আমার ঠিক মাথায় ঢোকে না এতোগুলো ন্যাশনাল চ্যানেল থাকার কী দরকার? দিল্লীতে CJP এর পার্লামেন্ট অভিযানের খবর পেতে পরপর ন্যাশনাল চ্যানেলগুলো দেখতে গিয়ে দেখি সর্বত্র একই খবর, পুলিশ কী বলেছে। পুলিশ কী কী জিনিস সাবধান করেছে, কী কী গুজব ছড়াতে নিষেধ করেছে।পরে, তার সঙ্গে যোগ হলো জে পি নাড্ডার সঙ্গে দুজন আন্দোলনকারীর ছবি, হাতে একটা কাগজ, ধরে নিচ্ছি তাদের দাবিপত্র। সমস্ত চ্যানেলেই বলছে খুব ভালো আলোচনা হয়েছে এবং আলোচনাকারীরা খুবই সন্তোষ প্রকাশ করেছে, যদিও তাদের কাউকেই সরাসরি দেখা যায়নি। কোনো দিন শুনিনি, আন্দোলনকারীরা সরকারের সঙ্গে তীব্র সংঘাতের সময়ে আলোচনা করে রীতিমতো সন্তোষ প্রকাশ করে, যদি না তারা sold out হয়ে যায়। যাহোক, সৌভাগ্যবশতঃ তারা পরবর্তী কালে সেরকম কোনো reaction দেননি। বরং বলেছেন অকারণ বসিয়ে রেখে চার ঘন্টা সময় নষ্ট করেছে। আন্দোলনরত ছাত্ররা এই প্রথম বসতে চেয়েছে, এটাও মিথ্যা কথা ছিল। আসলে সরকার একের পর এক মিথ্যা কথা বলে গেছে, আর তাকে সঙ্গত করার মহান দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে (নাকি, কাঁধে ফেলে দেওয়া হয়েছে!) জাতীয় চ্যানেলগুলো। তাহলে আর এতোগুলো চ্যানেল থাকার দরকার কি? একটাই সরকারি চ্যানেল থাকবে আর সে যা বলবে তাই শুনতে হবে। আর, আমাদের রাজ্যের কথা ছেড়ে দিন। সারাদিন ধরে শুনে (ও দেখে) যান কোন নামজাদা চোর কোথায় ঢুকলো আর কে কতো খারাপ কথা বলতে পারে। জাতীয় খবর তো প্রায় নেই, আর আন্তর্জাতিক পুরোপুরি ধরা ছোঁয়ার বাইরে। যাক, এসব বলে কী হবে? যথারীতি তারাও সেই অলিখিত scripted version এর বাইরে নয়।
অবশ্য এ আর নতুন কী জিনিস! পৃথিবীর অন্যত্র ছেড়ে দিন, আমাদের দেশেও এ জিনিস প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে এমনকি স্বাধীন ভারতবর্ষে, ইন্দিরা জমানায়!! আসলে, বর্তমান সরকার প্রায় সর্বক্ষণ নেহেরু খানদানের চতুর্দশ প্রজন্ম উদ্ধার করলে কি হবে ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষত এই ধরণের কাজের ঐতিহ্য বহন করতে তারা বড়ই উৎসাহী। সেই স্বৈরতন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও কিন্তু বাধ্য হয়েছিলেন গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী চিমনভাই প্যাটেলের অপসারণ সমেত গুজরাট বিধানসভার বিলুপ্তিতে (dissolution), ১৯৭৪ সালে। ঠিক দু বছর আগেই গুজরাটে ইন্দিরা কংগ্রেস মানে Cong R জিতেছিল ১৬৭টি আসনের মধ্যে ১৪০টি আসন।
গুজরাটে ছাত্র আন্দোলনের শুরু ১৯৭৩ সালে মোর্বি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ‘মেস ফী’ বাড়ানোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ফলস্বরূপ কয়েকজন ছাত্রের সাসপেন্সন থেকে এবং ক্রমশঃ তা ছড়িয়ে পড়ে সারা রাজ্যে। যা আরম্ভ হয়েছিল বিভিন্ন কলেজে ‘মেস ফী’ বাড়ানোর বিরুদ্ধে তা ultimately গিয়ে দাঁড়ায় দুর্নীতির অবসান ও মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে। সেই তুমুল ছাত্র আন্দোলন পরিচালিত হয় নতুন ‘গজিয়ে’ ওঠা ‘নবনির্মাণ আন্দোলনে’র নেতৃত্বে। সম্ভবতঃ আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও সেই আন্দোলনের অংশগ্রহণ করেন, তখন তিনি সদা যুবক। আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে আমরণ অনশনে অংশ নেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মোরারজী দেশাই। আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ভাবে পরিচালনার চেষ্টা সত্ত্বেও মোট ১০৩ জন নিহত হয় তার মধ্যে ৮৮ জন পুলিশের গুলিতে। হাজার হাজার মানুষ গ্রেফতার হয়, তার মধ্যে প্রায় দুশো জন MISA তে। উল্টো দিকে আন্দোলনকারীরা প্রায় বাধ্য করে একের পর এক বিধায়ককে পদত্যাগ করতে। আমাদের বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এক স্মৃতি রোমন্থনে জানিয়েছেন তখন এগারো বছর বয়সেই তিনি বাল স্বয়ংসেবক হিসাবে এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন (June 25,2025)। বাস্তবিক পক্ষে গুজরাট আন্দোলন থেকেই অনেক প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে ‘থালি বাজাও’ আন্দোলন।
এর প্রায় পরপরই আসে বিহার ছাত্র সংঘর্ষ্ সমিতির আন্দোলন।
মুশকিল হলো সেদিনের আন্দোলনকারীদের অনেকেই এখন উল্টোদিকে অর্থাৎ ক্ষমতায় আসীন এবং শুধু আসীন নয় অন্তত দুজন তো রীতিমতো দন্ডমুন্ডের কর্তা। তাই এখন, role reversal.. যে কোনো আন্দোলন দেখলেই মনে হয় অপ্রয়োজনীয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত, বিদেশী মদতপুষ্ট!!
কোন কোন ঘটনা সত্যি করে বিদেশী মদতপুষ্ট বলা সত্যিই কঠিন। তবে, বিরোধী রাজনৈতিক দলের মদত সেই ‘৭৩-৭৪ সালে গুজরাট আন্দোলনেও ছিল এবং বর্তমানে দিল্লির রাজপথেও আছে। কিন্তু বাড়তি যেটা ছিল এবং আজও আছে ভীষণ ভাবে, তা হলো মানুষের একটা বিশাল অংশের প্রাণঢালা আবেগ-অনুভূতি ও অদম্য উৎসাহ যাকে অস্বীকার করা সব দিক থেকেই অসম্ভব। সেই সময়ে স্বৈরাচারী ইন্দিরা গান্ধীর মতো প্রবল প্রতাপশালীও কিন্তু বাঁচাতে পারেননি তার অনুগত চিমনভাই প্যাটেলের গদীকে।
আর আজকে? দেখাই যাক…….
তবে, বর্তমান শাসকরা কি একবার ফিরে দেখবেন নিজেদেরই পুরোনো অতীতকে??











