Skip to content
Facebook Twitter Google-plus Youtube Microphone
  • Home
  • About Us
  • Contact Us
Menu
  • Home
  • About Us
  • Contact Us
Swasthyer Britte Archive
Search
Generic filters
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Menu
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Menu
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Search
Generic filters

ধারাবাহিক হিংসার গ্রাসে সোনার বাংলা

Screenshot_2026-01-26-07-42-48-11_680d03679600f7af0b4c700c6b270fe7
Bappaditya Roy

Bappaditya Roy

Doctor and Essayist
My Other Posts
  • January 26, 2026
  • 7:43 am
  • No Comments

“হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ

কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে,

সে কোলাহলের রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ

জলে ও মাটিতে ভাঙনের বেগ আসে। … “

[ দুর্মর – সুকান্ত ভট্টাচার্য ]

২০২৪ এ ফ্যাসিবাদ অবসানের নামে তথাকথিত জুলাই বিপ্লবের পর থেকে যেসব পৈশাচিক ঘটনা ঘটে চলেছে তাতে খুব পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিরা ছাড়া অন্যরা শিরোনামের সঙ্গে একমত হবেন আশা করি। সামাজিক বৈষম্য ও গণতন্ত্রের অবক্ষয়ের মধ্যেও যে সামাজিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক প্রগতি, পরিকাঠামোগত উন্নতি এবং মুক্তমনা শিল্প – সংস্কৃতির পরিবেশটুকু বিরাজ করছিল সামরিক বাহিনীর সহযোগিতায় ছাত্র – জনতার অভ্যুত্থানে এক ঝটকায় সেগুলিকে ধ্বংস করে ফেলা হয়। ৮ আগস্ট ২০২৪ কিছু ছাত্র নেতা, এন জি ও প্রধান, আমলা ও টেকনোক্র্যাট কে নিয়ে অস্থায়ী সরকার গঠিত হল। কিন্তু এই সরকারকে নিস্ক্রিয় রেখে প্রথম দিন থেকেই ভাঙচুর, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস, খুনজখম, লুটপাট, নারীর সম্ভ্রমহানি, মুক্তমনাদের উপর এবং সংবাদপত্র অফিসে হামলা, ডাকাতি, রাহাজানি, অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি ইত্যাদি অবাধে চলতে থাকে। দেশবিদেশের পরিবর্তনকামী  সহ  অনেকের মনে হয়েছিল পরিবর্তনের সৃষ্টির আগের বোধহয় এই ধ্বংসলীলা।

কিন্তু তারপর যখন দেখা গেল মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা বাতিলের এই ছাত্র আন্দোলন মার্কিন, চিন, পাকিস্তান, সৌদি, কাতার, তুরস্কদের সহযোগিতায়; নিষিদ্ধ উগ্র মৌলবাদী ‘জামাত – এ – ইসলাম  বাংলাদেশ’ (জামাত), ইসলামি জাতীয়তাবাদী ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টি’ (বি এন পি), কট্টর মৌলবাদী ‘হেফাজতে – ইসলাম – বাংলাদেশ’ (হেফাজতে) এর নেতৃত্বে এবং ‘জামাত – উল – মুজাহিদীন বাংলাদেশ’ (জে এম বি), ‘আনসারউল্লাহ বাংলা টিম’ (এ বি টি), ‘হরকত – উল – জিহাদ – ইসলামি বাংলাদেশ’ (হুজি), ‘আল কায়েদা বাংলাদেশ’ প্রমুখ জিহাদী সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সশস্ত্র অংশগ্রহণে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা হল; যখন যা কিছু ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যা কিছু ১৯৫২ – ’৫৬ এর মহান বাংলা ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যা কিছু বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যা কিছু বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের নাম পরিবার ও কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যা কিছু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভেঙ্গে – চুরে, জ্বালিয়ে – পুড়িয়ে তছনছ ও লুঠ করে নেওয়া হল; যখন দেখা গেল আইন রক্ষাকারী পুলিশদের গলা কেটে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে, থানা পুড়িয়ে, জেল ভেঙ্গে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের বের করে এনে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহ করে সমগ্র বাংলাদেশটিকে জল্লাদের উল্লাসক্ষেত্রে পরিণত করা হল; যখন জামাত – রাজাকারদের প্রধান কর্মসূচি ও বিনোদন হিন্দু, বৌদ্ধ সহ সংখ্যালঘুদের হত্যা, তাদের নারীদের ধর্ষণ, দেবস্থান ধ্বংস, বলপূর্বক ধর্মান্তকরণ, সম্পত্তি লুঠ ও দখল, ফসল আত্মসাৎ ও উচ্ছেদ প্রভৃতির বন্যা শুরু হল; যখন শিল্পী, সাংবাদিক, প্রতিবাদী, বাউল ফকির এবং আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী দলগুলির নেতা – কর্মীরা নৃশংসভাবে আক্রান্ত কিংবা  নির্মম গণপিটুনি ও হত্যার শিকার হলেন; যখন গ্রামজীবনে ‘ইসলামি তৌহিদি জনতা’র তালিবানি ফতোয়ায় জনজীবন ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল; যখন দেশগঠনের পরিবর্তে তীব্র ভারত বিরোধিতার বাতাবরণে ক্ষমতা দখলকারী নেতৃত্ব নিজেদের আখের গোছাতে মনযোগী থাকলেন; যখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ছত্রছায়ায় লালিত বিশ্ব ব্যাঙ্কের নোবেল বিজয়ী এজেন্ট মহম্মদ ইউনুস উড়ে এসে অস্থায়ী সরকারের মাথায় জুড়ে বসে নৈরাজ্য ও ধর্মীয় মৌলবাদকে  প্রশ্রয় দিয়ে এবং বারেবারে নির্বাচন পেছিয়ে দিয়ে ক্ষমতা সম্প্রসারণে মত্ত রইলেন – তখন কারো বুঝতে বাকি রইল না বাংলাদেশকে সংশোধনের পরিবর্তে এক গভীর অমানিশার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

অনেক অর্জন এবং গর্বের বিষয়ও ছিল

১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং  তারপর ২০০৯ থেকে ২০২৪, দীর্ঘ ২০ বছর শাসন ক্ষমতায় থেকে হাসিনা ওয়াজেদ এবং তাঁর আওয়ামী লীগ সরকারের আচার আচরণে স্বৈরতান্ত্রিক লক্ষণ গুলি জোরালোভাবে প্রকাশ পাচ্ছিল। বিরোধীদের নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হচ্ছিল, সরকারের কাজকর্মের সমালোচনাকে আমল না দিয়ে বিদূষক পরিবৃত হয়ে থাকছিলেন নেতারা, বিগত দুটি সাধারণ নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছিল। নেতা – মন্ত্রী এবং তাদের ঘিরে এক সুবিধাভোগী শিল্পপতি, ব্যাবসায়ী, মাফিয়া ও তাদের পরিবারগুলিকে  নিয়ে যে অভিজাততন্ত্র (Oligocracy) গড়ে উঠেছিল তারা সাধারণ মানুষকে শোষণ করে এবং দেশের সম্পদ লুঠ করে অতি ধনী হয়ে উঠছিল এবং বিদেশে দেশের সম্পদ পাচার করে দিচ্ছিল। বি এন পি, জামাত প্রভৃতির সঙ্গে যুক্ত অনেক দুষ্কৃতি, ধান্দাবাজ, মাফিয়া আওয়ামী লীগে ঢুকে ক্ষমতার বৃত্তে চলে গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক মন্দা, দেশের মধ্যে বস্ত্র শিল্পে স্থিতাবস্থা, কোভিড অতিমারির চাপ ও ১২ লক্ষের বেশি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর বোঝা – সব মিলিয়ে দেশের আর্থিক সমস্যা, দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধি অন্যদিকে কর্মসংস্থানের অভাব সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করছিল। তিনদিক ঘেরা বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত নির্ভরতা, ভারতের সীমান্ত ও পদ্মা – তিস্তা সহ দুই দেশের মধ্যে দিয়ে বহমান নদীগুলির জলের ভাগ নিয়ে বঞ্চনার অভিযোগ নিয়ে এবং ভারতের মাটিতে হিন্দুত্ববাদীদের বাড়াবাড়ি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জটিলতা ও জনমানসে প্রবল ভারত বিরোধিতা সঞ্চারিত করে। হাসিনার তরফ থেকেও প্রতিস্পরধী কট্টর ভারত ও আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী উগ্র মৌলবাদী জামাতকে প্রতিহত করতে অপর ইসলামি উগ্র মৌলবাদী হেফাজতেকে মদত এবং শিক্ষা থেকে প্রতিটি বিষয়ে ইসলামি মৌলবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। তারাও তাদের সাধ্যমত বাংলাদেশের তালিবানিকরণ এবং সমাজজীবনে মৌলবি ও তৌহিদি  ইসলামিক জনতা নামক ধর্মীয় দুর্বৃত্ত দের স্থাপন করার কাজ করে চলেন।

এতদসত্ত্বেও আগের জমানার সময় স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র বজায় রেখেই আন্তর্জাতিক মুক্ত অর্থনীতির প্রতিযোগিতায় নেমে বাংলাদেশ দৃষ্টি আকর্ষণকারী অগ্রগতি ঘটায়। জন্ম লগ্নের ৮০% দারিদ্রকে দূর করে দারিদ্রের হার ১৮% এ নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। বিশ্বের দ্রুততম এগিয়ে চলা অর্থনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির স্বীকৃতি পায়। বাংলাদেশের উন্নত বস্ত্রশিল্প ফুলে ফেঁপে ওঠে, কারখানাগুলিকে পরিবেশ বান্ধব করার ক্ষেত্রেও সাফল্য আসে। বাংলাদেশের জি ডি পি একটি পর্যায়ে ভারতকেও ছাড়িয়ে যায় এবং মানব উন্নয়ন সূচকে চিনের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। উপকূল অঞ্চল সহ বিপর্যয় মোকাবিলায় সাফল্য অর্জিত হয়। সড়ক, রেল, সেতু, ফেরি সহ পরিকাঠামো গঠনে ব্যাপক অগ্রগতি ঘটে যার মধ্যে পদ্মা নদীর উপর কুষ্টিয়া ও পাবনার মধ্যে লালন শাহ সেতু, ঢাকার মুন্সিগঞ্জ ও ফরিদপুরের মাদারিপুর – শরিয়তপুরের মধ্যে পদ্মা মাল্টিপারপাস সেতু, যমুনা নদের উপর টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জের মধ্যে বঙ্গবন্ধু সেতু, চট্টগ্রামে কর্ণফুলি নদীর নিচে  আণ্ডারপাস, ঢাকা মেট্রো ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গবেষণা, গণ পরিবহন সহ অন্যান্য পরিষেবা ক্ষেত্রেও অগ্রগতি ঘটে। পাবনা জেলার রূপপুরে  রাশিয়ার সাহায্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে ওঠে।

রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার পরিবর্তনের হয়তো প্রয়োজন ছিল, কিন্তু একেবারেই প্রয়োজন ছিলনা বিদেশী ও অশুভ শক্তির প্ররোচনায় এই রকম আত্মঘাতী ধ্বংস লীলার এবং তার সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজের পাকিস্তানিকরণ  ও তালিবানিকরণের। কেন এমন হল এবং বারবার কেন বাংলাদেশ এরকম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিপর্যয়ের শিকার তার অনুসন্ধানে আমাদের এই প্রাথমিক এবং সংক্ষিপ্ত অন্বেষণ। এর জন্য নিকট অতীতের কিছু বিষয় আমাদের ছুঁয়ে যেতে হবে।

সোনার বাংলা

আগের বেশ কিছু প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করেছি যে পারস্য, সুমের বা ব্যাবিলনিয়, মিশর, চিন, গ্রিস – মিনোয়ান – এশিয়া মাইনর এর সঙ্গে ভারতীয় সভ্যতা উন্নত প্রাচীন সভ্যতা। প্রাচীন ভারতে গঙ্গা – ব্রহ্মপুত্র বিধৌত বদ্বীপ দক্ষিণবঙ্গ – চন্দ্রদ্বীপ – সমতট  তুলনায় নবীন হলেও বারেন্দ্রভূমি, পুন্ড্রবর্ধন, গৌড় সম্বলিত উত্তরবঙ্গ অবশ্যই প্রাচীন সভ্যতার অংশ। নদীমাতৃক বর্ষামুখর অতিউর্বর এই সমতলের উৎকৃষ্ট কৃষিজাত দ্রব্যের সুখ্যাতি চতুর্দিকে। কৃত্রিম তন্তু আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত এখানকার সোনালী পাট ছিল সারা বিশ্বে সমাদৃত। এখানকার বৈচিত্র্যময় কৃষি ও কৃষিজাত, দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য, ক্রান্তীয় সুস্বাদু ফলফলাদি, বিভিন্ন প্রজাতির উপাদেয় মৎস্যর উৎপাদন ও যোগান অফুরন্ত হলেও এই দেশটি সকল দেশের সেরা ছিল বিভিন্ন ধরনের শিল্পে। এর মধ্যে উন্নত মানের সূক্ষ্ম কার্পাস দিয়ে বাংলার তন্তুবায় শিল্পীদের নির্মিত সূক্ষ্ম বস্ত্রের  চাহিদা ছিল সারা বিশ্বে। সেই প্রাচীনকাল থেকে বলাগড় প্রভৃতি স্থানের দক্ষ কারিগরদের তৈরি বিশাল বাণিজ্যতরী গুলিতে ভেসে বাংলার প্রসিদ্ধ পাটনি মাঝিদের নৌচালনায় সওদাগররা সপ্তগ্রাম, তাম্রলিপি প্রমুখ বন্দর থেকে সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দিয়ে বাণিজ্য করে প্রচুর লাভ করে ফিরতেন। বাংলার রেশম শিল্প ছিল আরেকটি বিশ্ব বিখ্যাত শিল্প। যার লোভে আর্মেনীয়, পর্তুগিজ, ডাচ, দিনেমার, ফরাসী, ব্রিটিশ প্রমুখ ইউরোপীয়রা কাশিমবাজার, ঢাকা সহ বিভিন্ন জায়গায় কুঠি নির্মাণ করেছিলেন।

মধ্যযুগে সুলতানি আমলেও ভারত বা হিন্দুস্তান ছিল সবচাইতে ধনী ও প্রাচুর্যময় দেশ এবং সুবে বাংলা ছিল সবচাইতে ধনী ও প্রাচুর্যময় প্রদেশ। এখান থেকে প্রচুর রাজস্ব আসত। তাই ব্রিটিশ সহ ঔপনিবেশিকরা ভারত ও বাংলা দখল করতে এত লালায়িত ছিলেন এবং ভারত ও বাংলাকে শোষণ ও লুঠ করে ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য বিশ্বের সব চাইতে ধনী দেশ হয়ে যায়। বাংলার শিল্প ও কৃষিজাত উৎপাদনগুলি নিয়ে ব্যবসা করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফুলে ফেঁপে উঠলেও তাদের নিম্নমানের বস্ত্র  ও অন্যান্য শিল্পের বাজার বাড়াতে বাংলার অসাধারণ বস্ত্র, রেশম ইত্যাদি শিল্পকে ধ্বংস করে দেয় তারা। এর উপর ইউরোপ, চিন সহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানির জন্য বলপূর্বক নীল, আফিং, চা প্রভৃতি চাষ করিয়ে বাংলার কৃষকদের রক্তশূন্য করে দেয়। তার উপর জমির অত্যধিক রাজস্ব আদায় সত্ত্বেও সহযোগী অত্যাচারী জমিদার – নায়েবদের অত্যধিক খাজনা আদায়ের চিরস্থায়ী ব্যবস্থা করে অতুল ঐশ্বর্যশালী ভারত ও সোনার বাংলাকে করে তোলে চির দুর্ভিক্ষের দেশ।

ব্রিটিশরা কিন্তু সহজে এসব করতে পারেনি। প্রতি পদে প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছেন কৃষক, কারিগর এবং জনজাতি যোদ্ধা দের থেকে। ব্রিটিশ ও সহযোগী ভারতীয়দের রচিত ইতিহাসে এই বিদ্রোহগুলি উপেক্ষিত হলেও এরমধ্যে কয়েকটি বিদ্রোহের অভিঘাত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। যেমন, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, উলগুলান, ওয়াহাবি বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, মহা বিদ্রোহ। এরমধ্যে অবিভক্ত বাংলায় কৃষক – কারিগরদের সংগঠিত সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬৩ – ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ), তন্তবায়দের আন্দোলন (১৭৭০ – ‘৮০), নীল বিদ্রোহ (১৭৭৮ -১৮০০ এবং ১৮৩০ – ‘৪৮ ), রেশম চাষিদের সংগ্রাম (১৭৮০ – ১৮০০), আফিম চাষিদের প্রতিরোধ (১৭৮০ – ১৭৯৩), রংপুর বিদ্রোহ (১৭৮২ – ‘৮৩), খুলনা যশোর ও বাখরগঞ্জের কৃষক বিদ্রোহ (১৭৮৪ – ‘৯৬), দ্বিতীয় চোয়াড় বিদ্রোহ (১৭৯৮ –’৯৯), ময়মনসিংহের কৃষক ও জনজাতি বিদ্রোহ (১৭৭৫ – ১৮২৭), চব্বিশ পরগনার ওয়াহাবি বিদ্রোহ (১৮৩১), ফরিদপুরের ফরাজি বিদ্রোহ (১৮৩৮ – ‘৪৭) বিশেষ উল্লেখযোগ্য। নীল বিদ্রোহ সফল হলেও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা অন্য বিদ্রোহ গুলিকে ছলে বলে কৌশলে দমন করতে সমর্থ হন। ১৭৬৯ – ‘৭০ (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এর  ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের মত ভয়াল  দুর্ভিক্ষের পরও অকৃপণ প্রকৃতি বাংলাকে অচিরেই সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা অবস্থায় ফিরিয়ে আনে। এখানকার ধান, পাট, রেশম, নীল, কাঠ ইত্যাদি বিক্রি করে ও রাজস্ব সংগ্রহ করে ব্রিটিশরা অত্যন্ত ধনী হয়ে ওঠেন। দুটি বিশ্বযুদ্ধের সময়েও বাংলার বালাম সহ উৎকৃষ্ট চাল, শস্য, সব্জী ইত্যাদি এবং কলকাতা শিল্পাঞ্চলের প্রস্তুত সরঞ্জাম ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অন্যতম রশদ। এমনকি পাকিস্তান গঠনের পরেও পাকিস্তানের অর্থনীতিতে রপ্তানি থেকে মূল রাজস্ব যোগাতো পূর্ব বাংলার পাট ও চা। তাই আক্ষরিক অর্থেই বাংলা বিশেষত নদীমাতৃক অতিউর্বর পূর্ব বাংলা সেই প্রাচীন কাল থেকেই ছিল সোনার দেশ। যৌবনে কুষ্টিয়ার শিলাইদহ এবং পাবনার শাহজাদপুরের পদ্মা ও যমুনা সান্নিধ্যে কাটানো বিশ্বকবি তাইতো একে সোনার বাংলা আখ্যা দিয়েছেন। আর তাইতো পাক তানাশাহীর থেকে স্বাধীন হওয়ার পর  বাংলাদেশ তার জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গ্রহণ করে বিশ্বকবির অপূর্ব ‘সোনার বাংলা’ গানটি।

সাম্প্রদায়িকতার বিষ এবং আড়াআড়ি ধর্মীয় বিভাজন

মধ্যযুগে মধ্যএশিয়া থেকে ভারতভূমিতে তুর্ক – আফগান আগ্রাসন এবং ইসলামের প্রবেশের পর বিভিন্ন ধারার হিন্দু ধর্ম ও অন্যান্য ভারতীয় ধর্মগুলির সঙ্গে ইসলামের সংঘাত চললেও এবং বলপূর্বক ধরমান্তকরণের বিষয়টি থাকলেও সমাজের মূল বিষয় ছিল কতিপয় ধনী ও ক্ষমতাশালী রাজা – সুলতান – বাদশা – জমিদার কর্তৃক ব্যাপক গরীব শ্রমজীবী কৃষক, কারিগর এবং সাধারণ প্রজা – রায়তদের শোষণ ও অত্যাচার এবং মুষ্টিমেয় উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ পুরোহিত কর্তৃক ব্যাপক সংখ্যক নিম্নবর্ণের শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষদের শোষণ ও অত্যাচার। যতনা নিম্ন বর্ণের মানুষ বলপূর্বক ধর্মান্তরিত হয়েছেন, তার চাইতে বেশি ধর্মান্তরিত হয়েছেন উচ্চ বর্ণের রাজা – জমিদার – ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের অত্যাচারে এবং সমাজ থেকে বিতাড়নের ফলে। ভারতীয় উপমহাদেশের বেশিরভাগ মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের পূর্বপুরুষ, পাকিস্তানের জনক মহম্মদ আলি জিন্না থেকে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা মুজিবর রহমানের পূর্বপুরুষ, ধর্মান্তরিত। সাধারণ গ্রামজীবনে দরিদ্র শ্রমজীবী হিন্দু – মুসলমান কৃষকরা একসাথে মিলেমিশে বাস করতেন। প্রতিটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক বিরোধী কৃষক বিদ্রোহে হিন্দু – মুসলমান কৃষক – কারিগর যোদ্ধারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করেছেন। তাঁদের সঙ্গে রাজ্যহারা  হিন্দু – মুসলমান নৃপতি – সেনাপতি এবং কাজ হারানো হিন্দু – মুসলমান সিপাইরা যুক্ত হয়ে ১৮৫৭ – ‘৫৮ র মহা বিদ্রোহ সংঘটিত করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত নাড়িয়ে দেন এবং শাসন ক্ষমতার কেন্দ্রগুলি থেকে ব্রিটিশদের সাময়িকভাবে অপসারিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

তারপর থেকে ব্রিটিশ শাসকরা ভীত হয়ে পড়েন। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামরিক সংস্কারের পাশাপাশি ভারতীয়দের ঐক্য ধ্বংস করতে সচেষ্ট হন। এইকাজে তাদের সহায়ক হয় সহযোগী হিন্দু – মুসলমান রাজা – নবাব – জমিদার এবং ব্রাহ্মণ পুরোহিত, পীর মওলানা সহ দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মৌলবাদী শক্তি। আর তখন থেকেই ব্রিটিশের তাস আলিগড়ের সৈয়দ আহমেদ খান থেকে পাঞ্জাবের লালা আর আর্য সমাজীরা। আর সেই সময় থেকেই অর্থাৎ বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে বাংলা সহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে হিন্দু – মুসলমান, মুসলমান – হিন্দু, মুসলমান – শিখ, মুসলমান – পারসি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূত্রপাত। ব্রিটিশ কর্তৃক একদিকে জাতীয় কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা; অন্যদিকে মোহামেডান এসোসিয়েশন, মুসলিম লীগ গঠন এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া। একবিংশ শতাব্দীর সূচনা থেকে ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয় আন্দোলন এবং সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্রিটিশরা সামগ্রিক দমনের সঙ্গে ধর্মীয় বিভাজন এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উপর বেশি জোর দেন। ঐ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে বাংলা, পাঞ্জাব, যুক্ত প্রদেশ, উত্তর – পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধ প্রভৃতি অঞ্চলে বড় বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটতে এবং এতদিনকার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সামাজিক অবস্থানটি ভেঙ্গে পড়তে থাকে। পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হতে থাকে। এই কাজে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ, জামায়েত – ই – ইসলামি, রাজাকার প্রভৃতি উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক সংগঠন গুলিকেও কাজে লাগানো হয়। কিন্তু বাংলায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে খান আব্দুল গফফর খানের মত সর্বজনগ্রাহ্য নেতা এবং পাঞ্জাবে ধর্মনিরপেক্ষ ‘ইউনিয়নিস্ট পার্টি’ ক্ষমতায় থাকায় তখনকার মত পরিস্থিতির বেশি অবনতি হয়নি। বাংলায় এ কে ফজলুল হকের ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ এবং যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের ‘শিডিউলকাস্ট ফেডারেশনে’রও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস খিলাফত আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করাতেও উত্তেজনার  প্রশমন ঘটে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ প্রশাসন কিছুটা নমনীয় হয়ে জাতীয়তাবাদী নেতাদের সঙ্গে আপোষ করেন এবং অ্যানি বেসান্ত ও তিলকের নেতৃত্বে নরমপন্থী হোমরুল আন্দোলনকে প্রশ্রয় দেন। গান্ধী, প্যাটেল প্রমুখ ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সৈন্য সংগ্রহে নামেন।

কিন্তু ব্যর্থ হলেও বাঘাযতীন, রাসবিহারী প্রমুখের নেতৃত্বে জার্মানির সাহায্যে দেশ জুড়ে বিপ্লব ও সেনা অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা, বাংলা ও পাঞ্জাবে সশস্ত্র বিপ্লবী কার্যকলাপ বৃদ্ধি, চৌরিচৌরার ক্ষোভের রোষানল, কাঁকড়ি ডাকাতি, জালিয়ানয়ালাবাগ গণহত্যা নিয়ে দেশজোড়া প্রতিবাদ, একের পর এক উদীয়মান কৃষক ও গণ আন্দোলন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের বিব্রত করে তোলে। বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও দাঙ্গার সৃষ্টির কৌশলে তারা জোর দেন। একদা দাদাভাই নৌরজীর শিষ্য, তিলকের উকিল, ধর্মনিরপেক্ষ কংগ্রেস নেতা, আপাদমস্তক সাহেবী বোলচালে অভ্যস্ত, দ্বিতীয়বার এক তরুণী পার্সি রমণীকে বিবাহ করা মহম্মদ আলি জিন্নাহকে গান্ধী – নেহরু কংগ্রেসের মধ্যে কোণঠাসা করায় ব্রিটিশরা কাজে লাগান। জিন্নাকে গান্ধীর সমান গুরুত্ব দিয়ে তারা মুসলিমদের প্রতিনিধি হিসাবে মান্যতা দেন এবং তাঁর মাধ্যমে মুসলিমদের স্বার্থরক্ষার জন্য সর্বত্র অংশিদারিত্ব দাবি করান। ব্রিটিশরা আরও চেষ্টা চালান আম্বেদকার, ডি. রাজা প্রমুখদের মাধ্যমে দলিতদের এবং দেশীয় রাজাদের নিয়ে প্যারামাউন্ট স্টেট্‌স নামে আরও দুটি বিভাজনের। আম্বেদকার একটি পর্যায়ে নমনীয় হয়ে পুনে প্যাক্ট করে গান্ধীর সঙ্গে রণকৌশলগত বোঝাপড়া করেন। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রাজ্যগুলির মধ্যে মতান্তর ছিল। ব্রিটিশদের হিন্দু – মুসলমান বিভাজনের কৌশলটিই বেশি ফল দিতে থাকে।

১৯২৯ এ নেহরু রিপোর্টের পাল্টা জিন্না ১৪ পয়েন্ট দাবি রাখেন যেখানে কেন্দ্রিয় আইনসভায় সংখ্যালঘু থাকা মুসলমানদের জন্য ১/৩ ভাগ আসন সংরক্ষণ এবং পাঞ্জাব, বাংলা, সিন্ধ, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বালুচিস্তান – মুসলমান অধ্যুষিত প্রাদেশিক সরকারগুলিকে অধিক ক্ষমতা প্রদানের কথা ছিল। ইসলামিক দার্শনিক, কবি ও আমলা মহম্মদ ইকবাল ১৯৩০ এ মুসলমান অধ্যুষিত প্রদেশগুলিকে একত্রিত করার প্রস্তাব দেন। ১৯৩৩ এ চৌধুরী রহমত আলি প্রথম পাকিস্তানের কথা বলেন। জিন্নার নেতৃত্বে ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগে’র ধর্মের ভিত্তিতে বিভিন্ন দাবি  ব্রিটিশের সমর্থন সত্ত্বেও সার্বিকভাবে প্রভাব ফেলতে পারেনা। ১৯৩৭ এর নির্বাচনে কংগ্রেস ব্যাপকভাবে জয়লাভ করে। কিন্তু ১৯৩৯ এ কংগ্রেস সরকারগুলির পদত্যাগ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বৃদ্ধি প্রভৃতি ঘটনা পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটায়। মুসলিম লীগ দ্বিজাতিতত্ত্বের দাবি সামনে আনে, কংগ্রেস সেভাবে এর বিরোধিতা করেনা, হিন্দু মহাসভা সমর্থন করে। ফজলুল  হক মুসলিম লীগে যোগ দিয়ে ১৯৪০ এর লাহোর সম্মেলনে মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিকে  নিয়ে স্বাধীন দেশ গঠনের আহবান জানান। বাংলার অপর দুই মুসলিম লীগ নেতা আব্দুল হাসিম পশ্চিম ও পূর্বের দুটি পৃথক দেশ  এবং এইচ. এস. সুরাবরদি শরৎ বসুর সঙ্গে স্বাধীন ‘ইউনাইটেড বেঙ্গল’ এর দাবি তোলেন। ঐ ১৯৪০ এই ‘অল ইন্ডিয়া আজাদ মুসলিম কনফারেন্স’ দিল্লিতে সম্মেলন করে ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন ভারতের ঘোষণা করেন। কিন্তু তাঁদের নেতা আল্লাবক্স সাম্রুকে গুপ্ত ঘাতক দিয়ে সিন্ধে হত্যা করিয়ে শুভ প্রচেষ্টার মৃত্যু ঘটানো হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর্বে (১৯৩৯ – ১৯৪৫) কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, সি পি আই ও হিন্দু মহাসভা ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের পাশে থাকেএবং নেতাজী সুভাষের নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনীর স্বাধীনতা অভিযানের বিরোধিতা করে। ১৯৪২ এর জনপ্রিয় ও সুব্যাপ্ত ‘ভারত ছাড়ো‘ গণ আন্দোলনের বিরোধিতা করে মুসলিম লীগ, সি পি আই ও হিন্দু মহাসভা।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পাঞ্জাবের ইউনিয়নিস্ট পার্টির জমিদার মুসলমান নেতারা মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯৪৬ এর নির্বাচনে কংগ্রেস ভাল ফল করলেও পাঞ্জাব, সিন্ধ ও বাংলায় মুসলিম লীগ ভাল ফল করে প্রাদেশিক সরকার গঠন করে। সিন্ধ ও বাংলায় মুসলিম লীগ সরকারের সহযোগী ছিল হিন্দু মহাসভা। এই মুসলিম লীগ এবং মুসলিম লীগ – হিন্দু মহাসভা সরকারগুলি ব্রিটিশ ও কংগ্রেসের সহযোগিতায় একের পর এক দাঙ্গা লাগাতে থাকে। পাঞ্জাবে হিন্দু – মুসলমান ও মুসলমান – শিখ ভয়াবহ দাঙ্গায়  ১০ লক্ষের বেশি মানুষের প্রাণহানী  ঘটে এবং  এক লক্ষের বেশি নারী ধর্ষিতা হন। দুই প্রান্তে এক কোটির বেশি উদবাস্তুর স্রোত বইতে থাকে। ভয়ঙ্কর দাঙ্গা ঘটে বাংলা, যুক্ত প্রদেশ (উত্তর প্রদেশ), দিল্লি, বিহার প্রভৃতি রাজ্যে। এক নোয়াখালিতেই ব্যাপক হিন্দু নিধন ও হিন্দু নারীর সম্ভ্রমহানির ফলে পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম বাংলায় উদ্বাস্তুর স্রোত বইতে শুরু করে। ঐ ‘৪৬ এই খোদ কলকাতার বুকে ভয়ঙ্কর দাঙ্গা হয়। রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা ও নৈরাজ্যের মধ্যে ব্রিটিশের পরিচালনায় নেহ্রুর নেতৃত্বে কংগ্রেস, জিন্নার নেতৃত্বে মুসলিম লীগ, বিড়লা, ইস্পাহানিরা ১৯৪৭ এ দেশটি ভাগ করে ফেলেন।

বাংলায় সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধি

একজোট হয়ে বাঙালির উত্তাল গণ আন্দোলনের ফলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের বাংলাকে ভাগ করার চক্রান্ত ব্যর্থ হলেও ব্রিটিশ শাসকরা পূর্ব বাংলার মুসলমান নবাব, জমিদার, বড় ব্যবসায়ীদের বোঝাতে সক্ষম হন যে মুসলমান প্রধান পূর্ব বাংলা পৃথক প্রদেশ হলে তাদের হাতেই ক্ষমতা থাকবে। তারাও বাংলার সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ষড়যন্ত্রে সামিল হয়ে পড়েন। তখন থেকেই মুনাফায় ফুলে ফেঁপে ওঠা মুসলমান পাট ব্যবসায়ীরা যুক্ত প্রদেশ, বিহার থেকে অবাঙালি উর্দুভাষী পীর, লাঠিয়াল, দুষ্কৃতি দের পূর্ব বঙ্গে নিয়ে আসতে থাকেন। তারাই সেই থেকে বিগত ১০০ বছর ধরে পূর্ববঙ্গ, পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশে ঘটে চলা অগুন্তি হিন্দু বিরোধী দাঙ্গায় নেতৃত্ব দেন এবং তারাই মুসলিম লীগ, জামাত, রাজাকার প্রভৃতি সংগঠনগুলি নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন। অন্যদিকে কংগ্রেসের উচ্চবর্ণের রাজা জমিদার ও স্বচ্ছল ভদ্রলোক বাবুদের নেতৃত্বে স্বদেশী, বয়কট, অসহযোগ, সত্যাগ্রহ, আইন অমান্য প্রভৃতি আন্দোলন পূর্ব বাংলার ব্যাপক সংখ্যক দরিদ্র মুসলমান, নমঃশূদ্র, রাজবংশী, কৈবর্ত, ‌মাঝি প্রমুখ শ্রমজীবী কৃষক কারিগরদের ছুঁতে পারেনা। বরং উচ্চবর্ণের হিন্দু নেতাদের শোষণ, অত্যাচার, অবহেলা এই বৃহৎ জনসমষ্টিকে তাঁদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিপক্ষে অনেকক্ষেত্রে নামিয়ে দেয়। বরং ১৯৩০ ও ১৯৪০ এর দশকে তাঁদের আকৃষ্ট করে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি এবং যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের সিডিউল্ড কাস্ট ফেডারেশন। কিছুটা প্রথমদিকে ‘ওয়ারকারস পেজেন্ট পার্টি’ এবং শেষের দিকে ‘কমিউনিস্ট পার্টি’।  বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনেও হিন্দু জাতীয়তাবাদী অভিমুখ ছিল এবং সেটি ছিল বৃহত্তর কৃষক, শ্রমিক, কারিগর, গরীব সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন। সিরাজগঞ্জের কৃষক আন্দোলনের বিপরীতে গিয়ে অরবিন্দ ঘোষের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবীরা হিন্দু জমিদারদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৯৩০ এর দশকে রাসমণি হাজং, মণি সিং, আবদুল ভাসানি প্রমুখের নেতৃত্বে ময়মনসিংহর বিস্তৃত অঞ্চলে একের পর এক শক্তিশালী কৃষক বিদ্রোহ এবং আন্দোলন সংঘটিত হয়। রাসমণি হাজং যুদ্ধ করতে করতে ব্রিটিশ সৈন্যের গুলিতে মারা যান, মণি সিং ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতা। চিনপন্থী সমাজতান্ত্রিক আবদুল ভাসানি ছিলেন অসম ও পূর্ব বাংলার কৃষক, ভাষা ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতা এবং ১৯৪৯ এ আওয়ামী মুসলিম লীগের  প্রতিষ্ঠাতা। মণি সিং এবং ভাসানি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেন।

১৯৩৭ এর প্রাদেশিক নির্বাচনে কংগ্রেস কিছুতেই কৃষক প্রজা পার্টির সঙ্গে জোট করল না। ফলে সরকার গড়তে কৃষক প্রজা পার্টিকে মুসলিম লীগের হাত ধরতে হল। নবাব জমিদারদের নিয়ন্ত্রনাধীন মুসলিম লীগ জোট সরকারকে কিছুতেই কৃষকদের স্বার্থে ফ্লাউড কমিশনের সুপারিশ কার্যকর হতে দিল না। বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হকের সরকার ফেলে দিয়ে ব্রিটিশ সমর্থনে মুসলিম লীগের খাজা নিজামুদ্দিন এবং সুরাবরদির প্রধানমন্ত্রীত্বে বাংলায় পরপর দুটি মুসলিম লীগ সরকার গঠিত হল। তাতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভা যোগ দিল। এরপর উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে ভাগচাষী আধিয়ারদের যে শক্তিশালী তেভাগা আন্দোলন শুরু হয়েছিল ব্রিটিশের সাহায্যে মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভা জোট সরকার এবং স্বাধীনতার পর কংগ্রেস সরকার সেটিকে নির্মমভাবে দমন করে। ইতিমধ্যে পূর্ব বাংলা জুড়ে মুসলিম লীগ পেশীবল দেখাতে শুরু করেছে, দ্বিজাতি তত্ত্বের মগজ ধোলাই গ্রাস করে ফেলেছে মুসলমান সমাজের এক বড় অংশকে। ‘নারা – য়ে – তকবির, আল্লা – হু – আকবর’ ও ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ শ্লোগানে দুষ্কৃতীরা মুহুর্মুহু হিন্দুদের উপর আক্রমণ, হত্যা, হিন্দু নারী ধর্ষণ, লুঠপাট ইত্যাদি শুরু করে দেয়। তাদের নেতৃত্ব দেয় পূর্বোক্ত উর্দুভাষী ‘বিহারি’ মুসলমান ও রাজাকাররা। বেশিরভাগ উচ্চবর্ণের হিন্দু ঘর – বাড়ি, জমিদারি – ব্যবসা, পেশা – চাকরি ছেড়ে পশ্চিম বাংলায় পালিয়ে এলেন, ভুলে গেলেন তাদের ফেল আসা দেশ ও সেখানে পড়ে থাকা নিম্নবর্ণের হিন্দু কৃষকদের। কিন্তু গরীব, মাটি ও জমির সঙ্গে সংপৃক্ত নমঃশূদ্র, রাজবংশী, সাঁওতাল, গারো, চাকমা, মারমা দলিত ও জনজাতি কৃষকরা থেকে গেলেন। মতুয়া নেতা প্রমথ রঞ্জন ঠাকুর পশ্চিমবঙ্গে চলে গেলেও সেইসময়কার অবিসংবাদী তপসিলি নেতা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল দেশভাগের প্রবল বিরোধিতা করে ব্যর্থ হয়ে শ্রেণীশত্রু বর্ণহিন্দুদের নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তে শ্রেণীমিত্র মুসলমানদের সঙ্গে নিজভুমি পূর্ব বাংলায় থাকতে স্বচ্ছন্দ বোধ করলেন। তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় আইনমন্ত্রী হিসাবে জিন্না মনোনীত মুসলিম লীগের তরফে যোগ দিলেন। সেই পর্যায়ে মুসলমানরা নমঃশূদ্র দের আক্রমণ করেনি। ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ায় জাপানি আক্রমণের ভয়ে ব্রিটিশরা পূর্ব বাংলা কে পূর্বরণাঙ্গন স্থির করে সমস্ত মজুত খাদ্য সরাতে, সেতু – নৌকা ভাঙ্গতে শুরু করে দিল। চার্চিল – ইস্পাহানি সৃষ্ট ভয়াল দুর্ভিক্ষ পূর্ব বাংলার ৩০ লক্ষ গরীব হিন্দু – মুসলমান কৃষকের প্রাণ নিল। তারপরেই ঘটল ম্যালেরিয়া ইত্যাদির মহামারী। নানা উপায়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা বাঙ্গালির কোমরটাই ভেঙ্গে দিলেন। এরপর মুসলিম লীগের সাহায্যে ভয়ানক দাঙ্গা ঘটিয়ে বাংলাকে আবার বিভাজন করে পূর্ব বাংলাকে তারা পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিলেন। নেতাজী সুভাষচন্দ্রের বড়দাদা শরৎচন্দ্র বসুর মত কতিপয় বাদে  উচ্চবর্ণের ক্ষমতালিপ্সু কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা ও সিপিআই নেতারা বাংলা ও দেশভাগ সমর্থন করলেন।

 পূর্ব বাংলা ও পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা, বাঙালি ও হিন্দু বিরোধিতা

রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা ও মৃতদেহের স্তূপের উপর রডক্লিফের কলমের আঁচড়ে  দেশ এবং বাংলা ও পাঞ্জাব প্রদেশ ভাগের পর স্বাধীনতার নামে ব্রিটিশ কমনওয়েলথ এর অধীন ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ এবং ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি ডোমিনিয়ন তৈরি হল। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল এবং প্রেসিডেন্ট – স্পিকার হলেন মুসলিম লীগ প্রেসিডেন্ট মহম্মদ আলি জিন্না, প্রধানমন্ত্রী হলেন মুসলিম লীগের জেনারেল সেক্রেটারি লিয়াকত আলি, সংবিধান সভার চেয়ারম্যান এবং আইন ও শ্রম মন্ত্রী, পরে তার সঙ্গে সংসদ ও কাশ্মীর বিষয়ক মন্ত্রী, হলেন যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। ব্রিটিশের আশকারায় পরাধীন ভারতে এতদিন প্রতাপ দেখানো জিন্না কিন্তু তাঁর সাধের পাকিস্তানে অভীষ্ট অঞ্চলগুলি পেলেন না। ‘পোকায় কাটা পাকিস্তানে’ হতাশ তিনি এবার স্বপ্নের কাশ্মীর দখলের চেষ্টা করলেন। পাকিস্তানে যুক্ত হতে ইচ্ছুক হায়দ্রাবাদ ও জামনগর সহ বেশিরভাগ করদ রাজ্য ভারতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেও কাশ্মীর রাজ্য ভারত বা পাকিস্তানে না যেতে চেয়ে স্বাধীনতা বজায় রাখতে চাইছিল। জিন্না সেনা ও মিলিশিয়া পাঠিয়ে কাশ্মীরের এক তৃতীয়াংশ দখল করে নিতে পারলেও ভারতীয় সেনা কাশ্মীর উপত্যকায় পৌছনোর আগে তাদের আটকে দিল এবং নেহরু – প্যাটেলদের চাপ ও কূটনীতিতে কাশ্মীর রাজ্য ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। সেই থেকে কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিবাদ এবং একের পর এক যুদ্ধ – সংঘর্ষ। জিন্না দুরারোগ্য যক্ষ্মা রোগে ভুগছিলেন। তিনি পাকিস্তান গঠনের এক বছর এক মাসের মধ্যে মারা যাওয়ায় লিয়াকত আলির নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িক বাঙালিবিদ্বেষী পাঞ্জাবী রাজনীতিক ও আমলারা পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করলেন। তাদের প্রশ্রয়ে পূর্ব বাংলায় মৌলবাদী মুসলিম লীগ ও রাজাকার দুষ্কৃতীরা নমঃশূদ্র সহ হিন্দুদের উপর নৃশংস আক্রমণ ও ভয়ঙ্কর অত্যাচার শুরু করল। পাক প্রশাসন ও পুলিশ দাঙ্গাকারীদের মদত দিল। যোগেন্দ্রনাথ প্রতিবাদ করলে লিয়াকত পাঞ্জাবী চক্র তাঁকে কোণঠাসা করে দিল। তিনি বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করে ১৯৫০ এ ভারতে চলে এলেন। ওদিকে পূর্ব বাংলায় মৌলবাদী ইসলামি দুষ্কৃতীদের ঘটিয়ে চলা উপর্যুপরি দাঙ্গায় হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, সম্পত্তি দখলের আতঙ্কের পরিবেশে নমঃশূদ্র, রাজবংশী, মাহিষ্য, কৈবর্ত প্রমুখ হিন্দু সম্প্রদায় সব হারিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে অনবরত ভারতে চলে আসতে  থাকল। তাদের পরিবারের বহু যুবতী ও কিশোরীদের দুষ্কৃতীরা অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে যৌন দাসী করে রাখল এবং বলপূর্বক ধরমান্তকরণ করল। ১৯৫০ এর নেহরু – লিয়াকত চুক্তি বাস্তবে কোন কাজ করল না। ১৯৪১ এ লাহোরে প্রতিষ্ঠিত কট্টর ইসলামি সংগঠন জামায়েতে ইসলামের কর্ণধার মৌলানা আব্দুল আলা মউদুদি এবং মৌলানা সাবির আহমেদ ওসমানি ১৯৪৯ এরমধ্যে প্রবল প্রভাব বিস্তার করে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে তাঁদের কটুর ধর্মীয় অনুশাসনে বদ্ধ করে ফেললেন। ফলে সেইথেকে পাকিস্তানের ধর্মীয় মৌলবাদের দিকে অভিযাত্রা এবং পাকিস্তানে বসবাসকারী হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি দের হয় বিতাড়িত করা অথবা ধরমান্তরিত করার একমাত্রিক কর্মসূচি। আবার এই ধর্মীয় উগ্রবাদ ১৯৫১ তে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও জিন্না পরবর্তী মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট লিয়াকত আলিকে হত্যা করে। লিয়াকত আলি তাঁর সময় থেকেই পাকিস্তানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সঁপে দিয়েছিলেন। সেইথেকে মোল্লা, মার্কিন আর মিলিটারি, তিন ‘ম’ পাকিস্তানের ভাগ্য নিয়ন্তা হয়ে গেল।

সমগ্র পাকিস্তানে ধর্মীয় সঙংখ্যালঘুদের পীড়নের পাশাপাশি পাক শাসকরা বাংলা ভাষা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদকে দমন করতে উঠে পড়ে লাগলেন। এর বিরুদ্ধে এবং উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে এবং মাতৃভাষা বাংলার উপযুক্ত মর্যাদা ও সরকারিভাবে উর্দুর সঙ্গে পাকিস্তানে সহযোগী ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে পূর্ব বঙ্গ জুড়ে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ অবধি ভাষা আন্দোলন চলল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন এবং আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আব্দুল ভাসানি, ফজলুল হক, মুজিবর রহমান, সামসুল হক, মনোরঞ্জন ধর, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, বসন্তকুমার দাস, আব্দুল মতিন, সওকত আলি, আবুল কাশেম, রৌশন আরা, সারা তাইফুর প্রমুখ। ১৯৫২ এর ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাতজন ছাত্র শহীদ হন। আন্দোলনের চাপে পাকিস্তানের অবাঙালি প্রশাসন  সাময়িকভাবে পিছু হটে। ১৯৫৩ তে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ ধর্মনিরপেক্ষ ‘আওয়ামী লীগে’ রুপান্তরিত হয়।  ১৯৫৪ এর প্রাদেশিক নির্বাচনে কৃষক শ্রমিক পার্টির সঙ্গে জোট করে আওয়ামী লীগ মোট ৩০৯ টি আসনের মধ্যে ২২৩ টি আসনে জয়লাভ করে। রসরাজ দত্তের ‘ই বি এস এফ’ ২৭ টি ও বসন্ত দাসের ‘পি এন সি’ ২৪ টি আসনে জয়লাভ করে। ‘পাকিস্তান মুসলিম লীগ’ পায় মাত্র নয়টি আসন।  হক সাহেবের মন্ত্রীসভা গঠিত হওয়ার পর প্রথমে আদমজী জুট মিলে পরে অন্যত্র বাঙালি ও উর্দুভাষী বিহারি মুসলমানদের মধ্যে ভয়ানক সংঘর্ষ হয় এবং ১৫০০ মৃত্যু ঘটে। পাক প্রশাসন ব্যাপক ধরপাকড় করে সন্ত্রাস নামায় এবং এই সুযোগে বিধানসভা ভেঙ্গে দেয় ও প্রাদেশিক সরকারকে ফেলে দেয়।

১৯৪৮ এ জিন্নার মৃত্যু এবং ১৯৫১ তে লিয়াকত আলি হত্যার পর ১৯৫৬ ও ‘৫৮ অবধি যথাক্রমে খাজা নিজামুদ্দিন, গুলাম মহম্মদ ও ইস্কান্দার মির্জা গভর্নর জেনারেল এবং খাজা নিজামুদ্দিন, মহম্মদ আলি বোগড়া, চৌধুরি মহম্মদ আলি, হাসান সুরাবরদি, ইব্রাহিম চুন্দ্রিগর ও ফিরোজ নুন প্রধানমন্ত্রীত্বের দায়িত্ব সামলান। ইস্কান্দার মির্জা সাময়িক প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৫৬ তেই পাকিস্তানের শাসকরা ‘ওয়ান ইউনিট স্কিম’ ঘোষণা করে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেন, ইস্ট বেঙ্গলের নাম পরিবর্তিত হয়ে ইস্ট পাকিস্তান করা হয়, পাকিস্তানকে ইসলামিক রিপাবলিক ঘোষণা করা হয় এবং নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। প্রথম দুবছর ইস্ট পাকিস্তানে একজন গভর্নর ও মুখ্যমন্ত্রী রাখলেও ১৯৬০ থেকে একজন পশ্চিমা প্রশাসক এবং ১৯৬৯ থেকে একজন পশ্চিমা সামরিক প্রশাসক বসিয়ে ১,৪৮,৪৬০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই প্রদেশটির সঙ্গে উপনিবেশের এবং এখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মত আচরণ করা হয়। সেই সঙ্গে তাদের সহযোগী মৌলবাদী মুসলিম লীগ, জামাত, রাজাকার নেতা – কর্মীদের উৎপীড়ন এবং হিন্দু সহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের  উপর আক্রমণ বৃদ্ধি পায়।

তারই মধ্যে ১৯৫৮ তে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর জেনারেল আয়ুব খান সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে সামরিক শাসন জারি করেন ও নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন এবং ১৯৬৫ এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিন্নার ভগিনী ফতেমা জিন্নাকে কায়দা করে হারিয়ে দিয়ে নিজের আসন পাকা করে নেন। ১৯৬৫ তেই মার্কিন অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ‘অপারেশন জিব্রাল্টার’ নামক ভারতের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালালে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে পর্যুদস্ত করে। পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীকে ধরে আয়ুব খান ১৯৬৬ তে তাসখেন্দে চুক্তি করে সমঝোতা করেন। চুক্তির পরেরদিনই ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর তাসখেন্দে রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। ১৯৬২ তে আয়ুব খান সার্বজনীন ভোটাধিকার কেড়ে নেন। তাঁর স্বৈরতান্ত্রিক ও বিমাতৃসুলভ শাসনে পূর্ব পাকিস্তানে জনঅসন্তোষ সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবর রহমান ১৯৬৬ তে স্বায়ত্বশাসন, গণতন্ত্র সমেত ১১ দফা দাবি পেশ করেন। পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করেন। এর প্রতিবাদে বুদ্ধিজীবীরা সোচ্চার হন, সনজীদা খাতুনরা রবীন্দ্রসঙ্গীত করতে করতে পথে নামেন। ১৯৬৮ – ‘৬৯ জুড়ে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে উত্তাল ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত হয় যাকে পুরোমাত্রায় সমর্থন করে আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ এবং কমিউনিস্ট পার্টি। যদিও ১৯৬৬ থেকে বিভিন্ন প্রশ্নে কমিউনিস্ট পার্টির বিভাজন শুরু হয় যা এখনও ঘটে চলেছে। মুজিবর রহমান সহ বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতাদের গ্রেফতার করে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’য় সোপর্দ করা হয়। সেনা – পুলিশের গুলিতে বাঙালি সামরিক অফিসার জাহিরুল হক ও ফজলে হক সহ ৬৮ জনের মৃত্যু হয়।

১৯৬৯ তে ইস্ট পাকিস্তান ছাত্র লীগ, ইস্ট পাকিস্তান স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (মতিয়া), ইস্ট পাকিস্তান স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (মেনন), ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন প্রমুখ মিলে ‘সরবদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গড়ে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি, গণতন্ত্র, স্বায়ত্বশাসন সহ ছয়টি দাবি পেশ করে তীব্র আন্দোলন শুরু করেন যা সেনা – পুলিশের সঙ্গে রাস্তার লড়াই এ পর্যবসিত হয়। বহু আন্দোলনকারী  হতাহত হন। ঐ বছরেই ‘ডেমোক্রেটিক একশান কমিটি’ মুজিব সহ নেতাদের মুক্তির দাবিতে জোরালো আন্দোলন শুরু করে। বাঙালি সৈন্যদের নিয়ে গঠিত ‘ফেব্রুয়ারি ১৫ বাহিনী’ বিদ্রোহ করে। পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে আয়ুব খান আরেক জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে ক্ষমতা ছেড়ে দেন। বিরোধী নেতা মুজিবর রহমান, খান আব্দুল ওয়ালি খান প্রমুখকে ছেড়ে দিতে হয়। এরপর ১৯৭০ এ ইয়াহিয়া খান ‘লিগাল ফ্রেমওয়ার্ক’ ফরমান জারি করেন। ১৯৭০ এ পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা হয়। মোট ৩০০ টি আসনের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানে ১৩২ টি ও পূর্ব পাকিস্তানে ১৬৮ টি আসন ছিল যারমধ্যে ১৩ টি (৭ ও ৬) মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত। আওয়ামী লীগ ১৬৯ টি আসন (প্রাপ্ত ভোট ৩৯.২০%) এবং প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ‘পাকিস্তান পিপলস পার্টি’ ৮৬ টি আসন (১৮.৬৩%) লাভ করে। মুসলিম লীগ ও জামাত মানুষের ভোটে পরিত্যক্ত হয়। বালুচিস্তান এবং উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। আওয়ামী লীগ একক গরিষ্ঠতা পেলেও পশ্চিম পাকিস্তানী সামরিক শাসক এবং রাজনীতিকরা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন না। মার্শাল ল এর অধীনে আরও দমনপীড়ন নামিয়ে আনলেন। গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হল। তখন ১৯৭০ এর এক জনসভায় ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল ভাসানি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তিনি গণ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেও নির্বাচন বয়কট করেছিলেন। ১৯৭০ এ ভোলায় এক ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ে পাঁচ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়।  ১৯৭১ এর ৩ মার্চ তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে মুজিবর রহমান স্বাধীনতার দাবি জানান এবং অসহযোগ আন্দোলনের কথা বলেন। ২৫ মার্চ তাঁকে গ্রেফতার করা হলে ২৬ মার্চ তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, যা বাঙ্গালি সামরিক অফিসার জিয়াউর রহমান বেতার মাধ্যমে সারা বিশ্বকে জানান। ক্ষিপ্ত পাক সামরিক শাসকরা সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দেন। ২৬ মার্চ রাত থেকে পাক সেনারা পূর্ব পাকিস্তানে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুরু করে। তাদের সঙ্গে ঐ হত্যালীলার সহযোগী ও পথপ্রদর্শক ছিল    মুসলিম লীগ, জামাত, রাজাকার, আল বদর, আল শামস … সমস্ত হার্মাদের দল। প্রথমে বেছে বেছে বাঙালি বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যক, শিল্পী, বিজ্ঞানী, অধ্যাপকদের নৃশংস অত্যাচার করে হত্যা করা হল। আব্দুর রহমান, আলিম চৌধুরী, ধীরেন্দ্রনাথ  দত্ত, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, আলতাফ মামুদ, গোলাম  মুস্তাফা, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, কালাচান্দ রায়, হরিনাথ দে, মুনির চৌধুরী, সেলিনা পারভিন, বিষ্ণু চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ সহস্রাধিক গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নির্মূল করা হয়। এবার গ্রাম শহরে নির্মূল করা শুরু হয় আন্দোলনকারী, আওয়ামী সমর্থক, হিন্দুদের। মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা জেনারেল ওসমানির  নেতৃত্বে মুক্তি বাহিনী গড়ে তুলে প্রতিরোধ শুরু করেন। শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও তারপর

জেনারেল হামিদ খান ও জেনারেল টিক্কা খানের পরিচালনায় পাক বা খান সেনা ও রাজাকারদের অত্যাচারে ৩০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়, চার লক্ষ নারী গণ ধর্ষিতা হন, ৩০ হাজার মুক্তি যোদ্ধার মৃত্যু ঘটে, এক কোটি উদ্বাস্তু ভারতে চলে আসেন। পাক সেনা – রাজাকার রা মিলে পূর্ব বাংলাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। ভারত উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেয়, মুক্তি যোদ্ধাদের সাহায্য করে, তাজউদ্দীন আমেদের প্রধানমন্ত্রীত্বে ১৯৭১ এর  ১০ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকার তৈরি হয়। ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ‘অপারেশন চেঙ্গিস খানে’র অধীনে ভারতের পশ্চিম সীমান্ত আক্রমণ করলে ভারত – পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়। পাকিস্তান ভারতের আটটি বিমানঘাঁটি আক্রমণ করলে ভারতের জল, স্থল ও বিমানবাহিনী পশ্চিম ফ্রন্টিয়ারে পাকিস্তানকে পর্যুদস্ত করে দেয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সাহস ও দক্ষতা দেখিয়ে ব্রেজনেভের নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য দেশকে কাছে টেনে নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের হুমকি এবং মাওয়ের চিনের চাপকে উপেক্ষা করতে সক্ষম হন। তাঁর দৃঢ় নেতৃত্বে এবং ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশ এর দক্ষ পরিচালনায় ভারতীয় সেনানীরা দক্ষতার পরিচয় দিয়ে মাত্র ১৩ দিনের যুদ্ধে পাকিস্তানকে  ধরাশায়ী করে দেয়। পূর্ব পাকিস্তানে ৯০ হাজার পাক সেনাকে নিয়ে জেনারেল নিয়াজী ভারতীয় সেনার লেফটেন্যান্ট – জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশ মুক্ত হয়। বেশিরভাগ উদ্বাস্তু ফিরে যান। ১৯৭২ এর ‘সিমলা চুক্তি’ অনুসারে ভারত দখলে থাকা সমস্ত পাক জমি এবং পাক বন্দীদের ফেরত দেয়। ১৯৭২ এর জানুয়ারি মুজিবর রহমান পাকিস্তানের জেল থেকে ঢাকা ফিরে বীরের সম্বর্ধনা পান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তাজউদ্দীন আমেদের কাছ থেকে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৭২ এর ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান  প্রণয়ন করা হয়। ১৯৭৩ এর নির্বাচনে এতই মুজিবরের জনপ্রিয়তা ছিল যে তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রায় একচ্ছত্র জয়লাভ (২৮৮ / ২৯৩) করে।

স্বাধীনতার আনন্দ ও আবেগ ছিল, দেশ গঠনের বাসনা ও উদ্যোগ ছিল, মুজিবর রহমানের মত জনপ্রিয় শক্তিশালী নেতা ছিলেন, হিন্দু এবং অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বহু বছর বাদে কিছুটা নিশ্চিন্তে বসবাসের সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু পাক হানাদার আর রাজাকাররা দেশটি ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে গেছে, অর্থনীতি তলানিতে, এত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য নেই, ডাঃ জাফরুল্লা চৌধুরীর ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’, ডঃ ফজল আবেদের ‘ব্র্যাক’ প্রমুখ এগিয়ে এলেও এত মানুষের খাদ্য – বস্ত্র – বাসস্থান যোগানোর এবং চিকিৎসা করার পরিকাঠামো নেই, ভারত সহ বিদেশী সাহায্যে আর কত চলে? উপকূলের একের পর এক ঘূর্ণিঝড় এবং কলেরা প্রভৃতি মহামারী বাংলাদেশকে পঙ্গু করে দিল। মুজিবর রহমান বিরোধী রাজনৈতিক, সংগ্রামী, সাহসী নেতা হিসাবে যতটা দড়, দেশ শাসক, পরিচালক ও প্রশাসক হিসাবে ততটা দক্ষতা দেখাতে পারলেন না। বরং তাঁর অদক্ষ পরিচালনা, স্বজনপোষণ, তাঁকে  ঘিরে একদল মোসাহেব এবং তাঁর পুত্র ও আত্মীয়দের দুর্নীতি, দাপট আর বাড়াবাড়ি বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায়।  প্রবল আর্থিক সংকট ডেকে আনে। ১৯৭৪ এ বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। বিরোধী রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, সোশালিস্ট পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টিগুলি ভারতের মত কেউ রুশ, কেউ চিন, কেউ ভারত, কেউ মুজিবপন্থী, কেউ মুজিবেবিরোধী বহুধা বিভক্ত। এরমধ্যে সেরাজুল আলম, হাসানুল হক ইনু, আবু তাহের দের নেতৃত্বে ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’ (জাসদ), ‘পূর্ববঙ্গ সোশালিস্ট পার্টি’, রোমান্টিক বিপ্লবী নেতা সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে ‘প্রলেতারিয়ান পার্টি অফ ইস্টবেঙ্গল’ (সর্বহারা দল), ‘ইস্ট পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি’, ‘বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (লেনিনিস্ট)’ প্রমু্খ ছাড়াও ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ)’, ‘বাংলাদেশ জাতীয় লীগ’ প্রমুখ দল সরকার বিরোধী জোরালো আন্দোলন শুরু করে। জাসদের সশস্ত্র ‘গণ বাহিনীর’ নেতৃত্বে ১৯৭২ – ‘৭৫ বিপ্লব সংঘটনের প্রচেষ্টা হয়, যা সেনা ও পুলিশ কঠোরভাবে দমন করে। ভারতের মাওবাদীদের মত মূলত দক্ষিণ বাংলাদেশে সর্বহারা দল কার্যকলাপ চালাত। তাদের মধ্যেও ভাঙ্গন ঘটে। সিরাজ সিকদারকে ‘জাতীয় রক্ষী বাহিনী’ গ্রেফতার করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মুজিবর রহমান ১৯৭৪ এর ডিসেম্বর ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করেন এবং ১৯৭৫ এর জানুয়ারি মাসে তাঁর আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী ‘কমিউনিস্ট পার্টি অফ বাংলাদেশ’, ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মুজাফফর)’, ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল লীগ’, ‘গণমুক্তি  ইউনিয়ন’, ‘জন সংহতি সমিতি’ দলগুলিকে নিয়ে ‘বাংলাদেশ পিজেন্টস ওয়ার্কার্স পিপলস পার্টি (বাকশাল)’ গঠন করে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের নামে একদলীয় সমাজতন্ত্র, বিরোধীদের মতে একদলীয় স্বৈরতন্ত্র, চালু করেন। ঐসময় সংবিধানের চতুর্থবার সংশোধন করে ‘বাকশাল’ বাদে অন্য সমস্ত রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়।

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট ক্যাপ্টেন হুদা, মেজর নুর, মেজর বজলুল হুদা, মেজর শারিফুল হক ডালিম, রাশেদ চৌধুরী প্রমুখ এক ঝাঁক জুনিয়র সামরিক অফিসার এর নেতৃত্বে বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। তারা ভোরে মুজিবর রহমানের ধানমন্ডির বাড়িতে গিয়ে তাঁকে সপরিবারে হত্যা করেন। কেবল মুজিব কন্যা হাসিনা এবং রেহানা বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। একদা মুজিব সহযোগী ষড়যন্ত্রকারী খোন্দকার মুস্তাক আহমেদ ক্ষমতায় বসেন। ৩০ আগস্ট বাকশাল এবং মুজিব প্রণীত বাকশালী আইনকানুন বাতিল করা হয়। জেনারেল জিয়াউর রহমান সহ সামরিক শীর্ষ কর্তারা গৃহবন্দী হন। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে এই ঘটনার মাধ্যমে  সি আই এ এবং আই এস আই -র সাহায্যে বাংলাদেশ থেকে সোভিয়েত ও ইন্ডিয়া ব্লককে হটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রভাব বিস্তার করে। নভেম্বরে আরেকটি অভ্যুত্থান এবং তারপর আরও কয়েকটি অভ্যুত্থান ঘটে। বারবার পরিবর্তন ঘটে বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে। জাসদ, জেনারেল জিয়া সহ অনেককে মুক্ত করে ‘সিপাহী – জনতা বিপ্লবে’র মাধ্যমে বাংলাদেশে মারক্সীয় শাসনের আরেকটি ব্যর্থ চেষ্টা করে। ১৯৭৫ এই জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখল করে জাসদ সহ রাজনৈতিক দলগুলিকে কড়া হাতে দমন করেন এবং মার্শাল ল জারি করেন। মেজর জিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেন, ধর্মনিরপেক্ষতা বদলে সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির – রহমানির – রহিম’ বাক্য বসিয়ে বাংলাদেশকে মুলত ইসলামি রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলেন এবং শিক্ষায় ইসলামি ধর্মীয় শিক্ষার উপর জোর দেন। তিনি ‘ইন্ডেমনিটি অরডিনান্স’ জারি করে মুজিব হত্যাকারীদের ছাড় দেন এবং মেজর ফারুক, মেজর রশিদ, মেজর ডালিম দের বিদেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসাবে নিয়োগ করেন। আবার একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ করে বাংলাদেশে রাজনৈতিক  স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম হন (১৯৭৫ – ‘৮১) যদিও আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থানেই তাঁর প্রাণহানি ঘটে। জিয়ার সময় আর্থিক উদারীকরণের মাধ্যমে অর্থনীতির কিছুটা উন্নতি ঘটে, তিনি ১৯ দফা আর্থিক সংস্কার নীতি পেশ করেন। তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারনা প্রবর্তন করেন। তিনি ১৯৭৭ থেকে সামরিক শাসকের পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট হন, ১৯৭৮ এর নির্বাচনের আগে ‘বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বি এন পি)’ গঠন করে নির্বাচনে জয়লাভ করেন।

এরপর কয়েকটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান এবং কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ১৯৮২ তে রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সেনা প্রধান হুসেইন মহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করলেন এবং সামরিক আইন লাগু করে তাঁর স্বৈরশাসন জারি করলেন। ১৯৮৩ তে তিনি নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করে ‘জাতীয় পার্টি’ গড়ে তুলে ১৯৮৬ ও ১৯৯০ এর দুটি বিতর্কিত নির্বাচনে জয়লাভ করেন। এরশাদের শাসনে ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, সরকারি সংস্থাগুলির বেসরকারিকরণ, বিরোধীদের গুমখুন, এরশাদের নিজস্ব নানা অপকীর্তি, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ইত্যাদি ঘটে এবং যার জন্য ব্যাপক স্বৈরতন্ত্র বিরোধী গণ আন্দোলন চলতে থাকে। বহু তরুণ আত্মাহুতি দেন। ১৯৮৯ এ এরশাদ বাংলাদেশকে ইসলামি রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। অন্যদিকে তাঁর সময়েই ১৯৮৩ তে জন ওষুধ নীতি, ১৯৮৪ তে বাংলাদেশে কৃষকের অধিকার সহ ভূমি সংস্কার অরডিনান্স এবং  ১৯৮৭ তে মাদক নিষিদ্ধ করে কড়া আইন প্রবর্তন হয়। অবশেষে ১৯৯০ তে এরশাদ ক্ষমতা  ছাড়তে  বাধ্য হন। তারপর কিছুদিন অন্তর্বর্তী সরকার থাকার পর ১৯৯১ এর নির্বাচনে জামাত কে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে।

সমকালের বাংলাদেশের দুটি ঘটনা ১৯৭১ এর গণহত্যার মূল চক্রী জামাত আমীর গোলাম আজম এবং অন্যান্য রাজাকারদের জিয়া বাংলাদেশে সসম্মানে পুনর্বাসন করার পর শহীদ জননী জাহানারা বেগম এর  নেতৃত্বে ‘ঘাতক – দালাল নির্মূল কমিটি’র উত্তাল গণআন্দোলন এবং ২০১৩ তে সংঘটিত আব্দুল কাদের মোল্লা সহ ১৯৭১ গণহত্যার  ঘাতকদের শাস্তির দাবিতে শক্তিশালী শাহবাগ ছাত্র আন্দোলন। ১৯৯০ এর এরশাদ অপসারণের পর বাংলাদেশী লব্জে গোলাপি ও আলাপী দুই বেগমের যুগ। জিয়াপত্নী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকাল ১৯৯১ – ‘৯৬ ও ২০০১ – ‘০৬ এবং মুজিবর কন্যা শেখ হাসিনার কার্যকাল ১৯৯৬ – ২০০১ ও ২০০৯ – ২০২৪। এরশাদ স্বৈরশাসন অবসানের জন্য একসঙ্গে আন্দোলনে নামলেও ২০০১ থেকে বিএনপি – জামাত এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের নিরন্তর বিবাদ ও সংঘর্ষে বাংলাদেশের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যা ১৯৯৪ তে চরমে পৌঁছে এক সাংবিধানিক সংকটে পরিণত হয়। ১৯৯৪ তে নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিন কে দেশ থেকে তাড়ানো হয়। আওয়ামী লীগের বয়কটের মধ্যে বিএনপি ১৯৯৬ এর ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জিতলেও বিরোধীদের তুমুল আন্দোলনে সরকার পড়ে গিয়ে তদারকি সরকারের তত্ত্বাবধানে ভোট হয়ে ১৯৯৬ এর জুনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। খালেদা জিয়ার প্রথম শাসনকালে পাকিস্তান, চিন ও মার্কিনের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হয়। এরশাদের কারাবাস হয়। মৌলবাদী কার্যকলাপ বাড়ে। ১৯৯২ তে ভারতের বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রতিক্রিয়ায় এবং অন্য সময়ে হিন্দু বিরোধী দাঙ্গা, হিন্দু দেবস্থান ভাঙ্গা ইত্যাদি চলতে থাকে। প্রথম হাসিনা সরকারের সঙ্গী ছিল জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ইত্যাদি। এরশাদ মুক্তি পান। এবার বিএনপি – জামাতের প্রবল বিরোধিতা এবং বাংলাদেশ জুড়ে অশান্তি ও হিংসায় হাসিনা সরকারও সঙ্কটে পরে যায়। অবশেষে মার্কিন হস্তক্ষেপে তদারকি সরকারের অধীনে ২০০১ এর নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে।

দ্বিতীয় খালেদা সরকারের সময়েও বিরোধী আন্দোলন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে। সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়ন বেড়ে যায়। বিশিষ্ট লেখক হুমায়ুন আজাদ তাঁর ‘পাক সার জামিন সাদ বাদ (২০০৩)’ গ্রন্থে বিষয়টি তুলে ধরলে ২০০৪ এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে তাঁকে কুপিয়ে মারার চেষ্টা হয়। ঐ বছরেই হাসিনার সভায় গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমান সহ বহু আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মী মারা যান। তার আগে ২০০১ এ রমনা বটমূলে  ‘ছায়ানটের’ অনুষ্ঠানে গ্রেনেড হামলা হয়। ২০০৫ এ সারা দেশে ইসলামি সন্ত্রাসবাদী দল ‘জে এম বি’ একের পর এক বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। আলফা সহ উত্তরপূর্ব ভারতের জঙ্গি সংগঠনগুলির আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। অবস্থা চরমে উঠলে ২০০৬ থেকে ২০০৮ অবধি তদারকি সরকারের অধীনে জরুরি অবস্থা চলে। তারমধ্যেও ২০০৭ এ ছাত্র – মিলিটারি বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়। ২০০৯ এর নির্বাচনে বামদের ও জাতীয়  পার্টিকে নিয়ে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। বিরোধী আন্দোলন, বাংলাদেশ রাইফেলস বিদ্রোহ, বিদ্যুৎ সংকট, বস্ত্র শিল্পে সমস্যা, ষ্টক এক্সচেঞ্জে ধ্বস প্রভৃতি সমস্যা অতিক্রম করে হাসিনা সরকার ১৯৭২ এর সংবিধান পুনরস্থাপিত করতে, অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটাতে, ডিজিটাল বিকাশে সফল হয়। পাশাপাশি ১৯৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়। যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন হিসাবে জামাতকে ২০১২ তে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তি ২০১৩ তে ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখা অভিজিৎ রায়, অনন্ত বিজয় দাস প্রমুখ ব্লগারদের হত্যা করে। ২০১৪ তেও ব্যাপক হিংসার মধ্যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জেতে। এই পর্বে ২০১৫ তে শিক্ষাক্ষেত্রে ভ্যাট তুলে দেওয়ার এবং ২০১৮ তে শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে  কোটা তুলে দেওয়ার দাবিতে ও পথ নিরাপত্তার দাবিতে তিনটি বড় মাপের ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত হয়। ২০১৭ থেকে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের স্রোত আসতে থাকে মায়ানমার থেকে। ২০১৯ ও ২০২৪ এর ভোট বিরোধীরা কারচুপির অভিযোগে বয়কট করেন। দুবারই হাসিনার সরকার গঠিত হয়। ২০২০ কোভিড অতিমারির থাবা, ২০২১ এ  সারা দেশ জুড়ে হিন্দু বিরোধী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ২০২৩ এ ডেঙ্গু মহামারি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

এখন বাংলাদেশ

১২০৪ এ তুর্ক – আফগান সেনাপতি বখতিয়ার খলজির আক্রমণ থেকে যে ধারাবাহিক হিংসার সুচনা, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক এবং তার সহযোগী রাজা – নবাব – জমিদারদের সময়ে শোষণ – লুণ্ঠনের সময়ে  যার তীব্রতা বৃদ্ধি এবং জাতীয়তা আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামকে বিপথগামী করতে যার সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার মিশ্রণ করা হয়, দ্বি জাতি তত্ত্ব – দাঙ্গা – রক্তপাত – দেশভাগের পর তানাশাহী পূর্ব পাকিস্তান হয়ে মুক্তি সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যে বাংলাদেশের সৃষ্টি – বিগত ৫৫ বছরে তা কিছুতেই থামেনি। ১,৪৮,৪৬০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের ১৭.৬৪ কোটি জনসংখ্যার দক্ষিণ এশিয়ার ভারতীয় উপমহাদেশে অবস্থিত জনবহুল এই ছোট দেশটিতে প্রথম থেকেই দুটি শক্তিশালী রাজনৈতিক – সামাজিক – সাংস্কৃতিক ধারা নিয়ত সংঘর্ষরত। (১) বাঙালি, ধর্মনিরপেক্ষ,‌ ভারতবন্ধু জাতীয়তাবাদ – যার অন্যতম উদ্গাতা আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী দলগুলি। (২) পাকিস্তানপন্থী, কট্টর ইসলামি, উগ্র ভারতবিরো, প্যান – ইসলামিজম  বা খিলাফত পন্থী – যার প্রবক্তা জামাত, হেফাজত এবং অন্যান্য ইসলামি দল ও সংগঠনগুলি। এর পাশাপাশি  আরেকটি শক্তিশালী ধারা বাংলাদেশের মাটিতে জিয়ায়ুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়ার দীর্ঘ শাসনে দৃঢ় স্থান করে নিয়েছে – (৩) ইসলামি, ভারতবিরোধী, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ – যার দাবিদার বি এন পি। বিগত ১০০ বছর ধরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং নির্মম অত্যাচার, খুন, ধর্ষণ, উচ্ছেদ, বলপূর্বক  ধরমান্তকরণ এবং ভারতে উদবাস্তুর স্রোতের পরেও বর্তমান বাংলাদেশে ৯১.০৪% মুসলমান জনসংখ্যার সঙ্গেই রয়েছে ৭.৯৪% হিন্দু, ০.৬০% বৌদ্ধ, ০.৩০% খ্রিস্টান এবং ০.০২% অন্যান্য ধর্মাবলম্বী জনসংখ্যা। হিন্দুর সংখ্যা এখনও এক কোটি ৪০ লক্ষ। তাই ২০২৪ এর তথাকথিত জুলাই বিপ্লবে ছাত্র – জনতাকে সামনে রেখে মার্কিন – পাক পরিকল্পনায়; চিন, সৌদি, কাতার, তুরস্ক, ব্রিটেনের প্রশ্রয়ে; স্বভাবসুলভ নিষ্ঠুর হত্যা ও ধ্বংসলীলার মধ্য দিয়ে জামাত ও ইসলামি মৌলবাদী শক্তির বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর থেকে পুনরায় হিন্দুরা টার্গেট। ভালুকার নিরপরাধ বস্ত্র শ্রমিক দিপু দাসের মত হিন্দু পুরুষদের প্রতিদিন মধ্যযুগীয় বর্বরতায় হত্যা করা এবং নারীদের গণধর্ষণ ও অত্যাচার করে ধরমান্তকরণ চলছে। চলছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যা কিছু অর্জন সেগুলি ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেওয়া, পাকিস্তানের সঙ্গে মহব্বত। তীব্র ভারত বিরোধিতা এবং বাংলাদেশের সমাজ সংস্কৃতি র তালিবানীকরণ। শিল্পী, সাংবাদিক, প্রতিবাদী, বাউল – ফকিরদের আক্রমন। যার অঙ্গ হিসাবে ‘জলের গান’ এর বাদ্য মিউজিয়াম ধ্বংস ও কোনক্রমে প্রাণ হাতে রাহুল আনন্দের দেশত্যাগ। ‘ছায়ানট’, ‘উদীচী’র মত বিশ্ববন্দিত সংস্থার এবং ‘প্রথম আলো’ ও ‘দ্য মর্নিং স্টারের’ মত নির্ভীক সংবাদপত্র অফিস  তছনছ করা। ৩০ কোটি টাকা খরচ করে জামাতের ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্র শিবিরের’ প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ দখল করা। আওয়ামী লীগকেই নিষিদ্ধ করে দিয়ে তার নেতা – কর্মীদের উপর পৈশাচিক আক্রমণ নামিয়ে আনা। ইউনুস সরকারের প্রতিনিধি এবং জামাত নেতাদের ঘন ঘন মার্কিন, চিন ও পাক সফর এবং পাক ও চিনা আধিকারিকদের বাংলাদেশে গতায়াত। ভারতের চিকেন নেক সংলগ্ন অঞ্চলে তাদের সক্রিয়তা বৃদ্ধি।  মার্কিন সেনার চট্টগ্রামে এসে মহড়া, সেন্ট মারটিন দ্বীপে ঘাঁটি গড়ার পরিকল্পনা এবং রাখাইন – পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্তে কালো মেঘের ঘনঘটা। এই অশান্তি ও নৈরাজ্যে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা পড়েছেন সবচাইতে বেশি বিপদে। জামাত, মৌলবাদীদের নিরন্তর আক্রমণ; এতদিনকার আশ্রয় আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি; প্রতিরোধের আহবায়ক চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের মিথ্যা মামলায় কারান্তর; ভারতের মোদী সরকারের ও পশ্চিমবঙ্গের মমতা সরকারের অমানবিক আচরণ, নীরবতা, নিস্ক্রিয়তা, আক্রান্ত হিন্দু  উদ্বাস্তুদের জন্য সীমান্ত সিল করে দেওয়া এবং আদানি সহ সহযোগী বড় ব্যবসায়ীদের বিদ্যুৎ, পিঁয়াজ সহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মুনাফা লাভের ব্যাবসা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া।

হাসিনা অতি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন, বুঝতে পারেননি যারা এতদিন তাঁর কাছ থেকে বেআইনি সুবিধা নিয়ে ফুলে ফেঁপে উঠেছেন, তাঁকে ঘিরে স্তাবকতায় ভরিয়ে রেখেছেন, তাঁদের অনেকেই মার্কিন ডিপ স্টেটের হয়ে কাজ করছেন। নিজের আত্মীয় সামরিক বাহিনীর প্রধানও বিপদের সময় পাশে দাঁড়ালেন না। চিন সফরের সময় দেশে তাঁর অনুপস্থিতি কাজে লাগানো হল। যুক্তরাজ্য সহ পশ্চিমি দেশগুলি যারা তারেক রহমান সহ খুনী – অপরাধী সবাইকে আশ্রয় দিয়েছে, তারাও বিপদে সাহায্য তো দূরের কথা আশ্রয় পর্যন্ত দিলনা। আর নিজেকে বিশ্বগুরু ঘোষিত ও রাজকোষের অর্থে অবিরত বিশ্বভ্রমণরত নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর বিজেপি সরকার? শুধুই বাগাড়ম্বর এবং চূড়ান্ত গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা। চিনের দখল করা জমির এক ইঞ্চিও  উদ্ধার করতে না পেরেও তাদের ভারতে ঢালাও ব্যবসা করতে দেওয়া, পাকিস্তান যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি, নেপাল – মাল দ্বীপ – শ্রীলঙ্কা  – মায়ানমার – ভুটান প্রতিবেশী বলয়ে উপর্যুপরি ব্যর্থতার পর বাংলাদেশে মুখ থুবড়ে পড়া। অন্য কোথাও ব্যবস্থা করতে না পেরে হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দিয়ে বিড়ম্বনা আরও বাড়ানো।

এমতাবস্থায় বাংলাদেশে কবে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মধ্যে। ছাত্র নেতারা যে সুষ্ঠ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিলেন তাদের যোগ দেওয়া সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি ইউনুস বেআইনিভাবে ক্ষমতায় থেকে যেতে বারবার সেটিই বানচাল করে দিয়েছেন। বিষয়টি খুবই দৃষ্টিকটু পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ায় মার্কিন প্রভুদের নির্দেশে আগামী ফেব্রুয়ারি’২৬ এ আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে লোকদেখানো নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। অশুভ শক্তিকে ক্ষমতায় রাখতে বোঝাপড়াও হয়ে গেছে। তাই ইউনুসের লন্ডনে গিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করা, হাসিনা জমানায় আর্থিক দুর্নীতি ও সন্ত্রাসে মদত দেওয়ার অভিযোগে ৮৪ টি মামলায় অভিযুক্ত লন্ডনে পালিয়ে থাকা তারেকের ১৭ বছর পর বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন, পৌঁছেই ইউনুসের সঙ্গে দ্বিতীয় বৈঠক এবং সমস্ত অভিযোগ ও মামলা থেকে ঝটপট মুক্তি। নিহত ভারতবিরোধী ‘ইনকিলাব  মঞ্চে’র জনপ্রিয় নেতা ওসমান হাদির  “দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা – ’ স্লোগানের পরিবর্তে তারেকের মুখে “দিল্লি নয়, পিণ্ডি (রায়ালপিণ্ডি) নয়, অন্য কোন দেশ নয়, সবার আগে বাংলাদেশ” স্লোগান।  অন্যদিকে ক্ষমতার আস্ফালনে মশগুল অনেকটাই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া একদা জনতার নয়নের মণি ছাত্র নেতারা ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি (জে এন পি)’ তৈরি করে নির্বাচনে জামাতের হাত ধরেছেন। তাদের থেকে একটি অংশ বেরিয়ে গিয়ে সংগ্রাম পরিচালনার জন্য ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন’ তৈরি করেছেন। নির্বাচনের পরে দুঃস্বপ্ন হয়তো আবার বাড়বে, তবে ক্ষমতার দুই দাবিদার বি এন পি ও জামাত দুজনেরই এখন লক্ষ্য ৩৫% আওয়ামী লীগ এবং ৮% হিন্দু ভোট। আবার দুজনে ভাগাভাগি করেও ক্ষমতায় আসতে পারেন অথবা পাকিস্তানের মত মার্কিন, মোল্লা ও মিলিটারি নিয়ন্ত্রিত বর্তমান টলমলে বাংলাদেশে অন্য কিছুও হতে পারে।

তবে যাই ঘটুক না কেন পূর্ব বাংলা, পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ, সংস্কৃতিবান, সর্বংসহা, সংগ্রামী মানুষ যারা বিগত ১০০ বছর ধরে অশুভ শক্তির হিংসার সঙ্গে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্ত লড়াই করে চলেছেন প্রকৃত স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁদের উপর ভরসা করাই যেতে পারে।

“হঠাৎ নিরীহ মাটিতে কখন

জন্ম নিয়েছে সচেতনতার দান,

গত আকালের মৃত্যুকে মুছে

আবার এসেছে বাংলাদেশের প্রাণ।”

[ দুর্মর – সুকান্ত ভট্টাচার্য ]

২৩.০১.২০২৬

PrevPreviousশ্রীলেখা মিত্র ।। পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত কর্মচারী সমিতির যৌথ কমিটির দ্বাদশ সম্মেলনে অভয়া স্মরণে
Next৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবসে রাষ্ট্রপতি পদকNext
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

সম্পর্কিত পোস্ট

আইনী আপডেট

March 15, 2026 No Comments

গত নভেম্বর থেকে কলকাতা হাইকোর্টে অভয়ার মামলা ৩৫ বারের ও বেশি তালিকাভুক্ত হলেও একবারও কার্যকর শুনানি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অসহ্য বিলম্ব ও দীর্ঘসূত্রিতার

ভারতের শহরের বিপন্ন বায়ু এবং নাগরিক স্বাস্থ্য

March 15, 2026 No Comments

এ দেশের দূষণ এখন আম নাগরিকদের সহনসীমাকে ছাপিয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে আজকাল আমরা সকলেই আর খুব বেশি ভাবিনা,সব কিছুই কেমন গা – স‌ওয়া হয়ে গেছে

আবার এক সংগ্রামী বন্ধুর চিরবিদায়!

March 15, 2026 No Comments

আবার এক বন্ধুর বিয়োগ ঘটলো আমাদের। ‘আমাদের’ – মানে সরকারবিরোধী সংগ্রামী জনতার। বিশেষভাবে শ্রমিক তথা মেহনতী শ্রমজীবী মানুষের রুটি রুজির লড়াইয়ে দীর্ঘদিনের অবিচল সাথী কমরেড

দিল্লীর যন্তর মন্তরে অল ইন্ডিয়া স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের সভাপতি সুভাষ লাম্বার বক্তব্য

March 14, 2026 No Comments

জেনে নেবেন

March 14, 2026 No Comments

কখনো আমার প্রপিতামহকে দেখলে প্রাচীন ভারতবর্ষের ইতিহাস জেনে নেবেন আর্যরা বহিরাগত ছিলেন কিনা মনুদেব তখনো বৌ পেটাতেন কিনা জেনে নেবেন কখনো আমার পিতামহকে দেখলে পরাধীন

সাম্প্রতিক পোস্ট

আইনী আপডেট

West Bengal Junior Doctors Front March 15, 2026

ভারতের শহরের বিপন্ন বায়ু এবং নাগরিক স্বাস্থ্য

Somnath Mukhopadhyay March 15, 2026

আবার এক সংগ্রামী বন্ধুর চিরবিদায়!

Dipak Piplai March 15, 2026

দিল্লীর যন্তর মন্তরে অল ইন্ডিয়া স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের সভাপতি সুভাষ লাম্বার বক্তব্য

Abhaya Mancha March 14, 2026

জেনে নেবেন

Aritra De March 14, 2026

An Initiative of Swasthyer Britto society

আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।

Contact Us

Editorial Committee:
Dr. Punyabrata Gun
Dr. Jayanta Das
Dr. Chinmay Nath
Dr. Indranil Saha
Dr. Aindril Bhowmik
Executive Editor: Piyali Dey Biswas

Address: 

Shramajibi Swasthya Udyog
HA 44, Salt Lake, Sector-3, Kolkata-700097

Leave an audio message

নীচে Justori র মাধ্যমে আমাদের সদস্য হন  – নিজে বলুন আপনার প্রশ্ন, মতামত – সরাসরি উত্তর পান ডাক্তারের কাছ থেকে

Total Visitor

613278
Share on facebook
Share on google
Share on twitter
Share on linkedin

Copyright © 2019 by Doctors’ Dialogue

wpDiscuz

আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।

[wppb-register]