- ছাত্রছাত্রীদের জন্য একটি ন্যাশনাল এসপিরেন্ট ওয়েলফেয়ার ফান্ড গঠন করা।
৮/- কোনো পরীক্ষা যে কোনো অনভিপ্রেত কারণে গ্রহণে অক্ষমতা দেখা দিলে সেটি ৭২ ঘন্টার মধ্যে সম্পূর্ণ করতে বাধ্যতামূলক করা।
৯/-সরকারী রিক্রুটমেন্ট পরীক্ষা যেগুলো বিভিন্ন কারণে শিডিউলের পরে নেয়া হবে তাতে বয়সজনিত ছাড় থাকতে হবে।
১০/- ইন্ডিপেন্ডেন্ট অডিট অব কম্পিউটার বেসড এক্সামিনেশন সেন্টারস।
ককরোচ নেতৃত্বকে ভুললে চলবে না এই দাবি শুধু তাদের নয়। শিক্ষামন্ত্রী ইস্তফা দেওয়ার পরেও সমাজ মাধ্যমে দেশের শিক্ষক ছাত্র এবং জনগণ এসব কথা লিখছে। ককরোচ রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা বদলের দাবিগুলো যখন প্রথম তুলেছিল ইনস্টাগ্রামে দেশের মানুষ সেই দাবিগুলো মনে রেখেছে। আপামর দেশের মানুষ দলমত নির্বিশেষে এই সব দাবিগুলির সঙ্গে একমত:
* অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিদের রাজ্যসভায় প্রার্থী করা চলবে না।
* ভোট সংক্রান্ত কোনো গূঢ় দোষ ধরা পড়লে বা বিনা কারণে কারো নাম ভোটার লিস্ট থেকে বাদ পড়লে চিফ ইলেকশন কমিশনারকে অ্যারেস্ট করতে হবে।
* গোদী মিডিয়া হাউসগুলোর লাইসেন্স ক্যানসেল করতে হবে।
* আরটি আই এ্যাক্টের ট্রান্সপারেন্সি চাই।
* দলবদলু এম এল এ ও এম পি দের ২০ বছরের জন্য ভোটে দাঁড়ানো বা কোনোরকম সরকারী পদে থাকা থেকে বিরত রাখা।
* মহিলাদের জন্য সরকারী ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ।
মান্য মোদি অমিত শাহ জি,ক্ষমতায় থেকে যুব সমাজ ও জনসমাজকে আপনাদের দাস ভাবা বন্ধ করুন।
মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা রাখুন।তারাই আপনাদের ক্ষমতায় এনেছেন, তারাই আপনাদের ক্ষমতায় রেখেছেন।তাই জনগণকে ভুল বুঝবেন না।সরকারের আচরণে যেন প্রমাণিত না হয়, প্রতিবাদীরা তাদের শত্রু।
ককরোচদের দাবির মধ্যে কিন্তু কোনো মোদি সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর দাবি নেই।
এদের তাই মোদি সরকারের বিরোধী ভাবা যায় কি? ককরোচরা কি প্রকৃত বিজেপির বিরোধী? নাকি এরা চায় মোদি সরকারের বিরুদ্ধে জমতে থাকা ক্ষোভ দূর হোক। সেটাও আগামীদিনে স্পষ্ট হবে।
কিন্তু নির্লজ্জ গোদি মিডিয়া এদেরকেই টুকরে টুকরে গ্যাং বলে পাকিস্তান – চীন – ডিপ স্টেটের এজেন্ট বলে দাগিয়ে দিচ্ছে, ক্ষমতার পা চাটতে চাটতে এরাই ক্ষমতাসীন সরকারকে ভুল বুঝিয়ে বিপদে ফেলে দিচ্ছে। ২০২৯ এ জনগণ এর উত্তর দেবে ।
মনে রাখতে হচ্ছে, দেশবাসীকে দেশদ্রোহী বলার রাজনীতি চিরকাল ফ্যাসিস্ট সরকারের লক্ষণ । কিন্তু ঘটনা হল, তার উত্তর জনগণ দেয়। কিছুদিন পরে ক্ষমতায় থাকা উন্মত্ত সেই দল সেই সরকারকে ইতিহাসে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
ককরোচ আন্দোলন তাই মোদি সরকারকে সতর্ক করে দিতে চেয়েছে, সংশোধন করতে চেয়েছে যাতে তারা মানুষের সমর্থন নিয়েই অনন্ত অমৃতকাল ভোগ করতে পারে।
তারা এই দেশ রাষ্ট্র সরকারের শ্রেণি স্বার্থে রাষ্ট পরিচালনার বিরুদ্ধে, নির্যাতিত মানুষের জন্য কোন দাবি তোলে নি।মধ্য প্রদেশের চিতা আন্দোলন একই সময়ে ঘটে গেল, তাদের জন্য ককরোচরা এক লাইনও কথা বলে নি। তাই মোদি বা বাম দলগুলি কারুর ভাবা উচিত নয় ককরোচ জনতা পার্টি মোদির শত্রু কিংবা বাম মতাদর্শ নিয়ে আন্দোলনে নেমেছিল।
আগামী দিন প্রমাণ করবে ককরোচরা আর কী চায়, কতটা এবং কীভাবে! তার আগে ককরোচ আন্দোলন থেকে বিরোধীরা ফায়দা তুলবে সে পথ আপাতত বন্ধ করে দিলেন মোদি। এরপর বিরোধীদের কাছে চ্যালেঞ্জ। কতটা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তারা ককরোচের দেখানো পথে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জামানা বদলে পথে নামতে পারে!















খুব ভালো লেখা। লেখককে এবং ডক্টরস ডায়ালগের টিমকে অভিনন্দন। পদত্যাগের পর এত তাড়াতাড়ি লেখা নিউজ চ্যানেল গুলো ছাড়া আর কেউ সম্ভবত বার করতে পারেনি। এই ধরণের প্রাসঙ্গিক বিষয়ে দ্রুত লেখা এবং প্রচারের সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম।