আমি বেসিকালি খানিকটা ঘরকুনো মানুষ। বইয়ে মুখ গুঁজে দিন কাটানো ছেড়ে বাইরে বেরোনোয় আমার প্রবল আলস্য। তাই, ফেসবুক প্রোফাইল দেখে যা-ই মনে হোক, বাস্তবে আমার বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা বেশ সীমিত।
অতএব বিভিন্নরকমের লেখাপত্র সামাজিক/রাজনৈতিক কাজে জড়িয়ে থাকি বটে, কিন্তু সেসব নিয়ে বাড়িতে প্রায়শই গঞ্জনা শুনি – “এই যে এসব লেখো, সরকার তো এমনিতেই তোমার উপর চটা, প্রশাসন বা পুলিশ যদি তোমাকে হ্যারাস করে, তাহলে কী হবে? আমি একা মানুষ, কোথায় দৌড়াবো?” (সত্যি বলতে কি, যেখানে ফেসবুকে সামান্য একখানা লেখার সুবাদে একটি কর্পোরেট সংস্থা আমার বিরুদ্ধে দশ কোটি টাকার মানহানির মামলা দায়ের করতে পেরেছিল, তখন এমন কিছু ঘটা যে অসম্ভব নয়, বরং নিতান্তই সম্ভব, সে তো বলাই বাহুল্য।)
কিন্তু এক্ষেত্রে আমার একটা স্ট্যান্ডার্ড উত্তর রেডি থাকে। বউকে বলি – তোমাকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। বিপদে পড়লে আমার পাশে থাকার লোক ঠিকই জুটে যাবে। কিছু করতে পারুক বা না পারুক, অনেকেই সঙ্গে থাকবে। অনেকেই আসবে, কিন্তু সবার আগে দৌড়ে আসবে চাকীদা Koushik Chaki
হ্যাঁ, সত্যিই, রণে-বনে-জঙ্গলে যেখানেই কেউ বিপদে পড়ে, স্মরণ করারও আগে যে মানুষটা দৌড়ে চলে যায়, সেই মানুষটাই কৌশিক চাকী। তো সেই চাকীদার বাড়িতে পুলিশ সমন পাঠিয়েছে। ডাক পড়েছে বউবাজার থানায়। কেন?
.
.
.
২০২৪ সালের অক্টোবর মাস। অভয়ার খুন ও ধর্ষণ নিয়ে মানুষের ক্ষোভ তখন তুঙ্গে৷
সরকারি হাসপাতালে ডিউটিরতা তরুণী চিকিৎসকের সঙ্গে যে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, সেই অবিশ্বাস্যে হতবাক হয়ে যাওয়া মানুষ, প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে পথে নেমেছেন। দিকে দিকে আছড়ে পড়ছে ক্ষোভ। ক্ষোভের বিস্তার দেখে মেলা-খেলা-মোচ্ছব দিয়ে অন্ধকার আড়াল করতে অভ্যস্ত প্রশাসন কিঞ্চিৎ দিশেহারা।
এ যদি একটা দিক হয়, তাহলে আরেকদিকে, ততদিনে মানুষ দেখে ফেলেছেন, প্রশাসন সদলবলে, এই জঘন্য অপরাধে দোষীদের ধরার চাইতে, অপরাধের প্রমাণ লোপাট করতে, অপরাধীদের আড়াল করতে বেশি ব্যস্ত। স্বাভাবিকভাবেই, প্রশাসনের কোনও স্তরের কোনও স্তোকবাক্যেই মানুষ ভরসা করছেন না।
ভরা পুজোর মরসুমে ধর্মতলার ধর্নামঞ্চে অনশনে বসেছেন জুনিয়র ডাক্তাররা। অনেকেই ভেবেছিলেন, উৎসবপ্রিয় বাঙালি ওদিক মাড়াবেন না। তাঁদের ভুল প্রমাণ করে দিয়ে, পুজো প্যান্ডেলের ভিড়কে হারিয়ে ধর্নামঞ্চে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি বেড়ে চলেছে রোজই।
প্রতিবাদে বিক্ষোভে মিছিলে কলকাতা তখন সত্যিই কল্লোলিনী তিলোত্তমা। দিনগুলো, আশা করি, কেউই ভুলে যাননি।
তার পর পেরিয়ে গেছে অনেকগুলো দিন, অনেক মাস। বিচার পাওয়া যাবেই – রাজ্যের পুলিশ না দিক, বিচার দেবে দেশের সেরা তদন্ত সংস্থা – এই বিশ্বাসটুকু তখনও ছিল। মাঝের এই মাসকয়েকে সে বিশ্বাসও গিয়েছে।
গণতান্ত্রিক পথে নির্বাচিত সরকার, সেই সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রশাসন, পুলিশ, তদন্তকারী সংস্থা থেকে শুরু করে আদালত অব্দি সবাই – মাঝের এই কয়েক মাস শিখিয়েছে, কারও উপরেই আস্থা রাখা যায় না। জাস্টিস যদি পেতেই হয়, তাহলে তা আদায় করে নিতে হয়। এবং সেই আদায়ের পথ রাস্তায় নামা। মোক্ষম এই শিক্ষা এতদিনে আত্মস্থ করা গিয়েছে।
অভয়ার খুন-ধর্ষণের পর এক বছর অতিক্রান্ত। বিচার না পাওয়ার হতাশা কাটিয়ে ক্রুদ্ধ মানুষ রাস্তায় নামছেন – বিচার আদায় করে নেবেন বলে।
এমতাবস্থায় সন্ত্রস্ত প্রশাসন কী করতে পারে? মানে সেই প্রশাসন, যারা অপরাধের প্রমাণ লোপাট করেছিল, অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা করেছিল – এবং, যদ্দূর মনে হয়, প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষভাবে, সেই অপরাধের অংশীদার ছিল? কী আশা করেন তাদের কাছ থেকে?
হ্যাঁ, যা আশা করেন, ঠিক তা-ই।
তারা টাকা ছড়িয়ে (যেমন ধরুন, পুজোয় অনুদান বৃদ্ধি) বা ভয় দেখিয়ে মানুষের মুখ বন্ধ করতে চাইছে।
ভয় দেখানো? কীভাবে?
২০২৪-এর অক্টোবর মাস দিয়ে এ লেখা শুরু করেছি। হ্যাঁ, মিছিল-মুখরিত সেই সময়ে দুখানা মিছিলের নাকি অনুমতি নেওয়া হয়নি। তাতে নাকি সাধারণ মানুষের খুব ভোগান্তি হয়েছিল। তো সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তি দেখে জনদরদী প্রশাসনের প্রাণ ডুকরে কেঁদে উঠেছে। (না, হাসপাতালে খুন-ধর্ষণ হলে, তার বিচার না হলে, একটি ব্যস্ততম হাসপাতালের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হয় না – তাই ঘটনার তদন্ত হয় দায়সারা।)
তো অতিমাত্রায় সংবেদনশীল এই প্রশাসন গত বছর অক্টোবর মাসে নিয়ম ভেঙে মিছিল করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ঘটানোর কারণে এক এক করে আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের থানায় ডেকে পাঠাচ্ছে। উদ্দেশ্য অতীব সাধু, বলাই বাহুল্য। ডাক স্রেফ জিজ্ঞাসাবাদের জন্যই। যেমন ধরুন, একেবারে শুরুতেই ডাক পড়েছে ডা কৌশিক চাকীর। তিনি ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের প্রেসিডেন্ট। ডাক পেয়েছেন মানসদা Manas Gumta এবং সুবর্ণ (সুবর্ণ গোস্বামী)। জুনিয়র ডাক্তারদের মধ্যে কিছু পরিচিত মুখও। সুতরাং…
আগামী আট ও নয় তারিখ, অভয়ার খুন-ধর্ষণের বর্ষপূর্তিতে জনগণের ধিকিধিকি করে জ্বলতে থাকা ক্ষোভ সুনামি হয়ে আছড়ে পড়তে চলেছে এই শহরে।
তার ঠিক আগে, বাড়ি বয়ে এসে এই সমন পাঠিয়ে থানায় ডাকাটা কেন, সে কি আর ব্যাখ্যা করতে হবে?
আসলে, নিজেরা খুব ভয় না পেলে, এমন বেপরোয়া হয়ে খড়কুটো আঁকড়ে ধরে ভয় দেখানোর চেষ্টা করা যায় না। প্রশাসন ভয় পাচ্ছে, এটুকু স্পষ্ট। আপনি ভয় পাবেন কিনা, সেটা আপনার চয়েস।
সত্যিটা আপনার সামনে। চয়েস আপনার হাতে। বাকি সিদ্ধান্তটা আপনিই নিন।









