২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ রাজ্য গ্রিভেন্স রিড্রেসাল কমিটি আয়োজিত স্বাস্থ্যদপ্তরের সিনিয়র-জুনিয়র চিকিৎসক, মেডিক্যাল ছাত্রছাত্রীদের আমন্ত্রণমূলক বৈঠকটি ঘিরে নাগরিক সমাজের কিছু আলোড়ন ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। ওই বৈঠকটিতে অভয়া হত্যাকান্ডের পর রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্য ও পুলিশমন্ত্রী কি বলেন তা জানার আগ্রহ ছিল। গ্রিভেন্স রিড্রেসাল কমিটি মেডিক্যাল কলেজ গুলিকে দুর্নীতি- দুর্বৃত্ত চক্র এবং ভয়ের রাজনীতি মুক্ত করতে কিছু সদর্থক পদক্ষেপ ঘোষণা করবে তেমন আশা ও ছিল। অভয়া হত্যাকাণ্ডের পর চিকিৎসক ও আপামর জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত চলমান আন্দোলন সরকারকে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য করেছিল, তার একটি হলো এই গ্রিভেন্স রিড্রেসাল কমিটি গঠন। এই কমিটির চেয়ারম্যান ও গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা বিগত প্রায় মাসখানেক সময় ধরে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও জেলাগুলিতে সভা করে স্বাস্থ্যব্যবস্থার বেশ কিছু সদর্থক পরিবর্তনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। থ্রেট কালচারের পাণ্ডাদের নাম উল্লেখ করে তাদের হাত থেকে নিরাপত্তা দানের প্রতিশ্রুতি ও দিয়েছিলেন।
গত ২২শে ফেব্রুয়ারি অভয়া মঞ্চ ও জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টর্স পশ্চিমবঙ্গ ও মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীকে একটি খোলা চিঠি দিয়েছিল রাজ্যের স্বাস্থ্যের হালহকিকৎ ও জনগণের প্রত্যাশা নিয়ে।
এখন মিটিং-এর পর আমরা *প্রাপ্তি/অপ্রাপ্তি* নিয়ে কিছু আলোচনা করতে চাই–
কিছু কথা যা না শোনা -না পাওয়া-অধরা হয়ে রইল
১। স্বাস্থ্য দপ্তর, মেডিকেল কাউন্সিল, হেলথ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড, হেলথ ইউনিভার্সিটি এককথায় স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা ওষুধ, সরঞ্জাম এমনকি বর্জ্য ও মৃতদেহ নিয়ে , পরীক্ষা, নিয়োগ, প্রমোশন, বদলি নিয়ে দুর্নীতি দুর্বৃত্ত চক্রের বিষয়টি আজ জনমানসে বহুল আলোচিত। কেউ কেউ CBI এর বিচারাধীন। কিন্তু এসবের কোন উল্লেখ আমরা দেখিনি ।
২। থ্রেট কালচারে অভিযুক্ত একাধিক চিকিৎসক, এমনকি কোন কোন প্রিন্সিপাল যাদের বিরুদ্ধে সরকার নিযুক্ত তদন্ত কমিটি প্রাথমিক তথ্যপ্রমানের ভিত্তিতে যে সব ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছিলেন তার রূপায়ণ নিয়েও ওই মিটিংএ কোন কথা হয়নি।
৩। সুষ্ঠু পরিষেবা দেওয়ার জন্য উপযুক্ত সংখ্যক চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিষয়টি আলোচনায় আসেনি।
৪। সন্দেহজনক ওষুধের ব্যবহারে রোগীর শারীরিক বিপর্যয় ও মৃত্যুমিছিল, এমনকি জাল ওষুধ চক্রের মত বিষয়ও অনালোচিত।
৫। মেডিক্যাল কাউন্সিল, পুলিশ ও প্রশাসন দ্বারা প্রতিবাদী চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও হেনস্থার বিষয়টি উল্লেখিত হয়নি।
৬। ক্যাম্পাস গণতন্ত্র যা এই আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল তার কথা শোনা যায়নি।
৭। দুর্নীতি -থ্রেট কালচারে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ও তাদের আশ্রয় প্রশ্রয়দানকারী অফিসারদের (প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি সহ) কিছু সময় পর অপসারণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, প্রতিশ্রুতি রাখা হয়নি।
৮। কেন্দ্রীয় রেফারাল ব্যবস্থা, হাসপাতালে রোগী বান্ধব পরিবেশ, সঠিক গুণমানের ওষুধ /সরঞ্জামের নিয়মিত সরবরাহ, বিকল যন্ত্রের দ্রুত মেরামতি এবং এই ধরণের অনেক বিষয় যা প্রতিশ্রুত ছিল তা রূপায়ণের সদর্থক পদক্ষেপ ঘোষণ করা হয়নি।
৯। হাসপাতালে সুরক্ষা ও অন্য বহু প্রশ্নে গঠিত রাজ্য স্তরের টাস্ক ফোর্স নিষ্ক্রিয় কেন তার জবাব পাওয়া যায়নি।
১০। জনগণের আন্দোলনের চাপে থ্রেট চক্রের পান্ডারা যারা কিছুটা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল, ঘুরপথে তাদের আবার স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত হওয়ার/ করার চেষ্টার বিরুদ্ধে কিছুই বলা হয়নি।
এখন পেলাম যা এবং তার হিসেব মেলানো
১। সরকারি চিকিৎসকদের প্র্যাক্টিস সংক্রান্ত একটি অতি নগণ্য সংস্কার ও BMOH দের আর্থিক অনুদানের (যা সমগোত্রীয় সাধারণ প্রশাসকদের তুলনায় অকিঞ্চিতকর) মতো একান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ওই সভায় বলার উদ্দেশ্য বোধগম্য হলো না।
২। কলেজ প্রতি দু কোটি (বলা হচ্ছে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কাজকর্ম পরিচালনার জন্য) নিয়েও অজস্র প্রশ্ন উঠেছে। যদি ওই অর্থ ছাত্র কাউন্সিল/ ইউনিয়নের হাতে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকে, তবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না করে কিছু মনোনীত /ঘনিষ্ঠদের হাতে এই বিপুল অর্থ আবার দাদাগিরি /থ্রেট কালচারকে নতুন ইন্ধন যোগাবে। আর যদি কলেজে কলেজে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশনের নির্দেশিকা অনুসারে খেলাধুলা /সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো তৈরির কথা ভাবা হয়, তবে তা এই মিটিংএ আলোচ্য বিষয় কিভাবে হয় জানা নেই এবং দুর্নীতির শিকড় উপড়ে না ফেললে এই অর্থেরও নয়ছয় হবে।
৩। সুরক্ষার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কিছু শোনা না গেলেও কিছু বিক্ষিপ্ত নির্দেশ এবং একটি উপদেশ পাওয়া গেল। ভাইদের প্রতি উপদেশ হলো বোনেদের সুরক্ষার দায়িত্ব নেওয়া। সহকর্মী /সহপাঠীরা পরস্পরের পাশে থাকবেন, এটা একান্তই স্বাভাবিক। কিন্তু বোনেদের দায়িত্ব ভাইদের দেওয়ার মধ্যে একদিকে যেমন প্রশাসনের দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলার ইচ্ছে ও অন্যদিকে এখানেও “রাতের সাথী” প্রকল্প চালু করার পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবই প্রকাশ পায়।
৪। হোস্টেল / কোয়ার্টার-এর মতো কিছু পরিকাঠামো তৈরি বা বছরে একবার চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনার কথা বলা হয়েছে। আমরা অপেক্ষায় রইলাম।
৫। আর জুনিয়র ও সিনিয়ার রেসিডেন্ট, পোষ্ট গ্রাজুয়েট ও পোষ্ট ডক্টরাল ট্রেনির ভাতা বৃদ্ধির একটি ঘোষণা সেদিন করা হয়। প্রসঙ্গত এরাজ্যের সিনিয়ার ও জুনিয়র চিকিৎসকদের বেতন ও ভাতা সর্বভারতীয় গড়ের অর্ধেকেরও কম এবং সিনিয়ার রেসিডেন্টদের ভাতা ৬ বছর বাড়েনি। অভয়া/তিলোত্তমা আন্দোলনে কোনভাবেই ভাতা বৃদ্ধির কোন দাবি ছিল না , তবুও সদিচ্ছা হলে এরকম একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনায়াসে একটি সরকারি আদেশনামা দিয়েই জানানো যেত। সেটা না করে কেন গ্রিভেন্স রিড্রেসাল কমিটি আহুত মিটিংএ ঘোষণা করা হলো তা অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। ভাতা বৃদ্ধি সঙ্গত হলেও এইভাবে ঘোষণা দুরভিসন্ধিমূলক এবং তা চিকিৎসক ও জনসাধারণের পারস্পরিক আস্থায় চিড় ধরিয়ে অভয়াদের সুবিচারের আন্দোলনকে দুর্বল করার চেষ্টা বলেই আমাদের মনে হয়।
এককথায় এই সভা আমাদের হতাশ করেছে। প্রায় কোন প্রশ্নেরই আমরা সদুত্তর পাইনি।
যতদিন পর্যন্ত স্বাস্থ্যসহ সমাজের সর্বক্ষেত্রে প্রশাসনিক রাজনৈতিক মদতপুষ্ট দুর্নীতি-দুর্বৃত্ত চক্র এবং ভয়ের পরিবেশ আমাদের সাধারণ জনজীবনকে বিপন্ন ও বিপর্যস্ত করবে, ততদিন শুধু ১ জন অভয়া নয়, অভয়া ২, ৩, ৪ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। তাই আমরা মাফিয়া সিন্ডিকেট মুক্ত, ভয়হীন একটা সমাজ গড়ে তোলার আহবান জানাই। সেই সমাজ গড়ার লক্ষ্যে নারী -প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার মানুষ সহ সকলের সুরক্ষা ও অধিকারের দাবিতে আইনি ও রাস্তার লড়াই আমাদের জারি থাকবে। আন্দোলন ভাঙার সব ধরনের চেষ্টাকে আমরা প্রতিহত করব।
ধন্যবাদ সহ
পুণ্যব্রত গুণ, মণীষা আদক এবং তমোনাশ চৌধুরী
আহ্বায়ক, অভয়া মঞ্চ












আনন্দবাজারের মতো কাগজে এটা বিবৃতি হিসেবে প্রকাশ করলে বেশি ভালো হবে।
সরকারের কাজ হল গোড়া কেটে আগায় জল ঢালা