ট্রাম্প প্রশাসন মাত্র ২-১ দিন আগে তার দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলেও আমার মতো মধ্যবিত্ত হেঁসেলে অনেক আগেই জরুরি অবস্থা জারী হয়ে গেছে। যখন থেকে নোভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কথা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে তখন থেকেই এই অবস্থা। সকাল, বিকেলে কী রান্না হবে, বাড়ির সবার পাতে কী খাবার দেব তা নিয়ে ভেবেই অস্থির। ভাবছেন, এর সঙ্গে আবার করোনার সম্পর্ক কী? হাড়ির খবর অবশেষে সামনে আনতেই হচ্ছে।
এত দিন সপ্তাহে দুদিন কনফার্মড নিরামিষ, বাকি পাঁচদিনে মাছ, ডিম, চিকেন ভাগযোগ করে মেনু ঠিক করা হোত।
করোনার কথা জানার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম বিদায় নিল চিকেন। যে কোনও ভাইরাস সক্রিয় হওয়া মানেই সবার আগে চিকেন বাদ। ডাক্তারবাবুরা যতই বলুন না কেন, খাবারের মাধ্যমে এই অসুখ ছড়ানোর কোনও চান্স নেই। কিন্তু আমরা অতি সাবধান। কাজেই চিকেন কেনার কোনও প্রশ্নই নেই।
অগত্যা কোলেস্টেরলের চোখ রাঙানির কথা ভুলে সেই সপ্তাহে একদিন মাটন আনা হল। মাটনের দাম শুনে প্রেশার খানিকটা বেড়ে গেলেও কিছু করার ছিল না। যতটা অন্য সময়ে আনি তার থেকে একটু কম করে হলেও কিনতে হল। হিসেবের সংসারে সামান্য বেহিসাবি হওয়ারও যে উপায় নেই! বাড়ি এসে জমিয়ে রান্না করে খাওয়া হল। সে খাবার হজম হওয়ার আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা ছবিতে দেখি কাঁচা মাটনের ওপর চলতাফিরতা করোনা ভাইরাস। সঙ্গে সঙ্গে বুক দুরুদুরু করে উঠল। আমরা যারা এই মাটন খেলাম সবাই সুস্থ থাকব তো! চোখের সামনে যা দেখছি তাকে অস্বীকার করার মতো সাহসী যে একেবারেই নই। সেই ছবিকে ধ্রুব সত্য বলে মনে করে সবাইকে দেখিয়ে তাদের মতামত নিলাম। সর্বসম্মতিক্রমে মাটন বিদায় নিল হেঁসেল থেকে। অবশিষ্ট যে মাটন পড়েছিল তা একরকম বুকে পাথরচাপা দিয়ে ফেলে দিতে হল।
এরপর আর কী। মাছে-ভাতে বাঙালি… ফিরে যেতে হল মাছেই। কিন্তু সে সুখও বেশিদিন সইল না। শোনা গেল এবং দেখাও গেল, তেলাপিয়া মাছে করোনা ভাইরাসরা আস্তানা গেড়েছে। তেলাপিয়া মাছ খেলে আর রক্ষে নেই। ওই ভাইরাস শরীরে চেপে বসবে। আর তেলাপিয়া মাছের জন্য তো কোনও আলাদা বাজার নেই। একই বাজারে সব মাছ বিক্রি হচ্ছে। একটার থেকে অন্যটায় ছড়াতে কতক্ষণ? অতএব মাছও ব্রাত্য হয়ে গেল।
চিকেন যখন বাদ তখন চিকেনের প্রোডাক্ট ডিম খাওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। বড়জোর হাঁসের ডিম চলতে পারে। তবে সে পাওয়া দুষ্কর। আর সপ্তাহে দুদিনের বেশি তা খাওয়া চলবে না।
তাহলে খাবটা কী? তার থেকেও বড় কথা সবার পাতে দেব কী? কারণ নিরামিষ খাবার কদিন আর মুখে রোচে? হাড়ির ভাত হাড়িতেই থেকে যায়। আবার বাজারে গেলেও অনেক লোকের মাঝে যেতে হবে। কাজেই বাজারেও যাওয়া ঠিক হবে না। রাস্তায় সবজি বিক্রেতার থেকে সবজি নেওয়া কতটা সেফ বুঝতে পারিনা।
আবার সেদিন এক ভিডিওতে দেখা গেল করোনা থেকে সেরে ওঠা এক মহিলার বক্তব্য হল, পেঁয়াজের সঙ্গে লবণ মিশিয়ে খান, করোনা ভাইরাস থাকলেও পেঁয়াজ হজমের আগে সেই জীবাণু হজম হয়ে যাবে অর্থাৎ করোনা পালানোর পথ পাবে না। অতএব বাড়িসুদ্ধ সবাইকে পেঁয়াজ খাওয়ানো শুরু করলাম। মনে মনে ভাবি, ভাগ্যিস এ সময়ে পেঁয়াজের দাম একটু কমেছিল। নাহলে তো করোনার থেকে মুক্তির কোনও পথ ছিল না। যদিও ডাক্তার বন্ধু পেঁয়াজের কথা শুনে বলল, ‘এ সব পাগলামি ছাড়। এই রোগ প্রতিরোধের জন্য নির্দিষ্ট যে গাইডলাইন আছে তা মেনে চল’।
ও ছাড়তে বললেও কি আর ছাড়তে পারি? তাই দিনরাত শুধু একটাই চিন্তা, কী রান্না করবো? সবাইকে কী খেতে দেব। সকালের তিনটে খবরের কাগজ থেকে বেছে বেছে করোনার খবর পড়ার পরেও যখনই সময় পাই টিভির খবরে চোখ রাখি। সন্ধ্যেবেলা শ্রীময়ী বা বাঘ বন্দি খেলায় আর মন বসে না। খবরের চ্যানেল খুঁজে বেড়ায় রিমোট। সেখান থেকে যদি কিছু বাড়তি তথ্য পাওয়া যায় সেই খোঁজ চলতে থাকে। জানিনা কবে এই জরুরি অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে হেঁসেল আবার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসবে?











