সাম্প্রতিক নেপালের গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের গণ অভ্যুত্থানের অনেক মিল থাকলেও অনেক অমিল রয়েছে। আমরা আগেই আলোচনা করেছি যে পিছনে বৃহৎ শক্তির ডিপ স্টেট, গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্ররোচনা, অর্থ সাহায্য, পরিকল্পনা ইত্যাদি থাকলেও মুলত কোভিড পরবর্তী আর্থিক মন্দা, একদা জনগণের নয়নের মণি জনপ্রিয় শাসকদের ক্রমবর্ধমান অপশাসন, স্বেচ্ছাচার, স্বৈরাচার, দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, পরিবারতন্ত্র, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার ইত্যাদি এবং তজ্জনিত প্রবল আর্থিক বৈষম্য, মদ্রাস্ফীতি, দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, সামাজিক অস্থিরতা ইত্যাদি ছিল এই গণঅভ্যুত্থানগুলির প্রধান কারণ। কোথাও জ্বালানির তীব্র সঙ্কট, কোথাও মুক্তিযোদ্ধা কোটার মাধ্যমে স্বজনপোষণ ও দুর্নীতি, কোথাওবা সমাজ মাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া আন্দোলনের ট্রিগার পয়েন্টের কাজ করেছে। শ্রীলঙ্কায় ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ অবধি এলটিটিই এর সঙ্গে ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত জয়ের মুখ দেখানো মাহিন্দা, গোতাবায়া, বাসিল আর চামালা রাজাপাক্সে – উগ্র জাতিয়তাবাদী চার ভাই ১৯০৯ থেকে ২০২২ এর গণঅভ্যুত্থান অবধি নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের জনক শেখ মুজিবর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা ওয়াজেদ ১৯৯৬ – ২০০১ এবং ২০০৯ – ২০২৪, ২০ বছর শাসন ক্ষমতায় ছিলেন। নেপালে ২০০৮ খেকে ১৭ বছর প্রচণ্ড, দেওবা, ওলিরা ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন। গণঅভ্যুত্থানে তিনটি দেশেই ক্ষমতাসীন শাসকরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন এবং সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ থাকে।
আবার তিনটি গণঅভ্যুত্থানের অনেকদিক থেকে অমিল রয়েছে। শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে পরিস্থিতি ঘনীভূত হতে কয়েক মাস লাগলেও অভ্যুত্থানগুলি ঘটেছে মাত্র কয়েকদিনে। নেপালে আরও কম। শ্রীলঙ্কার ২০২২ এর গণঅভ্যুত্থানে ব্যাপক গণরোষ আছড়ে পড়লেও এবং প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ জনগণ দখল করে নিলেও হিংসা, খুনোখুনি, লুঠতরাজের ঘটনা নগণ্য। দুপক্ষে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছিল। বিপরীতে বাংলাদেশে ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে একদিকে পুলিশ – র্যাফের আন্দোলনকারীদের উপর আক্রমণ, অন্যদিকে আন্দোলনকারী তথাকথিত ছাত্র জনতার সঙ্গে মিশে জামাত, হেফাজতে, রাজাকার সহ ইসলামি মৌলবাদী ও সন্ত্রাসবাদীরা ব্যাপক হিংসা, খুনোখুনি, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস, লুঠপাট, জেল ভেঙ্গে অপরাধীদের বের করে আনা, পুলিশ নিধন; বিরোধী আওয়ামী লিগ নেতা – কর্মী, সংখ্যালঘু – হিন্দু, বৌদ্ধ, বাউল, ফকির; শিল্পী; সাংবাদিক; বামপন্থী, প্রতিবাদী প্রভৃতিদের উপর আক্রমণ ও হত্যা, হিন্দু – বৌদ্ধ জনজাতি নারী নিগ্রহ, ধর্মস্থান ধ্বংস, ধর্ষণ, গৃহ – সম্পত্তি লুঠ ইত্যাদি ব্যাপকভাবে ঘটে চলে। প্রাণহানী হয় কয়েক হাজার। আর ছিল ঐ আন্দোলনের প্রবল ভারত বিরোধিতা যাতে বিএনপি সহ সমস্ত বিরোধী দলও সামিল হয়।
নেপালের ক্ষেত্রে আমরা দেখলাম ক্ষমতাসীন নেতা মন্ত্রীদের উপর আক্রমণ হলেও পুলিশের গুলি চালনায় মৃত্যু, গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া ডি এস পি কে হত্যা, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ঝালানাথ খানাল এর স্ত্রীর আটকে পড়ে পুড়ে মৃত্যু ছাড়া আর কোন খুনোখুনির খবর নেই। কিন্তু সরকারি সম্পত্তি, বাণিজ্যিক হোটেল, শপিং মল সহ ব্যাপক ধ্বংস, অগ্নি সংযোগ ও লুঠপাট ছিল বেলাগাম। ক্ষয়ক্ষতির অঙ্ক দাঁড়িয়েছে তিন লক্ষ কোটি নেপালি টাকা অর্থাৎ দেশের ছয়মাসের বাজেট। তিন কোটি জনসংখ্যার নেপালে ৩০ লক্ষ মানুষ ভারতে এবং ৩০ লক্ষ মানুষ অন্য দেশে কাজ করে অর্থ পাঠান। প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার মানুষ কাজের সন্ধানে দেশ ছাড়েন। সস্তা শ্রমিক ছাড়াও মানবপাচারকারী আড়কাঠি রা প্রতিদিন নেপালের পাহাড়ি অজ গ্রামগুলি থেকে কয়েক শত বালিকা, কিশোরী ও যুবতীদের নানা কায়দায় নিয়ে এসে ভারত ও অন্যদেশের পতিতালয় গুলিতে পৌঁছে দেয়। এইরকম এক দরিদ্র দুর্দশাগ্রস্ত দেশের এই বিশাল আর্থিক ক্ষতি অপূরণীয়। শ্রীলঙ্কা ও নেপালে সাধারণ মানুষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু দের উপর কোন আক্রমণ হয়নি।
শ্রীলঙ্কা সাগরবেষ্টিত ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্র, বাংলাদেশ ভারতীয় ভূখণ্ড দিয়ে তিনদিক ঘেরা নদীবিধৌত সমভূমি এবং নেপাল চিনা তিব্বত ও ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে বিশ্বের সর্বচ্চ হিমালয় পর্বতমালার কোলে অবস্থিত একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। শ্রীলঙ্কা প্রধানত থেরবাদী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেশ, বাংলাদেশ প্রধানত সালাফি সুন্নি ইসলাম ধর্মাবলম্বী দেশ এবং নেপাল প্রধানত শৈব হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তিনটি দেশেই রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে ধর্মের প্রভাব প্রবল। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবনের মান ইত্যাদি সূচকে উপমহাদেশের মধ্যে অনেক এগিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমাপে শ্রীলঙ্কার স্থান মধ্য – নিম্ন পর্যায়ে। বাংলাদেশ ও নেপাল বিভিন্ন সূচকে সহোদর ভারতের সঙ্গে বিশ্বের মধ্যে পিছনের সারিতে প্রায় পাশাপাশি। বাংলাদেশ ও নেপাল দুটিই গরীব দেশ এবং দুটি দেশ থেকেই জীবন জীবিকা, নিরাপত্তার কারণে অভিবাসনের হার অত্যধিক। তার মধ্যেও শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়নে ও পরিকাঠামো গঠনে যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটিয়েছিল, বিপরীতে ব্রাহ্মণ – কমিউনিস্ট দের কুশাসনে ও উপর্যুপরি ভূমিকম্পে নেপালের আর্থিক ও পরিকাঠামো শোচনীয় হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের জনঘনত্ব অত্যন্ত বেশি এবং নেপালের জনঘনত্ব খুবই কম।
শ্রীলঙ্কায় নির্বাচনের মাধ্যমে অনুরা দিশানায়েকের বামপন্থী সরকার দেশের আর্থ সামাজিক স্থিতিশীলতা অর্জনে প্রচেষ্টারত। নেপালে গণঅভ্যুত্থানকারীদের পছন্দের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী এবং প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকি বলেছেন ছয়মাসের মধ্যে নির্বাচন করাটা ম্যানডেট। বিপরীতে বাংলাদেশে বিদেশাগত মহম্মদ ইউনুস চাইছেন নির্বাচন যতটা সম্ভব পিছিয়ে দিয়ে ক্ষমতা ধরে রেখে জামাত সহ ইসলামি মৌলবাদীদের ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করতে। হাতে ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চিন, পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব, কাতার দের ডেকে আনছেন। আওয়ামী লীগকে শেষ করে দিতে চাইছেন এবং চালিয়ে যাচ্ছেন ভারত বিরোধিতা। তাই নেপালের গণঅভ্যুত্থানের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মিল এবং অমিল দুটি বিষয় ই মাথায় রাখতে হবে।










