কোচবিহার জেলার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের উচ্চ-মাধ্যমিক স্কুল। এগারো ক্লাসের রেজিস্ট্রেশনের আজই শেষ তারিখ। বছর দুয়েক থেকে অনলাইনেই হচ্ছে এসব কাজ। ব্যাপারটা খুব জটিল কিছু নয়। ছাত্র-ছাত্রীদের ছবি তোলা হবে মোবাইলে। তারা কালো কালিতে সই করবে একটা কাগজে। স্বাক্ষরটি স্ক্যান করা হবে। এগুলো আবার নির্ধারিত ওয়েবসাইটে আপলোড করতে হবে। সঙ্গে কী কী বিষয় তারা পড়বে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে, সেসব সিলেক্ট করা। এই হল কাজ। প্রায় সবারই হয়ে গেছে। দু’ একজনের বাকি। এরকমটা হয়েই থাকে গ্রামাঞ্চলের ইস্কুলে। মাধ্যমিক কিংবা উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে স্কুল-ছুট কী হারে বাড়ছে, তা তথ্যাভিজ্ঞ মহলের অজানা নয়।
হঠাৎ বেজে উঠল ক্লাস টিচারের ফোন। অজানা নম্বর। ‘হ্যালো’ বলতেই ফোনের অপর প্রান্ত থেকে হড়বড় করে বলা শুরু করল ক্লাস ইলেভেনের ইসমাইল (নাম পরিবর্তিত), “স্যার, আজকে নাকি লাস্ট ডেট, রেজিস্ট্রেশনের? আমার এক বন্ধু ফোন করে বলল।”
“হ্যাঁ, তুই কোথায়? তাড়াতাড়ি আয় স্কুলে। সার্ভারের সমস্যা হলে কিন্তু মুশকিল হবে”, শ্রেণী শিক্ষক বললেন।
“স্যার, আমি তো তিনচুলেতে।”
“ওখানে কী করছিস? বেড়াতে গেছিস নাকি?”
“না স্যার। এখানে অনেক নতুন রিসর্ট, হোম-স্টে’র কাজ হচ্ছে, জানেন তো। কী আর বলি, লেবারির কাজ করছি”, একটু থমকে বলল ইসমাইল, “স্যার, কত বললাম কিন্তু কন্ট্রাক্টর ছুটি দিল না। এখন বাড়ি এলে আমার কাজটা চলে যাবে স্যার। বলছি, একটু করে দিন না।”
“কিন্তু তোর ছবি, সিগনেচার, আরো তো কিছু তথ্য লাগবে, সেসব?”
“স্যার, আপনার মোবাইলে সেলফি আর সাইনের ছবি পাঠাচ্ছি। আর রেজিস্ট্রেশনের টাকাটাও অনলাইনে পাঠিয়ে দিচ্ছি। প্লিজ, একটু করে দেবেন। আর আমার বন্ধু আমার আধার কার্ড আর মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডের জেরক্স দেবে আপনাকে। একটু মিলিয়ে নেবেন প্লিজ।”
“সে তো হল। কিন্তু সাবজেক্ট কী কী নিবি, সেসব…”
“সে আপনি যা কিছু একটা দিয়ে দেবেন না হয়।”
“কিন্তু ইলেভেন এর অ্যানুয়াল পরীক্ষা?”
“ইলেভেনের পরীক্ষায় আবার আটকাবেন নাকি? প্লিজ স্যার। টুয়েলভে ঠিক মেক আপ করে নেবো স্যার। বোঝেনই তো, বাড়ির অবস্থা ভাল না।”
স্যার কী বলবেন ইসমাইলকে ভেবে পায় না। কীই বা বলার আছে?
ক্লাস টেনের চম্পা রায় (নাম পরিবর্তিত)। লম্বা, রোগা পাতলা গড়ন, শেষ বেঞ্চে চুপচাপ বসে থাকা মেয়ে। এপ্রিলে প্রথম সামেটিভ পরীক্ষার প্রথম দিন নাম, রোল নম্বর ধরে অনেক ডাকাডাকি করে ইনভিজিলেটর উপস্থিতির খাতায় ফুটকি বসিয়ে দিলেন।
দ্বিতীয় দিনে পরীক্ষা দিতে হাজির চম্পা। দায়িত্ব প্রাপ্ত ইনভিজিলেটর, যিনি আবার চম্পাদের ক্লাস টিচারও বটে, উপস্থিতির খাতা দেখে ব্যোমকে গেলেন। শিক্ষাবর্ষের প্রথম মাসে দিন কয়েক স্কুলে এসেছিল চম্পা। তারপর আজ হাজির পরীক্ষা দিতে। মাঝের দু’ মাস একদিনও আসেনি।
সেই শিক্ষিকা আবার একটু কড়া ধাঁচের। চম্পাকে চেপে ধরাতে প্রথমে কিছুই বলতে চায় না। দৃষ্টি মাটিতে। একেবারে স্পিকটি নট।
কিছুক্ষণ পর একটু একটু করে মুখ খোলে চম্পা। যেটা জানা গেল, চম্পাদের নিজস্ব জমি নেই। বাবা-মা অন্যের জমিতে কৃষি শ্রমিকের কাজ করে। সারা বছর কাজ থাকে না। তাই ‘সিজিনে’ ওরা চলে যায় তিস্তার চরে। সেখানে বাদাম, পটল কিংবা তরমুজ খেতে সারাদিন ধরে খাটে। মজুরি ছাড়াও জোটে এটা ওটা।
কিন্তু বাড়ির কাজকর্ম, ঘরকন্নার কাজ কে করবে? চম্পার নিচে আরো দুটো ভাই বোন আছে। একজন প্রাইমারি স্কুলে। অন্যজন চম্পাদের স্কুলেই ক্লাস সিক্স। তারা নিয়মিত স্কুলে যায়। কিন্তু তাদের দেখভাল, গৃহস্থালীর টুকিটাকি, পোষ্য ছাগল-মুরগিদের দেখেশুনে রাখা, এসব কে করবে?
চম্পা কিংবা চম্পাদের মতো অনেকেরই তাই নিয়মিত স্কুলে আসা হয় না। পারিবারিক আয়ের নিয়মিত যোগানের গেরোয় উপেক্ষিত থাকছে চম্পাদের লেখাপড়া। অবশ্য এ নিয়ে তেমন বিচলিত নয় কেউই। বাড়ির লোকের সোজাসাপ্টা মত, “যা অবস্থা, তাতে লেখাপড়া করে হবেটা কী, হ্যাঁ? সে তো বছর কয়েকের মধ্যেই যেতে হবে পরের বাড়ি। তার চেয়ে বাড়িতে থাকুক। কাজকম্ম করুক। না হলে পয়সা আসবে কোথা থেকে?”
তবে সকালে সপ্তাহে তিনদিন এক মাস্টারের কাছে ‘পেরাইভেট’ পড়ে চম্পা। সব ‘সাবজেট’ পড়ায়। চারশো টাকা মাইনে। ওর ভাই বোনদেরও ‘পেরাইভেট মাস্টার’ আছে। এই টাকা জোগাতে ওর বাবা মার হিমসিম অবস্থা।
“এই যে একটা পরীক্ষা দিলি না, ইস্কুলেও আসিস না, বাড়িতেও পড়িস না। পাশ করতে পারবি মাধ্যমিক?” কড়া শিক্ষিকার প্রশ্নের জবাব দেয় না চম্পা।
২০২৪ সালের মাধ্যমিকে অকৃতকার্য হয়েছে ১৫৭৭৬১ জন। আগামীবছর এই তালিকায় চম্পা কিংবা চম্পাদের মত আরো অনেকেরই নাম থাকলে মোটেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই। আসলে, পাশ ফেলের সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে মিডিয়ার টক শো কিংবা খবরের কাগজের উত্তর সম্পাদকীয় কলামে ঝড় উঠলেও যাদের নিয়ে এত চর্চা, তাদের খুব একটা আসে যায় না এতে। পাশ আর ফেলের ব্যবধান অনেকের কাছেই ক্রমশ কমছে দিনদিন।
শুধু উঁচু ক্লাস নয়। সেভেন এইটেও অনেক সময় এমন হয়, ক্লাস ঘর খাঁখাঁ। অন্য সময় বসার জায়গা নিয়ে ঝগড়া। কী হল হঠাৎ?
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ছেলেমেয়েরা সব ভিড় জমিয়েছে লঙ্কা খেতে। তৎপর হাত দিয়ে ফটাফট ছেঁড়া লঙ্কা বস্তাবন্দী হয়ে চলে যায় কাছের পাইকারি বাজারে। সেখান থেকে বড় লরিতে সোজা চালান ভিন রাজ্যে।
অনেকে নিজেদের চাষের লঙ্কা ছেঁড়ে। অনেকেই আবার ‘পার্ট টাইম শিশু শ্রমিক’। প্রতি কেজি লঙ্কা ছেঁড়ার চার-পাঁচ টাকা দর এই ক্ষুদে শ্রমিকদের। দিনের শেষে আয় বড়দের বিচারে স্বল্প হলেও এটাই ওদের কাছে অনেক।
এমনিতেই মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা, ভোট, কিছু স্কুলে ভোটের জন্য কেন্দ্রীয় বাহিনীর থাকার ব্যবস্থা, দীর্ঘ গ্রীষ্ম অবকাশ — এসবের সাঁড়াশি চাপে বছরে ক’টা দিন লেখাপড়ার জন্য বরাদ্দ থাকে ছাত্র-ছাত্রীদের? তার উপর এই অনুপস্থিতির প্রবণতা।
“স্কুলে না এলে শিখবে কী করে?”, “শুধু পড়াশুনো নয়, মিড ডে মিলের পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা।” এ সব কথার একটাই জবাব, “ধুর, অত পড়ে কী হবে স্যার? কয়েক বছর আগে ফার্স্ট ডিভিশন কিংবা ষ্টার পাওয়া দাদা দিদিরা কী করছে এখন, একটু খবর নিন।”
ব্যস। হাওয়া চুপসে গেল কি না এবার?
২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী এ দেশের ১৪.৬ শতাংশ পড়ুয়া স্কুলছুট হয়েছে বিভিন্ন কারণে। অতিমারি উত্তর পর্বে সংখ্যাটা আগের বছরগুলোর তুলনায় বেড়েছে, এটা হলফ করেই বলা যায়। কিন্তু খাতায় কলমে স্কুলে পড়েও যারা প্রায় ‘ড্রপ আউট’, তাদের কথা ভাবার সময় এসেছে।
এরাজ্যের ‘Annual Status of Education Report (ASER)’ উদ্ধৃত করে হিন্দুস্থান টাইমস দৈনিক লিখেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীতে পাঠরত তিরিশ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রী দ্বিতীয় শ্রেণীর পাঠ্য বই পড়তে পারে না। সমীক্ষায় আরো উঠে এসেছে, পঞ্চম শ্রেণীর অর্ধেকের কম ছাত্র-ছাত্রী দ্বিতীয় শ্রেণীর পাঠ্য বই পড়তে পারছে। আরো উঁচু ক্লাসে গেলে সংখ্যার হেরফের হবে কিছুটা। তবে যে ক্লাসে যা শেখা উচিৎ সেটা শিখছে না মোটেও – মোটের ওপর বিষয়টা একই।
একমাত্র স্কুলে নিয়মিত হাজিরাই এ ক্ষতে কিছুটা মলমের প্রলেপ লাগাতে পারে। এক দিন স্কুলে এসে পরের তিন দিন গড়হাজির থাকলে স্বাভাবিকভাবেই চতুর্থ দিন ক্লাসে বসে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে হবে মাস্টারমশাই বা দিদিমনির দিকে। যা পড়ানো হচ্ছে, সেটা দিনের পর দিন বুঝতে না পারলে কে আর রোজ রোজ স্কুলে আসতে চাইবে?
মাধ্যমিকে ফেল করা ছাত্র-ছাত্রীদের আর তাদের শিক্ষকদের নিয়ে কুৎসিত মিম ভিডিও বানানোই যায়। তার আগে একবার ঘুরে আসুন ফেল করা ছাত্র-ছাত্রীদের বাড়ি। ড্রপ আউট হতে হতেও কোনওরকমে স্কুলের ইউনিফর্মটুকু আর ছেঁড়া ফাটা মলিন ক’খানা পাঠ্যবই কষ্ট করে টিকিয়ে রেখেছে ওরা।
এবারে সময় এসেছে ইসমাইল, চম্পাদের মতো স্কুলছুটদের নিয়ে একটু ভাবার।
শ্রমজীবী ভাষা পত্রিকায় ১লা ডিসেম্বর ২০২৫ এ প্রকাশিত।











দারুণ হয়েছে। প্রতিটা school এর প্রায় একই ছবি, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে।
সহমত