ইউরোপীয় জলদস্যু ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯২ থেকে ১৫০৪ পর্যন্ত, কোটিকোটি মানুষের উপর বর্বরতম হত্যালীলা লুন্ঠন ও জবরদখলের যে সূচনা করেছিলো আমেরিকার বুকে, তা আজও সমানেই চলছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে সস্ত্রীক নিকোলাস মাদুরোকে গত ৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে অপহরণ এবং “আমরা ভেনেজুয়েলা চালাবো” – এই ঘৃণিত হুঙ্কারের ঘটনা সেই দস্যুবৃত্তির সাম্প্রতিকতম উদাহরণ। সময়ের সাথেসাথে সমাজের বহুকিছুই পাল্টায়। কিন্তু ‘গণতন্ত্র’ ও ‘সভ্যতা’-র বাণী ছড়ানো সাম্রাজ্যবাদের অমানবিক আগ্রাসী চরিত্র কখনোই বদলায় না।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলার সময়ে (১৯১৭), খোদ আমেরিকার বুকে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, “সত্য হলো এটাই, পশ্চিমা জাতীয়তাবাদের শুরুতে আর কেন্দ্রে রয়েছে সংঘর্ষের ও জয়ের মানসিকতা।”(‘The truth is that, the spirit of conflict and conquest is at the origin and in the centre of western nationalism.’: Nationalism; Rabindranath Tagore, Penguin Books, 2009, [With an Introduction by Ramchandra Guha], p: 46) বিগত প্রায় একশো বছরে এই কথা আরও মান্যতা পেয়েছে। ভারতবর্ষ সহ প্রাচ্যের সমাজগুলো বিভিন্ন সময়ে নিজেদের মধ্যে নানা কারণে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে জড়িয়েছে। কখনও প্রশাসনিক, কখনও বা সামাজিক, কখনও হয়তো ধর্মীয়, বা অন্য কোনও কারণে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেসব গোলোযোগ মিটেও গেছে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ গুণগতভাবেই পৃথক এক ব্যবস্থা। হামলা, হত্যা, লুঠ ও দখলদারী তার অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। প্রাচ্যের সভ্যতা দেশ-দেশান্তরে গিয়ে হত্যা-লুঠ-দখলদারী কায়েম করতে শেখায় নি কখনও।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা একসময়ে পৃথিবী জুড়ে এতটাই আধিপত্য কায়েম করেছিলো যে, বলা হতো – “ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না।” তার অধীনে থাকা পৃথিবীর কোনো-না-কোনো দেশে সূর্য ঠিকই আকাশে থাকতো। অহিংসা, সভ্যতা ও মানবতার পথে তাদের এতোবড় সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে নি; অসংখ্য মানুষের লাশ, রক্ত ও অশ্রুর বিনিময়ে গড়ে উঠেছিলো সেই সাম্রাজ্য। ভারতবর্ষ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। হাজার হাজার মানুষকে হত্যা ও অত্যাচারের পাশাপাশি এখানকার এতো বিপুল সম্পদ ব্রিটিশরা লুঠে নিয়ে যায় যে, আজও তাই দিয়ে তাদের লপচপানি চলে। এমনকি এতটাই নির্লজ্জ ও বেহায়া এই সাম্রাজ্যবাদী দেশটি, লুঠ করে নিয়ে যাওয়া বিভিন্ন বস্তু তারা ‘গর্বের সঙ্গে’ পৃথিবীর সামনে সাজিয়ে গুছিয়ে প্রদর্শিত-ও করে! আজও পর্যন্ত ভারতবর্ষের দারিদ্র্য এবং সবধরণের সামাজিক দুর্ভোগের অন্যতম কারণ – ব্রিটিশ কর্তৃক ভারতবর্ষ থেকে সম্পদ লুন্ঠন। রামমোহন রায় প্রথম ভারতীয় যিনি এই সম্পদ লুঠের উৎস ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলেন। বাঙালি সমাজের মধ্যে ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত (‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকার সম্পাদক), দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ (‘সোমপ্রকাশ’ সাপ্তাহিকীর সম্পাদক), বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রমেশচন্দ্র দত্ত, সখারাম গণেশ দেউশকর, এবং সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সম্পর্কে বারবার পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫)-র পর, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সেই অতীতের রমরমা আর থাকলো না। একের পর এক দেশ থেকে তার পাততাড়ি গোটাতে হয়। তার বিশ্বজোড়া সাম্রাজ্যে ‘সূর্য অস্ত’ যেতে শুরু করে! নতুন মোড়ল হিসাবে উঠে আসতে থাকে ইউরোপীয়দের প্রত্যক্ষ বংশধর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা। ‘দাদু-নাতির যুদ্ধ’-কে নাম দেওয়া হয় ‘আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ’ (১৭৭৫-১৭৮৩)! ‘দাদু’ যেসব কোটিকোটি ভূমিসন্তানকে নিমর্মভাবে নিকেশ করে আমেরিকার জমি দখল করেছিলো, ‘নাতি’-ও তাঁদের লাশ ও ভূমির উপরেই গড়ে তোলে ‘স্বার্বভৌম’ ও ‘উন্নত’ (!) আমেরিকা। নতুন দুর্বৃত্তদের দাপট শুরু হয় দুনিয়া জুড়ে।
১৯৯৩ সালে ২৬ জুন, আমেরিকা বোমাবর্ষণ করে ইরাকের উপর। কথায় বলে, ‘দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না’। কোনও দুরাত্মা মার্কিন প্রেসিডেন্টেরও ছলের অভাব কোনোদিনই হয় নি। ‘সত্যবাদী যুধিষ্ঠির’ বিল ক্লিন্টনের মুখনিঃসৃত বাণীতে আমরা জেনেছিলাম, ইরাক নাকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল! তাই, “স্টেট-স্পনসর্ড টেররিজম”-এ যারা জড়িত, তাদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়াটা “অত্যন্ত প্রয়োজনীয়” হয়ে উঠেছিলো যে, “জাতিগুলোর মধ্যে সভ্য ব্যবহারের প্রত্যাশাটা নিশ্চিত করা দরকার।”
আমেরিকা নিজে কতটা সভ্য? “স্টেট-স্পনসর্ড টেররিজম” থেকে তারা নিজেরা কতটা দূরে থাকে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে, বিভিন্ন দেশে তাদের কয়েকটি কীর্তি থেকেই আমরা তা পরিষ্কার বুঝতে পারি। যে তথ্যগুলো এখন আমরা দেখাবো, আন্তর্জাতিক মহলেও তা নির্ভরযোগ্য হিসাবে স্বীকৃত। যে বইটি থেকে এগুলো নেওয়া হয়েছে, (‘Killing Hope’, by William Blum, 2004, Zed Books Ltd., London) সেই বইটি সম্পর্কে নোয়াম চমস্কি বলেছেন, “Far and away the best book on the topic”; প্রাক্তন সিআইএ অফিসার জন স্টকওয়েল-এর অভিমত, “The single most useful summary of CIA history”.
এই বইটি থেকে, ১৯৪৯ – ২০০৩ পর্যন্ত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের অপকর্ম সম্পর্কে আমরা জানতে পারি – ৪৭ বার বিভিন্ন দেশের নেতৃত্বকে হয় হত্যা করেছে অথবা হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে এই বর্বর মার্কিন শক্তিটি। ১৯৫০-এর দশকে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাই; ১৯৫১ সালে উত্তর কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী কিম ইল-সুং; ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ন; ১৯৫৩-তে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদেঘ; ১৯৫৫ সালে ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু; ১৯৫৭ সালে ইজিপ্টের প্রেসিডেন্ট নাসের; ১৯৫৯, ১৯৬৩ ও ১৯৬৯-এ কাম্বোডিয়ার নেতা নরোদম সিহানুক; ১৯৬১ সালে কঙ্গো’র প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বা; ১৯৬৩-তে দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট নগো দিন-দিয়েম; ১৯৬০ থেকে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো’র জীবনহানির লক্ষ্যে বহুবার প্রচেষ্টা ও চক্রান্ত; ১৯৬৫-১৯৬৬ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট চার্লস্ দ্যা গল; ১৯৬৭-তে কিউবার নেতা চে গুয়েভারা; ১৯৭০-এ চিলি’র প্রেসিডেন্ট সালভাদোর আলেন্দে; ১৯৭৫ সালে জেয়ার’এর প্রেসিডেন্ট মোবুতু সেসে সেকো; ১৯৮০, ১৯৮৬, লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি; ১৯৮২ সালে ইরানের নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনী; ১৯৯১ ও ২০০৩ সালে ইরাকের নেতা সাদ্দাম হুসেইন; ইত্যাদি। বহুর মধ্যে এগুলো কয়েকটি মাত্র। লেখক উইলিয়াম ব্লাম জানিয়েছেন, “পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে” সিআইএ-র দ্বারা সংগঠিত বহু হত্যাকাণ্ডের এবং হত্যাকারীদের আমেরিকায় ঠাঁই দেওয়া সম্পর্কিত তালিকা এখানে নেই।
জন্মাবধি যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এ-ই হলো বর্বরোচিত ইতিহাস, দানবীয় বিমান-নৌ-স্থলবাহিনী নিয়ে দখলদারীর উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালে ভেনেজুয়েলার উপর তাদের ঝাঁপিয়ে পড়া, এবং নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বর্বরদের মতো আটক করা, কী সত্যিই অবাক হবার মতো ঘটনা? অবাক যদি হতেই হয়, তবে তা মার্কিন স্তাবকদের ভূমিকায়। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বর্বর শক্তি, দেশে দেশে হামলাবাজী চালিয়ে লাখো লাখো মানুষকে হত্যাকারী, আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো লুঠেরা – মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী পান্ডাদের কাছে ‘প্রিয়’ থাকার তাগিদে যারা কার্যত চুপ করে আছে, তারাও একই পাপে বিদ্ধ। বিশ্বের নানা প্রান্তে বিভিন্ন দেশ ক্রমশই গর্জে উঠছে মার্কিন দস্যুবৃত্তির বিরুদ্ধে। নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে যারা আজ ভেনেজুয়েলার সঙ্গে একই কাতারে দাঁড়াচ্ছে না, মানুষের জঘন্যতম শত্রু পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের ঘৃণিত দালাল হিসাবেই তারা ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বিশ্ব জনগণের ক্রোধ থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নিস্তার পাবার কোনও রাস্তা নেই। সাম্রাজ্যবাদী পান্ডাদের মন যুগিয়ে চলতে আগ্রহী মার্কিন দালালদেরও রেহাই নেই সভ্যতার পুঞ্জীভূত ঘৃণা থেকে রক্ষা পাবার। ইতিহাস বড়োই নিষ্ঠুর।।










